ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রথম ছাপানো বই

জুবায়ের আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০২-২০১৯ ইং ০০:২৬:৪১ | সংবাদটি ৪১৭ বার পঠিত


খ্রিস্টানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেলই হচ্ছে বিশ্বে প্রথম ছাপা অক্ষরের বই। জার্মানির মেইঞ্জ শহরের জোহানেস গুটেনবার্গ ১৪৫২-১৪৫৫ সালের মধ্যে গ্রন্থটি ছাপেন। যদিও জার্মান বিবলিওগ্রাফার’রা দাবি করেন যে, গুটেনবার্গের এই মুদ্রণের পূর্ণতা পায় জোহান ফস্ট এবং পিটার স্কফারের হাতে। জোহান ফস্ট ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ী, যিনি গুটেনবার্গের ব্যবসার আইনি অংশীদারিত্ব লাভ করেন এবং পিটার ছিলেন গুটেনবার্গের সহকারী।
কার্ডিনাল জুলস মাজারিন ফরাসি ১৭৬০ সালে এক স্টেটসম্যানের বইয়ের ভেতরে প্রথম ছাপা হওয়া বাইবেলের একটি কপি খুঁজে পান। বলা হয়ে থাকে, প্রথম ছাপা হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বাইবেল ১৮০৮টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। পৃথিবীর সব থেকে পুরাতন ছাপার অক্ষরে মুদ্রিত এই বাইবেলকে তাই প্রকাশকের নামানুসারে গুটেনবার্গ বাইবেল বলা হয়ে থাকে। উক্ত বাইবেলকে ৪২ লাইন বাইবেলও বলা হয়ে থাকে। কারণ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিটি ছাপা পাতায় ৪২টি করে লাইন ছিল। প্যারিসে মাজারিন এটা ১৭৬০ সালে প্রথম খুঁজে পান, এ জন্য অনেকে এই বাইবেলকে মাজারিন বাইবেল নামে অভিহিত করেন। ১৪৪০ সালে জার্মান বিজ্ঞানী জোহানেস গুটেনবার্গ একটি ছাপাখানা আবিষ্কার করেন। বিংশ শতাব্দি পর্যন্ত গুটেনবার্গের তৈরিকৃত ছাপাখানার মূলনীতি অনুসরণ করা হয়েছে সকল ধরনের ছাপাখানায়। গুটেনবার্গ প্রথমে বাইবেল মুদ্রণ করেন। প্রথম মুদ্রণে ১৮০ কপি বাইবেল ছাপা হয়। বাইবেলটি লাতিন ভাষায় ছাপা হয়।

ভারতবর্ষে মুদ্রিত প্রথম বই
ভারতবর্ষে সর্ব প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে গোয়ায় কয়েকজন পর্তুগিজ জেসুইট পাদ্রীর আনুকূল্যে। একটি জাহাজে করে ছাপাখানাটিকে পর্তুগাল থেকে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে বর্তমান ইথিওপিয়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। মাঝপথে গোয়াতে বিশ্রামের জন্য জাহাজটি দাঁড়ায়। তারপর নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে আবিসিনিয়াতে না গিয়ে সেই ছাপাখানা গোয়াতেই প্রতিষ্ঠিত হয়। জন দা বুসামেন্ট নামক এক স্পেনীয় ধর্মযাজক ও মুদ্রাকর এই ছাপাখানা থেকে Concluss নামে একটি পর্তুগিজ ভাষায় রচিত ও রোমান অক্ষরে মুদ্রিত ধর্মপ্রচারমূলক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এটিই ভারতবর্ষে মুদ্রিত প্রথম বই। এরপর সেই প্রেসে আরো বেশকিছু গ্রন্থ ছাপা হয়। কিন্তু সবই ওই পর্তুগিজ ভাষায় ও রোমান হরফে।
ভারতীয় ভাষায় ছাপা প্রথম গ্রন্থটি আসতে সময় লেগেছিল আরো ২২ বছর! ১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে কেরালার কুইলন থেকে Doutrina Christ নামক একটি পর্তুগিজ বইয়ের তামিল অনুবাদ গ্রন্থ Christya Vannakanam প্রকাশিত হয়। এটিই ভারতীয় ভাষায় ও ভারতীয় হরফে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ। আর এই গ্রন্থ নির্মাণের জন্য তামিল মুদ্রাক্ষরগুলো তৈরির মাধ্যমে যিনি ভারতীয় মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসে পথিকৃত্ হয়ে থাকলেন তিনি একজন জেসুইট পাদ্রী, নাম জোহানেস গনজালভেস।

প্রথম ছাপানো বাংলা বই
প্রথম বাংলা অক্ষরে বই ছাপানো হয়েছিল ১৬৮২ সালে। তবে সেটা ভারতীয় উপমহাদেশে নয়, বাংলা ভাষার এই ইতিহাস রচিত হয় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। তবে বইটি পুরো পাওয়া যায়নি, বইটির কিছু ছেঁড়া পাতা পাওয়া গিয়েছিল। এতে যে তামার মুদ্রণের নমুনা পাওয়া যায় তার বর্ণগুলো ছিল তামার পাত থেকে মুদ্রিত। অর্থাৎ তখনো ঢালাই করা বাংলা বর্ণের প্রচলন হয়নি। এরপর ১৭২৫ সালে জার্মানিতে আরেকটি বাংলা বই ছাপা হয়েছিল। সেটিরও ছেঁড়া পাতাসহ নানা নমুনা পাওয়া গেছে। এই নমুনা থেকেই মূলত এসব বইয়ের সন্ধান মিলেছে।
বাংলায় লেখা সবচেয়ে পুরোনো যে মুদ্রিত বইটি পাওয়া গেছে তার নাম ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’। বইটি লিখেছিলেন মনোএল দ্য আসসুম্পসাঁও। তবে বইটি বাংলা বর্ণে নয়, মুদ্রিত হয়েছিল রোমান হরফে। বইটি লেখা হয়েছিল ১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে। তবে স্পেনের লিসবন থেকে ছেপে বের হয় ১৭৪৩ সালে।

বাংলাদেশের প্রথম ছাপাখানা
বাংলাদেশের প্রথম ছাপাখানা ‘বার্তাবহ যন্ত্র’ রংপুরে ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বাংলা মুদ্রণ শিল্পের জনক হলেন চার্লস উইলকিন্স। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সম্পূর্ণ বাংলা অক্ষর ঢালাই করে বাংলা মুদ্রণের যথার্থ অর্থে সূত্রপাত ঘটান।
রংপুরের পর ঢাকার ছোট কাটরায় ১৮৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাপাখানাটিকে বাংলার পুরোনো প্রেস বলা যায়, যা পরে ‘ঢাকা প্রেস’ নামে পরিচিত হয়। এখান থেকে ‘দ্য ঢাকা নিউজ’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। তবে ১৮৫৯ সালে বাবুবাজারের ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’কেই ঢাকার পুরোনো ছাপাখানার মর্যাদা দেওয়া হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা মালিক ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র। বিখ্যাত ‘ঢাকা প্রকাশ’ সাময়িকপত্রটি প্রকাশিত হতো এই ছাপাখানা থেকে। ‘সুলভ প্রেস’ (১৮৬৩) বা ‘গন্ডেরিয়া যন্ত্র’ (১৮৯১) ঢাকার ছাপাখানার প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রেস।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • Developed by: Sparkle IT