ইতিহাস ও ঐতিহ্য

আমেরিকা আবিস্কার ও রেড ইন্ডিয়ান

প্রফেসর মো. আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০২-২০১৯ ইং ০১:০৭:৫৪ | সংবাদটি ১৭৩ বার পঠিত



প্রাচীনকালে অনেক মানুষ মনে করতেন পৃথিবী চ্যাপ্টা। কিন্তু অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলাম্বাস নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবী গোলাকার এবং তার ধারণায় ছিল জাহাজ নিয়ে পশ্চিম দিকে আটলান্টিক পাড়ি দিতে পারলে অবশ্যই এশিয়ার পূর্ব উপকূলে পৌঁছা যাবে। তার অজানা ছিল পশ্চিম দিকে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা নামে দু’টি মহাদেশ রয়েছে। এশিয়ার পূর্ব উপকূল তথা চীনে পৌঁছার ব্যাপারে কলাম্বাসের আত্মবিশ্বাস এত দৃঢ় ছিলো যে তিনি স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড ও রাণী ইসাবেলার কাছ থেকে চীনের তদানীন্তন গ্র্যান্ড খান এর নিকট পত্র লিখিয়ে নিয়েছিলেন। এমনকি সাথে নিয়েছিলেন একজন দোভাষী।
৩ আগস্ট ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলাম্বাস স্পেন থেকে পশ্চিম দিকে প্রথম জাহাজ ভাসালেন। দশ সপ্তাহ পর ১২ অক্টোবর ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ তিনি পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের একটিতে পৌঁছেন। তখন কলাম্বাসের ধারণায় ছিল এটি এশিয়ার দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত কোন একটি দ্বীপ। তিনি এ অঞ্চলের নাম দিয়েছিলেন ইন্ডিজ এবং এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের নাম দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ানস। পরবর্তীকালে এ নামকরণের ত্রুটি ধরা পড়লেও নাম আর বদলেনি। এখনও আমেরিকার আদিবাসীদেরকে অনেকে ইন্ডিয়ানস বলে থাকেন। ১৫০৬ খ্রি. যখন কলাম্বাস স্পেনে মৃত্যু বরণ করেন, তখন কেউ জানত না যে কলাম্বাস আমেরিকা নামে বিশাল এক মহাদেশ আবিস্কার করে ফেলেছেন। কলাম্বাস তা নিজেও জানতেন না। আবিস্কৃত মহাদেশটির অপর নাম হয় নিউ ওয়ালর্ড।
ক্যানাডার পূর্বাঞ্চল ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরপূর্বাঞ্চলের ইন্ডিয়ানদেরকে ইংরেজরা রেড ইন্ডিয়ান নামে আখ্যায়িত করত। কিন্তু আসলে নিউফাউন্ডল্যান্ডে বসবাসকারী বিওটুক গোত্রের আদিবাসীদেরকে রেড ইন্ডিয়ানস বলা হতো। কারণ তারা তাদের শরীর ও ব্যবহৃত দ্রব্য সামগ্রিতে সর্বদা লাল রং ব্যবহার করত। একদা আমেরিকার সকল আদিবাসীকে রেড ইন্ডিয়ানস বলা হতে থাকে। বর্তমানে এদেরকে নেটিভ এ্যামেরিকানস বা এ্যামেরিকান ইন্ডিয়ানস বলা হয়। কেউ কেউ এদেরকে এ্যামেরিন্ডয়ানসও বলে থাকেন।
প্রতœত্ত্ববিদদের দীর্ঘ গবেষণায় জানা যায় নতুন পৃথিবী অর্থাৎ আমেরিকায় মানুষের উপস্থিতির প্রমাণ বিশ হাজার বছরেরও কম। অথচ এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও পুরাতন পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে মানুষের উপস্থিতি একশত পঞ্চাশ হাজার বছরের কম নয়। এতে নিশ্চিত যে, আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের পূর্ব পুরুষগণ সুদূর অতীতে অন্য কোথাও থেকে এখানে আগমন করে থাকবে।
আমেরিকায় মানব আগমন প্রসঙ্গে একাধিক মতবাদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞদের মতে সুদূর অতীতের বিভিন্ন সময়ে সাইবেরিয়ার পূর্ব প্রান্ত থেকে মানুষ বেরিং প্রণালী অতিক্রম করে জলপথে আলাস্কার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ক্যাপ প্রিন্স অব ওয়েলসে পদার্পন করেছিল। এ দূরত্ব মাত্র চল্লিশ মাইল। পথিমধ্যে দুটো দ্বীপ রয়েছে; এগুলোর নাম বড় ও ছোট ডায়োমেড দ্বীপ, যা ছিল যাত্রাপথে বিশ্রাম গ্রহণের জন্য খুবই সুবিধাজনক। খোলা নৌকা যোগে পারাপার সহজ ছিল।
সকল আমেরিকার ইন্ডিয়ানদের গাত্রবর্ণ তামাটে বর্ণের; এর মধ্যে আবার হালকা হলুদ থেকে গাঢ় বাদামী ক্রমবিন্যাস লক্ষণীয়। তাদের চুল কালো ও সোজা, চুলের প্রাচুর্য মাথায় বেশি, কিন্তু শরীরের অন্যান্য অংশে অল্প। তাদের চোখ বাদামী, কারো হালকা, কারো গাঢ়। অনেক আমেরিকান ইন্ডিয়ানের চোখে চীনাদের ন্যায় মঙ্গোলীয় ভাজ রয়েছে, যাকে প্রায়ই বলা হয় হেলানো চোখ; তা নারী ও শিশুদের মধ্যে বিশেষভাবে দেখা যায়। তাদের মুখাবয় সাধারণত প্রসারিত এবং হাত পা খাট। আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো সাইবেরিয়ার পূর্বাংশের জনগণ ও চীন, জাপান ও কোরিয়ার মানুষের সাথে ভালোভাবে মিলে যায়। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, পনের থেকে বিশ হাজার বছর পূর্বে এশিয়া থেকে আমেরিকায় মানব দেশান্তর শরু হয়েছিল। তবে দেশান্তর যে একবারই ঘটেছিল, তা নয়। বরং বিভিন্ন সময়, হতে পারে এক শত বছরের ব্যবধানে, দলে দলে মানুষ পাড়ি দিয়েছিল। কোন শতাব্দীতে আগমন হয়ত ঘন ঘন ছিল, কোন শতাব্দীতে কম ছিল, আবার কোন শতাব্দীতে হয়ত আগমন ঘটেনি। উল্লেখ্য বিভিন্ন সময়ে আগত মানব গোষ্ঠিগুলো ভাষা ও সংস্কৃতিতে পার্থক্য মন্ডিত ছিল।
সুপ্রাচীন কাল ধরে দীর্ঘ সময় ব্যাপী আগত মানব গোষ্ঠির অধস্তন বংশধরেরা ধীরে ধীরে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি দক্ষিণ আমেরিকার সর্বদক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত টিয়েরা ডেল ফুয়েগোতেও ইন্ডিয়ানরা বসবাস করছে।
আমেরিকার আদিবাসীরা সাধারণত একই স্থানে দীর্ঘ দিন বসবাস করত না। প্রধানত খাদ্যের সন্ধানে তারা আবাসস্থল পরিবর্তন করতে বাধ্য হতো। কিন্তু পুরাতন বাসস্থানে তাদের উপস্থিতির চিহ্ন থেকে যেত। এরকম হাজার হাজার আবাসস্থলের চিহ্ন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় টিকে আছে। কাঠ-কয়লার অবশিষ্টাংশ, খাদ্য গ্রহণের পর মাছের কাঁটা ও প্রাণীর হাড়, ব্যবহৃত পাথরের চিপস, তীরের ফলা, পাথরের ছুরি ও স্কিন-স্ক্র্যাপার, কোন কোন অঞ্চলে প্রাপ্ত ভাঙা মৃৎপাত্র ইত্যাদির উপস্থিতি আদিবাসীদের পরিত্যক্ত আবাসস্থলের নির্দেশ দেয়।
বেরিং প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠি নিজ নিজ ভাষা ও জীবনাচার নিয়ে এসে প্রাচীন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। অতঃপর সময়ের পরিবর্তনে তাদের জীবন ধারায় ব্যাপক পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটে। ফলে পরবর্তীকালের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা, আচার অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির উদ্ভব পরিলক্ষিত হয়। ভূপ্রকৃতি, আবহাওয়া ও সংস্কৃতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। এ জন্য মানব গোষ্ঠির সাংস্কৃতিক শ্রেণিকরণ ও মহাদেশের ভৌগলিক বিভক্তিকরণের মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ দেখা যায়। ভাষা ও জীবনাচার ও সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে উত্তর আমেরিকায় ৩২৯টি অঞ্চল ও সমসংখ্যক ট্রাইব বা গোত্রের উদ্ভব ঘটেছিল।
বিভিন্ন গোত্রের ভাষা বিভিন্ন। কেবল ব্রিটিশ কলম্বিয়া অঞ্চলের আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের পাঁচটি স্বতন্দ্র ভাষা রয়েছে, এদের মধ্যে পার্থক্য স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষা দু’টির মধ্যে যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে সে রকম নয়, বরং ইংরেজি ও চীনা ভাষার মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য সেরকম। কেবল কানাডার ইন্ডিয়ানদের মধ্যে অন্তত পক্ষে এগারোটি প্রধান ভাষা ও পঞ্চাশটি উপভাষা ছিল। কিন্তু এ ভাষাগুলোর কোনটিরই বর্ণমালা ও লিখন পদ্ধতি ছিল না।
আমেরিকান ইন্ডিয়ান ভাষাগুলো ইউরোপীয় ভাষা থেকে নানাভাবে পার্থক্য মন্ডিত। এগুলো ব্যাকরণের ভিত্তি হচ্ছে ধারণা। বচন, লিঙ্গ ও কালের প্রসঙ্গে ইউরোপীয় কোন ভাষার সাথে এদের কোন সাদৃশ্য নেই। আমেরিকার আদিবাসীদের বিভিন্ন ভাষায় প্রিফিক্স ও সাফিক্সের ব্যবহার অত্যাধিক। কখনো মূল একটি শব্দের সাথে অনেকগুলো প্রিফিক্স ও সাফিক্স যুক্ত করে অনেক অর্থ প্রকাশ করা হয়।
আমেরিকার আদিবাসীদের ভাষার জটিলতার কারণে গভীর মনোযোগ দেয়া সত্ত্বেও কোন ইউরোপীয় ব্যক্তির পক্ষে তাদের কোন ভাষা পুরোপুরি রপ্ত করা সম্ভব হয়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে দুই ভিন্ন গোত্র তাদের ভাষা একত্রে মিশিয়ে নেবার প্রয়াস পেয়েছে। ইউরোপীয়দের আগমনের পর অনেক আদিবাসী ইংরেজী ও ফরাসি ভাষা শেখার চেষ্টা করেছে; এবং রেডিও, কার, এরোপ্লেন ইত্যাদি অনেক ইংরেজি শব্দ তারা আত্মস্থ করেছে।
প্রেইরি অঞ্চলের ইন্ডিয়ানরা সংকেত ভাষা ব্যবহারে দক্ষ ছিল। সংকেত ভাষায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি মুখে কোন শব্দ উচ্চারণ না করে কেবল হাত ও আঙুলের ইশারায় মনের যে কোন ভাব প্রকাশ করতে পারত এবং অন্য অভিজ্ঞ ব্যক্তি তা উপলব্ধি করতে কোন অসুবিধা হতো না। ইউরোপীয়দের আগমনের পূর্বে আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের উপস্থিতি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা জোড়ে বিস্তৃত ছিল। তাদের জীবনাচার ছিল ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের জীবনাচার থেকে ভিন্ন। তারা অনেকে কৃষিকাজ জানত না; প্রকৃতি থেকে খাবার সংগ্রহ করে জীবন যাপন ছিল তাদের অভ্যাস। আগ্নেয়াস্ত্র ও কাচের ব্যবহার ছিল তাদের অজানা। অধিকাংশ গোত্র ধাতব ব্যবহার জানত না। তারা প্রাণীর হাড় দিয়ে ছুরি, বল্লম সুই ইত্যাদি তৈরি করত। বৃক্ষের বাকল ও প্রাণীর পেশী থেকে তন্তু আহরণ করে তারা দড়ি বানাত। সাধারণত বন্য প্রাণীর বিচরণ ক্ষেত্রের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে কলহ ও যুদ্ধ সর্বদা লেগেই ছিল। কোন কোন অঞ্চলে লুটতরাজ শৌর্য-বীর্য প্রদর্শনের বিষয় হিসেবে গণ্য করা হতো; কোথাও তা ক্রীড়া হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যদিও এতে অনেক প্রাণহানি ঘটত।
বিস্ময়ের ব্যাপার এরকম সামাজিক অবস্থার মধ্যে কতিপয় মানবগোষ্ঠি উন্নতির অনেক উচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল। মধ্য আমেরিকার মায়া ও ইনকা সভ্যতা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
ক্রিস্টোফার কলাম্বাস কর্তৃক নতুন পৃথিবী অর্থাৎ আমেরিকা আবিস্কারের পর ইউরোপ থেকে মানুষ দলে দলে সেখানে গিয়ে বসতি শুরু করে। অতঃপর সেখানকার আদিবাসীদের সাথে তাদের সংঘর্ষের সূচনা ঘটে। আদিবাসীরা ইউরোপীয়দের আগ্নেয়াস্ত্রের মোকাবেলায় টিকে থাকতে পারেনি, যদিও তারা কোন কোন ক্ষেত্রে বীরের ন্যায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আদিবাসীদের অভ্যন্তরিণ গোত্রীয় কলহ ও তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল। ইউরোপীয়দের সাথে নিয়মিত যুদ্ধ ও আন্তকলহের সংঘর্ষে আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। যুদ্ধ বিগ্রহ ছাড়াও জনসংখ্যা হ্রাসের আরো কারণ ছিল। ইউরোপীয়রা অনেক সংক্রামক রোগের জীবাণু নিয়ে নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করেছিল। যক্ষ্মা, বসন্ত, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি রোগের জীবাণু ইতিপূর্বে আমেরিকায় মহামারী রূপে দেখা দেয় এবং বিপুল সংখ্যক আদিবাসীদের মৃত্যু ঘটে। প্রাকৃতিকভাবে এসব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আদিবাসীদের দেহে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।
আগত ইউরোপীয়দের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ, মহামারী ও গোত্রীয় কলহের কারণ আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা দারুণভাবে হ্রাস পায়। অল্প কিছু ইন্ডিয়ান বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে ইউরোপীয়দের সাথে মিশে যায়। বর্তমানে অতি অল্প সংখ্যক আমেরিকান ইন্ডিয়ান বিভিন্ন রিজার্ভ ক্যাম্পে বাধ্য হয়ে বসবাস করছে এবং সাধ্যানুযায়ী নিজের স্বকীয়তা লালন করে চলছে।
আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত লোক কাহিনীগুলো ছিল সম্পূর্ণ লোকমুখে প্রচারিত। তাদের লিখিত কোন ভাষা ছিল না। লোক কাহিনীগুলোর প্রকৃতি ছিল পবিত্র ও আধ্যাত্মিক। এগুলোর অন্যতম সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল স্পিরিট বা অদৃশ্য অশরীরী সত্তার উপর দৃঢ় বিশ্বাস। আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা বিশ্বাস করত পানির স্পিরিট জলাশয়ের সকল জীব নিয়ন্ত্রণ করে, স্থলের স্পিরিট ভূভাগের সকল জীব নিয়ন্ত্রণ করে এবং বনের স্পিরিট বনের জীব নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাই মানুষ নিজের সুখ শান্তির জন্য সর্বদা স্পিরিটকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। স্পিরিটকে কখনো বিরক্ত করা যাবে না।
তাছাড়া গোত্রের নির্দিষ্ট আচার অনুষ্ঠান ও শিষ্টাচার লোককাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। অধিকন্তু প্রকৃতি ও ঋতুর সাথে মানুষের গভীর যোগাযোগের লোককাহিনীগুলোয় প্রতিকের মাধ্যমে মহিমময় করে চিত্রিত ছিল।
অনেকগুলো উপাখ্যান ছিল বছরের নির্দিষ্ট ঋতু বা নির্দিষ্ট সন্ধ্যায় উপভোগের জন্য নির্ধারিত। আমেরিকার আদিবাসীদের ইতিহাস সংরক্ষণে লোককাহিনীগুলো আজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে এবং সংরক্ষণ করে যাচ্ছে তাদের ঐতিহ্য ও দেশাচার।
আবার দৈহিক গড়ন, গাত্রবর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতিতে পার্থক্য থাকলেও সমগ্র বিশ্বের মানুষ একই জাতি, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে একই প্রজাতিভুক্ত এবং তা হচ্ছে, কারণ তাদের মধ্যে মৌখিক সাদৃশ্য বিপুল। অধিকন্তু হৃদয়বৃত্তিক চিন্তা চেতনায় বিশ্বের মানুষ অভিন্ন। সুখ দুঃখ, হাসি কান্না ও আনন্দ বেদনায় জগতের সকল মানুষের প্রতিক্রিয়া মূলত একই রকম। মাতা পিতা সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিদ্যমান প্রেম, প্রীতি ও ভালোবাসার রূপ জগৎ জোড়ে অভিন্ন। তাই প্রাচীন বাংলার অজ্ঞাত নামা একজন চারণ কবি যথার্থই বলেছিলেন, ‘নানান বরণ গাভী রে ভাই! একই বরণ দুধ, জগৎ ভরমিয়া দেখি একই মায়ের পুত!’ এজন্য আমেরিকান ইন্ডিয়ানসহ বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠির লোকসাহিত্য ভৌগলিক, সামাজিক, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যজনিত বৈশিষ্ট্যের সাথে সর্বজনীন মানবিক সাদৃশ্য লক্ষণীয়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT