উপ সম্পাদকীয়

সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করতে হলে-

মোহাম্মদ আবু তাহের প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০২-২০১৯ ইং ০১:৫২:২৪ | সংবাদটি ১৬৩ বার পঠিত

সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। সম্প্রতি স্কুল শিক্ষার্থীসহ সড়ক দুর্ঘটনায় অন্যান্যদের নিহত হওয়ার প্রতিবাদে নারায়নগঞ্জে পোশাক শ্রমিকরা সড়ক অবরোধসহ বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের বেশি জীবন কেড়ে নিচ্ছে ঘাতক ট্রাক, বাস ও অন্যান্য যানবাহন। অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে সুস্থ অবস্থায় আবার ঘরে ফিরে আসা যেন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থা। ট্রাফিক ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও উন্নত দেশের মতো করতে না পারলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। ট্রাফিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।
২৯ জুলাই ২০১৮ রবিবার দুপুরে দুটি বাস মিরপুর থেকে বিমানবন্দর সড়কের দিকে আসার সময় ফ্লাইওভারে একে অন্যকে ওভারটেক করার অপখেলায় মেতে ওঠে। যাত্রী ধরার জন্য পাল্লা দিয়ে বাস দুটি ফ্লাইওভার থেকে নামে। এ সময় ফ্লাইওভারের গোড়ার দিকে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলো। তাদের কেউ কেউ দেওয়াল ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছিলো। সামনের দিকে এমন মুহূর্তে ঘাতক বাসটি অপেক্ষমান শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হলে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আব্দুল করিম রাজীব। আহত হন আরও ১২ শিক্ষার্থী। মাওসেতুং বলেছিলেন-“কোনো কোনো মৃত্যু পাহাড়ের চেয়েও ভারী।” কলেজ শিক্ষার্থীদের এ মৃত্যু পাহাড়ের চেয়েও ভারী মনে হয়। চলন্ত বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতার শিকার হলেন সম্ভাবনাময় তরুণ শিক্ষার্থীরা। এই বেদনা শুধু শিক্ষার্থীদের পরিবারের নয়, এই বেদনা সমগ্র জাতির। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে অনেক লেখালেখি, অনেক গবেষণা, অনেক আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ট্রাফিক আইন লংঘন, চালকদের বেপরোয়া গাড়ী চালানো। সারাদেশে বর্তমানে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। আর যানবাহনের তুলনায় লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা নয় লাখের কম। অর্থাৎ নয় লাখ যান চালাচ্ছেন ভূয়া বা অদক্ষ চালক। অদক্ষ ও লাইসেন্স বিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক মহাসড়ককে অনিরাপদ করে তুলেছে। সহপাঠীদের জন্য ন্যায় ও ন্যায়বিচার আর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশে রাজপথে নেমেছিল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা জানতে চায় আর কত লাশের বিনিময়ে শান্তি আসবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা চিৎকার করে জানতে চেয়েছেÑ ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?’ সংবাদ মাধ্যমে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় এমন অসংখ্য ড্রাইভার আছে যাদের কোনো ট্রেনিং নেই, যোগ্যতা ছাড়া লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে।
কলেজ থেকে বাড়ি ফিরবে বলে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় তাদের সহপাঠিরা মৃত্যুবরণ করেছে বেপরোয়া চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে। শিক্ষার্থীরা এই নৈরাজ্যের অবসান চায়। ট্রাফিকের কাজ কি তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণ, কিশোর শিক্ষার্থীরা। চালকদের কাছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি প্রশ্ন ছিল লাইসেন্স আছে? যারা লাইসেন্স দেখাতে পারেননি তাদের তুলে দেওয়া হয় ট্রাফিক পুলিশের হাতে। শিক্ষার্থীরা আবারও সুকান্তের কবিতার অসাধারণ পংক্তিমালাকে সত্যে প্রমাণিত করলো- “সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।”
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার কথা দেশবাসী ভুলে যায়নি। নিরাপদ সড়কের দাবি জনহিতকর দাবি। এ দাবি পূরণ হবে দেশবাসী আশা করে। খ্যাতিমান লেখক আনিসুল হকের প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক নিবন্ধ থেকে জানলাম রাজীব সৈনিক হতে চেয়েছিল। তিনি যখন তার বাড়িতে ঢুকলেন রাজীবের খালাতো ভাই মেহরাজ তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছে। আমিও এই নিবন্ধ পড়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। রাজীবের ছোট ভাই আল আমিন বাকহারা। বড় হয়ে সেও ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের পক্ষে আল আমিনের স্বপ্ন পূরণ কতটা সম্ভব হবে জানি না।
নিরাপদ সড়ক চাই এর চেয়ারম্যান ইলিয়াছ কাঞ্চন বলেছেন সারা দেশে অসংখ্য অদক্ষ ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে। এমন অসংখ্য ড্রাইভার আছে যাদের কোনো ট্রেনিং নেই, যোগ্যতা নেই, তাদের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। এমন ড্রাইভারদের হাতে কেউ নিরাপদ নয়। তাদের জন্য সড়কে মৃত্যু, এটা দুঘর্টনা নয় হত্যাকান্ড। তিনি বলেন ঢাকায় গণপরিবহনে যারা ড্রাইভার তারা ড্রাইভিং আইন কানুন জানেন না। শুধু গাড়ী চালানো শিখেই সড়কে নেমে পড়ে। রাজধানীতে একের পর এক দুর্ঘটনা সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এধরনের দুর্ঘটনা রাজধানীর বাহিরেও ঘটছে। বেশীর ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে চালকের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারনে। ৭ই মার্চ ২০১৮ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে মৌলভীবাজারের শেরপুরের কাছাকাছি সরকার বাজারের নাদাম পুর নামক স্থানে সি.এন.জি ও প্রাইভেট কারের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের ৪ জন ও উভয় গাড়ীর চালকসহ মোট ৬ জন মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। চালকের অবহেলার কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে এধরনের নৈরাজ্যের শিকার হয়ে আরো কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকার কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারার কাছে দুটি বাসের রেষারেষিতে তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের এক হাত বিচ্ছিন্ন করে এবং পরে তার করুণ মৃত্যুর ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। দায়ী চালকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে নিরাপদ সড়ক চাই আমাদের প্রত্যাশার বৃত্তেই আটকে থাকবে। গণপরিবহন হয়রানি বেড়েই চলছে। আমাদের দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা যাত্রীবান্ধব নয়। অনেক সময় ভাড়া নিয়ে বাস কন্ডাকটারদের সঙ্গে যাত্রীদের ঝগড়া লাগে। যে কারণে যাত্রার মাঝপথেও যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। কখনও মারাত্মক ধরনের অপরাধ করলেও পরিরবহন কর্মীদের খুব সহজে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয় না। অনেক সময় চালকের সাজার রায়ের প্রতিবাদে আন্দোলন হয় এবং ভোগান্তি পোহাতে হয় পরিবহন সাধারন যাত্রীদের। এ অবস্থা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। ৩১ জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্য্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় রাজধানীতে গণপরিবহনে অপ্রাপ্তবয়ষ্ক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন অবৈধ গাড়ি চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্য্যালয়। সেই সঙ্গে বিমান বন্দর সড়কে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শাস্তির ভয় না থাকার কারণেই অনেক চালক বেপরোয়া গাড়ী চালান। তারা কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে বর্তমানে প্যানেল কোড ৩০৪ (খ) ধারায় মামলা হচ্ছে। এ ধারার সর্বোচ্চ সাজা ৩ বছর। শাস্তি কম হওয়ায় গাড়ী চালানোর সময় চালকরা তেমন সতর্ক থাকেন না। আমাদের দেশে যানবাহন দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো চালকের একটি মোবাইল ফোন সঙ্গে থাকা এবং গাড়ী চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলা। মোবাইলের এ অপব্যবহার রোধ করতে হবে। নিরাপদ সড়কের জন্য গাড়ী চালানোর সময় চালকের মোবাইল ফোনে কথা বলা বন্ধ করা অপরিহার্য।
গত ২১ জুলাই চট্রগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার পথে দুর্ঘটনায় আহত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাইফুর রহমান পায়েলকে হানিফ পরিবহনের চালক ও তার সহকর্মীরা অচেতন অবস্থায় সেতু থেকে খালে ফেলে দেয়। এটাও কি দুর্ঘটনা? এটাও কি হত্যা নয়? কোন পথে এগিয়ে চলছি আমরা? যেখানে আমাদের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই, নিরাপত্তা নেই, যেখানে নেই জীবনের কোনো মূল্য। নিরাপদ সড়কের জন্য মানুষ আন্দোলন করছে অথচ সড়কে প্রতিদিন লাশের সংখ্যা বাড়ছে। চলার পথে মানুষ মুহূর্তেই বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই কি বাংলার বুক থেকে শতশত করিম, মিম, রাজীব, পায়েল, তারেক মাসুদ, মিশুক মনির ও রুপারা বাসের চাকায় হেলপারের অমানবিকতায় সবাইকে কাঁদিয়ে যাবে? বিচারের বাণী নিরবেই কাঁদবে? এমন সম্ভাবনাময় তরুন প্রাণের মৃত্যুর দায় কে নেবে? সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মৃত্যুর বিধান সহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবী। নিরাপদ সড়ক এর জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশ করছি-
১। ট্রেনিং ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া যাবে না। ২। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে যাত্রীবান্ধব করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ৩। পরিবহন সেক্টরকে আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। ৪। গাড়ী চালানার সময় চালক মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে তাৎক্ষণিক জরিমানা প্রয়োগ করার ব্যাপারে ট্রাফিক পুলিশের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন করে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। ৫। যানবাহনের গতির তারতম্য নিয়ন্ত্রণ, ওভারটেকিং, ওভারলোডিং ইত্যাদি বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৬। মহাসড়কে নিষিদ্ধ ঘোষিত যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। ৭। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ৮। সিলেট ঢাকা মহাসড়ক সহ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক চারলেন করার জন্য কার্যকরি উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৯। পথচারিদেরও আইন মানতে হবে। আইন মানার জন্য সচেতন করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • খাদ্য নিরাপত্তায় বিকল্প চিন্তা
  • জন্মাষ্টমী ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ
  • বৃহত্তর সিলেটবাসীর একটি গৌরবগাঁথা
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • Developed by: Sparkle IT