ধর্ম ও জীবন

রহস্যময় স্থাপনা খায়বার মরুভূমি

সাঈদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০২-২০১৯ ইং ০০:৪৩:১৪ | সংবাদটি ২৪৩ বার পঠিত

ওয়াদি আল বায়দা থেকে খায়বার যাবার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু যাওয়া হল না। স্থানীয় মসজিদের ইমাম আব্দুল্লাহ আলী আব্দুল্লাহর সাথে অনেক জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় কেটে গেল সারা বেলা। রহস্যময় পাথরের স্থাপনা দেখার জন্য পরদিন ভোরে আমরা খায়বার পথে যাত্রা করি। সাথে ভাইজান রশিদ আহমদ চৌধুরী ও তার বন্ধু জাবের আব্দুল্লাহ।
মদিনা থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খায়বার মরুভূমি। বিশ্বের প্রাচীনতম জনপদগুলোর অন্যতম। সেখানে রয়েছে পৃথিবীর আদি জনগোষ্ঠীর বসবাসের অনেক অজানা নিদর্শন। পাথরে নির্মিত স্থাপনা সমূহ নিয়ে নানা রকম লোক কাহিনী রয়েছে। যেগুলো স্থানীয় বেদুইনদের কাছে ‘বৃদ্ধ লোকেদের কাজ’ হিসেবে পরিচিত। হাজার হাজার বছরের পুরনো অনেক স্থাপনাকে সাধারণেরা ভূতের বাড়ি হিসেবে ধারণা পোষণ করে। এগুলো বিশাল জায়গা জুড়ে নির্মিত। বহু উপর থেকে না দেখলে প্রকৃত আকার বোঝা দুষ্কর।
গেল শতাব্দীর সূচনাতেও সমগ্র খায়বার মরুভূমি তিনটি এলাকায় বিভক্ত ছিল। আল-নাতাত, আল-শিক্ক এবং আল-কাতিবা। সম্ভবত মরুময়তা, আগ্নেয়গিরির খাদ এবং জলাধারের মত বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি এলাকাতেই একাধিক দুর্গ এবং আস্তানাসহ বাড়িঘর, গুদামঘর এবং ঘোড়াশাল ছিল। প্রতিটি দুর্গই একেকটি পৃথক পরিবারের অধীনে ছিল এবং আবাদি ফসল ও খেজুর বাগান দিয়ে ঘেরা ছিল। নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার জন্য তারা পাহাড়ের চূড়ায় অথবা উঁচু পাথুরে এলাকায় তাদের দুর্গগুলো স্থাপন করত।
জাবের আব্দুল্লাহ জানালেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে প্রত্মতাত্ত্বিকরা মধ্যপ্রাচ্যে এমন অনেক স্থাপনা আবিষ্কার করেছেন। মূলত তারা গোয়েন্দাগিরি এবং শত্রু স্থাপনার উপর নজরদারির উদ্দেশ্যে প্লেন থেকে অনুসন্ধান এবং চিত্রধারণ করতে গিয়ে এটি পেয়েছেন। ১৯২০ সালের দিকে এ ধরনের কাঠামোর অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছিল। বর্তমানে অবশ্য গুগল আর্থ সফটওয়্যার এসব রহস্য উদঘাটন সহজ করে দিয়েছে।
এক দশক আগে গুগল আর্থের মাধ্যমে দেয়ালের মতো অনেকগুলো স্থাপনা আবিষ্কার করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড কেনেডি। কাঠামোগুলোকে উপর থেকে দেখতে ‘দরজা’র মত মনে হয়। মাটিতে শোয়ানো ক্ষেতের বেড়ায় ব্যবহৃত দরজার মতো বলে তিনি আখ্যায়িত করেছেন। মাত্র ১৩ মিটার থেকে ৫১৮ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্য কয়েক’শ স্থাপনার অণুবীক্ষণিক চিত্র ধারণ করেছেন তিনি। তার ধারণা, এই স্থাপনাগুলো অন্তত ৯ হাজার বছর পুরানো।
সাউদী আরব ছাড়াও সিরিয়া, জর্ডান, ইরাক, আলজেরিয়া সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আগ্নেয়গিরি নিঃসৃত লাভা থেকে তৈরি সমভূমিতে ঘুড়ি, চাবির গর্ত বা কি-হোল, চাকা ও ত্রিভুজ আকৃতির পাথরের স্থাপনা আবিষ্কৃত হয়েছে। আবার কিছু আছে একাধিক লাইন দ্বারা সংযুক্ত। দেখতে দ্বি অথবা ত্রিখ-িত আয়তক্ষেত্র বলে মনে হয়। ঘুড়ি আকারের কিছু স্থাপনা উপর থেকে দেখতে লেজ এবং সুতা বিশিষ্ট ঘুড়ির মতোই মনে হয়। গবেষকদের ধারণা, হরিণ বা অন্য প্রাণীকে এ জাতীয় স্থাপনায় কৌশলে ঢুকিয়ে শিকার করার জন্যই এটি ব্যবহৃত হত।
ড. কেনেডি অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করেছেন, ত্রিভুজ বা কি-হোলের গোলাকার ছিদ্রগুলো নিখুঁত বৃত্তাকার। পাশাপাশি অবস্থিত একগুচ্ছ কি-হোল কিছু দূরে অবস্থিত বুল’স আইয়ের দিকে মুখ করে থাকে। নির্মাণশৈলীর দিক থেকে অবাক হবার মত। কেনেডির ধারণা, এগুলো ধর্মীয় প্রতীকের অংশ হতে পারে।
এ অঞ্চলে এক সময় ইহুদিদের বসবাস ছিল। তারও আগে অন্য জাতিসত্তার অস্থিত্ব রয়েছে। ৬২৫ সালে মদিনা থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর বনু নাদির গোত্র খাইবার ময়দানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু নাদির গোত্রের প্রধান হুয়াই ইবনে আখতাব তার পুত্রকে সাথে নিয়ে মক্কা ও মদিনা বিরোধী বেদুঈনদের সাথে যোগ দেয়। তখন খায়বার ছিল ইহুদীদের একটি নতুন উপনিবেশ। খায়বারের ইহুদীরা বনু কোরাইজা গোত্রের লোকদের বিশ্বাসঘাতকতায় উদ্দীপিত করেছিল। গাতাফান গোত্র ও বেদুঈনদের সাথে মিলিত হয়ে মদীনা আক্রমণ করার ব্যাপারে তারা চক্রান্ত শুরু করেছিল। এমনকি মুহাম্মাদ সা. কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। বিশ্বস্ত সুত্রে খবর পেয়ে মুসলিম বাহিনী তখন খায়বার অঞ্চল দখলে নেন। উম্মে সালামা সহ বেশ কিছু মুসলিম মহিলা আহত সৈন্যদের দেখাশুনা করার জন্য এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে খায়বার অঞ্চল মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
মূলত ৭ম হিজরিতে মদীনা আক্রমণের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় খায়বার যুদ্ধ হয়। মুহাম্মাদ সা. যুদ্ধে পরাজিত ইহুদীদের কোন শাস্তি কিংবা নির্বাসন দেননি। তাদের উৎপাদিত ফল ফসলের অর্ধেক মুসলমানদের প্রদান করার শর্তে খায়বারে থাকার অনুমতি দেন। ইহুদিগণ ধর্মপালনের অনুমতি এবং নিজ সম্প্রদায়ের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লাভ করে। তারা বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে প্রতিরক্ষা এবং মুসলমানদের সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ এবং যাকাত প্রদানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করে। যেগুলো মুসলিম নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক। এরপরও এক ইহুদী মহিলা মহানবীকে আমন্ত্রণ করে ছাগলের মাংসে বিষ মিশিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল। তাতেও তিনি তাদের ব্যাপারে ক্ষিপ্ত হননি, বরং ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। খায়বার বিজয়ের মাত্র ১৮ মাস পরেই মুহাম্মাদ সা. মক্কা দখল করতে সক্ষম হন। এভাবে অনেক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জাবের আব্দুল্লাহ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের মহত্ব ও বীরত্বগাঁথা ইতিহাস তুলে ধরেন।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  •   সুস্থতা আল্লাহ তা’আলার মহান নেয়ামত
  • মুমিনের মেরাজ
  • যে আমলে মিলবে জান্নাতের ফল লাভ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • মুসলমানদের পারস্পরিক সর্ম্পক ভ্রাতৃত্বের
  • মসনবি শরিফের একটি ঘটনা
  • ইসলামে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব
  • বাইতুল্লাহর সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর বন্ধন
  • তাফসিরুল কুরআন
  • আরাফাহের খুতবা : মুসলিম জাহানের অনবদ্য দিকনির্দেশনা
  • কোরবানি ও প্রাসঙ্গিক মাসাইল
  • পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা
  • তাফসিরুল কুরআন
  • সাবাহি মক্তবের আধুনিক সংস্করণ
  • মুসলিম উম্মাহর একতার নিদর্শন হজ্ব
  • তাফসিরুল কুরআন
  • ন্যায়বিচার একটি ইবাদত
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় : স্নেহ-ভালবাসা
  • মধুর ডাক
  • তাফসিরুল কুরআন
  • Developed by: Sparkle IT