উপ সম্পাদকীয়

দৃষ্টির বাইরে, অনুভূতির নিরিখে

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০২-২০১৯ ইং ০০:১৯:১৫ | সংবাদটি ১৬৬ বার পঠিত


বাংলাদেশে নবনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বিদগ্ধমহল নানা ধরনের আলাপ আলোচনায় ব্যাপৃত রয়েছে দেশটির বহির্দেশীয় সম্পর্ক নিয়ে। কেমনতরো পররাষ্ট্র নীতি হবে আবার প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে কিভাবে আরো ঘনিষ্ঠতা আর বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে তা নিয়েও চিন্তিত অনেকেই। আমাদের দেশটি উন্নয়নের গতিধারায় শামিল হতে পেরেছে অনেক বাধা বিঘœ পেরিয়ে। এই উন্নয়ন এর প্রবহমানতাকে অব্যাহত রাখতে সারথীর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
ভারত আমাদের নিকটতম দেশ। এটি আকারে যেমন বৃহৎ তেমনি পরাশক্তিধর দেশগুলির কাতারে শামিল হতে মরিয়া। পারমাণবিক শক্তিধরদের ক্লাবে আগেই নাম লিখিয়ে রেখেছে। শিল্পে ও গণতন্ত্র চর্চায় সেটি এগিয়ে আছে আমাদের চেয়ে বেশ উচ্চ মাত্রায়। বাংলাদেশ আকার আয়তনে ভারতের কাছে উল্লেখযোগ্য কিছু নয় কিন্তু শিল্প উদ্যোগে আর বিনিয়োগে বিপুল সম্ভাবনার আধার স্বরূপ। আমাদের সাথে ভারতের নানা ধরনের প্রতিবেশিসুলভ সমস্যা সংকট রয়েছে পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে সহযোগিতাও রয়েছে। বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারটি এ সকল গঠনমূলক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করে এগিয়ে নেবার ভাবনা বেশি করে করবেন বলে মনে হয়। আন্তঃনদী যোগাযোগ ব্যবস্থা বাড়াতে সমন্বিত খনন (নদী) ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে একটি পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যেতে পারে সহজেই। একই নদী যদি উভয় দেশে প্রবাহিত হয় তাহলে উজান ও ভাটি দুটো দেশের অভ্যন্তরস্থিত নদীর তলদেশটির উচ্চতা আর গভীরতার পরিমাণ সমন্বিত করতে পারলে যৌথ নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা সহজতর হবে। পণ্য পরিবহন মারফত বাংলাদেশ শুল্ক হার নির্ধারণ পূর্বক ভারতের কাছ থেকে উপার্জন করতে পারবে ভালো অংকের রাজস্ব। শীতকাল বা শুষ্ক মৌসুমে যদি আমাদের এলাকার নদীসমূহ ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হয় তাহলে আন্তঃদেশীয় নৌ যোগাযোগ বিপর্যস্ত হবে নিঃসন্দেহে। সে হিসাবে পুরো বৎসর সমানতালে ও পরিমাণে নদীসমূহের পানিপ্রবাহ যাতে নিরবচ্ছিন্ন থাকে সে ব্যাপারে যৌথ নদী কমিশনকে আরও তৎপর হতে হবে সরকারি ছত্রছায়ায়।
ভারতের সাথে ফারাক্কা আর তিস্তা নামক দুটি চুক্তি রয়েছে। গঙ্গা নদীর পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে ফারাক্কা চুক্তিটি হয়েছিল চুয়াত্তর সালে যখন আমাদের দেশে জনসংখ্যা ছিলা সাড়ে সাত কোটি আর আজ প্রায় ষোল কোটি। চুক্তিটি কার্যকর রয়েছে। বছর বছর নবায়িত হচ্ছে সেই আগের পরিমান এবং শর্তাবলীর আলোকেই। বলার অপেক্ষা রাখেনা এটি আমাদের দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য বা প্রকৃতি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার জন্য অনুকূল থাকছেনা কোনভাবেই। আশা করবো নবনির্বাচিত সরকার (বাংলাদেশ) ব্যাপারটি নিয়ে ভাবনা চিন্তা করে প্রয়োজনের নিরিখে ব্যবস্থাবলী গ্রহণ করতে আগুয়ান হবেন। তিস্তা চুক্তিটিও রয়েছে হযরবল অবস্থায়। ওই নদীটির বাধটি অটুট আছে। পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়ে ভারতীয় উষর ভূমিপ্রবন এলাকায় জলসিঞ্চন নিশ্চিত করে কৃষিব্যবস্থাকে বেগবান করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এলাকায় চলছে হাহাকার। পানি আসছে কিঞ্চিৎ পরিমাণে। মরুকরণ, কৃষি নির্ভর শ্রমজীবীদের হাহাকার আর তিস্তা নির্ভর জেলে, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় (জনগোষ্ঠী) সমূহের অন্ন সংকট প্রভৃতি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। তিস্তা চুক্তিটি নবরূপায়নের মাধ্যমে জলপ্রবাহ বাংলাদেশের প্রয়োজনের নিরিখে ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিশ্চিত করতে হবে। শোনা যায় আমাদের সরকার এ ব্যাপারে ওয়াকীবহাল এবং তৎপর তারপরেও কেন যেন সবকিছু স্তিমিত হয়ে আছে বুঝতে পারি না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার এ ব্যাপারে বাগড়া দিচ্ছে। তারা তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাকি পানিটুকু এখানে সরবরাহ করতে চাইছে। আমাদের প্রয়োজনীয় পানি সীমান্তরেখা ছুইছুই অবস্থান থেকে নিরূপন করতে চাইছে মমতা ব্যানার্জীর সরকার। এটি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আশা করা যাচ্ছে বাংলাদেশে নবনির্বাচিত সরকার ও নবগঠিত মন্ত্রীসভা অকাজে কালক্ষেপন না করে কর্মতৎপরতা দেখাবেন এবং বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ও প্রয়োজন মোতাবেক পানি প্রবাহ নিশ্চিতকরণের চুক্তি সম্পাদন করবেন। একটি বৃহৎ ও শক্তিধর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ঝগড়া ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়বে এমনটি ভাবা বাতুলতা মাত্র। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিজ্ঞজনোচিত সিদ্ধান্তের পথেই হাটবেন বলে আশা রাখি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি কখনোই আগ্রাসী নয় বা ছিলো না।
ভারত-বাংলাদেশ যোগাযোগ মাধ্যম হিসাবে রেল ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। এখানে ভারত নামক রাষ্ট্রটির উৎসাহ এবং স্বার্থ সমধিক। ভারতীয় ঋণে বেশ কয়েকটি বন্ধ হয়ে যাওয়া রেল লাইনকে পুনঃসংস্কার, পুনঃনির্মাণ এবং ভারী মালপত্র বহনে সক্ষম এমন রেল চলাচলের উপযুক্ত করা হচ্ছে। যদিও ভারতের দেওয়া ঋণটি পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকেই। এইসব রেলপথ দিয়ে ভারত তার একেবারে দূরপ্রান্তে পড়ে থাকা তেরোটি রাজ্যকে নিজ কেন্দ্রভূমির সাথে সংযুক্ত করতে পারবে সহজে এবং স্বল্পতম সময়ে আর ব্যয় সংকোচনতো হবেই। কোন ধরনের মালপত্র এই রেলপথে ব্যবহার করা হবে আবার শুল্কহার কি হবে সেগুলির বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি সাধারণ্যে। অনেকে বলছেন দূরপ্রান্তের তেরোটি রাজ্যেই চলছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনসহ নানা ধরনের অবিমৃষ্যকারীতা আর হঠকারি রাজনৈতিক ও সামরিক কার্যকলাপ। এ ধরনের কার্যকলাপ রুখতে ভারত ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে এই রেল সংযোগ ব্যবস্থা মারফত অস্ত্রশস্ত্র পরিবহন করে। একটি দেশের স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব আর স্বকীয়তা রক্ষার্থে অবশ্যই সচেতন আর অভিজ্ঞ গণতন্ত্র চর্র্চাকারী দেশ হিসাবে ভারত অস্ত্র পরিবহন নিশ্চয়ই করতে চাইবে না বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে। পণ্য পরিবহন এর মাধ্যমে যাতে বাংলাদেশকে অধিক পরিমাণ শুল্ক আদায়ে সহায়তার মাধ্যমে বন্ধু রাষ্ট্র ভারত উৎসাহী হবে, অগ্রণী ভূমিকাও নেবে। বাংলাদেশ ও ভারত এর মধ্যকার আমদানী রফতানী খাতে ঘাটতির পরিমান দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। পরিমানটি পাহাড়সম হতে বাকি। গ্রহণযোগ্য শুল্কহার ও অধিক পণ্য রফতানীর মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে চাইবেন বর্তমান নবনির্বাচিত সরকারটি এবং সে অনুসারে উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, গুণেমানে উন্নতি ও রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনে আমাদের সরকারটি নিশ্চয়ই সক্রিয় আর বাস্তববাদী ভূমিকা পালন করবেন। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ খাতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যাতে করে আমাদের দেশটি বিদ্যুৎ ক্রয় করে আনবে প্রতিবেশি দেশটি থেকে এবং আনছেও। মূল্য হার কত সেটা যদিও জানা নেই কিন্তু ক্রমান্বয়ে সেই বিদ্যুৎ পরিমানে বাড়বে। উদ্দেশ্য বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান শিল্পখাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা। আমাদের দেশের নানা জায়গায় শিল্প এলাকা, শিল্প পার্ক নামীয় অঞ্চলসমূহ স্থাপন করা হচ্ছে যাতে করে বিদ্যুৎ (আমদানীকৃত) ব্যবহার করে সেগুলি চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। বানরের পিঠা ভাগের মতো বা বারো হাত বাকুড়ের তেরো হাত বিচির মতো কোন অঘটন না ঘটে। সরু নল দিয়ে আগত সরবরাহ আবার বড় নল দিয়ে ফেরত গেলে ঘাটতি বাড়তেই থাকবে। এরই মধ্যে ভুটান এর সাথেও আলাপ আলোচনা চলছে যৌথ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার। ওখানে রয়েছে অসংখ্য প্রাকৃতিক জলাধার আর জলপ্রপাত। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে সুব্যবস্থা করা যেতে পারে অনায়াসে অনুরূপ সুযোগ রয়েছে নেপালেও। আমাদের বর্তমান গণমুখী সরকার এ ব্যাপারে তৎপর রয়েছেন বলে জানা যায়।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার আমাদের জন্য বিষফোড়া স্বরূপ একটি সমস্যা সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গা জাতি গোষ্ঠিকে উচ্ছেদ করে আমাদের দেশে ঠেলে দেয়ার মাধ্যমে। গণচীন আর ভারত এই অমানবিক ব্যবস্থাটি নিয়ে বেশি উচ্চবাচ্য করছে না। অন্যদিকে বাংলাদেশ এই দুই বৃহদাকার বন্ধু রাষ্ট্রের মুখপানে চেয়ে এ সকল রোহিঙ্গাদের আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন এমনভাবে যাতে করে তারা ক্রমান্বয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর সাথে একত্রে বসবাস করার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। এদের জন্য সকল নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে একটি পুরো দ্বীপকে সাজিয়ে গুছিয়ে আধুনিক জীবনমান নিশ্চিত করে এদেরকে ঠাই দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ শক্তিধর দুই প্রতিবেশী ভারত ও চীনকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই দেশ দুটি রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে বলে প্রতীয়মান হয়।
ভারত ও বাংলাদেশে চীন তার বিরাট পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। উদ্দেশ্য একটাই মার্কিন অর্থনৈতিক আগ্রাসনকে ঠেকানো। চীন কখনোও মার্কিন আধিপত্য স্বীকার করতে রাজি নয় বিশেষ করে অত্র এলাকায়। নেপাল, ভুটান জাতীয় ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহকে প্রায় উদরস্থ করার ব্যবস্থা করেছে চীনা বিনিয়োগ তৎপরতার মাধ্যমে। ভুটান রাজ্যটির তিনদিকে রয়েছে চীনা সীমান্ত। অর্থনৈতিকভাবে চীন নির্ভরতা বাড়ছে ভুটানে, অনুরূপ অবস্থানে রয়েছে নেপালও। ভারত নামক তথাকথিত পরাশক্তিধর দেশটির পানে আর যেন তাকাতে না হয় সে উদ্দেশ্যটি মোক্ষ হিসাবে ধরে নিতে নেপাল, ভুটানকে উদ্দীপ্ত করছে চীন। পুঁজি খাটিয়ে; কারিগরি জ্ঞান দিয়ে আর বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চীন যেন পক্ককেশ মাতব্বর হতে চায় মার্কিনীদের বদলে এই অঞ্চলে। বদল যায়ে মালি। আগর চমন হোতা নেহী-খালি।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • খাদ্য নিরাপত্তায় বিকল্প চিন্তা
  • জন্মাষ্টমী ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ
  • বৃহত্তর সিলেটবাসীর একটি গৌরবগাঁথা
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • Developed by: Sparkle IT