বিশেষ সংখ্যা

বাংলাদেশে প্রচলিত নানান ভাষা

মাজেদা বেগম মাজু প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০১৯ ইং ০১:২০:০৪ | সংবাদটি ৩০৮ বার পঠিত

ভাবের আদান-প্রদানের নামই হলো ভাষা। ভাবের বাহনই ভাষা। ভাব প্রকাশের তাগিদেই ভাষার উদ্ভব। ভাষার প্রধান কাজই হলো একের ভাবনাকে অনেকের কাছে পৌঁছে দেয়া। এ যুগের শ্রেষ্ঠ ভাষা বিজ্ঞানী চমস্কির মতে ‘ভাষা কোন যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, ভাষা মানুষের সৃজনী চেতনার সঙ্গে যুক্ত।’ প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) এর ভাষাই ছিল পৃথিবীর প্রথম ভাষা। ভাষা সম্পর্কে কোরআন শরীফে বলা হয়েছে ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, তাদের কাছে পরিস্কার ভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন ও যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।’ সূরা ইব্রাহিম ঃ আয়াত-৪।
মায়ের কাছ থেকে শেখা ভাষাকে বলা হয় মাতৃভাষা। ভাষা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে জন্মের পর শিশু মায়ের কাছে বা কোলে, বাড়িতে বা পারিপার্শ্বিক পরিবেশে যে ভাষাটি প্রথম শিখে সেটাই তার মাতৃভাষা। ভাষা বিজ্ঞানে তাকে এল ওয়ান (খ১) প্রতীক ব্যবহার করে ল্যাঙ্গুয়েজ ওয়ান বা প্রথম ভাষা বলা হয়।
বাংলাদেশের প্রায় সব আদিবাসীর নিজস্ব মাতৃভাষা আছে। ১৯৯১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী ২৯টি আদিবাসীর নাম উল্লেখ করে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১২,০৫,৯৭৮। ২০১১ সালের জনগণনায় দেখা যায় ২৭টি আদিবাসী, জনসংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। অন্যদিকে বাংলাদেশের আদিবাসী ফোরাম প্রকাশিত ২০০৮ সালের স্মরণিকায় ৪৫টি আদিবাসীর উল্লেখ রয়েছে। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভাষা হচ্ছে সাওতাল, চাকমা, ককবরক, খাসি, গারো, চাক, বম, মারমা, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুুরি, তঞ্চঙ্গ্যা, রাখাইন, মৈতৈ মণিপুরি, ¤্রাে প্রভৃতি। এ ভাষাগুলো বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষা পরিবারের সদস্য। প্রায় সব আদিবাসীর নিজস্ব মাতৃভাষা থাকা সত্ত্বেও তারা সবাই নিজেদের জীবিকা ও জীবনধারণের প্রয়োজনে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে বাংলা ব্যবহার করে থাকেন।
ইংরেজি থেকে শুরু করে গ্রিক ও বাংলা বা হিন্দির মতো ভাষাগুলো মূলত ইন্দো-ইউরোপীয় ধারা থেকে এসেছে। ১৫০টির বেশি ভাষার তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা গবেষকদের তথ্যানুসারে হাজার হাজার বছর আগের একটি অভিন্ন আদি জনগোষ্ঠীর মুখে মুখে প্রচলিত একটি প্রাচীন ভাষাগোষ্ঠীর আধুনিক উত্তরসুরি হিসেবে এসব ভাষা আবির্ভূত হয়েছে। গবেষকদের মতে সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে ছয় হাজার বছর আগে পন্টিক কাম্পিয়ান সমতলভূমি অঞ্চলে আদি ভাষাটির প্রচলন ছিল।
পৃথিবীতে আসলে কয়টি ভাষা রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান করা কঠিন ব্যাপার। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা মতে, বিশ্বে প্রায় ৭০০০ এর বেশি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা রয়েছে। পৃথিবীতে এখনো ৪৬টি ভাষা রয়েছে যা দু-একজন ব্যক্তি ছাড়া কারো বোঝার ক্ষমতা নেই। গবেষণা থেকে জানা যায় পৃথিবীতে এখনো প্রায় ৬ হাজার ৯০০ এর বেশি জীবন্ত ভাষা রয়েছে। বাংলাদেশে বাংলাসহ প্রায় ৪২। এর অধিকাংশই বিপদাপন্ন ভাষা। ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ হাজারের নিচে নেমে গেলেই ভাষা বিপন্ন হয়ে পড়ে। আবার ব্যবহারকারীর সংখ্যা যদি এর থেকে বেশিও হয় কিন্তু ব্যবহারকারীদের মধ্যে শিশু কিশোরের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম হয় তাহলে সে ভাষা বাঁচিয়ে রাখা দুরূহ হয়ে পড়ে। ভাষা পরিসংখ্যান এথনোলোগ এর তথ্যানুসারে প্রতি ১৪ দিনে একটি বিপন্ন ভাষার মৃত্যু ঘটছে।
প্রতিটি দেশের রয়েছে নিজস্ব লিখিত ও কথ্য ভাষা। বিভিন্ন প্রয়োজনে মাতৃভাষা ছাড়াও রপ্ত করতে হচ্ছে দ্বিতীয় কোনো ভাষা। ক্লাল্লাম ভাষাসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০০টি আদিবাসী ভাষার মতো কত ভাষা যে হারিয়ে গেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। এক ভাষা বিলুপ্ত হয়ে তৈরি হয় নতুন আরেকটি ভাষা। বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পাশাপাশি নানা স্তরে নানা কাজে রয়েছে নানান ভাষা। তাছাড়া বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদেরও রয়েছে নিজস্ব ভাষা। বাংলাদেশের অন্যান্য ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা, আরবি, ইংরেজি, উর্দু, সংস্কৃত, পালি, ফারসি অন্যতম।
বাংলা ঃ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ যেসব ভাষায় কথা বলে বাংলা তার মধ্যে ষষ্ঠ। বাংলাদেশে বাংলা কার্যত অদ্বিতীয় ভাষা। ভারতের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ভাষাও বাংলা। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের অন্তর্ভূক্ত এ ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন এক হাজার বছরের পুরোনো চর্যাপদ। মধ্যযুগে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের অসামান্য বিকাশ ঘটে। বাংলা ভাষার আধুনিক যুগের শুরু হয় পাদ্রি ও সংস্কৃত পন্ডিতদের হাতে। বাংলা গদ্যের শুরুর পূর্বে প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহের নাম উল্লেখযোগ্য। এরপর রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত্যের নানা মাধ্যমে কাজ করে বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় একার প্রতিভায় এই ভাষাকে শিখরে পৌঁছে দেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে অকুতোভয় বাঙালির রক্তের বিনিময়ে ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০০ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা ও কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে।
আরবি ঃ আরবি ভাষার জন্ম আরব উপদ্বীপে। আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষাগুলোর এক প্রধান অব পরিবারের এটি সেমিটিক ভাষা। ইসলাম ধর্মের সাথে সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। ধ্রুপদি আরবি কোরআন শরীফ এর ভাষা। এ ভাষা প্রায় ১০ কোটির বেশি লোকের মাতৃভাষা। আরবি বর্ণমালা ডান দিক থেকে বামে লেখা হয়। আরবি হরফ উর্দু ও সিন্ধি ভাষায় ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় এ ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ রয়েছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরবি ভাষার প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার।
ইংরেজি ঃ প্রায় নয় হাজার বছর আগে ইংরেজিসহ আধুনিক ইন্দো-ইউরোপীয় বিভিন্ন ভাষার উদ্ভব হয়েছিল পূর্ব ইউরোপের আনাতোলিয়ায় (বর্তমান তুরস্ক) সতেরো শতকের প্রথম ভাগেই বাংলা অঞ্চলে ইংরেজি ভাষার প্রচলন শুরু হয়। ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত চার্লস উডের এডুকেশনাল ডিসপ্যাচ-এ বলা হয়, নি¤œস্তরে শিক্ষাদানে ভাষা হবে নিজ নিজ মাতৃভাষা, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে হবে ইংরেজি। ১৭৮০ সালে জেমস হিকি প্রকাশিত ‘বেঙ্গল গেজেট’ ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বঙ্গের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র, অনেক বাঙালি ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইংরেজিতে সাহিত্য রচনার জন্য প্রসিদ্ধ। ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ তার উল্লেখযোগ্য ইংরেজি রচনা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ইংরেজিতে লিখেছিলেন। মুসলমান লেখকদের মধ্যে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যারা সৈয়দ আমীর আলী তাদের মধ্যে অন্যতম লেখক। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজি ভাষায় তার ‘সং অফারিংস’ এর জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
উর্দু ঃ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবর্গের অন্তর্গত ইন্দো-ইরানীয় উপগোত্রের একটি ভাষা উর্দু। দিল্লি ও তার আশপাশে প্রচলিত হিন্দি ভাষার সাথে প্রায় দুই শতাব্দী (১২০০-১৪০০) ধরে ফারসি শব্দের মিশ্রণের ফলে উর্দু ভাষার জন্ম হয়। ভাষাবিদেরা এ মিশ্রিত বুলিকে খাড়িবুলি, রিখতা ও হিন্দুস্থানি বলে আখ্যায়িত করেছেন। উর্দু একটি তুর্কি শব্দ। বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ লোক উর্দু ভাষায় কথা বলেন। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য উর্দু পত্রিকা ‘আল মাশরিক’ (১৯০৬-১৯০৭) ও ‘জাদু’ (১৯২৩) এবং পাকিস্তান আমলে ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত ‘ওয়াতন’ ও ‘পাসবান’ উল্লেখযোগ্য।
সংস্কৃত ঃ প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে চর্চিত সংস্কৃত ভারতবর্ষের প্রাচীনতম ভাষা। সংস্কৃত ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন ঋগে¦দ। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত ইন্দো-ইরানীয় উপশাখার একটি ভাষা সংস্কৃতের নিজস্ব কোন বর্ণমালা নেই। যে যে অঞ্চলে-এর চর্চা হয়েছে সেখানে প্রচলিত বর্ণমালাতেই এটি লিখিত হয়েছে। তবে দেবনাগরী বা নাগরী বর্ণমালা সংস্কৃত লেখার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পালযুগে (৭৫০-১১৬১) বৌদ্ধ রাজাদের সময়ে সংস্কৃত ভাষা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য চর্চা হয়। সেন যুগের হিন্দু রাজারা এ চর্চাকে আরো বেগবান করে তুললেও মুসলিম যুগেও (১২০৬-১৭৫৭) বাংলা অঞ্চলে সংস্কৃতের উল্লেখযোগ্য চর্চা হয়। বাংলায় সনাতন পদ্ধতিতে সংস্কৃতচর্চার কেন্দ্রগুলো ‘টোল’ নামে পরিচিত।
পালি ঃ ‘পালি’ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে ঝধপৎবফ ঞবীঃ অর্থে। প্রাচীন ভারতের একটি সমৃদ্ধ ভাষা পালিকে বৌদ্ধ পন্ডিতেরা শ্বাশত ভাষা বলে মনে করেন কারণ এ ভাষার পরিবর্তন অসম্ভব। বৈদিক ভাষার মতো ‘দেবভাষা’ পালির নিজস্ব কোন বর্ণমালা নেই। শ্রীলংকাতে সিংহলি লিপিতে পালি লিখিত হলেও খেমের, থাই, দেবনাগরী, বর্মী ও লাও লিপিতেও পালি লেখার প্রচলন আছে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত পালি ভাষা ও সাহিত্যের অসামান্য বিকাশ ঘটেছে। সদাবুদ্ধ এ ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে তার অনুসারীদের কাছে পালি ব্যাপক তাৎপর্য লাভ করে। পরে এ ভাষাতেই বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটক সংকলিত হয়। বাংলাদেশে ত্রিপিটক চর্চার ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। প্রথমদিকে দেবনাগরী ও রোমান হরফে পালি গ্রন্থ ছাপা হলেও পরে বাংলা অক্ষরে মুদ্রিত হওয়ায় পালিচর্চার পথ সহজ হয়। ১৯০৮ সালে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পালি পড়ানো শুরু হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পালি ভাষার চর্চা শুরু হয়।
ফারসি ঃ বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই ফারসি ভাষার প্রচলন ছিল। ইরান থেকে আসা সুফি দরবেশ, ব্যবসায়ী, সৈনিক ও রাজন্যরা এখানে ফারসি নিয়ে আসেন। বাংলায় ইসলাম প্রসারের কারণে এ জনপদে আসে আরবি ও ফারসি। ৬০০ বছরের (১২০৩-১৮৩৭) বেশি সময় ধরে যখন ফারসি বাংলার রাষ্ট্র ভাষা ছিল তখন এ দীর্ঘ সময়ে হাজার হাজার ফারসি গ্রন্থ লেখা হয়। উনিশ শতকে মুদ্রণযন্ত্রের প্রচলন ও আধুনিক গ্রন্থাগার স্থাপিত হওয়ায় ফারসিচর্চা ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ১৮৩৭ সালের ২০ নভেম্বর কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে অফিস-আদালত তথা রাস্ট্রীয় কর্মকান্ডে ফারসির ব্যবহার নিষিদ্ধ করলে ফারসির চর্চা স্তিমিত হয়ে আসে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে যে ১২টি বিভাগ খোলা হয়েছিল ‘ফারসি ও উর্দু বিভাগ’ তার একটি। ফারসি ভাষা আগমনের ৭০০ বছরে বাংলা ভাষায় প্রচুর ফারসি শব্দ ও ভাষাভঙ্গি প্রবেশ করার কারণে আমাদের সাহিত্যে অন্তত ১০ হাজার ফারসি শব্দ নানা সময়ে ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলাদেশে বাঙালির বাইরে প্রায় ৪০টিরও বেশি নৃগোষ্ঠী রয়েছে। এদেশে বসবাসরত নৃগোষ্ঠীগুলো পৃথিবীর অন্যতম ৪টি ভাষা পরিবারের প্রায় ৩০টি ভাষা ব্যবহার করে থাকে। গবেষকদের মতে ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তঞ্চঙ্গ্যা চাকমার উপভাষা। কেউ কেউ রাখাইনকে মারমা ভাষার উপভাষা, লালং বা পাত্রকে গারো আর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ও হাজংকে বাংলার উপভাষা হিসেবে চিহ্নিত করেন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীর ভাষার সংখ্যা প্রায় ২৬। এর মধ্যে সাওতাল, ককবরক, খাসি, গারো, চাক, বম, মারমা, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, তঞ্চঙ্গ্যা, রাখাইন, মৈতৈ মণিপুরি ও ¤্রাে অন্যতম।
তাছাড়া আরো যেসব ভাষা রয়েছে সেগুলো হলো-মুন্ডা নৃগোষ্ঠীর মৌখিক ভাষা ‘মুন্ডারী’ রবিদাস নৃগোষ্ঠীর ব্যবহৃত ভাষা ‘নাগরি’ কন্দ নৃগোষ্ঠীর প্রচলিত মৌখিক ভাষা ‘কন্দ’, অসমিয়া, বাংলা, গারো প্রভৃতি ভাষার সংমিশ্রণে তিব্বতীয় বর্মন ভাষার অন্তর্ভূক্ত ‘কোচ’ রানা কর্মকার নামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা ‘খোট্টা’ বর্মণ নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব কথ্য ভাষা ‘ঠার’ উত্তর কুকিচিন দলভুক্ত ভোট চীন ভাষাভাষীর ভাষা ‘পাংখোয়া’, বম, পাংখোয়া, খিয়া ও মণিপুরী ভাষার সংমিশ্রণে ভাষা ‘লুসাই’ ওরাঁওদের ভাষা ‘কুরুক’ মাহাতো নৃগোষ্ঠীর ভাষা ‘কুর্মালী’ এবং প্রায় বিলুপ্ত ভাষা ‘রাজবংশী’।
প্রতিটি দেশেই নিজস্ব লিখিত ও কথ্য ভাষার বাইরে অন্য ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। দুই হাজার বছরের পুরনো বৃহত্তর লন্ডনের পরিসীমার ভেতর বসবাসকারীরাই ৩০০টি ভিন্ন ভিন্ন জীবন্ত ভাষায় কথা বলে। সকল ভাষাভাষির লোকেরাই নিজেদের ভাষা বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেষ্ট। ভাষার বিলুপ্তি মানে কেবল একটি ভাষারই মৃত্যু নয়, একটি সংস্কৃতির, একটি মানবগোষ্ঠীর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানেরও বিলুপ্তি। তাই ভাষাকে বিকৃত করার মাধ্যমে গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে নিজ নিজ ভাষার প্রতি সকলেরই সচেতন ও যতœবান হওয়া একান্ত জরুরি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT