ইতিহাস ও ঐতিহ্য

গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস ও মুসলিম সাহিত্য সংসদ

মোহাম্মদ বদরুল আলম প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০২-২০১৯ ইং ০০:২৪:১৮ | সংবাদটি ১৮৪ বার পঠিত

শত বছরের ইতিহাস লালনের গৌরব ও গর্বের ধন, সংস্কৃতির পাদপীঠ ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’। এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে গবেষণা করব, এটা আমার জন্য অপার আনন্দের ও আগ্রহের বিষয়। কিন্তু একাডেমিক গবেষণা তিন/চার মাসের মধ্যে শেষ করতে হয়, পাশাপাশি অন্যান্য নিয়মিত কাজও করতে হয়। তাই সময় যতই এগুচ্ছে আমার ততই হতাশা বাড়ছে। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ প্রায় ৭ম যুগের নিকটবর্তী অর্থাৎ ৮৪ বছর (২০২১ সালে ৮৪ বছর পূর্ণ হবে)। আজ থেকে প্রায় ৭১৫ বছর পূর্বে হযরত শাহজালাল (রহ.) সিলেট শুভাগমন করে উন্নত সভ্যতার পত্তন করেছিলেন। আর তাঁর দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তাঁরই স্মৃতিধন্য এই সিলেট বাংলাদেশের সম্পদ, সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধি প্রতিক, সুপ্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারে ধন্য সিলেটের মাটি। স্বভাবতই সিলেটের ভূমিবরেণ্য চিন্তাবিদরা হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মিশনকে অব্যাহত রাখতে একটি সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লালন করে আসছিলেন। তাঁরই ধারাবাহিকতার ফসল হিসেবে ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’ বলে অনেকের মতামত। অন্যদিকে, বলা যায় ১৭৫৭ সালে ২৩ জুন পলাশী যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। শাসন ক্ষমতা আসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে। দীর্ঘ ২০০ বছর ইংরেজদের শাসনে মুসলমানদের রাজা তো গেছেই, রাজ্যও গেছে; সাথে ভাষাও। এখন তারা রাজ্যহারা, আপন ভাষাহারা, সংস্কৃতিহারা। আজ অফিস-আদালতে সেই ফার্সী ভাষা নেই, আগের সেই শিক্ষা ব্যবস্থা নেই, সবকিছু ইংরেজদের হাতে। রাজনৈতিকভাবে পরাজিত মুসলমানরা রাগে-দুঃখে-অভিমানে ইংরেজদের ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ না করায় আজ তাঁরা পিছিয়ে পড়েছে সর্বক্ষেত্রে (ভারতীয় মুসলমান সমাজ)। ১৭৫৭-১৮৫৭ সাল পর্যন্ত মুসলমানরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সঙ্গে একেরপর এক সশস্ত্র সংগ্রাম আন্দোলন করে সফল হতে পারেনি। তাই উনিশ শতকের শেষের দিকে কয়েক দশকে আপোষমূলক নিয়মতান্ত্রিক পথেই যাত্রা শুরু করে ভারতীয় মুসলমানরা। সেই সূত্রেই বিভিন্ন স্থানে সভা-সমিতি, সংগঠনের মাধ্যমে একত্রিত হয় মুসলমানরা। এই অভাববোধের ফসলই হলো মুসলিম লীগের জন্ম। তবে এ ধারণাটি বলা চলে তখনো অগ্রসরমান উচ্চবিত্ত সমাজে ছিল প্রায় সীমাবদ্ধ। এক্ষেত্রে নবাব আব্দুল লতিফ ও সৈয়দ আমির আলীর অবদান অনস্বীকার্য। ক্রমশঃ আধুনিক শিক্ষার প্রসার, আত্ম ও সমাজের চেতনার বিকাশ, বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রকাশ, ব্যক্তি উদ্যোগে পুথি-পুস্তক রচনা, নানা সভা সমিতির মাধ্যমে বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশক ভারতীয় বাঙালি মুসলিম সমাজের জাগরণের কাল। আর এই ধারার সফল ও মহতি উদ্যোগ ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’।
১৯৩৬ সালে ১৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ জন্মের আগে সিলেটে সাহিত্যচর্চার কোন উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান ছিল না। মুসলমান সমাজে সাহিত্যচর্চার ব্যাপক প্রচলন, বৃহত্তর সিলেটের বাংলাভাষী অজ্ঞাতনামা কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্য সংকলন, প্রাচীন পুথি সংগ্রহ এবং মুসলিম সাহিত্যসেবীদের সাহিত্যচর্চার সুযোগ দিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’। প্রাচীন সাহিত্য পত্রিকা আল ইসলাহ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আজীবন সম্পাদক মরহুম মুহম্মদ নূরুল হক তাঁর জীবনীতে লিখেন, ‘১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ১৫ সেপ্টেম্বর সংসদের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তখন আল ইসলাহ তৃতীয় বর্ষ আরম্ভ হয়েছে। এই সময় সৃজনশীল জনমত সুসংগঠিত হওয়ার সুযোগে মরহুম জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এবং মরহুম কবি আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে ভাববিনিময় ক্রমে ব্যাপক দাওয়াতের প্রেক্ষিতে যে বৈঠক হয় তাতে সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সংসদ নামে একটি সংস্থা বা সংগঠনের আত্মপ্রকাশ হয়। যা পরবর্তীকালে স্বনামধন্য ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’ নাম ধারণ করে’। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ পত্তনকালে সুফী কবি প্রয়াত হাসন রাজার সুযোগ্য পুত্র মরহুম কবি একলিমুর রাজাকে সভাপতি এবং দরগাহ শাহজালাল (রহ.) এর মুতাওয়াল্লি কথাসাহিত্যিক মরহুম আবু জাফর আব্দুল্লাহকে সম্পাদক করে, সহ-সভাপতি এডভোকেট আশরাফ উদ্দিন মোহাম্মদ চৌধুরী (এমএলএ), সহ-সম্পাদক সৈয়দ আব্দুল হাফিজ ও দেওয়ান অহিদুর রাজা চৌধুরী, সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ (এমএ), সৈয়দ আমিরুল ইসলাম (বিএ), ইকবাল হোসেন চৌধুরী, শেখ মোহাম্মদ সিকন্দর আলী, আবু মুক্তাদির মোহাম্মদ রইস, আবু মোহাম্মদ আব্দুজ্জাহের, মোহাম্মদ আব্দুল বারী চৌধুরী (বিএ) ও আব্দুল হাই নুর উদ্দিন প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ নিয়ে প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটি গঠিত হয়। বর্তমান কার্যকরী কমিটি ২০১৭-১৮ এর সভাপতি প্রফেসর মো. আব্দুল আজিজ, সহ-সভাপতি আ ন ম শফিকুল হক, লে. ক. সৈয়দ আলী আহমদ (অব:), আজিজ আহমদ সেলিম, মুহাম্মদ বাশিরুদ্দিন, সেলিম আউয়াল, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক দেওয়ান এ এইচ মাহমুদ রাজা চৌধুরী, সহ-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মুমিন আহমদ মবনু, কোষাধ্যক্ষ আব্দুস সাদেক লিপন এডভোকেট, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক আব্দুল মুকিত অপি, পাঠাগার সম্পাদক আহমদ মাহবুব ফেরদৌস, সদস্য মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সৈয়দ মুহিবুর রহমান, ডা. মোস্তাক আহমদ দীন, মো. শাহিনুর পাশা চৌধুরী, মাওলানা ফজলুল করিম আজাদ, অধ্যক্ষ মো. ছয়ফুল করিম চৌধুরী হায়াত, মো. রুহুল ফারুক, সৈয়দ মোহাম্মদ তাহের, জাহেদুর রহমান চৌধুরী, মুহিত চৌধুরী, শফিকুর রহমান চৌধুরী ও কামাল তৈয়ব। পিছিয়ে পড়া সিলেটের মুসলমানদের জীবনী শক্তি দানে উদ্যোগী হলেন আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়া। কাপ্তান মিয়া অবিভক্ত ভারতের আসাম রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী। ইংরেজি শিক্ষিত সিলেটী মানুষ। দরদী ও স্বজাতির প্রেমে উদ্বেলিত। বিশ শতকে সিলেটের প্রথম ইংরেজি শিক্ষিতদের মধ্যে তিনিই একমাত্র সিলেট ত্যাগ করেননি। কর্মক্ষেত্র হিসেবে সিলেটকেই বেছে নিয়েছিলেন।
প্রাচীনকালে আসূরবনিপাল ও আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি স্থাপনের মাধ্যমে গ্রন্থাগার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ১৭৭৮ সালে চালর্স উইলকিন্সের বাংলা হরফ নির্মাণ এবং ১৭৮৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির পত্তন বাংলার গ্রন্থাগার আন্দোলনের সূচনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে গ্রন্থাগার আন্দোলন জোরালো ভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। তবে এদেশের গ্রন্থাগার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বলা যেতে পারে, ১৮৫৪ সালে বাংলাদেশের প্রাচীনতম চারটি গ্রন্থাগার স্থাপনের মধ্য দিয়ে। ঢাকা সবচেয়ে পুরাতন গ্রন্থাগার ‘নথব্রক হল’ লাইব্রেরির কথা বলা যায়। ১৯৫৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির ভিত্তি স্থাপন করা হয় যাহা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিত। ১৯২৪ সালে ডিসেম্বর মাসে অল ইন্ডিয়া লাইব্রেরি কনফারেন্সে আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি প্রদেশে ডেলিগেশন এর সমন্বয়ে একটি রেজুলেশন পাস করা হয়। সেই কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘বেঙ্গল লাইব্রেরি এসোসিয়েশন’ গঠন করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হয় এবং পরবর্তীতে ‘পূর্বপাকিস্তান গ্রন্থাগার সমিতি’ নামধারণ করে। তৎকালিন পূর্বপাকিস্তান সমিতির বর্তমান নাম ‘বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি (খঅই)। দেশে গ্রন্থাগার ব্যবস্থার বিকাশ ও উন্নয়ন, গ্রন্থাগারিকতা পেশা ও পেশাজীবীদের কল্যাণে কাজ করার ব্রত নিয়ে ১৯৫৬ সালে মরহুম মুহম্মদ সিদ্দিক খান, আহমাদ হোসাইন, রাগিব হোসাইন প্রমূখ স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে তৎকালিন পূর্বপাকিস্তান গ্রন্থাগার সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর এ সমিতি ‘বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি’ হিসেবে রূপ লাভ করে। সমিতির উদ্যোগে ১৯৫৮ সালে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ৬ মাস মেয়াদী সার্টিফিকেট কোর্স চালু করা হয়। যা পরবর্তীতে ১ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্সে রূপ লাভ করে। বর্তমানে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে ১ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্স চালু আছে। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স চালু করেছে।
বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে প্রায় ১১০টি গ্রন্থাগার রয়েছে। এরমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ৮৭টি প্রায়। যা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অপ্রতুল। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এদেশের বেসরকারি একটি শীর্ষ স্থানীয় উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। মানবসম্পদ উন্নয়নে ও শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বর্তমানে ১২টি বিভাগের অধীনে বাইশটি একাডেমিক প্রোগ্রামে শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে ১৯৯৬ সালে ইউনিভার্সিটির যাত্রা শুরু হয়। তাঁরই ধারাবাহিকতা অনুভব করে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে জ্ঞানের আলো বিকশিত করতে; একটি উন্নত, দক্ষ, শিক্ষিত ও আলোকিত জাতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধীনে ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ লাইব্রেরির (সিলেট) বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটি সমীক্ষা’ শিরোনামে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব লিখিত আকারে পেশ করার জন্য গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইংরেজি এক সভায় অনুমোদন করে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। যার ফলে আজকের আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস।
বেসরকারি প্রাচীন কয়েকটি লাইব্রেরির মধ্যে অন্যতম লাইব্র্রেরি হচ্ছে, ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ লাইব্রেরি’। মাত্র ১৯টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে একসেশন রেজিস্টার অনুযায়ী ৫২,৫৭৭ খানা বই রয়েছে। অনেকের ধারণা একসেশন রেজিস্টারের বাইরেও অনেক বই রয়েছে। এর মধ্যে দুর্লভ সংগ্রহের একটি তালিকা করা হয়েছে, যাতে ১১০৬টি বই রয়েছে। তাছাড়া সম্রাট আওরঙ্গজেবের নিজ হাতের লিখা একখানা কোরআন শরিফ রয়েছে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ লাইব্রেরিতে। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সম্পর্কে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. গোলাম কাদির লেখক রাগিব হোসেন চৌধুরীর সম্পাদনায় রচিত ‘সিলেটের শতবর্ষের ঐতিহ্য কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’ গ্রন্থের ভূমিকা লিখতে গিয়ে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, ‘সুদীর্ঘ চার’শ আশি পৃষ্ঠার তথ্যবহুল এক গ্রন্থ। ঘটনাটি অপার আনন্দের ও শ্লাঘার বিষয় এই কারণে যে, এ জাতীয় কোন প্রতিষ্ঠানেরই লিখিত ইতিহাস নেই। এমন কি কলকাতার ‘এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল’ ও ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ এর মত প্রতিষ্ঠানেরও নেই। কখনও দু’একজন উৎসাহী সমাজকর্মী দু’একটি নিবন্ধের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ও অবদানের কথা স্মরণ করেছেন মাত্র। সেদিক থেকে রাগিব হোসেন চৌধিুরীর প্রয়াসকে বলা যেতে পারে অনন্য ও অভূতপূর্ব’।
জন্মগত হোক আর প্রকৃতিগত হোক মানুষ কোন না কোন ভাবে ভুল করে। প্রত্যেক লাইব্রেরিতে কিছু না কিছু সমস্যা থাকে, তেমনি কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ লাইব্রেরিতেও কিছু সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। তাঁর মধ্যে প্রধান সমস্যা হল, দক্ষ জনশক্তির অভাব, স্টক টেকিং ও পুস্তক ছাঁটাই ইত্যাদি। এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের জন্য স্টক টেকিং ও পুস্তক ছাঁটাই নিয়মিত করতে হবে। দক্ষ গ্রন্থাগারিক ও ক্যাটালগার নিয়োগ দিতে হবে। গ্রন্থাগার কর্মীদের বেতনসহ প্রয়োজনীয় ভাতাদি বৃদ্ধি করতে হবে। আশার কথা হলো, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ লাইব্রেরি ডিজিটালাইজেশন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। চলতি বছরে মুসলিম সাহিত্য সংসদের ওয়েবসাইট চালু হবে। এব্যাপারে কথা বলে জানতে পেরেছি কার্যকরী কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক দেওয়ান আবুল হোসেন মাহমুদ রাজা চৌধুরীর কাছ থেকে।তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ লাইব্রেরি অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সুস্থ্য-সুন্দর চিন্তা দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আমার পরিবর্তে যারা আসবে তাঁরাও সেই ধারা অব্যাহত রাখবে’।
পরিশেষে বলব, বর্তমান শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন করেছে বর্তমান সরকার। বছরের শুরুতে ছাত্রছাত্রী হাতে নতুন বইসহ শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়তন ও ডিজিটালাইজ করে শিক্ষার হার উত্তোরত্তর বৃদ্ধি করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা লাইব্রেরির গুরুত্ব বিবেচনায় এনে বাংলাদেশে প্রথম বারের মত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেন। ‘বই পড়ি, স্বদেশ গড়ি’ স্লোগানকে সামনে নিয়ে দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের গ্রন্থাগারিক পেশাজীবীরা বিভিন্ন ভাবে দিবসটি পালন করে। বই ইতিহাসের ধারক। একটি বই মানে সেখানে অসংখ্য তথ্যের ফুলঝুড়ি, অসংখ্য মানুষের কথামালা, অসংখ্য চরিত্রের বিচরণ। বইতে লিপিবদ্ধ হয় গল্প, কবিতা, ছড়া ইত্যাদি বিষয়। এক একটি বই কালের সাক্ষী। সে যেন হাজার বছরের পুরোনো বট গাছের মত। শুধু পার্থক্য হল একটি বটগাছ সময়ের চিহ্ন হিসেবে একই জায়গায় থাকে। কিন্তু বই হাত বদলায়, হয়তো একই বইয়ের মলাট বদলায়, বারংবার মুদ্রিত হয়। সৃষ্টি থেকে যায় লিখিত বক্তব্য আকারে। যত বই পড়ি ততই আমরা জানতে পারি। আর যা জানি সেই অনুযায়ী চিন্তাধারাকে পরিচালিত করি, সেভাবেই বাঁচি। কাজেই নিজেকে বাঁচাতে লাইব্রেরিকে বাঁচাতে সরকারের গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরি দিবস ঘোষণা এক দূরদর্শী চিন্তার ফসল বললে মোটেই ভুল হবে না। তাছাড়া স্কুলে সহকারি লাইব্রেরিয়ান, কলেজ সহকারি লাইব্রেরিয়ান পদ সৃষ্টি ও বাস্তবায়ন করছে বর্তমান ডিজিটাল সরকার। পরিশেষে লাইব্রেরিয়ানশিপ পেশার উন্নয়নে যাদের অবদান তাদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস ইতি টানছি। আল্লাহ সবার মঙ্গল করুক।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস
  •  পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • হারিয়ে যাচ্ছে গুম্বুজওয়ালা মসজিদ
  • একাত্তরের প্রতিরোধ যোদ্ধা
  • হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির গাছ
  • হবিগঞ্জের লোকখাদ্য
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • গ্রাম বাংলার ঢেঁকি
  • হযরত শাহজালাল (রহ.) ও ইবনে বতুতার মিথস্ক্রিয়া
  • যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক
  • মুক্তিযুদ্ধে ছাতক
  • একটি বিলুপ্ত বিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী
  • গড় যেভাবে গৌড় হলো
  • আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির কথকতা
  • ‘কান আই ঘাট’ থেকে কানাইঘাট
  • বেদে জীবনের চালচিত্র
  • ইয়ারানা ও বইনারী
  • আমেরিকা আবিস্কার ও রেড ইন্ডিয়ান
  • বাংলার জন্য প্রাণ দিলেন যারা
  • মুদ্রায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা
  • Developed by: Sparkle IT