সাহিত্য

চিরচেনা বাংলা ভাষা

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০২-২০১৯ ইং ০০:২১:৫৬ | সংবাদটি ১৭৮ বার পঠিত


বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামে সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’। মানব সভ্যতার ইতিহাসে রক্তঝরা একটি দিন হয়ে আছে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’। এই ‘একুশে ফেব্রুয়ারির’ও অনেক ইতিহাস আছে। ইতিহাস হলো, তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের দু’টি অংশ ছিল, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। একটা সময় দেখা গেল, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়ে গেছে। অর্থাৎ পূর্ব-বাংলার জনগণকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা প্রায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে লাগলেন। এমন কি পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ‘উর্দু’ কে তারা প্রাধান্য দিতে শুরু করলেন। পূর্ব বাংলার জনগণের মুখের ভাষা-বাংলা অবহেলার শিকারে পরিণত হলো। তাই পূর্ব-বাংলার জনগণ রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রাধান্য দেওয়ার দাবি জানালেন। আর এর প্রতিবাদ স্বরূপ, ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ গঠিত হলো সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৪৮ সালে মাত্র স্বাধীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেব পূর্ব-বাংলার রাজধানী বর্তমান ঢাকায় এলেন। এসেই ২১ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে) ও ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা করলেন-উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ফলে বাংলার জনগণ ‘না’ ‘না’-বলে এর প্রতিবাদ জানালো। মূলতঃ এর পরই ভাষার লড়াইটা বাঙালির মনে দানা বাঁধতে শুরু করে। যার আত্মপ্রকাশটা ঘটে ১৯৫২ সালের ‘২১ ফেব্রুয়ারি’।
‘মা’ এবং মায়ের ভাষাকে বাঙালিরা এক করে দেখেছে বলেই ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্যে সংগ্রাম করেছে। আর তখনকার সময়ে এটা ছিল এক বিরল আত্মত্যাগ! তাই আমরা বলবো, বাঙালির জীবনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ‘ভাষা আন্দোলন’-এর ভূমিকা রেনেসাঁসের মতোই যুগপৎ অর্থবহ। ভাষার চেতনা আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের মতো-কথা সাহিত্যেও অভিনব পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল চেতনার আলোয় আলোকিত হয় আমাদের সাহিত্যের আঙিনাও।
‘ভাষা’ যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়। তাই যুগে যুগে সাহিত্যিক সমাজের বিজ্ঞজনেরাও ভাষার পরিবর্তিত রূপই ব্যবহার করে থাকেন তাঁদের সাহিত্যে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, মীর মোশাররফ হোসেন, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তারাশংকর, বিভূতিভূষণ থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত প্রত্যেকে সাধু ভাষায় লিখতেন। অথচ এখন কেউ সাধু ভাষায় সাহিত্য রচনা করার চিন্তাও করতে পারেন না। এটাই পরিবর্তনের রীতি। আজ যা কল্পনা করছি না আমরা কাল তা হতে পারে বাস্তব। যে কারণে আমরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখতে পাই, চলিত ভাষা বাংলার কোনো জেলার মানুষের মুখের ভাষা ছিল না। চলিত ভাষা ছিল পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী তীরের লোকজনের ভাষা। আর সে-ই ভাগীরথী তীরের লোকজনের ভাষার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে এখনকার চলিত ভাষা। কেউ বা হয়তো বিস্মিত হয়েছেন, তাই না? কিন্তু এটাই সত্য। অন্তত বাংলা ভাষার ইতিহাস তা-ই বলে। আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনেকেই আমরা জানি না, এক সময় সমস্ত বাংলার রাজধানী ছিল কলকাতা। প্রায় সবকিছু তখন ছিল কলকাতা কেন্দ্রীক। আর সে-ই সময়টায় অনেকে জীবন-জীবিকার তাগিদে, সময়ের প্রয়োজনে কলকাতায় গিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। তাই এক সময় দেখা গেল, যারা কলকাতা গেলেন, তারাই কলকাতার ভাষাটিকে ভালোবেসে রপ্ত করে নিলেন। অর্থাৎ শিক্ষিত ও অভিজাত সমাজের লোকেরা যখন তাদের চা-চক্রে অথবা আড্ডায় চলিত ভাষা ব্যবহার করতে লাগলেন, তখন তাদেরকে দেখে কিছু সাহিত্যিক চলিত ভাষায় লেখা শুরু করে দিলেন। এভাবেই চলিত ভাষার শুরু। ঠিক সে সময় বিদ্যাসাগর সাধু ভাষাকে একটা মার্জিত রূপ দিয়েছিলেন। তারপর প্যারীচাঁদ মিত্র (টেকচাঁদ ঠাকুর) বাংলা সাহিত্যে প্রথম চলিত ভাষার ব্যবহার করেন তাঁর ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসে। ১৮৫৮ সালে রচিত এটি ছিল বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস।
সাধু ও চলিত ভাষার মধ্যে যে পার্থক্য, সেটা হলো ক্রিয়া আর সর্বনামের রূপের মধ্যে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘গিয়াছে’ এটা হয় ‘গেছে’ ‘পাইলে’ এটা হয় ‘পেলে’। গাছের আগাছা ছেঁটে যেভাবে গাছকে হালকা করা হয়, ঠিক সেভাবে সাধু ভাষাও ক্রমান্বয়ে চলিত ভাষায় রূপ নিল। মানুষ তাদের নিজের প্রয়োজনেই চলিত ভাষাকে আন্তরিকভাবে মেনে নিতে বাধ্য হলো। কারণ, চলিত ভাষা প্রাঞ্জল, চমৎকার। কিন্তু সাধু ভাষা গুরু গম্ভীর টাইপের এবং সাধু ভাষা সময় নষ্ট করে বেশি। চলিত ভাষা দ্রুতলয়ে বলা যায়। তাই স্বাচ্ছন্দ্য ও নিজের চৌকসভাবটা প্রকাশের জন্য চলিত ভাষাকে সমাজের মানুষ দ্রুত গ্রহণ করলো, হারিয়ে গেল কালের গর্ভে সাধু ভাষা। তবে এখনও কিছু সংবাদ প্রতিষ্ঠান সাধু ভাষা ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যেমন-দৈনিক ইত্তেফাক এর সম্পাদকীয়।
সময় বদলে যায়, বদলে যায় আশপাশের সবকিছুর প্যাটার্ন (ধরণ)। তাই আজকে আমরা যে চলিত ভাষায় কথা বলছি, এই ভাষাটার প্যাটার্নও (ধরণ) হয়তো একদিন সময়ের প্রয়োজনে বদলে যাবে। যেমন- এখন আমরা দেখছি কিছু রেডিও স্টেশন ও টিভি চ্যানেলে আরজে অথবা উপস্থাপকরা ইংরেজি-বাংরেজি হিন্দি ভাষা’র মিশেলে তাঁদের চৌকসভাবটা প্রকাশের চেষ্টা করেন। এক সময় হয়তো দেখা যাবে, এই জগাখিঁচুড়ী ভাষাটাই হয়ে যাবে নতুন কোনো নামে আমাদের মুখের ভাষা, লেখার ভাষা। তাই বাংলা ভাষাটা যে এক সময় অতলে ডুবে যাবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়?
অতএব অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্য আমাদের সকলের সম্মিলিত পদক্ষেপ দরকার। ‘২১ শে ফেব্রুয়ারি’র দিন সাদা-কালো পোশাক পরে শহীদ মিনারে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলে অথবা টিভি চ্যানেলের খবরে নিজের ছবি দেখানোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিজীবির ভেক না ধরে আমাদের তরুণ সমাজকে ভাবতে হবে কিভাবে বাংলা ভাষাকে, বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে চমৎকারভাবে মেলে ধরা যায়। শেষ প্রান্তে এসে আমি কবি শিহাব সরকার-এর ‘বাংলা ভাষা, ২৪৮৫ খ্রিস্টাব্দ’ কবিতার শেষ কয়েকটি পঙক্তিমালা বলে যাই-
ছিলে প্রদীপের শিখা,/ আজ তোমার বিদ্যুৎ চমকে ঝলসে ঝলসে ওঠে তোমার গৌরব/ তোমার একেকটি অক্ষরে লেখা হয়ে যায় কোটি মৃত্যু, জয়ধ্বনি ও/ শতাব্দীর ভোরের ইতিহাস----।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT