সাহিত্য [একটি রেড ইন্ডিয়ান উপাখ্যান]

বন্য বালক ও গুহার প্রাণী

ভাষান্তর : প্রফেসর মোঃ আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০২-২০১৯ ইং ০০:৫৮:৩৫ | সংবাদটি ৪৮ বার পঠিত

পৃথিবী সৃষ্টির পরই হাজার হাজার বছর আগে একটি বিশাল নদীর তীরে বাস করত একজন ইরোকুইয়ান শিকারী, তার স্ত্রী ও তাদের একটি ছোট ছেলে। শিকারীর নাম ছিল ক্যানাতি, যার অর্থ হচ্ছে ভাগ্যবান শিকারী এবং তার স্ত্রীর নাম ছিল সেলু, যার অর্থ হচ্ছে ইন্ডিয়ান শস্য। ছোট ছেলেটির কি নাম ছিল, তা কেউ আর মনে রাখতে পারেনি।
ক্যানাতিকে যে ভাগ্যবান শিকারী নামে ডাকা হতো, তা কোন আকস্মিক ঘটনা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে মনে হতো সে খুবই ভাগ্যবান ছিল অথবা ছিল খুবই দক্ষ। শিকারে বেরিয়ে সে কখনো একটি হরিণ, একটি টার্কি বা একটি অন্য কোন প্রাণী সাথে না নিয়ে বাড়ি ফিরত না। তার সাফল্যে তার স্ত্রী কখনো অবাক হতো না। শিকারলব্ধ প্রাণী নিয়ে স্ত্রীটি নদীর নিচের দিকে চলে যেত, তা সযতেœ পরিস্কার করত, খাবার অযোগ্য অংশ নদীতে ফেলে দিত এবং ধোয়ে রক্ত ছাড়িয়ে নিত।
মা যখন বাড়ির কাজে ব্যস্ত থাকত ছোট ছেলেটি খেলার কোন সাথী পেত না। তাই সে নদীর তীরে নিচের দিকে গিয়ে নিজে নিজেই যথেষ্ট আমোদ ও আনন্দে মেতে উঠত। একদিন মা নদী থেকে পানি নিতে এসে খানিক দূর থেকে শুনতে পেলে তার ছেলেটি যেন কার সাথে কথা বলছে। মা থেমে গেল এবং মনোযোগ সহকারে শুনল, সত্যিই তার ছেলে কার সাথে কথা বলছে এবং অন্য একটি শিশু জবাব দিচ্ছে। কিন্তু মা যখন এগিয়ে গেল, সেখানে অন্য কাউকে দেখতে পেল না। ক্যানাতি বাড়ি ফিরে এলে সেলু তাকে সব খোলে বলল। তারপর তারা সিদ্ধান্ত নিল, এ ব্যাপারে তারা ছেলেকে জিজ্ঞেস করবে। অতঃপর ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে সে সাথে সাথে জানাল ‘কেন! সে তো প্রায় সব দিনই পানি থেকে উঠে এসে আমার সাথে খেলে। সে বলে যে, সে আমার বড় ভাই। কারণ আমরা দু’জনই একই খাবার খেয়ে বড় হয়েছি।’
ছেলের কথা শুনে মাতাপিতা দু’জন বিস্ময়ে হতবাক! তারা কেবল একে অন্যের মুখের দিকে চেয়ে রইল! রাতে ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়লে মাতাপিতা অপর বালক সম্বন্ধে কথা তুলল। বিস্ময়কর বালকটি কে হতে পারে!
-‘আমার মনে হচ্ছে’ বলে সেলু থামল; তারপর বলল, ‘সে আমাদের ছেলেকে বলেছে তারা দুই ভাই কারণ তারা একই খাবার খেয়ে বড় হয়েছে। আমার মনে হয়, মাংসের টুকরা ও রক্ত যা আমি নদীতে ফেলে দেই, তা খেয়ে সে বড় হয়ে থাকবে।’
-‘তা হতে পারে,’ স্বামী সায় দিল, ‘এবং এরকম হলে সে সম্ভবত একজন শক্তিশালী জাদুকর হবে এবং আমাদের ছেলের কোন ক্ষতি করতে পারে! তাই আমাদের সজাগ থাকা দরকার।’
সেলু চায়নি ছেলের উপর কোন অনিষ্ট নেমে আসুক। তাই তারা ঠিক করল অদ্ভুত বালকটিকে পাকড়াও করতে হবে। কিন্তু তারা যখনই নদীর তীরে নেমে গেছে, প্রতিবারই বালকটি পানিতে ডুব মেরে অদৃশ্য হয়ে গেছে; এমনকি বালকটিকে দেখার আগেই!
অতঃপর তারা একটি কৌশল অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নিল। তারা তাদের ছেলেটিকে বুঝিয়ে বলল, সে যেন তার খেলার সাথীকে কুস্তিতে চ্যালেঞ্জ করে এবং কুস্তি খেলতে গিয়ে তাকে চেপে ধরে আটকে রাখে যতক্ষণ না তারা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। ছেলেটি তা করতে রাজি হলো। কারণ তার মা-বাবা অদ্ভুত বালকটির সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেই প্রতিবার সে অদৃশ্য হয়ে যেত, যা ছেলেটি পছন্দ করত না।
পরের দিন বরাবরের মতো তারা দু’জন নদীর তীরে খেলছিল। ছোট ছেলেটি বালকটিকে কুস্তি খেলতে আহ্বান করল। বালকটি আনন্দের সাথে আহ্বান গ্রহণ করল এবং উভয় কুস্তি শুরু করল। দু’বাহু দিয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বালুময় তীরে গড়াগড়ি করতে লাগল। যখন ছোট ছেলেটি বুঝতে পারল যে, সে বালকটিকে ভালোভাবে আটকে ধরতে পেরেছে, সে তখন উচ্চ স্বরে চিৎকার দিতে শুরু করল, ‘বাপি আস! আমি ওকে ধরেছি! আস! তাড়াতাড়ি আস!’
ছেলেটির চিৎকার শুনে ক্যানাতি ও সেলু তাদের সাধ্য মতো দৌড়ে নদী তীর অভিমুখে ছুটল।
-‘তাড়াতাড়ি আস! আমি তাকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারব না! সে আমার চেয়ে অনেক অনেক শক্তিশালী! তাড়া কর!’
ঠিক তখনই তারা সেখানে উপস্থিত হলো এবং তিন জন মিলে অদ্ভুত বালকটিকে আটকাতে সক্ষম হলো। বালকটি পিছলে পানিতে ফিরে যেতে পারল না।
-‘আমাকে যেতে দাও!’ ক্রোধান্বিত কন্ঠে বালকটি চিৎকার দিল, ‘আমাকে যেতে দাও! তোমরাই আমাকে প্রথমে নদীতে ফেলেছিলে! এখন আমাকে ফিরে যেতে দাও!’
বালকটির কান্না ও সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তারা তাকে বাড়িতে নিয়ে এল এবং বেঁধে রাখল। প্রথম এক বা দু’দিন বালকটি খাবার প্রত্যাখ্যান করল। কিন্তু পরে যখন দেখতে পেল, তারা তার কোন ক্ষতি করছে না, ক্রমে ক্রমে সে বশীভূত হয়ে গেল। একই সাথে সব সময় সে তার মতোই বন্য ছিল এবং যথোপযুক্ত নাম পেয়েছিল ‘বন্য বালক’।
অতঃপর তারা তাকে যে খাবার দিত বালকটি তা খেতে শুরু করল। যখন তারা নিশ্চিত হলো যে বালকটি পালিয়ে যাবে না, তখন তারা তার বাঁধন মুক্ত করে দিল এবং বালকটি তাদের ছোট ছেলের সাথে সুখে খেলতে থাকল দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।
একদিন বন্য বালকটি লক্ষ করল, ক্যানাতি একটি হরিণ ও একটি টার্কি শিকার করে বাড়ি ফিরছে। সে ছোট ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আমার অবাক লাগে, এসব সে কিভাবে করে! আমার বিশ্বাস সে একজন জাদুকর।’
না! তা আমি মনে করি না! কারণ সে একজন সত্যিকার ভাগ্যবান শিকারী। জবাব দিল ছোট ছেলেটি।
-‘না! এখানে আরো কিছু থেকে থাকবে। একজন শিকারী ভাগ্যবান হতে পারে দিনের পর দিন, এমনকি সপ্তাহর পর সপ্তাহ। কিন্তু চিরকালের জন্য নয়! ক্যানাতি কখনো খালি হাতে শিকার থেকে ফেরেনি, এমনকি সবচে খারাপ আবহাওয়ার দিনেও! আমার মনে হয়, একদিন আমরা তাকে অনুসরণ করি এবং দেখি সে কোথায় যায় ও কি করে!’
কিছুদিন পর এক সকালে ক্যানাতি যখন তীর-ধনুক নিয়ে শিকারে বের হয়ে গেল, বালক দু’টি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল যাতে সে তাদের দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। অতঃপর তারা তাকে সাবধানে অনুসরণ করতে লাগল যেন সে তাদের দেখতে না পায়, কিন্তু কাছে থাকল যেন সে তাদের দৃষ্টির বাইরে হারিয়ে না যায়।
ক্যানাতি দ্রুত হাঁটছিল। মনে হচ্ছিল তার পায়ে এক জোড়া জাদুর জুতা রয়েছে। এদিকে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বালক দু’টির শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। অবশেষে ক্যানাতি খাড়া ভূমির ঢালে ঘাসের মধ্য দিয়ে যেতে থাকল। এখানে কোন বৃক্ষ ছিল না এবং বালকরা জানত যে, বনের বাইরে গেলেই তাদেরকে দেখা যাবে। এখন তারা যা করতে পারে, তা হচ্ছে তাদেরকে তীক্ষè দৃষ্টি ও আশা করতে হবে যাতে ক্যানাতি তাদের দৃষ্টির বাইরে চলে না যায়।
তাদের সৌভাগ্য! ঢালুর সামান্য দূরে থাকতেই ভাগ্যবান শিকারী থামল। সেখানে গুহার মুখে একটি বিরাট গোলাকৃতি পাথর ছিল। সে পাথরটি গড়িয়ে সরাল এবং তার ধনুকে যথাযথভাবে তীর স্থাপন করে অপেক্ষা করতে লাগল। সে যেন প্রস্তুত হবার সময়ই পেল না, একটি বিরাট হরিণ গুহা থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে দিল দৌড়। সাথে সাথে ক্যানাতি ধনুক তাক করে তীর ছোড়ল। বাতাসে শব্দ তোলে তীর লক্ষ্যভেদ করল। সাথে সাথে হরিণটি লুটিয়ে পড়ল। ক্যানাতি পুনরায় বিরাট পাথরটি গড়িয়ে গড়িয়ে গুহা মুখে রেখে দিল এবং হরিণটি কাঁধে নিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা দিল।
ক্যানাতি তাদের অতিক্রম না করা পর্যন্ত বালক দু’টি ঘন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রইল। তারপর তারা ভিন্ন পথে বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা হলো যাতে ক্যানাতি তাদেরকে দেখতে না পায় এবং দৌড়াতে শুরু করল যাতে ক্যানাতির আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে।
নিরিবিলি জায়গায় বন্য বালকটি বলল, ‘এভাবেই সে শিকার করে থাকে। গুহার ভিতর সে সব হরিণকে আটকে রেখেছে এবং তার প্রয়োজন মতো একটি একটি করে বাইরে আসতে দেয়।’
এটি একটি চমৎকার গোপন ব্যাপার। বালকরা যা দেখেছে, তারাও কি একইভাবে সহজে হরিণ শিকার করতে পারে কিনা। একদিন বালক দু’টি জানতে পারল যে, বাড়িতে প্রচুর মাংস রয়েছে তাই ক্যানাতি শিকারে বের হবে না। তারা তীর-ধনুক নিয়ে বিরাট গুহাটির পথে পা বাড়াল।
গুহার মুখের প্রকান্ড পাথরটি বালক দুটি গড়িয়ে গড়িয়ে সরাতে সক্ষম হলো। কিন্তু তাদের হাতের কম্পন থামিয়ে তীর-ধনুক নিয়ে প্রস্তুত হবার আগেই একটি হরিণ লাফ দিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে টিলার কিনারা দিয়ে দৌড়ে হারিয়ে গেল। তারপর আরেকটি বেরিয়ে গেল, তারপর আরেকটি, এভাবে একের পর এক লাফিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকল; অতঃপর জোড়ায় জোড়ায়, অবশেষে একসাথে ডজন ডজন ও শত শত দ্রুত দৌড়ে চলে গেল। কিন্তু বালক দু’জন একটি হরিণও শিকার করতে পারল না।
তারপর বেরিয়ে আসতে লাগল মুস হরিণ, এলক, ক্যারিবো ও অন্যান্য সকল চতুষ্পদ প্রাণী, যতক্ষণ পর্যন্ত পশু পালের উপস্থিতিতে দিগন্ত বরাবর স্থলভাগ কালো হয়ে গেল। অতঃপর গুহা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করল ঈগল, পেঁচা, টার্কি, হাঁস, রাজহাঁস ও অন্যান্য পাখি যতক্ষণ পর্যন্ত না আকাশ ভরে গেল। ভূমিতে পশুপালের দৌড়াদৌড়ির শব্দ ও আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির ডানার ঝাপটানর শব্দে বালক দু’টি ভীত-শঙ্কিত হয়ে উঠল! মাইলের পর মাইল দূর থেকে ক্যানাতি পাহাড়ে বজ্রপাতের ন্যায় শব্দ শুনতে পেল। সে সবদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না, আকাশও পরিস্কার, এক খন্ড মেঘও নেই! সে আবার মনোযোগ সহকারে শুনল এবং বোঝতে পারল, তা বজ্রধ্বনি নয়, বরং দৃঢ় গর্জনধ্বনি, ক্রমান্বয়ে উচ্চ নিনাদে বেড়ে চলছে।
সে সেলুকে বলল, ‘আমার দুষ্ট ছেলেরা কোন সমস্যায় পড়েছে! যাই, গিয়ে দেখি ব্যাপারখানা কি!’
ক্যানাতি দৃঢ়ভাবে ধনুক হাতে নিয়ে, অনেকগুলো তীর, ছুরি ও মুগুর সঙ্গে নিয়ে দ্রুত ছুটে চলল জাদুর গুহার পথ ধরে; কারণ শব্দ ওদিক থেকেই আসছিল।
বেশি দূর যাবার আগেই প্রথমে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রাণীগুলোর সাথে ক্যানাতির সাক্ষাৎ ঘটল। যতই সে অধিক সংখ্যক প্রাণী দেখতে পেল, কি ঘটেছে তা অনুমান করতে পারল এবং আরো দ্রুত দৌড়াতে লাগল। সে আশা করছিল সবগুলো প্রাণী গুহা থেকে বেরিয়ে যাবার আগেই সে বড় পাথরটি গুহার মুখে পুনরায় বসিয়ে দেবে।
কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গেছে! সে যখন ওখানে পৌঁছল, একটি বিশাল খালি গুহা ও ভীত-সন্ত্রস্ত দু’টি ছোট বালক ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না।
ক্যানাতি কঠোর দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাল এবং অনেকক্ষণ যাবৎ তীব্র ভর্ৎসনা করল। তাদেরকে সে যা বলেছিল, তা কখনো কেউ ভুলেনি। সে বলেছিল, ‘এ যাবৎ আমরা আরাম ও আয়েশের মধ্যে ছিলাম। যখনই ক্ষুধা বোধ করতাম, আমি কেবল এখানে গুহার কাছে চলে আসতাম, একটি হরিণ বা একটি টার্কি শিকার করে বাড়ি ফিরে তা তোমাদের মায়ের হাতে তুলে দিতাম। এখন থেকে আমার পক্ষে তা আর কখনো করা সম্ভব হবে না। এখন আমাদের খাদ্যের জন্য আমাকে শিকার করতে হবে এবং তোমাদেরকেও তা করতে হবে, চিরকালের জন্য করতে হবে, তোমাদের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত, এবং তা সকল মানুষকে করতে হবে। এমন অনেক দিন আসবে, একেবারেই কোন শিকার জোটবে না। কারণ তোমাদেরকে দেখার সাথে সাথেই প্রাণীগুলো দৌড়ে পালিয়ে যাবে, ঠিক আজ যেভাবে তারা পালিয়ে গেছে গুহার মুখ খোলার সাথে সাথে। আজ থেকে চিরকালের জন্য সকল মানুষকে খাদ্যের জন্য শিকার করতে হবে, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তারপরও প্রয়োজনীয় সব কিছু সবাই সব সময় পাবে না।
তাই আজকাল আর ভাগ্যবান শিকারীকে দেখা যায় না এবং যারা দক্ষ শিকারী তারাও মাঝে মাঝে খালি হাতে বাড়ি ফিরে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT