উপ সম্পাদকীয়

নারীর মর্যাদা : একাল সেকাল

মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০২-২০১৯ ইং ০০:১৯:৪২ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত

এ উপমহাদেশে বৃটিশ শাসন শুরুর বহু পূর্বে রাজা বাদশার শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। কিংবদন্তী প্রচলিত আছে, রাজা বল্লাল সেন আমাদের দেশে কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তন করেন। এ প্রথা অনুসারে নামজাদা কুলীনেরা বহু বিবাহ করতে পারতেন। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর এমনকি শতাধিক স্ত্রীর কুলীন স্বামীর সন্ধান পাওয়া যায়। অতি বৃদ্ধ কুলীনেরা বালিকা বিবাহও করতে পারতেন। এ সব কুলীন জামাই পালাক্রমে এক এক শ্বশুর বাড়ী আসতেন। দু’এক রাত্রি যাপন করে উপঢৌকন ও কৌলীন্য সম্মান আদায় করে তলপী বাহক সহ অপর শ্বশুর বাড়ির দিকে রওয়ানা হতেন। স্ত্রীরা যে যার পিত্রালয়ে পড়ে থাকতেন। সারা জীবনে অনেকের ভাগ্যে স্বামীকে দু’এক বারের বেশি জুটতনা। অনেক স্ত্রী জীবনের শেষ ভাগে এসে স্বামীর চেহারাটুকু ভাল করে টাহর করতে পারতেন না। পিতা মাতার মৃত্যুর পর এসব নারীর দুর্দশার অন্ত ছিল না। ভাইয়ের বা অন্য কোন আত্মীয়ের সংসারে দু’মুঠোর অন্নের জন্য অনাদর আর অবহেলার পাত্রী হিসেবে দিনাতিপাত করতেন। এরা ছিলেন বল্লাল সেনের প্রতিষ্ঠিত প্রথার বলি।
বৃটিশ আমলে গ্রাম বাংলায় হাজারে ৪/৬ জন শিক্ষিত লোক পাওয়া যেত। এঁরা আবার উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন না। চিঠিপত্র লিখতে ও পড়তে সক্ষম ছিলেন। কারো কাছে চিঠি বা টেলিগ্রাম আসলে পড়ানোর জন্য কাউকে পাওয়া মুশকিল ছিল। গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত হাঁটলে দু’একজন শিক্ষিত ব্যক্তি পাওয়া যেত। তখনকার যুগে গ্রামাঞ্চলে মোটর যান ছিলনা। ইঞ্জিন চালিত নৌকা, লঞ্চ এগুলো ছিল না। লোকজন পায়ে হেঁটে, নৌকায় চড়ে কিংবা গরুর গাড়ীতে করে যাতায়াত করতেন। তাই দূরে কোন আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া কষ্টসাধ্য ছিল। মোবাইল ফোনের নাম গন্ধও ছিল না। তখনকার সমাজে বাল্য বিবাহের প্রচলন ছিল।
প্রত্যন্ত গ্রামের এক কিশোরী। দুনিয়াতে এক ভাই ছাড়া তার কেউ নেই। মা-বাবা মাটির নীচে চলে গেছেন সেই কবে। ভাইয়ের হাতে বড় হয়েছে মেয়েটি। ভাই তার ‘মা’ আবার ভাই তার ‘বাবা’ও বটে। ভাই তার আদরের ছোট বোনকে উজানের কোনও এক গ্রামের গৃহস্থ পরিবারে বিবাহ দেন। শ্বশুর, শাশুড়ী, ননদ, দেবর সবই আছে তার গৃহস্থালীর কাজ কর্ম করতে হয় সদ্য বিবাহিতা মেয়েটিকে। নব বধূটিকে শাশুড়ী জ্বালাতন করেন। স্বামীটি তাকে যথেষ্ট আদর করেনা। ফলে মেয়েটির চোখে জল। তার দুঃখের কথা শুনার কেউ নেই। ভাইটি তার বাড়ির কাছে একটি হাটে শ্রমিকেরা কাজ করে। অভাব অনটনের জন্য বোনকে অনেক দূরের সেই গ্রামে গিয়ে দেখতে পারেন না। অন্য কোন মাধ্যমেও বোনের খবর পাননা। মেয়েটির শ্বশুর বাড়ির পাশ দিয়ে খর¯্রােতা একটি নদী বহমান। মেয়েটি কলসি দিয়ে নদী থেকে পানি আনে। শাশুড়ীর নির্যাতনে অতিষ্ট মেয়েটি। এক দিন নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। মেয়েটির মন খারাপ। জল আনতে মেয়েটি নদীতে যায়। একখানা নৌকা পাল তুলে ভাঁটার দিকে যাচ্ছে। মাঝি আপন মনে বৈঠা চালাচ্ছেন। বধূটি আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। তার দুঃখের কথামালা গানের মাধ্যমে মাঝিকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল। যে গানটি যুগ যুগ ধরে আমাদের লোক-সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করে রাখছে। গানের প্রতিটি শব্দ ও লাইন তাৎপর্যপূর্ণ। সুর ও ছন্দ হৃদয় স্পর্শ করে। নি¤েœ গানের কথাগুলো উল্লেখ করা হলো-
‘নাইয়ারে, নায়ের বাদাম তুইলা/কোন দূরে যাও চইলা।/অচেনা সায়রে মাঝি,/সে কথা যাও বইলা,/নায়ের বাদাম তুইলা,/কোন দূরে যাও চইলা,/নাইয়ারে, ভাঁটির দেশে যাও যদি তুমি,/হিজল তলীর হাটে,/সেথায় আমার ভাইজান থাকে,/আমার কথা কইও তাকে,/মইলাম দুঃখে জ্বইলা,/কোন দূরে যাও চইলা,/নাইয়ারে, পরানে আর সইবে কত?/আগুন জ্বলে মনে,/বনের আগুন দেখতে পারে,/মনের আগুন পুইড়া মারে,/দেখে দেখে জ্বইলা,/কোন দূরে যাও চইলা।/নাইয়ারে, এবার যদি না নেয় নাইয়র/শুনবে লোকের মুখে,/অভাগী তার বোন যে ছিল,/মাটি তারে ডাইকা নিল,/তোমরা সুখে রইবা,/কোন দূরে যাও চইলা।’
উপরে বর্ণিত কিশোরী মেয়েটির ঘটনা কাল্পনিক। তবে উক্ত গানের সারমর্ম উপলব্ধি করলে তার নেপথ্যে এ ধরনের ঘটনা থাকতে পারে বলে অনুমান করা যেতে পারে। আজকের দিনে স্বামী গৃহে পান থেকে চুন খসলেই স্ত্রী বাপের বাড়ি সব বলে দিতে পারেন। স্বামীর অনুমতি দূরের কথা, অনেক বেআড়া স্ত্রী স্বামীকে না বলে পিত্রালয়ে (নাইয়র) চলে আসে। আগেকার দিনে স্ত্রীরা বাজারে গিয়ে কাপড় ছোপড় ক্রয় করার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল না। স্বামীরা যা ক্রয় করতেন স্ত্রীদের তা পছন্দ হতো। স্ত্রীরা হাসিমুখে তা গ্রহণ ও ব্যবহার করতেন। এখনকার যুগে স্ত্রীরা মার্কেটে গিয়ে ইচ্ছে মত কাপড়, কসমেটিক, এটা-সেটা ক্রয় করে থাকেন। সুতরাং নারীরা আগের মত অবলা নন্।
আগেকার দিনে গ্রামের মাতব্বরদের একাধিক স্ত্রী থাকতেন। গ্রামের বড় মুরব্বি মানেই তিনি ৩/৪ জন স্ত্রীর স্বামী। তখন একাধিক বিয়েতে বাধা নিষেধ ছিলনা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সতিনেরা মিলেমিশে সংসার করতেন। বর্তমান যুগে একাধিক বিয়েতে আইনগত বাধা আছে। ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে স্ত্রীর লিখিত অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা যায়। যৌতুকের জন্য স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতিত হলে প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধান আছে। যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর মাধ্যমে স্ত্রীরা স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। প্রথমোক্ত আইনের ৪ ধারায় যৌতুকের জন্য ও শেষোক্ত আইনের ১১(গ) ধারায় যৌতুকের জন্য মারধর করার অপরাধে স্বামীর জেল জরিমানার বিধান আছে। আগেকার দিনে নারীদের পক্ষে এ ধরনের আইন-কানুন ছিল না। সুতরাং নারীরা আগের মত অসহায় নন।
বর্তমান যুগে কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষরা অসহায় বলা যেতে পারে। যৌতুকের মামলাগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিথ্যা বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। মিথ্যা মামলার বেড়াজালে পড়ে অনেক স্বামী স্ত্রীর কাছে নাস্তানাবোদ হচ্ছেন। হিন্দু ধর্মে স্বামীকে ‘পতি দেব’ বলে। স্বামীর যুক্তি সঙ্গত আদেশ-উপদেশ মেনে চলা স্ত্রীর কর্তব্য। স্বামী হয়ত স্ত্রীকে কোন বিষয়ে আদেশ বা উপদেশ দিলেন। ভাল স্ত্রী হলে তা সহজেই পালন করবেন। বদমেজাজী স্ত্রী হলে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। স্ত্রী উল্টো স্বামীকে ছ’খানা নির্দেশনা দিয়ে বসলেন, ফলে মনোমালিন্যতা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। স্ত্রী মিথ্যার প্রলেপ লাগিয়ে উক্ত ঘটনাকে তিল হতে তাল বানিয়ে স্বামীর উপর যৌতুকের মামলা করে বসলেন। তারপর স্বামীটির কতনা যাতনা! অনুসন্ধানে এ ধরনের মিথ্যা মামলার তথ্য বেরিয়ে আসছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে পুরুষরাই অবলা বললে ভুল হবেনা। সুতরাং নারীরা আগেকার দিনের মত অবলা নন্।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শবে বরাত : আমাদের করণীয়
  • শিক্ষকের গায়ে কলঙ্কের দাগ
  • উন্নয়ন হোক দ্রুত : ফললাভ হোক মনমতো
  • হার না মানা জাতি
  • বাংলা বানান নিয়ে কথা
  • আলজেরিয়ার পর সুদানেও স্বৈরশাসকের পতন
  • দেশের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার হাল-চাল
  • ইলিশ : অর্থনীতি উন্নয়নের বড় হাতিয়ার
  • নুসরাত ও আমাদের সমাজ
  • শিশুরাই আমাদের শিক্ষক
  • জ্ঞান বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা
  • প্রসঙ্গ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং আমাদের জাতীয় ঐক্য
  • বজ্রপাত আতঙ্ক ও আমাদের করণীয়
  • সুদান : গণবিপ্লবে স্বৈরশাসক বশিরের পতন
  • মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকার
  • বৈশাখের বিচিত্র রূপ
  • বিচার নয় অভিশাপ
  • আমাদের জীবনে মিডিয়ার প্রভাব
  • সার্বজনীন বৈশাখী উৎসব
  • ঐতিহ্যময় উৎসব পহেলা বৈশাখ
  • Developed by: Sparkle IT