সাহিত্য

বিদায় আল মাহমুদ

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০২-২০১৯ ইং ০০:৪০:৫৮ | সংবাদটি ২০৯ বার পঠিত



আল মাহমুদ চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুটা শুক্রবারে হোক। ‘আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার/ যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার/ কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে/ মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;/ অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে / ভালোমন্দ যা ঘটুক, মেনে নেবো: এ আমার ঈদ।’
বাস্তবে তাই হলো। ৮২ বছর বয়সে ১৫ ফেব্রুয়ানি শুক্রবার রাত ১১টায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কবি ইন্তেকাল করলেন।
আল মাহমুদ বিশ শতকের দ্বিতীয় অংশে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি শুধু কবি নয়, একাধারে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গাল্পিক, শিশুসাহিত্যিক, ছাড়াকার এবং সাংবাদিক। তিনি তাঁর কাজ দিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন। সরকারবিরোধী দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে কারাবরণও করেছেন।
আল মাহমুদের জন্ম ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার মোড়াইল গ্রামে। তাঁর মূল নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাইস্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড হাইস্কুলের পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। অতঃপর তিনি তিতাসের মতো আজীবন আত্মপ্রত্যয়ী এবং খর¯্রােতা ছিলেন। তাঁর জন্ম, শৈশব, কৈশোর, যৌবনে সব গিয়েছে তিতাস নদীর তীরে। তিনি বিভিন্ন কবিতায় তিতাসের স্মৃতিচারণ করেছেন বিভিন্নভাবে। ‘মুক্ত করে চক্ষু দুটি/ যেই ফেলি নিঃশ্বাস/ পিছিয়ে বললে, একি,/ শঙ্খিনী তিতাস?’ (করতলে)। ‘তিতাস’ শিরোনামে তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতাও আছে, ‘এ আমার শৈশবের নদী জলের প্রহার/ সারাদিন তীর ভাঙে, পাক খায়, ঘোলা ¯্রােত টানে/ যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্য নৌকার পালে/ গতি প্রবাহ হানে/ মাটির কলসে জল ভরে/ ঘরে ফিরে সলিমের বই তার/ ভিজে দু’টি পায়।’ (তিতাস)
কবি আল মাহমুদ সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্রধরে ঢাকা আসেন ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর প্রথম ঢাকায় আসার স্মৃতিচারণে কবি ও সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী আমাকে বলেন, একটা ছেলে একটা টিনের বক্স হাতে সওগাত অফিসে আসে কবিতা দিতে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সদ্য গ্রাম থেকে আসা। আমি তাকে বললাম, টেবিলে কবিতা রেখে যাও। সে তাই করলো। কবিতা হাতে নিয়ে দেখলাম, ভালো কবিতা। প্রকাশও করলাম। সেই ছেলে একদিন আল মাহমুদ হয়ে ওঠে। আমাদের স্বীকার করতে হবে, গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা এই কবি শুধু কবিতা সাধনা করে একের পর এক সাফলতা অর্জন করেছেন। ডিঙিয়ে গেছেন তাঁর সময়ের সকল কবিকে।
আল মাহমুদের লেখালেখির শুরু যতটুকু জানা যায়, সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্রপত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক কর্তৃক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায়। তিনি নাসির উদ্দিনের সওগাতেও লিখতেন। আল মাহমুদের কর্মজীবন শুরু হয় দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
আল মাহমুদ যখন সাংবাদিক, তখন খুবই সাহসী। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ নামক পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে যখন জাসদ গঠিত হয় তখন দৈনিক গণকণ্ঠ জাসদের মুখপাত্র বলেই প্রচার লাভ করে। এই সময় আল মাহমুদ আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক এক বছরের জেল খাটেন। অবশেষে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধু তাঁকে শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘ দিন তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৮ বছর বয়সে কবিতা লিখে আল মাহমুদ প্রশংসিত হতে থাকেন। ঢাকায় আসার পর পত্রিকায় কাজ নেন ও সাহিত্যে পুরোদমে মনযোগী হন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ, কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তাঁর নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।
১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে কবিতার বই ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হলে তিনি বাংলার প্রখ্যাত কবিদের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। এরপর ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘কালের কলস’, ও ‘সোনালি কাবিন’, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’। এই কবিতার বইগুলো আল মাহমুদকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখায় মনোযোগী হন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম ছোটগল্পের বই ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’ প্রকাশিত হয়।
আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহ, সহজিয়া, ধ্রুপদি, বাউল-মরমি, বাস্তব-পরাবাস্তব, ধর্ম-ধর্মহীনতা, আগুন-পানি, শালীনতা-অশ্লীলতার সংমিশ্রণ করেছেন তার কবিতায়। ফলে বিভিন্ন খন্ডে খন্ডিত সমাজের কোন খন্ডই তাঁকে হজম করতে পারেনি। অনেকের সাথে তাঁর সংঘাতটা এখানেই। দলান্ধ ধার্মিক কিংবা অধার্মিকেরা নিজেদের মতো না পেয়ে করেছে আল মাহমুদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। এই সব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আল মাহমুদ বলেন, ‘আমার চোখ দ্রষ্টব্যে উল্টো দিকে ফিরানো/ যেখানে ফালতু আবরণ উঠে গিয়ে আসন বেরিয়ে পড়ে/ কেউ বক্তিতা করলে আমি শুনতে পাই না/ বরং বক্তার জিভের ওপর তার আত্মাকে দেখতে পাই/ কেউ সেজদায় নত হলে/ আমি দেখি একটি কলস ভরা লোভ উপুড় হয়েছে।’ (উল্টো চোখ)।
সাহিত্যে অশ্লীলতা একটি আপেক্ষিক বিষয়। তবু অভিযোগ ওঠে আল মাহমুদের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার। প্রকৃত অর্থে আল মাহমুদের কবিতায় এমন কিছু শব্দের প্রয়োগ রয়েছে যা সামাজিক চোখে অশ্লীল, তবে শিল্পের চোখ দিয়ে দেখলে ভিন্ন প্রশ্ন, ‘এখন তোরা তুঙ্গ করে তোল/ উর্ধ্বে ধর মাংসর গোলাপ/ আঘাত থেকে আসবে ছেলেগুলো/ নাভির নিচে উষ্ণ কালসাপ।’ (মাংসের গোলাপ)। ‘পিয়ালার মতো দুটি বক্ষপদ্মে উড়ে গেলো দৃষ্টির ভ্রমর/ কাছে গিয়ে ডাকলাম।’ (অসুখে একজন)। ‘তারপর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী/ খেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ।/ শস্যের সপক্ষে থেকে যতটুক অনুরাগ পারি/ তারো বেশি ঢেলে দেবো আন্তরিক রতির দরদ।’ (সোনালী কাবিন)। ‘ঘুমের ছল কামের জল/ এখনো নাভিমূলে/ মোছেনি তবু আবার এলো/ আগের শয্যায়। (শূন্য হাওয়া)। ‘এমন কি মেয়েরা যখন কলকাতায় শাড়ি পাল্টায়/ আমার চোখ নির্লজ্জের মতো দ্রুত দেখে নেয়’। ... ‘পাটখেতে দমবন্ধ গরমের মধ্যে মুল্লাবাড়ির/ সবচেয়ে রূপসী মেয়েটিকে চুমূ খাওয়া’। (উল্টো চোখ)
আল-মাহমুদের কবিতা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে কিছু কারণে, এর মধ্যে অন্যতম তাঁর অসাধারণ এবং পাঠকের পরিচিত ‘উপমা’ ব্যবহার, ‘গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল’। (সোনালি কাবিন)। ‘মায়ের দেহের মতো চিরচেনা এই সে শহর’, ‘বৃষ্টির শব্দের মতো, হাসি যার কাঁপায় প্রহর’। (তৃষ্ণার ঋতুতে)। ‘সাহস হলো, বিদ্যুৎ চমকের মতো/ বিপদ আর মানুষের অসহায়তার ওপর দিয়ে/ যা হৃদয়য়ের ভেতর সঞ্চারিত হয়/ কিংবা ঈমানের উপমা হলো সাহস। (সাহসের উপমা)
পুরাণ বা মিথের ব্যবহার বিশ্ব সাহিত্যের একটি আদি ধারা। বাংলা অভিধানে ‘পুরাণ’ শব্দটি ইংরেজি ‘মিথ’ অর্থে ব্যবহৃত। পুরাণ বা মিথ হলো, প্রাচীনকাল থেকে লোকমুখে প্রচারিত কেচ্ছা-কাহিনি বা তথ্য-উপাত্তহীন আদি ইতিহাস-সম্পৃক্ত বিশ্বাস, ধারণা ও নৈসর্গিক ঘটনাবলির ব্যাখ্যা, অতিকথা, কল্পকথা। পশ্চিমা সাহিত্যে গ্রিক লোককথা থেকে মিথ গ্রহণ করে উপমা তৈরি করা হয়। মধ্যপ্রচ্যে বাইবেল, কোরআন কিংবা আলেফলায়লা ইত্যাদি থেকে কাহিনী সংগ্রহ করে উপমা তৈরি করা হয়। আর ভারতীয় সাহিত্যে হিন্দু পুরাণ মিথ-উপমার সমৃদ্ধ ক্ষেত্র। অতপর ভারতবর্ষে সংকরায়ন হয়েছে প্রথমে ইসলামের সাথে। এরপর পশ্চিমা গ্রিক মিথের সাথে। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ যেমন গীতা কিংবা পুরাণ থেকে কবিতার উপদান নিয়েছেন, তেমনি আল মাহমুদও তার কবিতায় কোরআন থেকে কাহিনীকে উপজিব্য করেছেন। আল মাহমুদের মিথাশ্রয়ী কবিতাগুলোয় মিথের প্রচলিত ধারণা ভেঙে ‘জুলেখার আগুন’, ‘ইউসুফের উত্তর’, ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ প্রভৃতি কবিতায় মিথিক প্রসঙ্গের মর্ম ও অভিজ্ঞান নতুনভাবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি প্রথাগত বিশ্বাসের বিপরীতে নতুন আস্থার অনুষঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। আল মাহমুদের কবিতায় কোরআন-হাদিসের নৈতিক শিক্ষাবিষয়ক কাহিনী থেকে শুরু করে প্রাচীন ইতিহাস, গ্রিক, হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি, কৌম সমাজের আদিম বিশ্বাস উপমা হিসেবে উঠে এসেছে। আল মাহমুদ কিংবা নজরুলের মতো এত উদারচিত্তে আর কেউ সবধর্ম থেকে কাহিনী উপমায় নিতে পারেননি। বাংলার বহমান ইতিহাস আর মিথের পুন্ড, পুরীর গৌরব, গৌতম বুদ্ধ, শ্রীজ্ঞান, নচিকেতা, ঋত্বিক, মহাস্থানগড়, মহালিঙ্গ শীলভদ্র ইত্যাদি ধারণ করে আল মাহমুদ তাঁর কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। ‘আমায় উঠিয়ে নাও হে বেহুলা শরীরে তোমার/ প্রবল বাহুতে বেঁধে এ গতর ধরো, সতী ধরো।’...‘অঘোর ঘুমের মধ্যে ছুঁয়ে গেছে মনসার কাল/ লোহার বাসরে সতী কোন ফাঁকে ডুকেছে নাগিনী’ (সোনালি কাবিন)। ‘পৃথিবীর চিহ্ন নিয়ে যদি ফেরে আশার কপোত/ গভীর আদরে আমি তুলে নেবো ফসলের বীজ/ আল্লাহর আক্রোশ থেকে যা এনেছি বাঁচিয়ে যতনে/ আবার বুনবো তা-ই পুণ্যসিক্ত নতুন মাটিতে।/ তোমাকে জড়াবো বুকে হে প্রেয়সী, তোমাকে কেবল/ রক্তের উত্তাপ দেবো, প্রেম দেবো, গান দেবো বেঁধে,/ তোমাকে ফসল দেবো, গৃহ দেবো, তৃপ্তি দেবো নারী।/ আপনাকে শান্তি দেবো আর নূহ, শক্তি দেবো আমি।’ (নুহের প্রার্থনা)।
এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আল মাহমুদ কোরআন এবং বাইবেল থেকে যেমন হযরত নুহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবনে সমস্ত পৃথিবী জলে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা এবং মহাপ্লাবন শেষে নুহ নবী কর্তৃক একটি কপোত উড়িয়ে পৃথিবীর বাসযোগ্যতা পরীক্ষা করা ইত্যাদি নিয়ে ‘নুহের প্রার্থনা’ শিরোনামে দীর্ঘ একটি কবিতা লিখেছেন, তেমনি তিনি বিভিন্ন কবিতায় নিয়ে এসেছেন ভারতীয় মিথ থেকে বেহুলা, মনসা, নচিকেতা, গৌতম ইত্যাদির কাহিনী। সরাসরি ইতিহাস থেকেও আছে বর্গীয়দের লুটরাজের কথা। এই সব কবিতায় কবি মিথ বা অলৌকিক কাহিনীর পাশাপাশি জীবনজগতের আশা-আকাঙ্খা, প্রেম-ভালোবাসা, আসক্তি, অর্থনীতি ইত্যাদিও অসাধারণ দক্ষতায় উপস্থাপন করেছেন।
আল মাহমুদের কবিতার আড়ালে বাউল-মরমিদের চিরচেনা সুর, সুফিতত্ত্ব ইত্যাদি স্পষ্ট শোনা যায়। তিনি কবিতায় কোরআন থেকেও বিভিন্ন কাহিনীকে অবলম্বন করেছেন। ‘অলৌকিক স্পর্ধা দাও। ঈশ্বরের অপরূপ ফল / আমি যেন বিদ্ধ করে নিতে পারি। যেন/ ভাগ করে দিতে পারি/ আমার সে প্রিয়তমা নারীকে কেবল।’ (অন্ধকারে একদিন)। এই কাহিনী তিনি কোরআনের আদম-হাওয়ার নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার ঘটনা থেকে নিয়েছেন। অতঃপর এই ফল ভাগাভাগি করতে চাচ্ছেন প্রিয়তমা নারীর সাথে। মরমী ধারায় শিষ্য যখন গুরুর চিন্তা অনুযায়ি হয় না তখন বলা হয়, ‘অকারণে তূলসির মূলে জল ঢালিলাম’। আল মাহমুদ সেই কথাই বলেছেন, ‘তখন ভেবেছি সোনার গাছ/ একদিন দেবে হীরের ফুল/ একদা মরমী হাওয়ার আঁচ/ দোলাবে এ গাছ মুক্তোফল/ আজ চেয়ে দেখি ভিজিয়ে ভুল/ অফলার মূলে ঢেলিছি জল।’ (মায়াবৃক্ষ)। বাউলরা নদী তীরে বসে উজান কিংবা ভাটির পথের মাঝিকে ডাকে, তা বাংলার পুরাতন একটি নিয়ম। আল মাহমুদও তাই করেছেন তার কবিতার ভাষায়, ‘জল ছেড়ে এসো প্রবালেই ঘর বাঁধি/ মাটির গন্ধ একবার ভালোবেসে/ জল ছেড়ে এসো মাটিতেই নীড় বাঁধি/ মুক্তো কুড়াতে যেয়োনা সুদূরে ভেসে।’ (সমুদ্র-নিষাদ)।
আল মাহমুদের মনে মাওলানা জালাল উদ্দির রুমী (র.)-র এশকের আগুন জ্বলছিলো, তাই তাঁর বিভিন্ন কবিতায় রুমিকে পাওয়া যায়, ‘সরাসরি কিংবা ইশারা ইঙ্গিতে পাওয়া যায়,/ ইশকের আগুনে বসে মাওলানা রুমীর গজল/ গাও কি রুহের পাখি? নাকি কোনো সুফীর সাধনে/ মেঘলোক ভেদ করে ছিন্ন করে নীলের চাদর/ অনন্তে সাঁতার কেটে ছুঁতে চাও ও-মুখাবয়ব’ (নেকাব)। আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় সুফীতত্ত্বের দেহতত্ত্ব নিয়ে প্রচুর খেলেছেন। দেহতত্ত্ব শীর্ষক তাঁর একটি কবিতাও রয়েছে, ‘কি মাখন পাও তবে প্রেমিকের নিত্য পরাভবে / দেহের মন্থন বিষে যে শরীর নগ্ন, বিবসনা। / আমারও মোক্ষই কাম্য, মেহনের চৌহদ্দি পেরিয়ে / ছুঁতে চাই আসক্তির আরও গূঢ় রহস্যের তল।’ (দেহতত্ত্ব)। ‘তরঙ্গিত প্রলোভন’, ‘চক্রবর্তী রাজার অট্টহাসি’, ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, ‘সবুজ ঈমান’, ‘হযরত মোহাম্মদ’, ‘বিশ্বাসের চর’, ‘নীল মসজিদের ইমাম’, ‘কদর রাত্রির প্রার্থনা’, ‘আলো নিরাকার’, ‘অদৃষ্টে প্রবেশ’, ‘হে আমার আরম্ভ ও শেষ’ কবিতাগুলোতে আল মাহমুদ তাঁর অধ্যাত্ম চেতনার প্রমাণ রেখেছেন।
আল মাহমুদ কবি এবং চিন্তক। ময়দানের কিংবা দলীয় রাজনীতিতে কোনদিন সক্রিয় ছিলেন না, তবে রাজনৈতিক চিন্তা ছিলো তাঁরমধ্যে। যৌবনে আল মাহমুদ মার্কসবাদি চিন্তার বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি জাসদের পত্রিকা গণকণ্ঠের সম্পাদক হিসেবে জেলেও গিয়েছেন। তাঁর চিন্তায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে কোরআন পাঠের মাধ্যমে। তিনি এই পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেছেন তাঁর বিভিন্ন কবিতায়। তাঁর স্পষ্টকথা, ‘পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে/ আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয় এ ছিলো সত্যিকার ঘুম/ কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলিনি, আর ঠিক তখুনি/ সেই মায়াবী পর্দা উঠলো যার ফাঁক দিয়ে/ যে দৃশ্যই চোখে পড়ে তোমরা বলো, স্বপ্ন।’ পরবর্তী বর্ণনায় কবি বলেন তিনি এই স্বপ্নে পৃথিবীর ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। কীভাবে কোথায় কতটুকু ধ্বংস ছিলো কবি বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে / সেই মহাগ্রন্থের কাছে নেমে এলাম / যখন দু’হাত বাড়িয়ে তা বুকের কাছে তুলে আনতে যাবো / খোলা পৃষ্ঠায় একটি আয়াতের ওপর নজর পড়লো/ ‘এইভাবে বহু শহর আমি ধ্বংস করেছি / যেহেতু তা ছিলো অন্যায়কারি / ফলে তা ধ্বংসস্তূপ হয়ে রয়েছে / আর পরিত্যক্ত কূপ, আর উঁচূ চূড়ার প্রাসাদ।’
১৬৭ লাইনের কবিতা ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’-তে কবি তাঁর পরিবর্তনে কোরআনের প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। আল মাহমুদ কবি ছিলেন। নজরুলের মতো বিদ্রোহী ছিলেন না, তবে তাঁর কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাসে প্রতিবাদ ছিলো কাব্যিক ভাষায়। কোরআন পাঠ থেকে তাঁর প্রশ্ন ছিলো মনে, ‘নৈশব্দের চেয়ে নিঃশেষ হওয়া কি ভালো নয়? কিংবা/ অসম্মানের চেয়ে মৃত্যু।’

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT