ধর্ম ও জীবন

মুমিনের জীবনের লক্ষ্য

মাওলানা তোফায়েল আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০২-২০১৯ ইং ০০:৪২:০৫ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

ইমাম ও খতিব, খন্দকার জামে মসজিদ, রায়নগর, সিলেট।
মুসলিম হল ইসলাম ধর্মকে নিজের ধর্ম বলে বিশ্বাস ও স্বীকার করে এমন ব্যক্তি। অপরদিকে মুমিন হল ইসলাম ধর্মকে নিজের ধর্ম বলে বিশ্বাস ও স্বীকার করার পাশাপাশি তা নিজের ভেতরে ও বাহিরে ধারণ করে এবং সাথে সাথে কঠোরভাবে এর নির্দেশাবলী মেনে চলে, এমন ব্যক্তি। অর্থাৎ, সকল মুমিন মুসলিম, কিন্তু সকল মুসলিম মুমিন নয়। মহান রাব্বুল আলামীন কুরআনের নানা জায়গায় মুমিনের বিভিন্ন পরিচয় তুলে ধরেছেন। যেমন ‘তারা সালাত কায়েম করে ও যাকাত প্রদান করে এবং তারা পরকালের প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে।’ (আন-নামল, ২৭/১-৩)
‘অবশ্যই মুমিনগণ সফল হয়েছে। যারা তাদের সালাতে বিনয়ী-নম্র-ভীত। আর যারা অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে। আর যারা যাকাত দানের ক্ষেত্রে সক্রিয়। আর যারা তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী। কেবলমাত্র তাদের স্ত্রীদের ও তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে (দাসীদের) ক্ষেত্রে তারা নিন্দনীয় নয়। অতঃপর যারা এছাড়া অন্যকে কামনা করবে তারাই সীমালংঘনকারী। আর যারা তাদের আমানতসমূহের ও ওয়াদার সংরক্ষণকারী। আর যারা তাদের সালাতসমূহের হেফাজত করে। তারাই হল উত্তরাধিকারী। যারা ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী লাভ করবে, তারা তাতে চিরস্থায়ী হবে।’ (মু‘মিনুন, ২৩/১-১১)
‘আসলে মুমিন তারাই, যখন আল্লাহর স্মরণ করা তখন তাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে আর যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় আর তারা তাদের রবের উপর ভরসা করে। যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই হল প্রকৃত মুমিন, তাদের রবের নিকট তাদের জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদাসমূহ আর ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।’ (আনফাল, ৮/২-৪)
‘আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী তারা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় ও অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করে, আর তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে আর যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, তাদের উপর আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। তাওবা, ৯/৭তারা তওবাকারী, ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুকুকারী, সিজদা আদায়কারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা হেফাযতকারী আর মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও।’ (আত-তাওবাহ, ৯/১১২)
আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন, ‘মুমিন ভালোবাসার বস্তু।’ মুমিন ব্যক্তি অপরকে ভালোবাসেন এবং অপর মানুষও মুমিনকে ভালোবাসে। মানুষকে ভালোবাসার অর্থ কী? ভালোবাসার অর্থ হলো, মানুষের মঙ্গল কামনা করা, মানুষকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করা এবং মানুষের বিরুদ্ধে কোনোরূপ হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ না করা। মানুষের ওপর কোনোরূপ জুলুম হলে তার প্রতিকার করা এবং তাকে আদর্শিক ও নৈতিক অধঃপতন থেকে রক্ষা করা মুমিনের কাজ। পাপ ও কুফরের মারাত্মক অমঙ্গল থেকে মানুষকে রক্ষা করার কাজ কোনো সাময়িক কাজ নয়, বরং এ এক অবিরাম সংগ্রাম, আর তা জীবনভর চালিয়ে যাওয়াই মুমিনের কাজ। আর এর মাধ্যমেই জীবনমুক্তি ঘটানো সম্ভব। এর বিপরীতে জীবনমুক্তির সাধনা ব্যর্থ।
মুমিনের জীবনের লক্ষ্য ও কর্মবিন্দু একটি, আর তা হলো দুনিয়া জাহানের মালিক ও খালিক আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা এবং তার নারাজ ও ক্রোধ থেকে বাঁচবার জন্য সাধ্যমত অবিরাম চেষ্টা সাধনা করা বা জিহাদ চালিয়ে যাওয়া। মুমিন বান্দাহ মেহনত ও পরিশ্রম দ্বারা আল্লাহ নিয়ামত বরকত ও ফজিলতের যে ব্যবস্থা মুমিন বান্দাহর জন্য করে রেখেছেন তা সে হাসিল করতে সক্ষম হবে। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় আমাদের সমাজে আমরা অনেকেই ‘জিহাদ’ ও ‘মেহনত’কে বিকৃত অর্থে ব্যবহার করতে চাই।
আমরা কেউ কেউ আল্লাহর রাস্তায় মেহনতকে খুব সীমিত অর্থে ব্যবহার করি। প্রকৃত পক্ষে ‘আল্লাহর রাস্তায় মেহনত করার অর্থ খুব ব্যাপক এবং তা উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর অবশ্য কর্তব্য। নিজের সাধ্যানুযায়ী আল্লাহর পয়গামকে মানুষের কাছে পেশ করা, আল্লাহর হুকুমকে সমাজে চালু করা ও আল্লাহর কলেমাকে বুলন্দ করা এবং আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে লেখনী ও বক্তৃতা, কূটনীতি এবং অস্ত্রের দ্বারা অবিরাম সংগ্রাম (জিহাদ) করার অর্থ হলো আল্লাহর রাস্তায় মেহনত করা।’ (মা’আরেফুল হাদীস)
দীনের বিজয়ের জন্য মুমিন অবিরাম সংগ্রাম করবে। বিশ্বে প্রচলিত সব ধর্মের ওপরে দীনের (ইসলাম) বিজয় প্রতিষ্ঠার জন্যই আল্লাহ রাসূলকে (সাঃ) পাঠিয়েছেন। সে ধারায় মুমিনের জীবনের আসল কাজ দীন প্রতিষ্ঠার মেহনতে নিজকে সোপর্দ করা।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের অনেক স্থানে মুমিনের গুণাবলির কথা উল্লেখ করেছেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তার প্রতিদানের কথাও বলেছেন। যেমন আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন-ওই কিতাবটি প্রকৃত কিতাব, এতে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই। যা মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক। যারা অদৃশ্য বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, যথাযথভাবে নামাজ প্রতিষ্ঠা রাখে, আমি তাদের যে রিজিক দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এই কিতাবকে যা আপনার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেই কিতাবের ওপর যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের অনেক স্থানে মুমিনের গুণাবলির কথা উল্লেখ করেছেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তার প্রতিদানের কথাও বলেছেন। যেমন আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন-ওই কিতাবটি প্রকৃত কিতাব, এতে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই। যা মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক। যারা অদৃশ্য বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, যথাযথভাবে নামাজ প্রতিষ্ঠা রাখে, আমি তাদের যে রিজিক দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এই কিতাবকে যা আপনার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেই কিতাবের ওপর যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে এবং তারা আখেরাতের ওপর নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে। তারাই স্বীয় প্রতিপালকের পক্ষ থেকে হেদায়েতের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারাই সফলকাম। (সুরা : বাকারা, আয়াত-২, ৩, ৪, ৫)
আল্লাহতায়ালা উক্ত আয়াতসমূহে মুমিন মুত্তাকিদের পাঁচটি গুণাবলি উল্লেখ করেছেন।
১. মুমিনের প্রথম গুণ হলো তারা ‘ঈমান বিল গায়েব’ তথা অদৃশ্য বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে।
যেমন কবরের আজাব, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি। অর্থাৎ রসুল (সা.) যেসব অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন এবং মানুষ যেসব বিষয় স্বীয় বুদ্ধিবল ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যের মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করতে অক্ষম, সেসব বিষয়ে পূর্ণ আস্থাশীল হয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে।
২. মুমিনের দ্বিতীয় গুণ হলো তারা যথাযথভাবে নামাজ কায়েম রাখে। কোনো অবস্থাতেই নামাজ ছাড়ে না। কখনো কোনো কারণে নামাজ কাজা হলে তার হৃদয় ক্ষরণ শুরু হয়ে যায়, অর্থাৎ সে নামাজের সব ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব সযতেœ ওয়াক্ত মতো আদায় করে।
৩. মুমিনের তৃতীয় গুণ হলো, তারা সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে। তারা কৃপণ কিংবা লোভী নয়। আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার প্রকারসমূহ (১) সম্পদের জাকাত আদায় করা (২) সদকায়ে ফিতর আদায় করা (৩) ফকিরদের দান করা (৪) অভাবিকে ঋণ প্রদান করা (৫) ওয়াক্ফ তথা মসজিদ, মাদ্রাসা, মুসাফিরখানা, মেহমানখানা তৈরিসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা (৬) হজের সফরে ব্যয় করা (৭) আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা (৮) আর্থিক সংকটে জর্জরিত আত্মীয়-স্বজনের জন্য ব্যয় করা (৯) মাতা-পিতার জন্য ব্যয় করা, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির ভরণপোষণের জন্য ব্যয় করা (১০) মেহমানকে আপ্যায়ন করা। (মাআরেফুল কোরআন)
৪. মুমিনের চতুর্থ গুণ হলো- তারা কোরআনের প্রতি ঈমান আনার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবসমূহের প্রতিও ইমান আনে।
৫. মুমিনের পঞ্চম গুণ হলো, তারা পরকালের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে। বস্তুত পরকালের প্রতি বিশ্বাস থেকেই সৃষ্টি হয় নেক আমলের অনুপ্রেরণা এবং গুনাহের অনুশোচনা। উপরোল্লিখিত গুণের অধিকারী মুমিন মুত্তাকিদের জন্য দুটি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। (১) ওইসব লোকই তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে হেদায়েতপ্রাপ্ত এবং তারা হেদায়েতের ওপর থাকবে অটল অবিচল (২) আর ওইসব লোকের জন্যই ইহকাল ও পরকালের সফলতা রয়েছে। আর রয়েছে জান্নাতের হাজারো নেয়ামত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT