স্বাস্থ্য কুশল

শিশু কিশোরদের মানসিক সমস্যা

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০২-২০১৯ ইং ০০:৪৪:১০ | সংবাদটি ২৭৮ বার পঠিত

শিশুরা আমাদের নতুন সকাল। আর এই শিশুদের মনোজগৎ স্পর্শ করতে পেরেছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি শামসুর রহমান। যেমনÑ ‘কাকের ছায়া’ ছড়ায় তিনি মজার ছন্দে শিশুদের শিখিয়েছেন কিভাবে পথ খোঁজে বের করতে হয়। তাহলে ছড়াটি পড়া যাকÑ
কাঠফাটা সেই দুপুরে/ কাকটা গেল পুকুরে।/ পানি খাওয়ার আমেজে/ পুকুরপারে নামে যে।/ সরিয়ে ঝরা পাতাটা/ দেখে কাকের মাথাটা।/ কে এল ফের দুপুরে/ ভাগ বসাতে পুকুরে?/ ঠুকরে মজা পানিকে/ নিজের ছায়াখানিকে/ তাড়িয়ে দিয়ে ঘুসিতে/ নেচে ওঠে খুশিতে!
এসব ছড়া এখন শিশুদের খুব কম শোনানো হয়। ছড়ার বদলে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ভিডিও বা স্মার্টফোন গেমস। ফলে তাদের মন বিকশিত হয় না, বুদ্ধি প্রসার লাভ করতে পারে না। কিশোর বয়সে তারা গেমিংয়ের নেশায় ভোগে। একসময় মানসিকভাবে অসুস্থও হয়ে পড়ে অনেক শিশু কিশোর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউটের এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৮ বছরের উর্ধ্বে নাগরিকদের মধ্যে মানসিক রোগের প্রকোপ ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ১৮ বছরের নিচে শিশু কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগের প্রকোপ ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে, শিশু কিশোররাই তুলনামূলকভাবে মানসিক সমস্যায় বেশি আক্রান্ত। এটা ভয়ের কারণ এই জন্য যে, ওরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। শিশু কিশোরদের মধ্যে মানসিক সমস্যা হওয়ার কারণ দারিদ্র্য, পরিবার ও বিদ্যালয়ে নির্যাতন, মাদকাসক্তি, পড়ালেখা ও উদ্বেগ উৎকণ্ঠার চাপ, প্রেম অথবা পরীক্ষায় ব্যর্থতা, বিষণœতা ইত্যাদি।
তবে নতুন কিছু উপসর্গও শিশু কিশোরদের মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমনÑ কম্পিউটার, ভিডিও বা স্মার্টফোন গেমস। খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই গেমিংয়ের নেশাকে কয়েকটি দেশের প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রথমবারের মতো এটাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানসিক রোগ হিসেবেও স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছেন। এই আন্তর্জাতিক সংস্থার ১১তম ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজ (আইসিডি) তে এটাকে গেমিং ডিজঅর্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হবে বলে জানা যায়।
শিশু কিশোরদের সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করা, উত্ত্যক্ত করা, সাইবার বুলিং ইত্যাদিও ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই এখন বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ডিপ্রেশন বা বিষণœতা হবে বিশ্বের নাম্বার ওয়ান ডিজিজ বা রোগ যা থেকে শিশু কিশোরও আশঙ্কামুক্ত নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ সুইসাইড বা আত্মহত্যা। এটাকে বিশ্বব্যাপী ‘ফাস্ট ইমাজিং ডিজিজ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর এই আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ মানসিক বৈকল্য বা বিকারগ্রস্ততা। এর প্রধান ঝুঁকিতে আছে কন্যা শিশুরা। কারণ, এই কন্যা শিশু কিশোরীরা বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন, দাম্পত্য কলহ, প্রেমঘটিত সম্পর্কের জটিলতা, উত্ত্যক্ত, অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ ইত্যাদির শিকার হয়ে সুইসাইডের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। ১০ থেকে ১৯ বছরের মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে মানসিক সমস্যাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাছাড়া, আমাদের অনেক মানুষ আছেন, শারীরিক সমস্যা জটিল আকার ধারণ না করা পর্যন্ত ডাক্তার সাহেবের কাছে যাবে না। টিউমার, গলায় ক্যান্সার হয়ে গেলেও অনেক লোক রোগীকে হোমিওপ্যাথি ঔষধ সেবন করান। আরে বিজ্ঞানের যুগে এতো বোকা হলে কি চলে? এবার বোঝেন মানসিক রোগ হলে আমাদের দেশের লোকেরা কি করে। মানসিক রোগ সম্পর্কে আমাদের এখানে লোকজনের মধ্যে নেতিবাচক ধারণাও আছে। যেখানে একজন ডিপ্রেশনের প্যাশেন্টাক ঝবহঃরী-০৫ সম খাওয়ায় যদি মাত্র ৬ মাস, প্যাশেন্ট সুস্থ হয়ে ওঠবে। সেখানে জাদুটোনা ইত্যাদি ভুল ধারণা নিয়ে রোগীকে নিয়ে কবিরাজের কাছে যায়। এক সময় এই হালকা সমস্যা জটিল হয়ে যায়।
আমাদের সবাইকে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, মানসিক রোগী মাত্রই পাগল নয়। অথচ অনেক মা-বাবা তাদের মানসিকভাবে অসুস্থ ছেলেমেয়েকে শিকলে বেঁধে রাখেন। এটা একদম ঠিক নয়। এতে রোগী অসহায়বোধ করে। তাই মানসিক রোগী যদি কাউকে আক্রমণ বা আঘাত না করে, তাহলে তাকে কখনোই বিচ্ছিন্ন করা অথবা শিকলে বাঁধা ঠিক না। এই কাজটা যদি কেউ করে থাকে তাহলে সে অমানবিক কাজটির জন্য সৃষ্টিকর্তার আদালতের বিচারে শাস্তি পাবে। অর্থাৎ, এখানে আমি বলতে চাচ্ছি, নেচারাল একটা পানিশম্যান্ট সে পাবেই। কারণ, একটা সুস্থ পাখিকে বেঁধে রাখলে আমরা দেখি সে মুক্তভাবে চলাফেরার জন্য ছটফট করে। তাহলে মানুষ সুস্থ হোক আর অসুস্থ হোক শিকলে বেঁধে রাখলে সে কেন ছটফট করবে না? আর শিশু কিশোররা আরও বেশি মুক্তভাবে চলাফেরা করতে চায়। এই শিশু কিশোরদের কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে মা বাবা তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। এটা ঠিক না। এতে ওই শিশু বা কিশোরের মধ্যে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার মানসিকতা কাজ করে। আর বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে সে পাচারকারীর খপ্পড়েও পড়ে যেতে পারে। তাই এ ব্যাপারে আমাদের এখন থেকেই সিরিয়াস হওয়া দরকার। অর্থাৎ, শিশু কিশোরদের মানসিক সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন প্রপার ট্রিটম্যান্ট। এবং অবশ্যই, অবশ্যই দরকার মেন্টাল সাপোর্ট। অনেকে মানসিক রোগ ‘সিজোফ্রেনিয়া’র রোগীদের সাথে মিশেন না, কথা বলেন না অথচ ক্যান্সার রোগীর সাথে রিলাক্স মুডে কথা বলেন, তার হাতের খাবার খান। কিন্তু একজন মানসিক রোগীকে অবহেলা করেন। এটা কি টিক? সব রোগীই সমান। দেশের অন্যতম পপুলার দুই মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার জনাব মোহিত কামাল ও জনাবা মেখলা সরকার প্রতিদিন কতো মানসিক রোগী দেখেন। তাঁদের ফ্যাশন, ষ্টাইল দেখেছেন? বিশেষ করে ডাক্তার মেখলা সরকারকে দেখে কি বোঝা যায় যে তিনি একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ? কত স্মার্ট তাই না? তারা যদি মানসিক রোগীর সাথে স্বাচ্ছন্দ্যে মিশতে পারেন, কথা বলতে পারেন, তাহলে আমরা পারবো না কেন?
ডিপ্রেশনের রোগীকেও অনেকে মানসিক সমস্যা বলে অবহেলা করেন। অথচ ডিপ্রেশন কিছুই না। এটা হালকা প্রবলেম। আমরা সবাই যে কোনো দুঃসময়ে অথবা যে কোনো খারাপ খবর শোনার পর বিষণœ হয়ে পড়ি। এটাকে মুড অফ বলা যায়। রিলাক্সের ঔষধ সেবন করলে রোগীর মুড অন হয়ে যায়। অতীতকে নিয়ে ভাবার সময় পায় না সে। বিশ্বের অনেক তারকা সিঙ্গার, এ্যাক্টররাও এক সময় ডিপ্রেশনে ভোগতেন। এখন হাসি খুশি প্রাণবন্ত।
অতএব, কোনো মানসিক রোগীকে আমরা অবহেলা করবো না। বিশেষ করে শিশু কিশোরদের মানসিক রোগ হলে আমরা ¯েœহ মমতা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করবো। এতে কাজ না হলে অবশ্যই ডাক্তার দেখাবো, কবিরাজ নয়। আমাদের পলিটিক্যাল লিডাররা সবকিছু ডিজিটাল করতে চান। কিন্তু মান্দাতার আমলের সবকিছু বদলে ফেলতে গিয়ে কম্পিটিশনে লেগে যান যদি আপনারা, তাহলে ‘পাগল’ শব্দটি বদলে ফেলতে পারেন না? পথে ঘাটে এই যে এত মানসিক রোগী অসহায়ভাবে ঘুরে তাদেরকে ডিজিটালের আওতায় নিয়ে আসা হয় না কেন? মানসিক রোগীদেরও সাথে নিয়ে আমরা ‘চলো বদলে যাই’! শ্লোগান দিতে পারি না কেন? তাই আসুন আজ থেকে শিশু-কিশোর সহ সকল মানসিক রোগীকে আমরা জাস্ট, ‘প্যাশেন্ট’ বলবো। এবং যত দ্রুত সম্ভব এইসব ‘প্যাশেন্ট’দের উন্নতমানের চিকিৎসা সেবা দিয়ে স্বাভাবিক লাইফে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো। শিশু কিশোরদের মুড অবশ্যই অন রাখার চেষ্টা করবো। কারণ, একদিন হয়তো ওরাই বলবেÑ নোঙর তোলো! তোলো!/ সময় যে হলো! হলো!/ নোঙর তোলো তোলো!/ সময় যে হলো হলো!/ নোঙর তোলো! তোলো...।
নোঙর তোলার মতো পজিশনে শিশু কিশোরদের নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তো আমাদের। আমরা কি সেই দায়িত্ব ঠিকঠাক মতো পালন করছি?

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • এডিস মশা ডেঙ্গু ছড়ায়
  • রোগ প্রতিরোধে আনারস
  • স্থূলতা : এখনই ব্যবস্থা জরুরি
  • মেহেদীর কতো গুণ
  • যে সব খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর
  • শিশুকে ওষুধ দিন বয়স ও ওজন অনুযায়ী
  • জ্বর কমার পরের সময়টা ঝুঁকিপূর্ণ
  • কম্পিউটারজনিত চক্ষু সমস্যা
  • ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া জ্বরের লক্ষণ
  • ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায়
  • সুস্থ থাকতে ওজন নিয়ন্ত্রণ
  • স্মার্টফোনের প্রতি শিশুদের আসক্তিতে ভয়ানক ঝুঁকি!
  • বন্যায় স্বাস্থ্য সমস্যা : করণীয়
  • কম বয়সেও স্ট্রোক হতে পারে
  • থানকুনির রোগ নিরাময় গুণ
  • সাপের কামড় : জরুরী স্বাস্থ্য সমস্যা
  • প্রাকৃতিক মহৌষধ মধু
  • চোখ দিয়ে পানি পড়া
  •   তরুণদের মনোরোগ ও পরিবার
  • ঘাড় ব্যথায় করণীয়
  • Developed by: Sparkle IT