ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০২-২০১৯ ইং ০০:৪৭:০৬ | সংবাদটি ১১২ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
কুরআন ও সুন্নাহর পরিভাষায় ‘এক্বামত সালাত’ অর্থ, নির্ধারিত সময় অনুসারে যাবতীয় শর্তাদি ও নিয়মাবলী রক্ষা করে নামায আদায় করা। শুধু নামায পড়াকে ‘এক্বামত সালাত’ বলা হয় না। নামাযের যত গুণাবলী, ফলাফল, লাভ ও বরকতের কথা কুরআন হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে, তা সবই ‘এক্বামত সালাত’ (নামায প্রতিষ্ঠা) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন, কুরআন কারীমে আছেÑ‘নিশ্চয়ই নামায মানুষকে যাবতীয় অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে)।
নামাযের এ ফল ও ক্রিয়ার তখনই প্রকাশ ঘটবে, যখন নামায উপরে বর্ণিত অর্থে প্রতিষ্ঠা করা হবে। এজন্য অনেক নামাযীকে অশ্লীল ও ন্যক্কারজনক কাজে জড়িত দেখে এ আয়াতের মর্ম সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা ঠিক হবে না। কেননা, তারা নামায পড়েছে বটে কিন্তু প্রতিষ্ঠা করেনি।
আভিধানিকভাবে যাকাতের অর্থ দু’রকম পবিত্র করা ও বর্ধিত হওয়া। শরীয়তের পরিভাষায় সম্পদের সে অংশকে যাকাত বলা হয়, যা শরীয়তের নির্দেশানুসারে সম্পদ থেকে বের করা হয় এবং শরীয়ত মোতাবেক খরচ করা হয়।
যদিও এখানে সমসাময়িক বনী ইসরাইলদিগকে সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু তাতে একথা প্রমাণিত হয় না যে, নামায ও যাকাত ইসলাম পূর্ববর্তী বনী ইসরাইলদের উপরই ফরয ছিল। কিন্তু সূরা মায়েদায় বর্ণিতÑ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক বনী ইসরাইল থেকে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন এবং আমি তাদের মধ্য থেকে বার জন দলপতি মনোনীত করে প্রেরণ করলাম। আর আল্লাহ পাক বললেন, যদি তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত আদায় কর, তবে নিশ্চয়ই আমার সাহায্য তোমাদের সাথে থাকবে।’ এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বনী ইসরাইলের উপর নামায ও যাকাত ফরয ছিল। অবশ্য তার রূপ ও প্রকৃতি ছিল ভিন্ন।
রুকুর শাব্দিক অর্থ ঝুঁকা বা প্রণত হওয়া। এ অর্থের পরিপ্রেক্ষিতে এ শব্দ সেজদার স্থলেও ব্যবহৃত হয়। কেননা, সেটাও ঝুঁকারই সর্বশেষ স্তর। কিন্তু শরীয়তের পরিভাষায় ঐ বিশেষ ঝোঁকাকে রুকু বলা হয়, যা নামাযের মধ্যে প্রচলিত ও পরিচিত। আয়াতের অর্থ এই যে, রুকুকারীগণের সাথে রুকু কর।’ এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, নামাযের সমগ্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে রুকুকে বিশেষভাবে কেন উল্লেখ করা হলো? উত্তর এই যে, এখানে নামাযের একটি অংশ উল্লেখ করে গোটা নামাযকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন, কুরআন মাজীদের এক জায়গায় ‘ফজর নামাযের কুরআন পাঠ’ বলে সম্পূর্ণ ফজরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। তাছাড়া হাদিসের কোন কোন রেওয়ায়েতে ‘সেজদা’ শব্দ ব্যবহার করে পূর্ণ এক রাক’আত বা গোটা নামাযকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এর মর্ম এই যে, নামাযিগণের সাথে নামায পড়। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন থেকে যায় যে, নামাযের অন্যান্য অংশের মধ্যে বিশেষভাবে রুকুর উল্লেখের তাৎপর্য কি?
উত্তর এই যে, ইহুদীদের নামাযে সেজদাসহ অন্যান্য সব অঙ্গই ছিল, কিন্তু রুকু ছিলো না। রুকু মুসলমানদের নামাযের বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম। এজন ‘রাক্বি’য়িন’ শব্দ দ্বারা উম্মতে মুহাম্মদীর নামাযিগণকে বুঝানো হবে, যাতে রুকুও অন্তর্ভুক্ত থাকবে, তখন আয়াতের অর্থ হবে এই যে, তোমরাও উম্মতে মুহাম্মদীর নামাযিগণের সাথে নামায আদায় কর। অর্থাৎ, প্রথম ঈমান গ্রহণ কর, পরে জামাতের সাথে নামায আদায় কর।
নামাযের জামাত সম্পর্কিত নির্দেশাবলী : নামাযের হুকুম এবং তা ফরয হওয়া তো ‘আক্বিমুস সালাত’ শব্দের দ্বারাই বুঝা গেল। এখানে “মা’আর রাক্বি’য়িন” (রুকুকারীদের সাথে) শব্দের দ্বারা নামায জামাতের সাথে আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ হুকুমটি কোন ধরণের? এ ব্যাপারে ওলামা ও ফকীহগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সাহাবা (রা.) তাবেয়ীন এবং ফুকাহাদের মধ্যে একদল জামাতকে ওয়াজেব বলেছেন এবং তা পরিত্যাগ করাকে কঠিন পাপ বলে অভিহিত করেছেন। কোন কোন সাহাবা (রা.) তো শরীয়তসম্মত ওযর ব্যতিত জামাতহীন নামায জায়েয নয় বলেও মন্তব্য করেছেন। যারা জামাত ওয়াজিব হওয়ার প্রবক্তা এ আয়াতটি তাদের দলিল।
অধিকাংশ ওলামা, ফুকাহা, সাহাবা ও তাবেঈনের মতে জামাত হলো সুন্নতে মোয়াক্বাদাহ। কিন্তু ফজরের সুন্নতের ন্যায় সর্বাধিক তাকীদপূর্ণ সুন্নত। ওয়াজিবের একেবারে নিকটবর্তী।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT