বিশেষ সংখ্যা

ভাষার ব্যবহারের শুরু ও একুশ

জিয়া আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০১৯ ইং ০১:২৩:১৭ | সংবাদটি ৬৮ বার পঠিত

সংস্কৃতির বিকাশে ভাষার গুরুত্ব কতটুকু, মানব জাতির কিংবা সভ্যতার পর্যায়গুলো বিশ্লেষণ করলে তা দেখা যায়। সংস্কৃতির অন্যতম খুটি ও পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হচ্ছে ভাষা। ভাষা ছাড়া সংস্কৃতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান, কিংবা ইতিহাস কল্পনা করা যায় না । মানব সভ্যতায় মানুষ শ্রেষ্ঠ প্রাণী কেবল তার ভাষা ব্যবহারের সক্ষমতা আছে বলে। ডেনিয়েল এভার্ট (এম.আই.টির অধ্যাপক) তার বই ‘কীভাবে ভাষার শুরু’-তে বেশ চমকপ্রদ তথ্য প্রদান করেছেন। মানব বিবর্তনের তৃতীয় পর্যায়ের হোমোনিডদের (মানুষের বৈশিষ্ট্য আছে এমন প্রাণী) বলা হয় হোমো এরেকটাস, যাদের ব্রেইন সাইজ তাদের আগের দুই হোমোনিডের চেয়ে বেশি ছিল। ধারণা করা হয়, সম্ভবত হোমোনিডদের মধ্যে হোমো এরকটাস ভাষার ব্যবহার আগে করে।
আধুনিক ভাষা থেকে সে ভাষার বৈচিত্র্য কতটুকু ছিল তা রহস্যই রয়ে গেছে। তবে আধুনিক গরিলা থেকে হোমো এরেকটাসের ভোকাল এপারেটাস এতটা বিকশিত ছিল না। হোমো এরকটাস যে ভাষার ব্যবহার করত, সেটা ধারণা করা হয় তাদের পাওয়া জীবশ্ম, তাদের সংস্কৃতি, হাতিয়ার ও বসবাসের জায়গা থেকে। আরেকটা বিষয় থেকে ধারণা পাওয়া যায় হোমো এরেকটাস ভাষার ব্যবহার করতো। কারণ হোমো এরেকটাস সমুদ্রপথে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়ার জন্য নৌকা সদৃশ্য এক ধরনের বাহন ব্যবহার করতে শিখে, যা তৈরি করতে গেলে তাদের সেই উপকরণ সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে অর্থাৎ কী ধরণের উপকরণ লাগবে, তার কাঁচামাল কোথায় থেকে নিয়ে আসতে হবে সেটা জানতে হবে এবং সেইগুলো কীভাবে একত্রিত করে একটা আকৃতি প্রদান করা যায় সেই জ্ঞান থাকা জরুরি।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হরো পরষ্পরের সাথে যোগাযোগ করা বা ভাববিনিময় করা। ধারনা করা হয় তারা যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে ভাষা ব্যবহার করতো। মানব বিবর্তনের তার শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি জিনগত বিবর্তনও শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবে হোমো এরকটাসের ও জিনগত পার্থক্য ছিল আধুনিক মানুষের চেয়ে এবং তা অপেক্ষাকৃত কম বিকশিত ছিল। হোমো এরেকটাসে ঋড়ীচ২ জিন ছিল না, যা ঋড়ৎশযবধফ নড়ী চৎড়ঃবরহ চ২ নামে পরিচিত, যেটা আধুনিক মানুষে আছে এবং এর জন্য আধুনিক মানুষের ভোকাল কর্ড এতটা উন্নত পর্যায়ের। কিছু নৃ-বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্ক থাকলে ও পাওয়া জীবশ্ম ও অন্যান্য উপকরণ থেকে বলা যায় হোমো এরেকটাস থেকে ভাষার ব্যবহার শুরু হয়, যা তার উত্তরসুরি হোমো সেপিয়ান্সে আরো বিকশিত পর্যায়ে এসেছে।
হোমা সেপিয়ান্সে থেকে আধুনিক মানুষ যেখানে আজ হাজারো ভাষা। এই হাজারো ভাষার মধ্যে (প্রায় সাড়ে তিন হাজার) বাংলা আমাদের একটি অনন্য ভাষা। পৃথিবীতে ভাষার জন্য সংগ্রাম হয়েছে, রাজ পথ রঞ্জিত হয়েছে এইরকম ইতিহাস অনেক কম। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আইরিশদের গ্যালিক ভাষা, স্পেনের বাস্কভাষীদের ভাষা, ১৯৬১ সালের আসামের শিলচরের আন্দোলন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে অনেক মতবাদ আছে তার মধ্যে ড. নীহাররঞ্জন রায়ের মতে ‘চট্টল (বঙ্গ-সমতট-বরেন্দ্র) অঞ্চলের লোকজনের ভাষারূপে আদি বাংলা ভাষা আসে এবং সে ভাষা নিয়ে তখনকার উচ্চবিত্তদের মধ্যে একধরণের অবজ্ঞা ছিল।’
প্রশ্ন হচ্ছে বাংলা ভাষার উৎপত্তির পর সেটি কি কেবল প্রাচীন যুগেই অবজ্ঞার শিকার হয়েছে? সহজ উত্তর হচ্ছে না মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে এসে ও বাংলা ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত এবং অবহেলিত হচ্ছে। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪২ সালের ইংরেজ ছাড় আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এর মধ্যে ১৯৪৭ এর প্রেক্ষাপট ভাষার বিচারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ অনেকটা পূর্ব পরিকল্পনা থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মাতৃভাষা রূপে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। এ নিয়ে সর্বপ্রথম কলম ধরেন বিভিন্ন লেখকগণ তাদের মধ্যে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। ড. এনামুল হকের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য এবং বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদকীয় লিখা হতো এ নিয়ে এর মধ্যে আজাদ, মিল্লাত ও ইত্তেহাদ উল্লেখযোগ্য। তার পরের ইতিহাস সবারই জানা। সর্বশেষ ১৯৯৯ সালের ১৯ নভেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন কারণ ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসাবে স্বীকৃতির জন্য প্রবাসী বাঙালিদের অবদান কোন অংশে কম নয়। তার মধ্যে কানাডা প্রবাসী ও ‘মাদার ল্যাগুয়েজ লাভার অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ এর প্রতিষ্ঠাতা রফিকুল ইসলামের নাম উল্লেখযোগ্য। রফিকুল ইসলামই প্রথম জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে চিঠি লিখেছিলেন (৯ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৮) এবং তাকে পরামর্শ ও প্রস্তাব করেন যেকোন ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে একটা নির্দিষ্ট দিবস পালন করা উচিত। ২০০৮ সাল থেকে পৃথিবীজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে বহুভাষা ও বহুবিচিত্র সংস্কৃতিকে অগ্রসর ও সংরক্ষণ করতে।
বিশ্ব যখন তার নিজস্ব ভাষাগত জ্ঞান ব্যবহার করে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও চিকিৎসাসহ সবখাতে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা তত ভাষা বিমুখী হচ্ছি। চীন, জাপান, রাশিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশের অনেকেই মনে করে যে তাদের দ্বিতীয় ভাষার প্রয়োজন নেই। কারণ তারা তাদের নিজস্ব ভাষাকে ব্যবহার করেই জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করছে। ফাল্গুনের এক আলাদা মহত্ত্ব আছে বাঙালি সমাজের কাছে সেটা অনেকেরই অজানা। বাংলা ভাষার জন্য যে আন্দোলন হয়ে ছিল তা ৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮ (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) সেই আন্দোলনের ফসল আমরা পাই আরেক ফাল্গুনে অর্থ্যাৎ ৪ই ফাল্গুন ১৩৬২ (১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬)।
আধুনিক সামাজিকতা বিশেষ করে সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাতিব্যস্থ সব তরুণ কি জানে বাংলা কী করে আমাদের প্রাণের ও অস্থিত্বের ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেল। আন্তর্জাতিক ভাষার প্রয়োজন অবশ্যই আছে কিন্তু সামাজিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্তিক বিকাশের জন্য মাতৃভাষার বিকল্প নেই।
একুশের চেতনা হোক সর্বজনীন, নতুন প্রজন্ম লালন করুক মধুময় এই ভাষাকে, ব্যবহার করুক সর্বক্ষেত্রে আর তাদের ভালবাসায় অক্ষত থাকুক বাংলা সযতেœ।

 

শেয়ার করুন
বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা
  • পেছন ফিরে দেখা
  • মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের ভূমিকা
  • স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়
  • ভাষার ব্যবহারের শুরু ও একুশ
  • প্রসঙ্গ : ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ
  • ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা
  • বাংলাদেশে প্রচলিত নানান ভাষা
  • বর্ষ গণনা ও ক্যালেন্ডারের ইতিকথা
  • নতুন বছরে নতুন শপথ
  • সালতামামি ২০১৮ : প্রত্যাশার ২০১৯
  • বাংলাদেশ, বাংলাদেশ
  • বিজয় দিবসের তাৎপর্য
  • ছেলেবেলার ঈদ
  • রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
  • সার্বজনীন উৎসবের দিন
  • ঈদের আনন্দ হোক সবার ঘরে
  • ঈদ : ভ্রাতৃত্বের ফোয়ারায় উদ্ভাসিত হোক জীবন
  • ঈদ, আনন্দের ঝর্ণাধারা
  • হিমশীতল স্পর্শ
  • Developed by: Sparkle IT