সাহিত্য গ্রন্থালোচনা

‘ইসরাফিলের বাঁশি’র কথা

মোহাম্মদ মহি উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০২-২০১৯ ইং ০০:৫৬:৫৬ | সংবাদটি ১৪৫ বার পঠিত

একজন কথাসাহিত্যিকের কাজ কী? এর বহুমাত্রিক উত্তর থাকতে পারে। তবে একটা ব্যাপার সর্বজনীন, তা হলো- সময়কে তুলে ধরা। আশ-পাশে ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলোকে পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টি নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে শব্দে ফ্রেম বন্দি করে রেখে যাওয়া। যদি তাই হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে সৈয়দ আলী আহমদ একজন শিল্পীর মত শব্দের আঁচড়ে তাঁর উপন্যাসকে বানিয়েছেন সমাজের- পোর্ট্রটে গ্যালারী যেখানে তুলে ধরেছেন শিক্ষা ব্যবস্থার অধঃপতন, কোটাপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা, সামাজিক মূল্যবোধের ভেঙ্গে পড়ার করুণ প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক স্খলন ইত্যাদি। তাঁর প্রকাশভঙ্গি প্রাঞ্জল, সেন্স অব হিউমার চোখে পড়ার মত, শব্দ চয়নে দেখিয়েছেন ব্যাপক পারদর্শিতা।
শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রিভুজি একটা আকার থাকে- শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক হচ্ছেন এই ত্রিভুজের তিন উপাদান। যখন এক কোণ ধসে পড়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে বিনির্মানের স্বপ্ন দেখাই যায়। এমনকি দুই কোণ ভেঙ্গে গেলেও আশা রাখা যায়। তবে যখন তিনকোণই আক্রান্ত হয়ে যায়, তখন আশা করা বাতুলতারই নামান্তর, তখন একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ আর থাকে না। এই উপন্যাসে একটা জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে ধংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে তা তুলে ধরা হয়েছে।
উপন্যাসের একটা চরিত্র- হিসাব স্যার, তিনি কোটাধারী শিক্ষক, তিনি না পড়িয়েও গোল্ডেন এ প্লাস এনে দিতে পারেন। এক লক্ষ টাকায় গোল্ডেন এ প্লাস, পঞ্চাশ হাজারে প্লাস পাওয়ার নিশ্চিয়তা দেন। এর বাস্তব প্রমাণ কিছুদিন আগে আমরা দেখেছি, একটা বেসরকারি টিভি চ্যানেল তা প্রমাণসহ শিক্ষামন্ত্রনালয়কে অবগত করেছে।
তিনজন স্কুল বন্ধু-কমল, রাজু ও সাদি কে দিয়ে উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয়। একজন গোল্ডেন এ প্লাস, অপরজন এ প্লাস, অন্যজন এ। শিক্ষা ব্যবস্থা এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে এ প্লাস-ই শেষ কথা। এই বিশ্বাসটুকু শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের মনে বদ্ধমূল হয়ে বসে আছে। অধিকাংশ শিক্ষকেরাই প্রফেশনালিজম ব্যাপারটা যেন একেবারেই চেনেন না। তাইতো ক্লাশে মনোযোগ না দিয়ে সিন্ডিকেট প্রথায় বেশি মনোযোগি। তাছাড়া অনেকেই হয়ে ওঠেন দলীয় ভৃত্য যা পেয়েছি হোস্টেল সুপার অরফে সুইপার স্যারের মাঝে। শিক্ষকরা আজ আর শিক্ষকতায় নেই। তারা হয়ে উঠেছেন দোকানি। কেউ অংকের দোকান, কেউ ইংরেজির, কেউ বা হিসাব বিজ্ঞানের দোকান খুলে বসে আছেন। এভাবেই শিক্ষা আজ পণ্যতে রূপায়িত হয়েছে। শিক্ষার এমন বাণিজ্যিকীকরণ ফুটে উঠেছে উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের মধ্য দিয়ে। শিক্ষার্থীরা উনাকে হিসাব স্যার বলেই ডাকে। এই ডাকটা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণটা দেখিয়ে দিল। এতসব জ্ঞানপাপীদের ভিড়েও যে সৎ শিক্ষকরা আছেন প্রিয় বিদ্যাপিঠে, হউক না সেটা সংখ্যায় অল্প, এ ব্যাপারটা লেখকের চোখ থেকে বাদ পড়েনি। তাই তো লেখক আদর্শ কয়েকজন শিক্ষকের চরিত্রও অঙ্কন করেছেন-আখঞ্জী স্যার, আরিফ স্যার, অংকের স্যার, এবং একজন ম্যাডাম। একজন ঔপন্যাসিকের সার্থকথা এখানেই, যেখানে দৃষ্টি ফেলা হবে সেখানে বাদ যাবে না কিছুই।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারে লেখক পাঠকদের বলতে চেয়েছেন-শিক্ষার্থীদের মেধা মনন বাড়াতে হলে দরকার সাহিত্য সংস্কৃতির শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। এই পরিবেশটা যারা তৈরী করবেন তার মধ্যে শিক্ষকরা বিশেষ করে অধ্যক্ষদের দায়িত্ব বেশি। লেখকের শ্লেষ লক্ষণীয়- ‘গণমুখী শিক্ষা মানেই শিক্ষাঙ্গনে কিরান ও কৈবর্ত শ্রেণির প্রাধান্য।’ তাই তো দুঃখজনক হলেও সত্য যে অধিকাংশ শিক্ষালয়ে সাহিত্য সংস্কৃতির আয়োজন করা হয় না। আর আয়োজন করা হলেও এটা যাত্রার আসরে রূপান্তরিত হয়।
আমি যেহেতু নিজেও শিক্ষক, অভিভাবকদের মনস্তাত্মিক ব্যাপারটাও জানি। ওরা ছেলেমেয়েদের মননে শুদ্ধতা দিতে চায় না, চায় হাতে এ প্লাস ধরিয়ে দিতে। এভাবে একটু একটু করে শিক্ষাব্যবস্থা তাসের ঘরের মত ধসে পড়েছে। এই নির্মম বাস্তবতা খুব নিঁখুতভাবে লেখক ইসরাফিলের বাঁশিতে তুলে ধরেছেন। বিকাশ’দা ছাত্র রাজনীতির মুখপাত্র। পাঠকরা অবাক না হয়ে পারবেন না, একটা চরিত্রকে কোনোরূপ ছোট না করে, হাসি তামাশার ছলে ক্যাম্পাসের ছাত্ররাজনীতির চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস দেখে। তার মাঝেই খুঁজে পাওয়া ছাত্র নেতারা কীভাবে রাজনীতির নামে আর্থিক ফায়দা হাতিয়ে নেয় শিক্ষার্থী কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। বিকাশদা’র অনেক বক্তব্যের ভেতর দিয়ে সমাজ বাস্তবতার চিত্র যেন প্রিন্টেট ফোটোগ্রাফ হয়ে বের হয় মাঝে মধ্যে। যেমন- ‘এই যুগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা অনেক বড় কথা। গ্রেড, ডিভিশন কাজে লাগে না। পার্টি করো, বড় পদে যাও। একসময় তোমরাই মন্ত্রী, এমপি, মেয়র হবে। গোল্ডেনরা ওদেরকে স্যার ডাকবে। ডাক্তার, সচিব, ইঞ্জিনিয়ার সবাই এক ধরণের কেরাণি।’
তাবু আপা চরিত্র আপনাকে নাড়া দিবেই। খুব ভালো মনের একজন মেয়ে। নিজের সুখ দুঃখের খবর না রাখলেও অন্যদের খেয়াল রাখেন। সবাইকে দেখভাল করে রাখায় উস্তাদ। এ যেন আমাদের পরিবার পরিজন থেকে নেয়া একটা উজ্জ্বল চরিত্র। সাফিউল ভাইকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে লেখক অংকন করেছেন। আমরা দেখতে পাই কলেজে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা কিংবা বর্তমানের যে কোনো ব্যাপার নিয়ে উপন্যাসের কমবেশ সব চরিত্রকে অবগত করেন, সাথে যেন আমরা পাঠকরাও অবগত হই।
উপন্যাসের শেষ দিকে দেখতে পাই একটি কলেজের ছাত্রাবাস পুড়ানোর নির্মম উপাখ্যান। রাজু বৃত্তির টাকা পেয়ে মায়ের জন্যে একটা শাড়ি আর বোনের জন্যে একটা সুতি জামা কিনেছিল। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে চাই হয়ে গেলে আবেগের শাড়ি ও জামা। সেদিন হোস্টেলে কি শুধুই মায়ের শাড়ি পুড়েছিল? না সেখানে ছিল কারো কারো মৃত মা কিংবা বাবার স্মৃতির শেষ এ্যালবাম, হয়ত কোনো রুমে ছিল প্রিয়তমা বা বন্ধুর দেয়া মায়াবি উপহার। হোস্টেল পুড়ানোর এই অভিশপ্ত দিনের কথা এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তা সব এই লেখায় ভাগাভাগি না করে পাঠকের জন্যে রেখে দিতে চাই।
রাজু যেন বিশাল সমুদ্রে একাকি সংগ্রামরত আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সেন্টিয়াগোর মত বদ্ধপরিকর- মা আর বোনের জামার বদলা নিতে। রাজু একটু একটু করে হয়ে উঠতে যাচ্ছে দস্তয়েভস্কির নায়ক রাসকলিœকভের মত। ঐ নায়কের মতই সুপারম্যান হবে, আইন নিজের হাতে নিবেই নেবে। শেষমেষ তাই হলো- হোস্টেলে আগুন দেয়া দু’জনকে সে নিজ হাতে খুন করেছে যা পুলিশ প্রশাসন টেরই পায়নি। এক ছায়ামূর্তির প্রশ্নের জবাবে সে বলে যা করেছি ভালোই করেছি। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জেলা জজের চেম্বারে ঢুকে স্বীকারোক্তি দিল- বিকাশ’দা ও আশীষকে হত্যা করার ব্যাপারটা। আলবেয়ার ক্যামুর আউটসাইডার উপন্যাসের নায়কের মতই সমাজ ভন্ডামীর খোলস থেকে বের হয়ে সত্য সত্তা হিসেবে রাজু নিজেকে কাঠগড়ায় উপস্থাপন করেছে। এই আত্মসমর্পণ যেন সমাজকে ঝাঁকুনি দিয়ে সমাজ সংস্কারের দিক-নির্দেশনার মৌন এক মঞ্চায়ন। বিকাশদা’কে হত্যা করার পর রাজু কাঁদল। এই কান্না নিছক কোনো কান্না নয়, যেন গ্রীক বীর একিলিছের সেই মুহূর্ত যে কিনা বিরোধী পক্ষের ট্রয়-বীর হেকটর’কে হত্যা করে নিজ তাবুতে এনে অঝর ধারায় কেঁদেছিল। একিলিছের কান্না আর রাজুর কান্নার চৈতন্য এক। তারা কারো লাশ চায়নি, হত্যাযজ্ঞের নায়ক হতে ওরা পৃথিবীতে আসেনি। তবু তাদেরকে তাই হতে হয়েছে। রাজা আর রাজপ্রাসাদ রক্তের বুনো খেলায় চিরকাল আনন্দ পায় যার শিকার হয় রাজুরা।
মঞ্চের আড়ালে থাকা অপরাধীরা কি ধরা পড়বে? মোটেও না। প্রত্যেক অপরাধ মঞ্চের পেছনে থাকে আরেকটা অপরাধ মঞ্চ যা খোলা চোখে দেখা যায় না। ঐ নাদেখা অংশকে গোচরে আনার প্রয়াস দেখিয়েছেন লেখক।
উপন্যাসে রাজু ও বেলীর নিটল এক প্রেম কাহিনীও আমরা লক্ষ্য করি যা শেষ হয়েও হলো না শেষ। এই অসমাপ্ত ভালোবাসা পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যায়।
গল্পটা সামান্য, ক্যানভাসটা অনেক বড়। জীবনের গভীর দর্শনগুলো গল্পের ছলে, কলেজ জীবনের প্রাত্যাহিক জীবনের ভেতর দিয়ে পৌঁছে গেছেন অন্য জীবনে।
গল্পের ভেতর আর নামকরণ অনেকটাই দূরবর্তী অবস্থানে। বুদ্ধিদ্বীপ্ত কথাসাহিত্যিকরা মাঝে মাঝে এমন ড্রিবলিং পাঠকদের সাথে করেন। পাঠকরা সে ড্রিবলিংকে স্পষ্ট করতে চায়। আমিও চেয়েছি। আমরা জানি- ইসরাফিলের বাঁশির হুংকারে তছনছ হবে এই পৃথিবী। লেখক হয়ত বুঝাতে চেয়েছেন- সমাজ ব্যবস্থা ধ্বংসের দোর গোঁড়ায়। এখনি সময় অধঃপতন থেকে উঠে দাঁড়ানোর। নামকরণের এই বাঁশি যেন চূড়ান্ত ধ্বংসের প্রাথমিক সংকেত, জীবনের দিকে ফিরে আসার আহ্বান, না হয় আমাদের ধ্বংস অনিবার্য। সমাজের সমস্যা তুলে ধরেই দায়িত্ব শেষ করেননি, দিয়েছেন সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার নীরব কিছু দিকনির্দেশনাও- উপন্যাসের অভিনবত্ব এখানেই।
পাঠকরা পড়লে চিন্তার খোরাক পাবেন। আমার বলার মধ্যে অনেক না বলা আছে। সে না বলাটুকু আপনাদের জন্যে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT