বিশেষ সংখ্যা

ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা

সাদিয়া চৌধুরী পরাগ প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০১৯ ইং ০১:২০:৪৭ | সংবাদটি ১৫৭ বার পঠিত

আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয় হলো মুক্তির চির জাগ্রত ভাস্কর। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ বিন¤্র চিত্তে আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে এই মহান দিন উদযাপন করে। এই উদ্যাম মিলন প্রমাণ করে যে, ধর্ম যার যার, দেশ ও মাটি সবার।
আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয় প্রাপ্তি সম্পর্কে আলোচনাকালে প্রথমেই উঠে আসে ন’মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের কথা। এই দিনে পৃথিবীর মানচিত্রে আসে প্রিয় বাংলাদেশ। স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর রণক্ষেত্রে বাংলার স্বাধীনতা সূর্যকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় দুইশত বৎসরেরও অধিক বৎসর অতিবাহিত হওয়ার পর শত লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, দুর্ভোগ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসানে বিংশ শতাব্দীর এক সময়ে সেই হারানো দিবাকরের পুনরুদ্ধার ঘটে।
স্বাধীনতা হরনের (১৭৫৭ সাল) আকস্মিক ঘটনায় দেশের জনগণ কিছুদিন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থাকলেও অনতি বছরের মধ্যে তারা সংঘবদ্ধ হতে থাকে মুক্তির লক্ষ্যে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিশাল ব্যাপারটির সংকল্প ও প্রস্তুতি চলতে থাকে পুণ্যভূমি জালালাবাদের মাটিতে অর্থাৎ এই সিলেট শহরে। এই অঞ্চলের নির্ভীক বীর সৈয়দ হাদী ও মাহদী দুই সহোদরের নেতৃত্বে গোপন ঘাঁটি গড়ে ওঠে দেশের স্বাধীনতা পুর্নোদ্ধারের লক্ষ্যে। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য যে, ইংরেজ সরানোর এই সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের পরিকল্পনা অচিরেই আনুধাবন করে এবং তা ধুলিষ্মাৎ করে দেয় ও স্বাধীনতাকামী বীর সহোদরকে গুলি করে হত্যা করে। এবং এরাই হলেন স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সর্বপ্রথম মুক্তিযোদ্ধা ও আত্মদানি মানুষ।
বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর প্রায় একই সঙ্গে বিহার ও উড়িষ্যা বেনিয়া ইংরেজদের হস্তগত হয়ে যায়। কারণ নবাব আলীবর্দী খাঁ শুধু সুবাহ বাংলার অধিশ্বর ছিলেন না, একই সঙ্গে তিনি বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীন নৃপতি ছিলেন। তাঁর পরলোক গমনের পরে মনোনীত ও সুযোগ্য উত্তরাধিকারী, দৌহিত্র নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বিশাল মসনদে আরোহণ করেন।
কিন্তু নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে অতি অল্প বয়সকালে এবং মসনদ লাভের অল্প সময়ের মধ্যে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও স্বজন পরিজনদের ঈর্ষা দ্বন্দ্বের কবলে পড়ে যান। এবং এদেরই যোগসাজশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রধান রবার্ট ক্লাইভের শিকার কিংবা হত্যার লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। যার পরিণতিস্বরূপ এদেশ ও জনগণকে ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন থেকে ১৯৪৭ সালের আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক বৎসর দাসত্বের অপমান ও ঘৃণ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে হয়।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ইংরেজ সরকারের পরাধীনতার নাগপাশ থেকে ও বিশাল ভারত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাকিস্তান নামে যে নতুন রাষ্ট্র পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান দখল করে এর এক অংশ পূর্ব-বাংলার মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চর যা পূর্ব-পাকিস্তান নামে পরিচিতি লাভ করে। এবং অপর অংশ হাজার মাইলেরও অধিক দূরত্বের অঞ্চল পশ্চিম পাকিস্তান। এই দুই অঞ্চলের জনগণ একই ধর্মের শামিয়ানা বা ছায়াতলে থাকায় তৎকালীন সময়ে অনেকের প্রাণে দৃঢ়মূল ধারণা প্রোথিত হয় যে, ইসলামের সাম্যবাদ ও উদারনীতি দ্বারা সংঘবদ্ধভাবে পাকিস্তান শাসিত হতে থাকবে।
কিন্তু নব-সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ব অংশ অর্থাৎ পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের বিশাল বিশ্বাস ভঙ্গ করতে তৎকালিন পাকিস্তান সরকার কাল ক্ষেপণ করেনা যেনো। এরা অচিরেই পূর্ব পাকিস্তান কিংবা পূর্ব অঞ্চলের জনগণের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ প্রদর্শণ ও নানা অসম কার্যোকলাপ প্রকাশ করতে থাকে। তাদের মনোভাব এমনভাবে পরিলক্ষিত হয়ে ওঠে যে, পূর্ব বাংলাবাসী যেনো পুরানো দখলদার বেনিয়া ইংরেজদের হাত বদল হয়ে নব্য দখলদার শাসক, পশ্চিম পাকিস্তানিদের কর্র্তৃত্বে বাঁধা পড়েছে। এবং এর প্রকৃত চিত্র পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে ১৯৪৭ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ঢাকার বুকে তমদ্দুন মজলিশ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্লাটফর্ম গঠন হওয়ার অল্প দিনের মধ্যে। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক আবুল কাশেম এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু না বাংলা?
সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় ভাষা নিরসন ও নিশ্চয়তার কারণে তরুণ অধ্যাপক আবুল কাশেম এই প্রশ্নটি জাতির সম্মুখে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে ও গণতান্ত্রিক নীতি বৃত্তে থেকেই তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৯৪৮ সালে) পূর্ব পাকিস্তান সফরকারে স্পষ্ট ভাষায় মতামত জানিয়ে বলেন, উর্দু, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।
সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত সমগ্র পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান সফরের প্রধান উপলক্ষ্য এবং আকর্ষণ ছিল, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে ঋদ্ধ ও খ্যাত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগদান করা। এবং সেখানে সেই সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আলোচনার এক সময়ে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হওয়ার প্রতি যে জোরালো দাবি উত্থাপন করতে থাকেন, এর প্রতি উত্তরে উপস্থিত ছাত্রগণ বারবার নো, নো ইংরেজি শব্দের মাধ্যমে নিজেদের বলিষ্ঠ মতামত জানাতে থাকে। এর প্রেক্ষাপটে যে প্রকট সত্য উন্মোচিত হয় তা হলো, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার বুকে প্রতিষ্ঠিত ও নব্য সৃষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠন কর্তৃক উত্থাপিত প্রশ্নের আষ্ট-পৃষ্ঠে জড়িত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদান ও দেশের সর্বজন দ্বারা এর গণতান্ত্রিক প্রাপ্তি স্বীকার করে নেওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীগণ সেদিন তাদের ঐতিহাসিক সমাবর্তন অনুষ্ঠান চলাকালে গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সম্মুখে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের নৈতিক দাবি ও অধিকার সম্পর্কে শাসককে শুধু জাগ্রত করেনি, বলতে গেলে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সফরকে ম্লান করে দিয়েছিল।
১৯৪৭ এর ১৪ই আগস্ট থেকে ১৯৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি এই গুরুত্বপূর্ণ প্রায় পাঁচটি বৎসরে পূর্ব পাকিস্তানের মাটি ও মানুষের অন্তরে শুধু রাষ্ট্রভাষা বাংলাকরণের অগ্নি দহন ঘটেনি, এর পাশাপাশি জনগণকে নির্মমভাবে শোষণের যাঁতাকলে পিষ্টের দৃশ্য ভেসে ওঠে। উদাহরণ স্বরূপ এ অঞ্চলের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি, সোনালী সূত্র পাটকে তুলে ধরা যায়। বেনিয়া ইংরেজ শাসনামলে এই সোনালী সূত্রের কাঁচামাল দ্বারা সাত সাগর পারের ডাল্ডি শহর গড়ে ওঠে। অথচ, পাকিস্তান লাভের পর এই পাট উৎপাদনে সরকারের অমনযোগী অভিপ্রায় দিন দিন প্রকাশ পেতে থাকে এবং বিশ্ব বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় পাট পতন্মুখী ও অলাভজনক ফসলে পরিণত হতে থাকে। উপরন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য কাঁচামাল ও এর রাজস্ব দ্বারা পশ্চিম পাকিস্তানকে নতুন রূপে সাজানো গোছানো এবং নিরন্ন ও প্রান্তিক মানুষের জন্যে কর্ম সংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি ছিল চোখে পড়ার মত। অথচ এ ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের ওই অঞ্চলের দরিদ্র জনগণ ছিল একেবারেই উপেক্ষিত। যা থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হতে থাকে পাকিস্তানের শাসকদলের বৈষম্যমূলক রূঢ় আচরণসহ ইসলামের সাম্য নীতি লঙ্ঘনের ভয়ানক চিত্র সমূহ। উপরোন্তু সরকারি চাকরি কিংবা সামরিক বাহিনী ও বিমান বাহিনীসহ অন্যান্য পদস্থ কর্মে পূর্ব পাকিস্তানের যোগ্য লোক নিতেও নানা আপত্তি বিপত্তির কৌশল ফাঁদ পেতে রেখে তাদেরকে প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হত। সে কারণে বলা যায়, ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের দাবানল ধীরে ধীরে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক চক্রের অগণতান্ত্রিক মনোভাব ও বৈষম্যমূলক কর্মকান্ডের পরিণতিতে ৬৯-এর গণ-আন্দোলন বিসুভিয়াসের অগ্নোৎপাতের আকার ধারণ করে। এবং ৭০-এর নির্বাচন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের অবিশ্বাস্য জয় লাভ, পাকিস্তানের তৎকালিন প্রেসিডেন্ট এহিয়া খান ও তার দোসর এরা অহমিকাবোধ, ঈর্ষা ও পাশবিকতার জঘন্য মন-মানসিকতার কারণে মেনে নিতে পারেনি। ফলে নানা টালবাহানার এক পর্যায়ে ২৫শে মার্চ (১৯৭১) এ ভয়ংকর রাত সৃষ্টির মাধ্যমে মানবতা লঙ্ঘন করে ধর্মীয় বিধি নিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্বিচারে আদমের হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার বুকে ভার্সিটির শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, সাধারণ জনগণ, পুলিশ বাহিনী, শিশু-নারী-বৃদ্ধ কেউ এই বিভৎস হত্যা থেকে নিস্তার পায়নি।
ন’মাসের এই যুদ্ধে প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। হাজার হাজার সতীকে সতীত্ব হারাতে হয়। মাকে হারাতে হয় বুকের ধন, তার সন্তান। স্ত্রীকে হারাতে হয় ঘর বাঁধার সাধ বাসনার সঙ্গী স্বামী, বা বর পরিচিতির ভালোবাসার মানুষটিকে। ঘর-বাড়ি, গরু ছাগল অর্থাৎ সম্পদ হারাতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ জনমানুষকে। কিন্তু হাল ছাড়েনি কেউ। যারা দেশের মাটিতে কিংবা যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রতিক্ষণে মৃত্যুর মুখোমুখী হয়ে বেঁচে বর্তে ছিল এদের সর্বক্ষণের প্রার্থনা ছিল, দেশ মুক্তি ও শান্তির উদ্দেশ্যে।
২৬শে মার্চ (১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার দিন হলেও ১৬ই ডিসেম্বর (১৯৭১) এর পূর্ণ প্রাপ্তি ও বিজয়ের দিন। তবে, আমাদের স্মরণ রাখতে হবে ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন যে স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয় এরই পুনোর্দয়ন ঘটে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সনে। দেশের জন্যে ত্যাগ স্বীকারে যারা মান ইজ্জত ধন সম্পদ এবং প্রাণ দান করে গিয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বর তাঁদের জন্যেই গৌরবোজ্জল হয়ে ওঠে। এদিন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন। মুক্তির শুভ দিন।

 

শেয়ার করুন
বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • প্রসঙ্গ : মে দিবস
  • মে দিবস ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন
  • শ্রমিক দিবস ডাক দিয়ে যায়
  • মে দিবস পালনের মতাদর্শগত ভিত্তি
  • নববর্ষ নিয়ে আসুক শান্তি
  • বৈশাখী ভাবনা
  • বৈশাখে রবীন্দ্র-নজরুল
  • শৈশবের নববর্ষ উদযাপন
  • মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা
  • পেছন ফিরে দেখা
  • মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের ভূমিকা
  • স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়
  • ভাষার ব্যবহারের শুরু ও একুশ
  • প্রসঙ্গ : ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ
  • ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা
  • বাংলাদেশে প্রচলিত নানান ভাষা
  • বর্ষ গণনা ও ক্যালেন্ডারের ইতিকথা
  • নতুন বছরে নতুন শপথ
  • সালতামামি ২০১৮ : প্রত্যাশার ২০১৯
  • বাংলাদেশ, বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT