ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের শিলপাটা

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০২-২০১৯ ইং ০০:২৫:১৯ | সংবাদটি ৩১ বার পঠিত

দুনিয়ার তাবৎ রান্না খাদ্যকে বিশেষজ্ঞরা প্রথমে প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। মশলামুক্ত ও মশলাযুক্ত। আমরা মশলাযুক্ত ভোক্তা দলের অন্তর্ভুক্ত। মশলা ছাড়া বাঙালি রাঁধুনি বা বাবুর্চি অচল। কত বিচিত্র মশলা আছে, এগুলো ছাড়া রসনা তৃপ্ত হয় না কিন্তু হিসাব মেলানোর গরজও কেউ বোধ করে না। পুরুষানুক্রমিক সবাই খেয়ে আসছেন। হিসাব রাখেন শুধু রাঁধুনি। মরিচ, পিঁয়াজ, হলুদ, আদা, রসুন, ধনিয়া, জিরা, দারুচিনি, লং, এলাচি, গোলমরিচ, শর্ষে, জয়ত্রী, লবঙ্গ, জায়ফল, আলু বোখারা, শাহিজিরা, কাবাবচিনি, বীটলবণ-এভাবে বলা হয় বারো মশলা। বারো নয় হিসাব কষলে সংখ্যা বাড়বে। বলতেই হবে রসনাবিলাসে আমাদের ঐতিহ্য অনন্য। এ দেশের মাটি ও আবহাওয়া নানা রকম মশলা উৎপাদনেরও উপযোগী। বলা হয় এই মশলার আকর্ষণেই সাত সাগর তেরো নদী পেরিয়ে আর পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে বিদেশি বণিকরা এক সময় ছুটে এসেছিল এ দেশে। মশলাযুক্ত পঞ্চব্যঞ্জন’ ছাড়া এ দেশের ভোজনরসিক পুরুষ তৃপ্ত হয়নি আর বউ-শাশুড়ি ও জামাই, সন্তানদের না-খাইয়ে শান্তি পাননি। কিন্তু মশলা তো আর ফলের মতো খাওয়া হয় না। এর কায়দা ও মেকদার বা পরিমাণ আছে। কেটে, বেটে একেবারে পিষে, ছেঁচে, গুঁড়ো করে ব্যবহার করা হয়। রান্নায় মাত্রা ঠিক রাখতে হয়। একইভাবে মশলাবাটা বা পেষা সঠিক না হলে বিপত্তি। মশলাখেকো এ জাতি সে কৌশলও ঠিক ঠিক আবিষ্কার করে নিয়েছিলেন। মশলা বাটতে হবে। আনো বড় বড় সাইজের পাথর। পাথর কেটে বানাও পাটা বা শিল ‘পোতাইল’, শিলপাটা বা শিলনোড়া। চ্যাপ্টা অংশ পাটা আর গোলাকার ভারী পাথরের রোলার বা পেষণদ- হলো পোতাইল বা নোড়া। এর ব্যবহার কবে প্রথম শুরু হয়েছিল জানা যায় না। তবে এ পদ্ধতি বহু প্রাচীন তা লোকসাহিত্য, প্রবাদপ্রবচন ইত্যাদি থেকে অনুমান করা যায়।
হিলে পাটায় ঘষাঘষি মরিচের পরান নাশ। এটি প্রবাদ। তো এই ঘষাঘষি ছাড়া মশলা খুব কমই কাজে লাগানো যায়। মরিচ, পিঁয়াজ, হলুদ, রসুন, আদা, বাখর বাঙালির প্রতিদিনের রান্নার উপকরণ। গরীব-ধনী-নির্বিশেষে কমবেশি মশলা লাগবেই। আর এর জন্য দরকার শিলপাটা। এমন বাড়ি ছিল না যার প্রতিটি রান্নাঘরের এক কোণায় বেড়ার সঙ্গে পাটা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়নি। তবে শুধু পাটা নয় শিলপাটায় জোড়। বেড়ার দিকে পাটার বুক আর বাইরের দিকে পিঠ রেখে দাঁড় করানো পাটার আড়ালে নোড়া। নিচে হয়তো এক টুকরো কাঠ বা খাট। গৃহিণীরা প্রয়োজনমতো প্লেট বা বাটিতে মরিচ, আদা ইত্যাদি নিয়ে বসতেন। পাটায় এক এক রকম মশলা রেখে বিশেষ কায়দায় শিল দিয়ে পেষার সময় ঘষঘষ শব্দ হতো। মাঝে মাঝে সামান্য পানির ছিটা দিচ্ছেন আর দু’হাতে শিল ঘষছেন। শরীরের ঊর্ধ্বাংশ তালে তালে হেলছে। এক সময় দেখা যেত পিঁয়াজ বা মরিচের অস্তিত্ব নেই। বাটিতে পড়ে আছে রঙের তারতম্য নিয়ে লেইর স্তূপ। মহিলারা একেকটি বাটিতে অথবা প্লেটে স্তূপ স্তূপ করে রাখতেন। একসঙ্গে কয়েক দিনের মশলাপেষা সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট সময়ের পর তা বাসি, গান্ধা বা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ঘরে ঘরে মশলাবাটা ছিল রুটিন কাজ। বিয়েশাদি, দাওয়াত-জিয়াফত দিয়ে মেহমান খাওয়ানোর সময় এ ঘর ও ঘর থেকে শিল নোড়া জড়ো করা হতো। মশলাবাটায় নিযুক্ত হতেন মেয়েরা বিশেষ করে শ্রমজীবী নারীরা। পিঁয়াজ, আদা, রসুন ঘাইল ছিয়ায় প্রথমে কুটার পর পাটায় এনে পেষা হতো। এসব মশলায় তৈরি হতো সুস্বাদু মুখরোচক নানা তরকারি, কারি, সালুন বা ব্যঞ্জন।
মশলাভুক বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে গবেষণা আছে। যে যাই বলুন, মশলাপ্রীতি ছিল এবং আছে। এই মশলাপ্রীতির মাত্রা আন্দাজ করার জন্য একটি তথ্য উল্লেখ করি। সাধারণত প্রতিদিনের খাবারে আদার ব্যবহার থাকে কম। অথচ দেশে এই আদার বার্ষিক চাহিদা ২ লাখ ১৯ হাজার টন। দেশে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে ১ লাখ ১০ হাজার টন আদা উৎপাদিত হয় এবং ঘাটতি পূরণ হয় আমদানি করে । চারশ’ কোটি টাকা এতে ব্যয় হয়। আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর নেয়ার প্রবাদ এখন তাই নিস্তেজ হয়ে গেছে (সূত্র : দৈনিক নয়া দিগন্ত; ১৫ জানুয়ারি ২০০৯)। অনুমান করা যায় কী পরিমাণ মশলা প্রতিদিন দেশে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য এতে বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। যে মশলা এক সময় বিদেশিদের টেনে এনেছিল সেই মশলাযুক্ত খাবার দিয়ে এখন আমরা ইউরোপ আমেরিকা জয় করে নিচ্ছি।
মশলার ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য শিলপাটা এখন হারিয়ে যাচ্ছে। গুঁড়ো মশলায় বাজার সয়লাব। মেশিনে ভেঙে গুঁড়ো মশলা দৃষ্টিনন্দন প্যাকেটে বাজারজাত হওয়ার পর থেকে গৃহিণী রাঁধুনিরা মশলা পেষার কষ্ট থেকে বেঁচে গেছেন। শিলপাটায় মশলা বাটতে কোমল হাত আর খসখসে হবে না। কারণ এখন শিলপাটার স্থান অনেকাংশে দখল করে নিয়েছে ব্লান্ডার। অনেক ঘরে তাই খানদানি পাটা হয়তো আছে কিন্তু ব্যবহার নেই। বাজারের প্যাকেট মশলায় ভেজালের দৌরাত্ম আছে। তবু কাটতি প্রচুর। গুঁড়ো মশলায় তরকারির স্বাদ কম হয় অথবা রঙ মনের মতো ফোটে না। এরকম অনুযোগ থাকলেও গুঁড়ো মশলাই এখন গ্রামগঞ্জেও ঘরে ঘরে ঢুকে গেছে। সনাতনপন্থিরাই কোনো রকম রান্নার কাজে পেষা মশলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
গুরুত্ব কমে এলেও গৃহস্থালির অনিবার্য উপকরণ শিলপাটা একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। শিলপাটা তৈরিতে সিলেট অঞ্চলের রয়েছে খ্যাতি। সিলেটের জাফলং, জৈন্তার পাটা শুধু দেশে নয় বিদেশেও সমাদৃত। জাফলং পাথরের জন্য বিখ্যাত। বিশাল পাথর কেটে শিল নোড়া তৈরির একটি পেশাজীবী সম্প্রদায় সেখানে গড়ে উঠেছে। ছোট বড় সাইজের পাটা তৈরির কলাকৌশল আছে। উন্নতমানের পাথর ও কারিগরদের দক্ষতায় এখানে যে পাটা তৈরি হয় তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাক, নৌকায় চালান হয়। নিম্নমানের পাথর হলে পাটায় মশলা পিষতে বালু উঠে যায়। জৈন্তার পাটায় এটি হয় না। পাটার মূল্য সাইজভেদে চার থেকে সাত আটশ’ টাকা (২০০৯)। ওজন বেশি হওয়াতে পরিবহন কষ্টকর। তবু সিলেটের পাটা ব্রিটেন পর্যন্ত চলে গেছে। সিমেন্ট দিয়েও শিল নোড়া তৈরি হয়। ওজনে হালকা। তবু গৃহিণীরা তা পছন্দ করেন না। কারণ মান পাথরের পাটার মতো উন্নত নয়। পাটা ক্ষয় হয় খুব ধীরে ধীরে। প্রথমে কিনে অমনিতে ঘষাঘষি করে ব্যবহারোপযোগী করতে হয়। পাটা ভোতা হলে তা ধার বা শান দেয়ার কাজ এক শ্রেণীর লোকের পেশা। বাড়ি বাড়ি এরা ঘুরতেন ‘এই-পাটা-ধার’ বলে হাঁক দিতেন। এখন এদের সংখ্যাও কমে আসছে। এ যুগে দেশে ভেজালের ভোজবাজিতে অনেকে আদি শিলপাটার দিকে ফিরতে আগ্রহী। বলা যায় না, হয়তো আবার সুদিন ফিরে পাবে শিলনোড়া।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুদ্রায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা
  • হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা
  • প্রথম ছাপানো বই
  • বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের শিলপাটা
  • গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস ও মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রাচীন মালয় রাষ্ট্র ব্রুনাই
  • সিলেটের ঐতিহ্য সুরমা
  • সিলেট অঞ্চলের ইংরেজি সংবাদপত্র
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সেকালে সিলেটের কেনাকাটা
  • লোকসংস্কৃতি ও আমাদের সাহিত্য
  • শীতের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস
  • বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অতীত ও বর্তমান
  • নাটোরের জমিদার রানী ভবানী
  • ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সাহিত্য সাময়িকী নিশানা
  • জলসার একাল-সেকাল
  • স্তম্ভবিহীন মসজিদ
  • বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠা
  • হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ
  • Developed by: Sparkle IT