সাহিত্য

বই, বইমেলা এবং বই পড়া

শাহাদাত চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০২-২০১৯ ইং ০০:৪৪:৩৬ | সংবাদটি ২০৫ বার পঠিত

‘মানুষের জন্ম হেরে যাওয়ার জন্য হয়নি। সে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু পরাজিত হতে পারে না।’ এরকম কথা কাগজে পড়ে, বক্তৃতায় শুনে আর টেলিভিশনের পর্দায় দেখে কারো মনে সহজেই এর প্রভাব পড়ে যাবে, এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। হাজারো নীতিকথার মতো এটাও নিছক এক নীতিকথা এবং একটা সাদামাটা উক্তি হিসেবেই কানে ঠেকবে। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য কোন গল্পে প্রকৃতির প্রচন্ডতার সাথে লড়াইরত একজন নায়ক যখন কথাটি বলবে তখন সেটি আর সাদামাটা থাকে না, থাকতে পারে না।
মার্কিন কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। ১৯৫২ সালে ‘দি ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ নামক তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসে এঁকেছিলেন জীবন আর প্রকৃতির অপূর্ব এক চিত্র। কিউবার উপকূলীয় নুনা জলের সাথে ভাগ্যবিড়ম্বিত এক বৃদ্ধ জেলের জীবনকে মিশিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন এক মহাআবোহ। ১৯৫৩ তে পুলিৎজার আর ১৯৫৪ তে নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত বইটিতে টানা ৮৪ দিন চেষ্টা করেও কোন মাছ ধরতে না পারা জেলেটির প্রতি পাঠকের মমতা যখন চরমে পৌঁছে তখন তার মুখ দিয়ে বের করানো হয় কথাটি। মূর্তিমান হয়ে উঠে কথার গভীরতা আর বিশালতা। আর এভাবেই একটি বই পাঠককে খুঁজে দেয় জীবনের সার্থকতা।
এদেশে মাজার ব্যবসার সাথে আমাদের পরিচিতি দীর্ঘ দিনের। ধর্মের অবয়বে সহজ সরল মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে ফেঁপে উঠে বাবারা। গা সওয়া এই ব্যাপারটিতে আমাদের প্রতিক্রিয়া সামান্যই। কিন্তু বিষয়টিকে যখন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ‘লালসালু’র মাধ্যমে ১৯৪৮ সালে বইয়ের পাতায় চিত্রিত করলেন তখন আর প্রতিক্রিয়াহীন থাকেনি মানুষ। হাজার বক্তৃতার মাধ্যমে যে কথা বলা যায়নি, লেখক তাঁর ১১০ পৃষ্ঠার উপন্যাসে এর চেয়েও বেশি কথা বলে ফেলেছিলেন। বাংলা একাডেমি তাঁকে পুরস্কৃত করে এর সীকৃতিও দিয়েছিলো।
‘লালসালু’র মত বই পাঠকের মুখাবয়বে তৃতীয় আরেকটি চোখ লাগিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অতিরিক্ত এই চোখের মাধ্যমে পাঠক অদৃশ্য অনেক কিছুই দেখার সক্ষমতা লাভ করে। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ পায়। এতে করে সমাজকে এবং সমাজের নানা ঘটনা প্রবাহকে সূক্ষ্মভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতা লাভ করে মানুষ।
লক্ষ প্রদীপ জ্বালিয়ে স্থির জলে তা ভাসিয়ে দিলে কী এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণাই না হবে! প্রদীপের ফাঁকে ফাঁকে সবুজ চুড়িদার রেশমি কাপড়ের ফুলদানি সাজিয়ে নিজেকে যদি তার মধ্যখানে বসিয়ে দেওয়া হয়? ভাবা যায় কেমন দেখাবে দৃশ্যটা? মনের গহীনে স্বর্গের সুমিষ্ট অনুভূতি বইবে নিশ্চয়। একটা ভালো বই একটা প্রদীপের চেয়ে হাজারগুণ উজ্জ্বল। জীবনকে বইয়ের প্রদীপে ঘিরে রাখলে জীবন কখনো পথ হারাতে পারে না। রুশ সাহিত্যিক লিয় টলস্টয়কে তাঁর তিনটি প্রিয় বস্তুর নাম বলতে বলা হয়েছিলো। তিনি বলেছিলেন ‘প্রথমটা হলো বই, দ্বিতীয়টা বই, আর তৃতীয়টাও বই।’
অজানাকে জানা আর অচেনাকে চেনার যতগুলো মাধ্যম আছে তার মধ্যে বই হলো সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। এটা যে কোন বই হতে পারে। হতে পারে উপন্যাস, ছোটগল্প কিংবা কবিতার বই। রম্য, জীবনী, ধর্মীয়, ইতিহাস কিংবা বিজ্ঞানের বইও থাকতে পারে পছন্দের তালিকায়। বইয়ের বিশাল সমুদ্রে প্রথম ডুব দেওয়াটাই হলো কঠিন কাজ। একবার তা করে ফেলতে পারলে আর পেছনে তাকাতে হয় না। জ্ঞান তাপস ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর দৈনিক ১৮ ঘন্টা বই পড়ার গল্প এবং লাইব্রেরিতে নিজের অজান্তে বন্দীবস্থায় তাঁর সারা রাত বই পড়ে কাটিয়ে দেওয়ার গল্প অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকতে পারে। কিন্তু বই পড়ার আনন্দ যারা পেয়ে গেছে তাদের কাছে এগুলো খুব একটা বড় ঘটনা নয়।
আপনি রহস্য উপন্যাস ভালোবাসেন, পড়ুন সত্যজিৎ রায়। জীবনের সরলতা পছন্দ করেন হাতে নিন হুমায়ূন আহমেদের হিমুসমগ্র, আর জটিলতার জন্য ছুটে যেতে পারেন মিসির আলির কাছে। জীবনকে আর তার পারিপার্শিকতাকে বুঝতে চান, চলে যান রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের কাছে। প্রকৃতির নৈসর্গিকতা দেখতে ডাকুন বিভূতিভূষণ অথবা জীবনান্দকে। মহানবীকে জানার ইচ্ছা থাকলে গোলাম মোস্তফা পড়ে দেখতে পারেন। সাইন্স ফিকশনের জন্য জুলভার্নের পাশে আছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল।
শামসুর রাহমান, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, জসীম উদ্দীন, সুফিয়া কামাল, সৈয়দ মুজতবা আলী, মুনীর চৌধুরী, আর আল মাহমুদরা তাঁদের জীবনের বোধগুলোকে কাগজের পাতায় লিপিবদ্ধ করে আমাদের জন্য সম্পদ করে রেখে গেছেন। এমন সম্পদের অবহেলা করা মানে নিজের দুর্ভাগ্যকে নিজে ডেকে আনা। সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দ আলী আহসান, হুমায়ুন আজাদ, মানিক বন্দোপাধ্যায়, মীর মোশাররফ হোসেন, শওকত ওসমান আর প্রমথ চৌধুরীরা আমাদের আশেপাশেই ঘুরছেন। আমাদেরকে ডাকছেন প্রতিনিয়ত। একটু দূর থেকে ডাকছেন হোমার, ঈসপ, জালাল উদ্দিন রুমি, চার্লস ডিকেন্স, শেখ সাদী, আল্লামা ইকবাল, কালিদাস, মার্ক টোয়েন, শেকসপীয়ার, ওমর খৈয়াম আর ম্যাক্সিম গোর্কিরা। ছুটে যাওয়া উচিৎ শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, আর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কাছেও।
কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এইসব লেখকদের পাশাপাশি প্রতি বছর শত শত নবীন লেখক আর কবিরা ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে জড়ো হন একুশের বই মেলায়। বট গাছের তলায় এক টুকরো চটের ছালার উপর ৩২টি বই নিয়ে ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া মেলাটি আজ পুরো ‘বাংলা একাডেমি’ চত্বর ছাড়িয়ে ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’ পর্যন্ত বিস্তৃত। চিত্তরঞ্জন সাহার একক উদ্যোগে ‘স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ’ নামক একটি মাত্র প্রকাশনীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে যাত্রা করে কালের পরিক্রমায় তা এখন কবি-সাহিত্যিক, প্রকাশক, লেখক আর পাঠকের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। লেখক আর পাঠক তৈরিতে রেখে চলেছে মহা অবদান।
যুবসমাজের একটি অংশ যখন চারিত্রিক অধঃপতন, মাদকের ছোবল, আর হানাহানিতে নিমজ্জিত তখন কিছু সৃজনশীল তরুণ-তরুণী লিখে যাচ্ছেন অবিরাম। বছর জুড়ে তিল তিল করে গড়ে তোলছেন তাদের শব্দ-বাক্যের সোনালী দালান। পরম মমতা আর মস্তিষ্কের সকল ক্ষমতা দিয়ে লেখা বইগুলো নিয়ে হাজির হন বাঙালির প্রাণের মেলায়। সেই সাথে অভিজ্ঞ লেখকদের নতুন নতুন লেখনী মেলাকে করে তোলে আরো মহিমান্বিত।
‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।’ সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত উক্তিটি বুকে ধারণ করে পারিবারিক বাজেটের একটা অংশ বই কেনায় ব্যয় করা উচিৎ। কালজয়ী সব বইয়ের পাশাপাশি নবীনদের বইও কেনা দরকার। আজকের নবীন লেখকরাই তো একদিন সৈয়দ মুজতবা আলী আর শরৎচন্দ্র হয়ে উঠবে কিংবা তাঁদের চেয়েও বড় কেউ। ‘একুশে পদক’ আর ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ প্রাপ্ত লেখক আবু ইসহাক তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’টি রচনা করেছিলেন মাত্র ২০ বছর বয়সে ১৯৫১ সালে। তিনি তো ননই, এমনকি সে সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি জসীম উদ্দীন পর্যন্ত করতে পারেননি উপন্যাসটির প্রাথমিক মূল্যায়ন। ১৯৬১ সালে এক সম্মেলনে জসীম উদ্দীন সেটা স্বীকারও করেছিলেন। আর এটি লেখার পর প্রকাশের জন্য কোন প্রকাশক খুঁজে পেতে আবু ইসহাকের লেগেছিলো চার চারটি বছর।
‘আলোকিত মানুষ চাই’ আন্দোলনের প্রবক্তা ‘বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে’র প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবু সায়ীদের ‘বই পড়া’ কর্মসূচীর কথা আমরা সবাই কম বেশি জানি। ১৭ লক্ষেরও বেশি ছাত্র ছাত্রীকে এই কর্মসূচীর আওতায় এনে তিনি জাতিকে আঙ্গুল দিয়ে বই পড়ার গুরুত্ব দেখিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের উচিৎ পাড়ায় পাড়ায় গ্রান্থাগার প্রতিষ্ঠা করে যুবসামাজকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলা।
প্রত্যেক বাড়িতে সামর্থ অনুযায়ী একটি গ্রান্থাগার গড়ে তোলে পরিবারের সদস্যদের বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। একটি নয় দুটি নয়, কিনতে হবে অনেক বই। এই অনেক মানে কতটা? দশটা? না। বিশটা? হলো না। তাহলে কতটা? একটি পরিবারের খাবারের পেছনে যতটা খরচ হয় কমপক্ষে তার চার ভাগের এক ভাগ। তবে সংসারে অভাবটা প্রকট হলে হিসেবটা একটু ভিন্ন হতে পারে। পেটের খাবারের জন্য টাকা লাগলে মস্তিষ্কের খাবারের জন্যও তো টাকা লাগবে।
ওদিকে যারা ব্যস্ততার অজুহাতে বই পড়েন না তারা বিল গেটসের দিকে তাকাতে পারেন যার সময়ের দাম টাকার মূল্যে সেকেন্ডে দশ হাজার। বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী এই ব্যক্তি ২০১৮ সালে ৫০টির মত বই পড়ে ফেলার সময় পেয়েছেন এবং এগুলোর কয়েকটি সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ বুকরিভিউও লিখেছেন। রীতিমতো বইয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করে এগুলো পড়ার জন্য সকলকে পরামর্শও দিয়েছেন।
এবার একটা গল্প বলি। গল্পটির শেষে একটি ধাঁধাঁ আছে। দেখা যাক কয়জন ধাঁধাঁটির উত্তর দিতে পারেন? এক রাজার একজন জ্ঞানী সহচর ছিলেন। রাজা প্রায়ই তাঁর সাথে গল্প গোজব করে সময় কাটাতেন এবং তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতেন। একদিন সকালে রাজা তাঁকে দূত মারফত ডেকে পাঠালেন। দূত এসে দেখলো সহচর ব্যক্তিটি একটি কক্ষের মাঝখানে মাদুর পেতে বসে একমনে বই পড়ছেন। চারপাশে বইয়ের স্তূপ। দূতটি তাঁকে রাজার তলবের কথা জানালে তিনি বললেন, ‘রাজাকে গিয়ে বলো পরে আসছি। বেশ কিছু বিখ্যাত প-িত মনিষী ঘরে আছেন, তাঁদের সাথে আমার কিছুক্ষণ থাকতে হবে।’ দূত ফিরে যেতে যেতে ভাবলো ব্যাটা বুঝবে মজা। একে তো মিথ্যা বলছে তার উপর রাজার আদেশ অমান্য করার মত বেয়াদবী! কিছুটা খুশি আর কিছুটা আগ্রহ নিয়ে দূত রাজাকে ব্যাপারটা জানালো। আর বলল, ‘মহারাজ, আমি কিন্তু কক্ষে তাঁকে একা দেখেছি। কোন মনিষী টনিষী ছিলো না।’ দূত রাজার অগ্নিমূর্তি ধারণের একটা মজার দৃশ্যের অপেক্ষা করছিল। কিন্তু দেখা গেলো রাজা কোন রাগ তো করলেনই না, বরং দূতকে বললেন, ‘শুনো, তিনি মিথ্যা বলেননি। তাঁর কাছে আসা মনিষীরা সবাই অশরীরী তাই বাস্তবে তুমি তাঁদের দেখতে পাওনি।’ এই বলে রাজা তাঁকে বিদায় করে দিলেন। দূত মনমরা হয়ে বাড়ি ফিরে বউকে ডেকে বললো, ‘ওগো শুনছো, আমাদের রাজা একটা আস্তো গাড়ল।’ প্রিয় পাঠক, বলুন তো গল্পের এই রাজা কি আসলেই গাড়ল?

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT