সাহিত্য

কাব্যিক ঘ্রাণে সুশোভিত ‘মেঘরাখালের বাঁশি’

নাসিম আহমদ লস্কর প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০২-২০১৯ ইং ০০:৫৮:০৪ | সংবাদটি ২৩৮ বার পঠিত

কবিদের বোধের জগৎ আলাদা। তাঁদের চিন্তাভাবনা সমাজের সাধারণ লোকদের নিয়ে হলেও চিন্তাজগৎ সমাজের সাধারণ লোকদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। চিন্তাভাবনা আর নতুন সৃষ্টির নেশা এ দুইয়ের মিথস্ক্রিয়ার ফলেই সৃষ্টি হয় এই অনন্য চিন্তা জগতের, সৃষ্টি হয় নতুন নতুন কবিতার।
কবি মামুন সুলতানের চিন্তার জগৎ জুড়ে রয়েছে সৃজনশীল ভাবনার নুড়ি আর নুড়ি। সদা হাসিখুশিময় এই কবি তাঁর ধারালো চিন্তাজগতটিকে বাঁচিয়ে রাখতে দীর্ঘদিন ধরে রচনা করে আসছেন কবিতা।
গত একুশে বইমেলায় সিলেটের প্রাকৃত প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘরাখালের বাঁশি’। ৬৪ পৃষ্ঠার এ বইটিতে স্থান পেয়েছে প্রেম, দ্রোহ, ভালোবাসা, দেশপ্রেম, সমাজ বাস্তবতা ইত্যাদি বিষয়ক নানা কবিতা।
বইয়ের প্রথম কবিতা অসুরপুত্রে ফুটে উঠেছে এক চরম অপ্রিয় বাস্তবতা। মানুষ যদি কেবল আয়েশ করে দিনাতিপাত করতে থাকে তবে তা কখনো মঙ্গল বয়ে আনেনা। প্রতিটি মানুষই ব্যক্তিগত জীবনে সুখের আকাঙ্খা করে থাকে। তাই বলে সুখের দিনে মানুষকে হেঁয়ালিপনায় কাটালে চলবে না। ভবিষ্যৎ অপ্রত্যাশিত নিকষকালো বিপদের কথাও তাঁকে ভাবতে হবে। সবসময় সচেতন থাকতে হবে তাঁকে। ফলে, কোন বিপদ আসলে সে সহজেই তা সমাধান করতে পারবে। কবিতাটিতে কবি একইসাথে ব্যক্তিগত ও জাতীয় বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতাটির শেষের দিকে কবি পাঠককে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, অসচেতনতার কারণে যেমন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তেমনি রাষ্ট্রব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং উপদেশ দিয়েছেন সবসময় অপ্রত্যাশিত বিষয় নিয়ে সচেতন থাকতে।
‘নিশিগন্ধা ঘ্রাণে মোহিত হয়ে/ নিরাপদ নিদ্রায় যাপন করছো ঘুমকাতুরে রাত/ তোমার সঞ্চিত সুখ এই রাতে বেহাত হতে পারে/ তোমার জীবন এই ঘুম কেড়ে নিতে পারে/ তোমার অসুরপুত্র।/ সবাই বলে ভয় পেয়ো না/ আমি বলি ভয়ে ভয়ে কাতর হও/ আমরা পরাধীন থাকতে থাকতে স্বাধীন হয়েছি/ তাই স্বাধীনতার মানে আমরা বুঝি/ স্বাধীনতা মানে আ্মার বুকের মানিক/ আমার লালিত স্বপ্ন।’
ভেসে যাচ্ছে কবিতায় ফুটে উঠেছে এক জটিল বীভৎস ক্রান্তিকালের কথা। সেই সাথে ব্যক্ত হয়েছে প্রত্যাশার সুর। কবিতার প্রথমদিকে ফুটে উঠেছে নির্মমতার আর্তনাদ। নিজ জন্মভূমিতে জন্মভূমির সন্তান যখন খুন হয় তখন কবি জগতের চারদিকে করুণ অবস্থার প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। নিজেকে প্রশ্ন করেন এই বিপথগামীরা কেন এমন জঘন্য কাজ করে? কোথায় লুকিয়ে আছে তাঁর সেই অপশক্তি। কবিতার শেষাংশে কবি তার পরম আকাঙ্খার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি আবার এই বাংলায় চিরচেনা ভাওয়ালি গান শুনতে চান। তিনি ফিরে পেতে চান তার সেই চির পরিচিত লাবণ্যময় বাংলা। কবি এখানে গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
‘গতির গলিপথে গলিত লাশের মিছিল/ .......নিজভূমে নিহত হয় নিরীহ মানুষ।/ তবু জনতার ঝুলন্ত জিহ্বায় করাত করাত ধ্বনি-
কিছু নহে বলে সাহসের কথা শুনি।/ গলিত লাশের গন্ধ গোলাপবাগে আর গোলাপ ফোটে না।/ ..........জোয়ারে ভাসেনা স্বপ্নের সাম্পান।/ ভোরের হাওয়ায় কবে শুনবো ভাওয়লি সুর।/ নতুন ভোর কবে আসবে নদীমাতৃক বাংলায়?
প্রতিটি মানুষ তার প্রিয় মানুষটিকে অনন্য, অদ্বিতীয় নামে ডাকতে চায়, কাছে পেতে চায় তার মনের মানুষটিকে একান্ত নির্জনে। প্রিয় নাম দিয়ে প্রিয় মানুষটির কাছে প্রিয় বার্তা দিতে চায়। ভালোবাসার এ অনুরাগের কথা কবি ফুটিয়ে তুলেছেন ‘চলো সেই নামে ডাকি’ কবিতায়।
‘যে নাম চন্দ্রিমা রাতে ঝলমল করবে তারা ভরা আকাশে/ স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে নক্ষত্র নীহারিকায়/ ধুমকেতু উপড়ে পড়বে নতুন উদ্যমে/ চলো সেই নামে ডাকি।/ যে নাম কেবল তোমার জন্য/ তুমিই কেবল ছড়িয়ে পড়বে ওই নামে/ চলো সেই নামে ডাকি।’
প্রতিটি মানুষ চায় উন্নত সমৃদ্ধ জীবন গঠন করতে। সাহস আর দৃঢ় মনোবল থাকলে মানুষ তাঁর আপন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। কেউ যদি অপ্রত্যাশিত দুঃখ থেকে আপন মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে তবে সুখ একসময় তার অতি কাছে চলে আসে। ‘এগিয়ে চলো’ কবিতায় কবি পাঠককে ঘুরে দাঁড়ানোর পন্থা শিখিয়ে দিয়েছেন।
‘চিতার আগুনে আর দগ্ধ করো না নিজেকে/ তুষের গুপ্ত আগুন জ্বেলো না মনে/ ..............বরং সব স্বপ্নকে রুমালে বেঁধে মরুপথে হেঁটে চলো।/ হয়তো উটের উলান থেকে ঝরে পড়বে/ হাজারো জমজম ধারা.............’
বইটি পাঠ করে আমার মনে হয়েছে বইটি বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ। কবির শৈল্পিক চিন্তাভাবনা বইটিকে কাব্যরসে পূর্ণ করে তুলেছে। আমি বইটির পাঠক প্রিয়তা কামনা করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT