সাহিত্য পাঠোত্তর আলোকাত

দীর্ঘশ্বাসভেজা আলিঙ্গন

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০২-২০১৯ ইং ০১:১২:৩৯ | সংবাদটি ২২৯ বার পঠিত


‘অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন, তার বক্ষে বেদনা অপার; অগ্নিসম জ্বলে অহির্নিশি।’ এই বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ের বিষাদমাখা দীর্ঘশ্বাস ধারণ করে ‘দীর্ঘশ্বাসভেজা আলিঙ্গন’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। জীবন মানেই সুখ দুঃখের মিশ্রণ। কেউ দুঃখ চায়না। তবু যাপিত জীবনে দুঃখ আছে, দুঃখ থাকবেই। এ চিরন্তন সত্য মেনে নিতেই হয়। এই বাস্তবতা শাব্দিক শিল্পিত বিন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে ‘দীর্ঘশ্বাসভেজা আলিঙ্গন’ কাব্যগ্রন্থ। এর কারিগর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চ ডিগ্রিধারী, পেশায় শিক্ষক কবি খয়রুজ্জামান খসরু। এটি তাঁর প্রথম প্রকাশনা। কিন্তু পাঠকের মনে হবে ‘বহুজল ঘেটে বহু পথ হেঁটে পরিপক্কতা অর্জন করেই খসরু তাঁর বইটি নিয়ে হাজির হয়েছেন সাহিত্যের অঙ্গনে। পাঠোত্তর প্রতিক্রিয়ায় আমরা তাঁকে বাংলা কবিতার বিস্তৃত অঙ্গনে সুস্বাগত জানাই।
খয়রুজ্জামান খসরু একজন প্রবাসী। প্রবাস জীবনে অনেকের সৃজনীসত্তা পাউন্ড ডলারের নিচে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু কেউ কেউ ব্যতিক্রম। শিল্পসাহিত্যের সঙ্গে নাড়ির অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তাঁরা ছিন্ন করতে পারেন না। কবি খয়রুজ্জামান খসরু তাদেরই একজন। এর প্রমাণ আলোচ্য বই। বইয়ের কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে গতানুগতিকতার উর্ধ্বে তিনি একজন শব্দশিল্পী। প্রথমে নামকরণটাই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আসলে জীবনের কাক্সিক্ষত অনাকাক্সিক্ষত প্রেম-বিরহ, হাসি কান্নার সঙ্গে আলিঙ্গন করেই বেঁচে থাকতে হয়। ফেলে আসা দিনের আনন্দ-সুখও এক সময় স্মৃতি হয়ে রূঢ় বর্তমানে দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়ে যায়। এরই মাঝে আবার চলমান জীবনের নানাবিধ যন্ত্রণা দিনের আরাম রাতের বিশ্রাম কেড়ে নেয়। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় দীর্ঘশ্বাসই জীবনের অনিবার্য সত্য। সামাজিক, পারিপার্শ্বিক জীবনের বিকৃতি, মানবিক বিচ্যুতি প্রভৃতি সজাগ সচেতন হৃদয়ে পীড়া দেয়। এরই কাব্যিক ছবি আছে আলোচ্য গ্রন্থে। এ রকম ছবি এঁকেই কবিরা লাভ করেন ‘অলৌকিক আনন্দ।’ এই আনন্দানুভূতি ভাগাভাগি করবার দক্ষতা সকলের থাকেনা। যাদের আছে তাঁরা হচ্ছেন শিল্পী। কবি খয়রুজ্জামান খসরুকে যেকোনো বোদ্ধা পাঠক এ তালিকায় ঠাঁই দেবেন। কবিতাগুলো পাঠ করে আমি নির্দ্বিধায় এটি প্রত্যাশা করি।
কবিতা হচ্ছে হৃদয় দিয়ে অনুভবের বিষয়। আধুনিক, উত্তরাধুনিক কাল পেরিয়ে বাংলা কবিতা এখন আঙ্গিক ও বাকভঙ্গিতে লাভ করেছে নতুন মাত্রা। এর স্বাদ পাঠ করেই ভোগ করতে হয়। মিষ্টির স্বাদ কেমন, তা লিখে অথবা বক্তৃতা দিয়ে পাঠক-শ্রোতার রসনায় পৌছানো যায়না। তবু ভালো লাগা মন্দ লাগার কথা আমরা বলি এবং লিখি। কারণ এটিও বাংলা সাহিত্যের একটি অঙ্গ। ‘দীর্ঘশ্বাসভেজা আলিঙ্গন’ বোদ্ধা যেকোনো পাঠককেই অন্তত স্বগতোক্তির তাড়না দেবে। একজন পাঠক হিসেবে বলছি, বহুদিন পর এই কবিতাগুচ্ছে নতুনত্বের স্বাদ পেয়েছি।
কী আছে এতে? শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণে না গিয়ে বলি, এতে আছে প্রখর আবেগ অনুভূতির মিশ্রণে জীবনের সমকালীন ছবি। নান্দনিক ভাষ্য ও চতুর শব্দচয়নে কবি এঁকেছেন চারপাশের মানচিত্র। ফেলে আসা জীবনের অলিগলি থেকে কুড়িয়ে এনেছেন উপকরণ। না, সরল ভাষ্যে নয়। শৈল্পিক কুশলতায় তিনি সমকালীন বাস্তবতাকেও পাঠকের পাতে উপহার দিয়েছেন।
সার্থক কবিতা পাঠককে শব্দাতীত ভুবনে নিয়ে যায়। খসরুর কবিতায় এ গুণটি বিদ্যমান। উপমা, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষা প্রয়োগ এবং শব্দচয়নে তাঁর দক্ষতা অসাধারণ। ইতিহাস, ঐতিহ্য, রূপকথা, লোক-বিশ্বাসের আশ্রয়ে কবি পাঠককে নিয়ে যান দূরে বহুদূরে। ‘মেঘের ভেতরে দেখি জুলেখার মুখ/ কবিতা রচিতে তাই লাগে বড় সুখ। সুখের সাগরে থাকে চন্দ্রাবতী সই/ চারদিকে শোরগোল গোপীনাথ কই।’ অথবা, ‘তালের পিঠা চোঙ্গা পিঠা ভাপা পিঠার সঙ্গে/ বিরইন চাউলের ভাত দিমু ইলিশভাজা পাতে।’ এ রকম পঙক্তিগুলো পাঠককে নিয়ে যায় নিজ স্মৃতি ও ঐতিহ্যের দুয়ারে। ছন্দে ছন্দে তিনি ছোটকালের ছোট কথা’য় অতীত দিনের ফুল তুলেছেন। শৈশবে গাছের ফল পাড়া, বড়দের নিষেধ অমান্য করে কাদাজলে সাঁতার, আমকুড়ানো, স্কুলকামাইর স্মৃতি পাঠককে নিয়ে যাবে শৈশব কৈশোরে। একইভাবে ক্ষুদিরাম, ঈশা খান, নূর হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ, শোষণ, বৈষম্য, ভেজাল সামাজিক রাজনৈতিক বিকৃতি ইত্যাদি উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। কোথাও ছন্দে ছন্দে, কোথাও গদ্যছন্দে শব্দের শিল্পিত যুৎসই বিন্যাসে। তাঁর ইচ্ছা: দমিয়ে রাখা পেছনের সারির লোকের অযুত কণ্ঠস্বর/ স্বর্গমর্ত পাতাল ভেদ করে বিছিয়ে দেওয়া চন্দনির রঙে/ মানুষকে এনে দিক অনাবিল প্রশান্তির এক মুঠো আশা। কবিতা হোক উষার অনাবিল আকাশ/মাটির গন্ধে কস্তুরি আমেজ।’ (কবিতা: ত্রিকোণমিতি)
আধুনিক কবিতার বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার প্রবল অভিযোগ ছিল একসময়। এখন অনেকটা স্তিমিত। তবে একেবারে বিলীন হয়নি। আসলে কবিতার পূর্ণস্বাদ গ্রহণ এ যুগে পাঠকের বিদ্যাস্বত্তার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। যেমন কবি খসরুর কবিতায়: মারণাস্ত্র তৈরি করে মানুষ হত্যার সাড়ম্বর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত/ হিটলার, হালাকু চেঙ্গিস ও রাবণ নিধনে তোমার আগমন বড়ই জরুরি--’ (প্রতীক্ষা)।’ এর সামগ্রিক মর্ম উপলব্ধির জন্য হিটলার, হালাকু রাবণ সম্পর্কে পূর্ব ধারণা থাকতে হবে। অর্থাৎ কবিতা এখন অগ্রসর চিন্তাচেতনার পাঠকের জন্য অধিকতর উপাদেয়। অবশ্য খয়রুজ্জামান খসরুর কবিতা গায়েগতরে, শব্দ, রূপক উপমা চয়নে আধুনিক হলেও সকল স্তরের পাঠকের জন্য সহজবোধ্য।
আলোচ্য বইটি আকারে ছোট। চার ফর্মার মধ্যে এক চল্লিশটি শিরোনামে কবিতাগুলো মুদ্রিত। গদ্য আঙ্গিকে, ছন্দ এবং গদ্য ছন্দে বর্ণগুচ্ছ, নীলিমাগুচ্ছ শিরোনামে আছে খ- কবিতাও। সব মিলিয়ে বৈচিত্র্যে মধুর ও চিত্তাকর্ষক বইটি প্রকাশ করেছে সিলেটের নাগরী প্রকাশন। প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০১৯। মূল্য ১৫৫ টাকা। আল নোমানের চমৎকার প্রচ্ছদে বইটির ছাপাও বলা যায় ত্রুটিমুক্ত। বইটি পাঠকমহলে সমাদৃত হবে, পাঠক হিসেবে এ আমার বিশ্বাস।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT