শিশু মেলা

ইড়িং বিড়িং তিড়িং

সঞ্জয় কর প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০২-২০১৯ ইং ০০:০৫:৫১ | সংবাদটি ১১৫ বার পঠিত


ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজনের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে অর্ক। সবার প্রশ্নের মূল কথা একটাই। স্কুলের সামনে আসতেই গজম্বর আলীর সাথে দেখা। গজম্বর আলীও সবার মতো বলে উঠলেন “মানুষ উন্নত জীবন যাপনের জন্য গ্রাম থেকে শহরে যায়। আর তোমরা শহর ছেড়ে গ্রামে এসেছো! মেম্বার সাহেবের বাড়ী ভাড়া করেছো! বলতো বাপু মতলবটা কি?
কোন কারণে শহর ছেড়ে গ্রামে এসেছে অর্কের পরিবার তা অর্ক ভালো ভাবে জানে। কিন্তু আব্বু আম্মুর নিষেধ আছে। কাউকে সত্যি কথাটা বলা যাবে না। সে গজম্বর আলীকে বলে-
- শহরের মানুষ গ্রামে আসতে নিষেধ আছে নাকি?
- তা নিষেধ থাকবে কেন?
গজম্বর আলী আর কথা বাড়ালেন না। মেম্বার সাহেবের ভাড়াটে বলে কথা। শুধু গজম্বর আলী নয় এলাকার কোন মানুষই বিষয়টি নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করছেন না। মেম্বার সাহেব উক্ত গ্রামের একজন প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য ব্যক্তি। কিছুদিন পূর্বে উনার ছোট ভাই খুন হয়েছেন। গভীর রাতে মুখোশধারী ডাকাতরা ঘরে ঢোকে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে চলে যায়। টাকা, পয়সা, সোনা দানা দূরের কথা একটা সুতাও নেয়নি ডাকাতরা। পুলিশের ধারণা ডাকাতি নয় পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই কেউ এরকম ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু কে? আজও তা জানা যায়নি।
চার সদস্যের পরিবার নিয়ে অর্কের আব্বু মেম্বারের বাড়ীতে এসেছেন। তারা হলেন অর্কের আব্বু সবুর উদ্দিন, চাচা গফুর উদ্দিন, অর্কের আম্মু এবং অর্ক। সবুর ও গফুর দু’জনেই দেখতে কুচকুচে কালো। স্বাস্থ্যবান, লম্বা, চোখ দু’টো বড় বড়, দু’জনেরই গোফ আছে কিন্তু সবুর সাহেবের গোফে সামান্য পাক ধরেছে। দু’জনেরই চুলগুলো ছোট ছোট। গ্রামের মানুষের অনেকেরই ধারনা সবুর এবং গফুর সাহেবরা ডিবি পুলিশের লোক। কেউ কেউ ভাবছেন সবুর ও গফুরকে ভাড়া করেছেন মেম্বার সাহেব নিজের নিরাপত্তার জন্য।
অর্কের কাছে কখনোই মোবাইল ফোন থাকতো না। এ গ্রামে আসার পর অর্ককে মোবাইল কিনে দিয়েছেন অর্কের আব্বু এবং খুব সাবধান করে বলে দিয়েছেন উনি যখনই ফোন করে বাড়ীতে আসতে বলবেন ঠিক তখনই যেন অর্ক স্কুল থেকে বাড়ীতে ফিরে আসে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে এ ব্যাপারে বলা আছে।
স্কুলের গেইটের ভেতর প্রবেশ করে অর্ক। স্কুল ভবনের সামনে ছোট্ট মাঠ। মাঠের চারদিকে ছোট বড় অসংখ্য গাছ যেন ছাতার মতো দাঁড়িয়ে আছে। মাঠে একটুও রোদ নেই। ঝিরঝির বাতাস বইছে। গাছের ডালে ডালে পাখিরা উড়াউড়ি করছে। বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন গাছের গোড়ায় বসে কি যেন বলছে। সেদিকে নজর পড়ে অর্কের। অর্কের সাথে আছে মেম্বার সাহেবের ছেলে পিপলু। অর্ক পিপলুকে বলে ছাত্রছাত্রীরা গাছের গুঁড়ায় বসে কি করছে?
- ওরা মন্ত্র পড়ে পোকা ধরছে।
- মন্ত্র না পড়ে পোকা ধরা যায় না?
- না
- কেন?
- মন্ত্র না পড়লে গাছের গুঁড়া থেকে পোকা বের হয় না।
- তাই বুঝি! চলতো দেখি।
অর্ক ও পিপলু একটি গাছের গুঁড়ার নিকট যায়। সেখানে একটি মেয়ে গাছের শিকড়ের নিকট মুখ নিয়ে জোরে জোরে মন্ত্র পড়ছে।
ইড়িং বিড়িং তিড়িং পোকা
তোর দুয়ারে দিলাম ঠোকা
পুকারে বুকারে হিং টিং ছট
আয় বেরিয়ে পটাপট।
মন্ত্র পড়া শেষ হতে না হতেই একটি পোকা বেরিয়ে এলো। পোকাটা হাতে নিয়ে পিপলু সেটা অর্ককে দেখালো। অর্ক বলে-
- এটি কি পোকা?
- ইড়িং বিড়িং তিড়িং পোকা।
- এটি কামড় দেয় না?
- না, এটি খুব নিরীহ ধরনের পোকা।
- পোকাটি মরে গেল নাকি?
- না, এটি মন্ত্র না পড়লে নড়াচড়া করে না।
- তাই?
যে হাতে পোকা পিপলু সে হাত মুখের কাছে নিয়ে জোরেজোরে মন্ত্র পড়তে লাগলো-
পুকারে বুকারে হিং টিং ছট
হাটরে হাট পটাপট।
মন্ত্র শেষ হতে না হতেই পোকা নড়াচড়া শুরু করলো। এ ধরনের পোকা কখনও দেখেনি অর্ক। পোকার এমন অদ্ভুদ নামও শোনেনি সে। অর্ক এই পোকার নাম দেয় অচিন পোকা। আব্বুর মতো তন্ত্র মন্ত্রে বিশ্বাসী নয় অর্ক। মন্ত্রের সাথে অচিন পোকা বের হওয়ার পেছনের যুক্তি খোঁজে সে। এক এক করে বেশ কয়েকটা গাছের গুঁড়ায় পোকা ধরা দেখলো অর্ক। মন্ত্র পড়ার কায়দাও এক। পোকা বের হওয়ার কায়দাটাও একই। মন্ত্র পড়লে পোকাটি নড়াচড়া করে নতুবা করে না। বিষয়টি ভাবিয়ে তুললো অর্ককে। এটাও বুঝা গেল পোকা ধরার মন্ত্রটি স্কুলের সকল ছাত্রছাত্রীদের মুখস্ত। স্কুলের এমন কোন ছাত্রছাত্রী নেই যে, এই মন্ত্রটি জানে না। মন্ত্র পড়ে পোকা ধরাটা যেন তাদের কাছে একটি মজার খেলা। এবার প্রতিটি গাছের গুঁড়ায় ঘাস, লতা পাতা হাত দিয়ে সরিয়ে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিল অর্ক। দেখা গেল প্রতিটি গাছের গুঁড়ার চতুর্দিকে প্রায় চার আঙ্গুল পর পর অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গর্ত। তার মধ্যে একটি গাছের গুঁড়ার ঘাস লতা পাতা কেটে পরিষ্কার করে অর্ক। সে পিপলুর কাছ থেকে পোকা ধরার মন্ত্রটি কাগজে লিখে নিয়ে উক্ত গাছের গুঁড়ার কাছে মুখ নিয়ে সবার মতো মন্ত্র পড়তে শুরু করলো। মন্ত্র পড়া শেষ হতে না হতেই যথারীতি বেরিয়ে এলো একটি পোকা। মন্ত্র পড়ার সময় যে ক্ষুদ্র গর্তটি অর্কের মুখ বরাবর ছিল ঠিক সে গর্ত থেকেই পোকাটি বের হলো। অনেক ভাবনার পর উপলব্ধি করে অর্ক। পোকাটি হাতে নিল সে। মোটেই নড়াচড়া করছে না পোকাটি। অর্কের হাতে যেন চুম্বকের মতো লেগে রইলো এটি। কোন রহস্য উদঘাটন করতে না পেরে ফের মন্ত্র পড়তে শুরু করলো অর্ক। কি আশ্চর্য! পোকাটি নড়ে চড়ে বসলো।
টিফিন পিরিয়ডে সকল ছাত্রছাত্রী পুনঃরায় বাহিরে বেরিয়ে এলো। সবাই খেলাধুলায় ব্যস্ত। কিন্তু অর্ক একটি পোকা ধরে নিয়ে ক্লাসরুমের বেঞ্চের উপর রেখে গভীর ভাবনায় ডুবে রইলো। কখন যে, টিফিন টাইম শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারলোনা সে। ক্লাসের ঘন্টা বেজে উঠলো। অর্কের ক্লাসরুমের ঠিক দরজা বরাবর বারান্দায় ঝুলানো ছিল ঘন্টাটি। দপ্তরি ঘন্টায় আওয়াজ তুলতেই, বেঞ্চে রাখা পোকাটি যেন ভয় পেয়ে নড়াচড়া শুরু করলো। সাথে সাথেই অর্কের কপালের চিন্তার রেখাগুলো বিলিন হয়ে মুখে যেন সফলতার হাসি ফুটে উঠলো।
পিপলু স্কুল ক্যাপ্টেন। অর্কের কথামতো পিপলু সব ক্লাসে জানিয়ে দিলো ছুটির পর সকল ছাত্রছাত্রী যেন স্কুলের মাঠে থাকে। অর্ক “ইড়িং বিড়িং তিড়িং পোকা” সম্পর্কে সবাইকে কিছু বলতে চায়। ছুটির ঘন্টা বাজলো। সকল ছাত্রছাত্রী অতি উৎসাহে স্কুলের মাঠে জড়ো হলো। সকলের মনে কৌতুহল, শহরের ছেলে অর্ক কি বলতে চায়? স্কুলের বারান্দায় পিপলুর সাথে দাঁড়িয়ে আছে অর্ক। অর্ক বলে “প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ তোমাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে। তোমরা মনে কর মন্ত্র গুণে অচিন পোকা গর্ত থেকে বের হয়ে আসে এবং নড়াচড়া করে। আসলে তা নয়। অচিন পোকাটি ভীষণ শব্দ ভীরু। পোকার গর্তের সামনে মুখ নিয়ে যেকোন শব্দ করলেই গর্তের ঠিক মুখের কাছে যে পোকাটি থাকে তার কানে শব্দ পৌঁছায়, তৎক্ষণাত ভয় পেয়ে পোকাটি বাহিরে বের হয়ে আসে।” অর্কের কথা কেউই মানলো না। সবাই প্রমাণ চাইলো। বাস্তব প্রমাণ দেখাতে অর্ক একটি গাছের নিকটে গেল এবং গাছের গর্তের কাছে মুখ নিয়ে জোরে জোরে বললো:
অচিন পোকা, অচিন পোকা
শব্দ কি ভয় পাও?
ভয় পেলে বেরিয়ে এসো
সবার ভুল ভাঙ্গাও।
সাথে সাথেই একটি পোকা বের হয়ে এলো। পোকাটি ধরে হাতে নিলো অর্ক। অর্কের যে হাতে পোকা সেই হাতের কাছে মুখ নিয়ে পিপলু ‘ভু’ করে খুব জোরে একটি আওয়াজ করলো। সাথে সাথে পুকাটি নড়াচড়া শুরু করলো। এবার সবার ভুল ভাঙ্গলো।
হঠাৎ অর্কের মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলো। ফোন রিসিভ করে কানে ধরে অর্ক। তার আব্বুর কন্ঠ শোনা গেল। “অর্ক তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসো।” দ্রুত গতিতে পিপলুকে নিয়ে বাড়ির দিকে অগ্রসর হলো অর্ক। বাড়িতে পৌঁছা মাত্রই অর্কের আম্মু বললেন-
- আজই আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে অর্ক।
- কেন আম্মু?
- সন্ত্রাসীরা আমাদের অবস্থান জেনে গেছে, ওরা তোমার আব্বুকে পেলে মেরে ফেলবে।
- আব্বুতো একজন সৎ ও আদর্শবান সাংবাদিক। সৎ মানুষের এতো কষ্ট কেন আম্মু?
- সৎ মানুষদের মহান আল্লাহ তায়ালা কঠিন পরীক্ষা নেন। তোমার আব্বু সেই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন।
অর্ক আর কোন কথা না বলে, বিষণœ মনে পিপলুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT