সম্পাদকীয়

হারিয়ে যাচ্ছে দেশী গাছ

প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০২-২০১৯ ইং ০০:২২:২৪ | সংবাদটি ২৩১ বার পঠিত


হারিয়ে যাচ্ছে দেশী গাছ। যেন সবুজ শ্যামল গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক রূপ মাধুর্য আজকাল বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম অঞ্চলের সবুজ বৃক্ষ-লতা-পাতা রকমারী বৃক্ষরাজির সমারোহ হারিয়ে যাওয়ার পথে। মানুষের আগ্রাসী হাতের ছোবলে গ্রামীণ বন-বনানী ধ্বংস হওয়ার পথে। সেই সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে দেশীয় বৃক্ষ সম্পদ। আর সেই স্থানটি দখল করে নিচ্ছে বিদেশী প্রজাতির গাছ। অথচ অমিত সম্ভাবনার এই দেশে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে। প্রকৃতিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য প্রজাতির বনজ, ভেষজ, ফলদ, ঔষধিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় অসংখ্য গাছপালা। এগুলোতে ওষুধি গুণাগুণ ছাড়াও রয়েছে ভিটামিন ও পুষ্টিগুণ। অথচ এগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে, পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। তাছাড়া, সাম্প্রতিককালে ভেষজ চিকিৎসার প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়লেও দেশীয় বৃক্ষ সম্পদ ধ্বংস হওয়ায় সেই প্রবণতায়ও ভাটা পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
মূলত গ্রাম নির্ভর আমাদের এই বাংলাদেশ। গ্রামীণ জনপদে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় নাম নাজানা অসংখ্য বৃক্ষলতা-পাতা। এগুলো আমাদের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে জন্ম নিচ্ছে, বেড়ে উঠছে বছরের পর বছর ধরে। এইসব ছোটবড় বৃক্ষরাজির মধ্যে রয়েছে ঔষধি গুণ। সত্যি বলতে কি, এই গাছ গাছড়াই হচ্ছে মানবদেহের বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্য আবিষ্কৃত ওষুধের আদি উৎস। এছাড়া এই বৃক্ষ সম্পদ বনজ প্রাণী পশু পাখীর আশ্রয়স্থলও। অথচ গ্রামীণ বৃক্ষ সম্পদ ধ্বংস হওয়ার ফলে প্রাণী আর রকমারী পাখীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে গ্রাম বাংলায়। আবাসন সমস্যা নিরসনে তৈরী হচ্ছে ঘর বাড়ি। ফলে সাবাড় করা হচ্ছে বন জঙ্গল। রাস্তাঘাট নির্মাণেও কাটা হচ্ছে বন। আবার বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে ঘন বন কেটে ফসলি জমিও তৈরী করা হচ্ছে। অর্থাৎ নানাভাবে গ্রামীণ বৃক্ষ সম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে অনেক দেশীয় গাছ গাছালি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশীয় বৃক্ষরাজি ধ্বংস করে নতুন করে যেসব গাছ লাগানো হচ্ছে, তার অনেকগুলোই বিদেশী প্রজাতির। যেগুলো আমাদের পরিবেশের সঙ্গে মানানসই নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ইউক্যালিপ্টাস, আকাশিয়ার মতো আগ্রাসী প্রজাতির বৃক্ষ বিদেশ থেকে আমদানী করা হয়েছে। যেগুলো বন্যপ্রাণীসহ বন ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অর্থাৎ বিদেশী প্রজাতির বৃক্ষ দিয়ে কৃত্রিম বনায়ন করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। যা আমাদের পরিবেশের জন্য হুমকি স্বরূপ। এগুলো বন্য প্রাণীর জন্যও হুমকি স্বরূপ। আর ইউক্যালিপ্টাস জমির জন্যও ক্ষতিকর। এখন বাস্তবতা হলো-দেশে বনায়ন হচ্ছে বিদেশী আকাশিয়া, ইউক্যালিপ্টাস আরপাইন গাছ দিয়ে; আর হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রাকৃতিকভাবে তৈরী হওয়া ঐতিহ্যবাহী বন, দেশীয় প্রজাতি ও ঔষধি গাছ-গাছড়া।
আমাদেরই অবজ্ঞা আর অবহেলায় দেশীয় প্রজাতির গাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। আর সেই স্থান দখল করে নিচ্ছে বিদেশী গাছ। আসবাবপত্র তৈরীতেও বিদেশী প্রজাতির কাঠ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। অথচ দেশীয় প্রজাতির আম, জাম, কাঁঠাল, হিজল, তমাল, অর্জুন, জারুল, জলপাই, নিম, তেঁতুল, মেহগনি, সেগুন, শিরিষ, আমলকি, কৃষ্ণচূড়া, শিলকড়ই, শিমুল, তেজপাতা, হরিতকি, বহেড়া, গর্জন, কদম, বট ইত্যাদি কাঠ ও ফলফলাদির গাছের দিকে নজর দেওয়া জরুরী। এগুলোর উন্নয়নের উদ্যোগ নিলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা এবং পুষ্টি নিশ্চিত হবে। এখানে উল্লেখ করা জরুরী, ইতোপূর্বে সরকারের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে নিম, ফজলি আমসহ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষের স্বত্ব কিনে নিয়েছে বিদেশীরা। এটা খুবই দুঃখজনক। দেশীয় বৃক্ষ সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে, সচেতন করে তুলতে হবে সব মহলকে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT