শিশু মেলা

সাদা বিড়াল

ইসলাম জাভেদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০২-২০১৯ ইং ০০:১১:৪৮ | সংবাদটি ৫২ বার পঠিত

আসমাদের বাড়ি থেকে তাদের স্কুল প্রায় দুই মাইলের মতো দূরত্ব। দেড় মাইল কাঁচা আর বাকিটা পাকা রাস্তা। এক সময় সে গ্রাম থেকে কোন মেয়ে হাইস্কুলে যায়নি। এখন ১০ থেকে ১৫ জন মেয়ে স্কুলে যায়। স্কুল ছুটির পর একটি চমৎকার সারিবদ্ধ গতি ভঙ্গিমায় রাস্তার দু’পাশে দিয়ে মেয়েরা হেঁটে যায়। রাস্তার দু’পাশে ধানক্ষেত। কালো ছাতা, সাদা আর সবুজ পোশাক দেখে মনে হয় এক অদ্ভুত সৌন্দর্যে অলংকৃত পুতুলেরা হেঁটে যাচ্ছে। আসমা স্কুল ছুটির পর একমনে বাড়ি ফিরে। সুন্দরী মেয়ে বলে রাস্তায় অনেক ছেলের উৎপাতের সম্মুখীন হতে হয়। কাঁচা রাস্তার মোড়ে একটি বয়স্ক তেঁতুলগাছ রয়েছে। তেঁতুলতলায় প্রায় দিন গ্রামের কয়েকটা দুষ্ট ছেলে ওতপেতে বসে থাকে। আসমা তেঁতুল গাছের মোড়ে এসে ছাতা উঠিয়ে দেখলো আজ দুষ্টু ছেলেরা কেউ নেই। শুধু একটি চমৎকার সাদা বিড়ালছানা রাস্তায় পাশে হাঁটছে। মনে হচ্ছে বিড়ালছানাটি আসমার দিকে চেয়ে আছে। আসমা তার সহপাঠী রুবিকে বললো-দেখ, রুবি বিড়ালছানা কেমন করে আমার দিকে চেয়ে আছে।
রুবি বলল- শুনেছি এ তেঁতুলগাছে বড় বড় জিন থাকে, জিনরা নাকি বিভিন্ন ধরনের জীব-জন্তুর রূপ ধারণ করতে পারে। আমার কি মনে হয় জানিস- এটা সাধারণ কোন বিড়াল নয়। বিড়ালবেশে কোনো বদ জিন তোর দিকে চেয়ে আছে। তুই একটু বেশি সুন্দরী তো, তাই তোর প্রতি ছেলেদের যেমন আকর্ষণ রয়েছে। তেমনি জিনেরও আছর করা ইচ্ছা রয়েছে। জিনের নাম শুনে আসমা ভয় পেয়ে গেল। ভয় পাওয়ার পেছনে বিরাট একটি কারণ আছে। গত বছর তাদের স্কুলে একটি ঘটনা ঘটেছে। আসমা তখন নবম শ্রেণির ছাত্রী। সে দিনের দুপুরের রোদে ছিল প্রচন্ড উত্তাপ। স্কুলের ৩য় ঘন্টার পর আসমার সহপাঠী রেহানা হঠাৎ করে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করলো। স্কুলের অন্য ছাত্রীরা প্রথমে কিছু না বুঝে তার সাথে দুষ্টুমি করতে আরম্ভ করলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর রেহানার চোখের দিকে তাকিয়ে তারা বুঝতে পারল, তার কিছু একটা হয়েছে। রেহানাকে জিনে আছর করেছে। এ খবর দ্রুত সারা স্কুলে ছড়িয়ে পড়ল। মোল্লা স্যার রেহানাকে অফিসে নিয়ে আসতে খালাকে বললেন। খালা স্কুলের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞ বোয়া। সবার খালা। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক সকলের খালা। খালা রেহানাকে ধরে ধরে অফিসে নিয়ে আসলেন। আসমা সহ কয়েকজন ছাত্রী জানালা দিয়ে রেহানাকে দেখলো। রেহানা মোল্লা স্যারের সামনে বসে আছে, তার চেহারা এক রাগান্বিত প্রেমিকার মতো, কামুক দৃষ্টিভঙ্গি। মোল্লা স্যার তার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে কি যেন পড়ছেন। হঠাৎ করে রেহানা চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে নেশাখুরের মতো ঠাস করে মোল্লা স্যারের গালে মারলো একটা থাপ্পড়। শিক্ষকসহ ছাত্র ছাত্রীরা ভয় পেয়ে গেল। মাথা ঘুরাতে ঘুরাতে রেহানা মোল্লা স্যারকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। মোল্লা স্যার আস্তাগ-ফির উল্লাহ, আস্তাগ-ফির উল্লাহ পড়তে পড়তে দিলেন দৌড়। মোল্লা স্যারের দৌড় দেখে দু’একজন শিক্ষকও ভয়ে দৌড় দিলেন। প্রধান শিক্ষক ছিলেন হিন্দু, সুশীল চন্দ্র দাশ। তিনি হায় ভগবান, হায় ভগবান বলে কিছুটা ভয় কমান। খালাকে দিয়ে রেহানাকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হল। সেটাই ছিল আসমার জীবনে প্রথম জিনে ধরা মানুষ দেখা। সেই থেকে সে জিনকে খুব ভয় পায়। আসমা ও রুবি হাঁটছে। তাদের ধারণা তেঁতুল গাছে জিনের আস্তানা। কিছুক্ষণ পর রুবি তার বাড়ি চলে গেলো, এখন আসমা একা। মনে হচ্ছে বিড়ালটা তার পিছু নিয়েছে। ভয়ে তার পা-দুটু একটু একটু কাঁপছে, আসমা মনে মনে ভাবছে। জিন শুধু মেয়ে মানুষের উপর আছর করে কেন? তবে কি জিন জাতি সবাই পুরুষ? জিনের ভয় মন থেকে দূর করার জন্য রাস্তার পাশে বাঁশের বেড়ায় কতটুকরো বাঁশ রয়েছে গুনে গুনে হাঁটতে লাগলো আসমা। গ্রামের ভেতর আঁকাবাঁকা পথ। গাছের ঘন ছায়া, দূরে ছোট মাঠে গ্রামের কয়েকটি ছেলে ফুটবল খেলছে, বাড়ির পথে এসে মনে একটু সাহস পেল আসমা, পিছন দিকে তাকিয়ে দেখলো বিড়ালছানা তার পিছন পিছন আসছে। দৌড়ে ঘরে ঢুকলো সে। লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারল না।
আসমার ছোট ভাই রিফাত বিড়ালটিকে দেখে বেশ খুশি হয়েছে। ইতোমধ্যে রিফাত বিড়াল ছানাটিকে নিয়ে খেলা করতে শুরু করেছে। আসমা এতক্ষণে বুঝতে পারল বিড়ালটি আসলে জিন জাতিয় কিছু নয়। ধীরে ধীরে বিড়ালটি আসমাকে আপন করে নিল। এখন বিড়ালটি মাঝে মধ্যে আসমার কোলে উঠে খেলা করে। বিড়ালকে কোলে নিয়ে ওর সাদা নরম লোমগুলোর উপর হাত বোলাতে আসমার ভালোলাগে। শোয়ার সময় বিড়ালটি কম্বলের মাঝে লুকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে গেলে আসমা অনুভব করতো তার বুকের কাছে অথবা পায়ের কাছে বিড়ালটি শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। যখন তখন বিছানায় শুয়ে পড়তো। ইচ্ছামত সারাটা বাড়ি ঘুরে বেড়াতো। কোন এক সকালে আসমা ঘুম থেকে উঠে দেখলো খাটের নিচে ফুটফুটে সাদা তিনটি বিড়ালছানা মিউ মিউ করছে। পাশে পোয়াতি বিড়ালটি ঘুমিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। আসমার খাটের নিচে বিড়ালের বাচ্চার জন্ম হয়েছে শুনে তার বড় ভাবী একটু হাসলেন। আসমার মা এ বাচ্চাসহ পোয়াতি বিড়ালটাকে খড়ের ঘরে নিয়ে রাখলেন। বিড়ালের সন্তানগুলো এখন খড়ের ঘরে রয়েছে। বাচ্চাগুলোর চোখ এখনো ফুটেনি।
আসমা ভাবল বিড়ালছানার প্রতি তার মার এত অবহেলা কেন। গত মাসে বড় ছাগলটি ৩টি বাচ্চার জন্ম দিয়েছে। মা সরাসরি ধাত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। জন্মের সাথে সাথে বাচ্চাগুলোর কানে বাতাস দিয়েছেন। আঁতুড় ঘরে প্রসূতি ছাগলকে লতাপাতা এনে খেতে দিয়েছেন। বাচ্চাগুলো দুধ খাচ্ছে কি না মা সব সময় খেয়াল রাখতেন। অথচ বিড়ালছানাগুলো খড়ের ঘরে এক নিদারুন অবহেলায় পড়ে আছে। কেউ ফিরেও দেখছে না। আসমা ভাবছে বিড়ালের মাংস ভক্ষণ করা হারাম। এ হালাল-হারামের কারণেই কি বিড়ালের সামাজিক কোন মূল্য নাই। যদি হালাল হত তবে বিড়ালের ফার্ম তৈরি হত। আসমা কথাগুলি যখন ভাবে তখন তার মন বিমর্ষ হয়ে উঠে। বিড়ালের প্রতি এক আশ্চর্য মায়ায় টান অনুভব করে।
একদিন স্কুল থেকে এসে আসমা দেখলো জাহিদ এসেছে। জাহিদ তার মামাতো ভাই। শহরে কোন এক নামকরা কলেজে পড়ে। জাহিদকে দেখেই আসমার মনে পড়ে গেলো রুমান্টিক চিমটির কথা। জাহিদার মারাত্মক একটি অভ্যাস চিমটি কাটা। অন্যের শরীরে চিমটি কেটে সে খুব আনন্দ উপভোগ করে। জাহিদের চিমটি আসমার ভালো লাগতো কিনা তা বিচার করা মুশকিল। তবে জাহিদ চিমটি কাটলে আসমা কখনো বাঁধা দিত না। এমন হাসি তামাশার জন্য জাহিদকে দেখলেই আসমার মনটা রোমান্টিক হয়ে উঠে। চিমটি কাটার জন্য জাহিদ বিকাল থেকে আসমার পিছু নিয়েছে। কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না।
সন্ধ্যার পর আসমা পড়তে বসেছে, এমন সময় জাহিদ পড়ার ঘরে এলো। জাহিদ জানতো জাম্বুরা ফুলের ঘ্রাণ আসমার খুব প্রিয়। আসমার জন্য জামির গাছ থেকে কিছু ফুল এনে তার সামনে রাখে। আসমা হেসে হেসে ফুলগুলি কুড়িয়ে হাতের মুঠোয় নিচ্ছে। জাহিদ দু’আঙ্গুল তুলে আসমাকে চিমটি কাটতে যাবে ঠিক তখনই সে চিৎকার মেরে লাফিয়ে উঠলো। আসমার মনে হল টেবিলের নিচে কোন বিষাক্ত সাপ জাহিদের পায়ে ছোবল মেরেছে। ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল। পরক্ষণে বুঝতে পারলো তার প্রিয় বিড়ালটি জাহিদের পায়ে আঁচড় দিয়েছে। ক্ষত স্থান থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে। জাহিদ উত্তেজিত হয়ে উঠল। গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে বিড়ালটিকে লাথি মারলো। আসমা তাকে ধরে আটকাতে পারেনি। জাহিদের আঘাতে বিড়ালটি ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মেঝের উপর ছিটকে পড়ে ছটফট করতে লাগল। আসমা বিড়ালটির মাথায় পানি ঢেলে বাঁচানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু পারল না। নাক, মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। হতভাগ্য বিড়ালের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে সে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। মনটা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত। তাই রাতে ভাত না খেয়ে সে শুয়ে পড়লো। জাহিদ তার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে নরম সুরে বললো- তোমার খুব সাধের পোষা বিড়ালটি আমি মেরেছি, এখন আমার নিজের উপর অত্যন্ত রাগ হচ্ছে। আমি লজ্জিত, দুঃখিত, আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি ভাবিনি বিড়ালটি এভাবে মরে যাবে।
আসমা চোখের জল মুছতে মুছতে বললো- আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলেও বিড়ালের স্মৃতি আমাকে ক্ষমা করবে না। তোমাকে দেখলেই বিড়ালের কথা মনে হবে।
সুতরাং তোমার সাথে দেখা না হলেই ভাল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT