মহিলা সমাজ

বায়ান্নর অভূতপূর্ব স্মৃতি

মালেকা খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০২-২০১৯ ইং ০১:৩৯:৫৬ | সংবাদটি ২২০ বার পঠিত

ভাষার জন্য লড়াই করে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া বাঙালির যে কত বড় ত্যাগ, কত বড় সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য্য তা দেখে পৃথিবীর যে কোনো স্থানে বসবাসকারী বাঙালি অহংকার বোধ করে থাকে। বাংলাদেশ ছোট একটা দেশ। এই ছোট দেশটার মানুষের সাহস দেখে অবাক হয় বিশ্ববাসী।
আমার সুযোগ হয়েছিল ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশগ্রহণ করার। আমার স্কুল ছিল ঢাকার অভয়দাস লেনের কামরুন্নেসা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। আমি পড়তাম ক্লাস সেভেনে। টিফিনের ছুটির সময় পুকুর ঘাটে বসে উঁচু ক্লাসের আপারা আমাদের বোঝাতেন পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা ভাষাকে পছন্দ করে না। উর্দু হরফে বাংলা লিখতে হবে, পড়তে হবে। তাহলে কি করতে হবে জানো? আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে।
নুরি আপা, নীলুফার আপা, শাহাজাদী আপা, আনোয়ারা আপা আরও অনেকেই আমাদের মতো ছোটদের বোঝাতেন। সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের বোঝানো হতো বাংলা ভাষার জন্য প্রতিবাদ করতে হবে। মনে পড়ে খালেদা ফ্যান্সি আপার কথা, হামিদা আপার কথা, মমতাজ আপার কথা, হেনাদীর কথা, নূরননাহার আপার কথা, রোজী সুলতানা আপার কথা।
লতিফা আপা ঘোষণা দিলেন ৪ ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ বলে মিছিল করে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব। মনে পড়ে উঁচু ক্লাসের ছাত্রী হাসনা আপা, জুলেখা আপা, মাছুমা আপা, পারুল আপা, মুকুল আপা, বকুল আপা, মলি আপা, শেলী আপার কথা। মনে পড়ে অনেক আপা ও ভাইয়ের মুখ। শিক্ষকদের নিষেধ অমান্য করে মাতৃভাষার জন্য ৪ ফেব্রুয়ারি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ছোট থেকে বড় এভাবেই ছাত্রীদের দুই লাইনে দাঁড় করানো হলো। গেইটের দারোয়ান ছিল ভাতুদা। স্বাস্থ্যবান ভাতুদা তার সমস্ত শরীর আর দুই হাত দিয়ে তালাবদ্ধ বিশাল গেইট আঁকড়ে আছেন। হাট্ যাও, হাট্ যাও বলে চিৎকার করছেন। একটা হুলস্থূল কা-। এক সময়ে কোনো এক ছাত্রী কি কৌশলে যেন ভাতুদার কোমর থেকে চাবির গোছা ছিনিয়ে আনলো। হৈ-হৈ-রৈ-রৈ করে তালা খুলে গেইটের দুই ডালা খুলে দিলেন আপারা। আমরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ বলতে বলতে গেইট দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
মিছিলটা অভয়দাস লেন ছেড়ে হাটখোলা রোডে উঠল। পথের দুধারের মানুষ করতালি দিয়ে উৎসাহিত করছিল, আর ছাত্রীদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই শ্লোগানে মুখরিত করছিল ঢাকার আকাশ বাতাস। একরাশ বিস্ময় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আমাদের মিছিল এসে থামল। সুশৃঙ্খলভাবেই কামরুন্নেছা স্কুলের বিশাল মিছিলটির ছাত্রীরা এক জায়গায় থাকলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইবোনেরা করতালি দিয়ে আমাদের অভিনন্দন জানালো। বড় বড় আপারা আমাদের বুঝিয়ে বললেন আমরা এমনই করে আবার মিছিল করে আসব ২১ ফেব্রুয়ারি।
এসেছি মিছিল করে, এখন ফিরতে হবে নিজেদের মতো করে। আপারা বলে দিয়েছিলেন কাছাকাছি যারা থাক তারা একসঙ্গে যেয়ো। সহপাঠী শওকত ও আমি কাছাকাছি থাকতাম। ঠিক হলো আমরা রিকশা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাব। শওকতদের বাড়ির মোটামুটি কাছাকাছি আসার পর শওকত বলল, ঐ যে বাবা দাঁড়িয়ে আছে।
দারুণ চিন্তায় পড়ে গেলাম দুজনে। আমরা তো স্কুলের গাড়িতে আসা-যাওয়া করি। এভাবে রিকশায় আসতে দেখলে অভিভাবকরা কি বলবেন, তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তাই ভয় করছিল। তা ছাড়া আমাদের কাছে রিকশা ভাড়াও নেই। অগত্যা রিকশাওয়ালাকে অনুনয় বিনয় করে বললাম, এখন তো আমাদের কাছে পয়সা নাই, কালকে বিকেল পাঁচটায় এলে পয়সা দিয়ে দেব। কী জানি কেন, রিকশাওয়ালা আমাদের কথায় রাজি হয়ে গেলেন।
আম্মা তখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। রিকশাওয়ালাকে মনে মনে কত যে ধন্যবাদ দিলাম। রাতের খাওয়ার পর বাবা পড়ার টেবিলের কাছে এসে আস্তে করে নীচু স্বরে বললেন, ‘কী রে, তোদের মিছিল কেমন হলো?’ ততক্ষণে আমার চোখে পানি ঝরা শুরু। আম্মা পাশের ঘর থেকে জানতে চাইলেন বাবার কিছু লাগবে কিনা? আমার বন্ধুসুলভ রসিক পিতা আমাকে রক্ষা করলেন। এ নিয়ে একটি কথাও বলেননি। ভোরে উঠে দেখি বাবা মর্নিংওয়াক থেকে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছেন, হাতে খবরের কাগজ। আমি গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম। মৃদুস্বরে বাবার কাছে ‘দশ আনা’ পয়সা চাইলাম। বাবা কোনো কথা না বলে পকেট থেকে একটা টাকা বের করে আমার হাতে দিলেন। স্কুলে গিয়ে শওকতের সঙ্গে দেখা। আমি টাকাটা শওকতের হাতে জোর করে দিলাম। কারণ রিকশাওয়ালা তো ওর বাসার সামনেই এসে অপেক্ষা করবে আর ভাড়াটা আমিই আগে জোগাড় করে ফেলেছি। টিফিনের পরে আমরা ক্লাসে ঢুকেছি। আমরা যারা ক্লাস না করে গতকাল মিছিলে গিয়েছিলাম তাদের অভিভাবকদের নামে একখানা চিঠি শ্রেণি শিক্ষক ধরিয়ে দিলেন আমাদের হাতে। আমরা হতভম্ব।
সে রাতে আমার ঘুম হয়নি। ভয়ে ভয়ে থাকলাম, বাবা আবার চিঠির উত্তরে কী লেখেন। চিঠির উত্তরটা খামে ভরে আমার পড়ার টেবিলে বই চাপা দিয়ে রেখে মর্নিংওয়াকে চলে গিয়েছিলেন বাবা। বাবার উত্তরটা খুউব সংক্ষিপ্ত ছিল ‘সকলের সঙ্গে মিছিলে অংশ নিয়েছে, এতে অন্যায়ের কিছু দেখি না।’ যথারীতি চিঠির উত্তর ক্লাস টিচারের কাছে জমা দিলাম।
আপাদের কথামত বায়ান্নর একুশ তারিখে আবার আমরা সমবেত হই কামরুন্নেছা স্কুলে। আমাদের উঁচু ক্লাসের আপারা আমাদের সংগঠিত করতে করতেই খবর এলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। তখন আপারা আমাদের বাড়ি ফেরার পরামর্শ দেন। এবার আর রিকশা নয়, যার যার মতো হেঁটে দৌড়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। গোটা ঢাকা শহর ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণে। সে এক অবিশ্বাস্য চেতনার উন্মেষ ঘটানোর স্মৃতি আমার। বায়ান্নোর ফেব্রুয়ারিতে কিশোর বয়সে আমরাও ভাষা আন্দোলনে শরিক হতে পেরেছি এটা আমার সারা জীবনের জন্য গর্ব হয়ে আছে।
একুশ মিশে আছে আমাদের সত্তার সঙ্গে। একুশ আমাদের সাহসের খুঁটি। একুশ আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশের প্রথম পাঠ। সেই বায়ান্নো থেকে অপেক্ষায় থাকি কবে আসবে আরেক একুশ।
লেখক : বায়ান্নোর স্কুলছাত্রীদের মিছিলের একজন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT