ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৩-২০১৯ ইং ০১:১৬:৪৮ | সংবাদটি ১৩৫ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
দু’টি মানসিক ব্যাধি ও তার প্রতিকার :
সম্পদ-প্রীতির ও যশ-খ্যাতির মোহ এমন ধরনের দু’টি মানসিক ব্যাধি যদ্দরুন ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জীবনই নিষ্প্রভ ও অসার হয়ে পড়ে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, মানবেতিহাসে এযাবৎ যতগুলো মানবতা বিধ্বংসী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এবং যতো বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি বিস্তার লাভ করেছে, সেগুলোর উৎপত্তিই হয়েছিল উল্লেখিত এ দু’টি ব্যাধি থেকে।
সম্পদ প্রাপ্তির পরিণতি ও ফলাফল :
(১) অর্থগৃধতা ও কৃপণতার অন্যতম জাতীয় ক্ষতির দিক হল এই যে, তার সম্পদ জাতির কোন উপকারে আসে না। দ্বিতীয় ক্ষতিটি তার ব্যক্তিগত। এ প্রকৃতির লোককে সমাজে কখনও সু-নজরে দেখা হয় না।
(২) স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা : তার সম্পদলিপ্সা পূরণার্থ জিনিসে ভেজাল মেশানো, মাপে কম দেয়া, মজুদদারী, মুনাফাখোরী, প্রবঞ্চনা-প্রতারণা প্রভৃতি ঘৃণ্য পন্থা অবলম্বন তার মজ্জাগত হয়ে যায়। স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে সে অপরের রক্ত নিংড়ে নিতে চায়। পরিশেষে পুঁজিপতি ও মজুরদের পারস্পরিক বিবাদের উৎপত্তি হয়।
(৩) এমন লোক যত সম্পদই লাভ করুক, কিন্তু আরো অধিক উপার্জনের চিন্তা তাকে এমনভাবে পেয়ে বসে যে, অবকাশ ও অবসর বিনোদনের সময়েও তার একই ভাবনা থাকে যে, কিভাবে তার পুঁজি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে যে সম্পদ তার সুখ-সাচ্ছন্দের মাধ্যমে পরিণত হতে পারত, তা পরিণামে তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
(৪) সত্য কথা যত উজ্জ্বল হয়েই সামনে উদ্ভাসিত হোক না কেন, তার এমন কোন কথা মেনে নেয়ার সৎসাহস থাকে না, যাকে সে তার উদ্দেশ্য সাধন ও সম্পদলাভের পথে প্রতিবন্ধক বলে মনে করে। এসব বিষয় পরিশেষে গোটা সমাজের শান্তি ও স্বস্তি বিঘিœত করে।
গভীরভাবে চিন্তা করলে যশ-খ্যাতির মোহের অবস্থাও প্রায় একই রকম বলে পরিলক্ষিত হবে। এর ফলশ্রুতিস্বরূপ অহঙ্কার, স্বার্থান্বেষা, অধিকার হরণ, ক্ষমতা লিপ্সা এবং এর পরিণতিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও অনুরূপ আরো অগণিত অমানবিক সমাজবিরোধী ও নৈতিকতা বিবর্জিত দাঙ্গা-হাঙ্গামার উৎপত্তি ঘটে, যা পরিণামে গোটা বিশ্বকে নরকে পরিণত করে দেয়। এই উভয় ব্যাধির প্রতিকার কুরআন পাক এ ভাবে উপস্থাপন করেছেÑ বলা হয়েছে ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর’ অর্থাৎ, ধৈর্য ধারণ করে ভোগ-বিলাস ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনাকে বশীভূত করে ফেলো। তাতে সম্পদপ্রীতি হ্রাস পাবে। কেননা, সম্পদ বিভিন্ন আস্বাদ ও কামনা বাসনা চরিতার্থ করার মাধ্যম বলেই ধন প্রেমের উদ্ভব হয়। যখন এসব আস্বাদ ও কামনা বাসনার অন্ধ অনুসরণ পরিহার করতে দৃঢ় সংকল্প হবে, তখন প্রাথমিক অবস্থায় খানিকটা কষ্ট বোধ হলেও ধীরে ধীরে এসব কামনা যথোচিত ও ন্যায়সঙ্গত পর্যায়ে নেমে আসবে এবং ন্যায় ও মধ্যমপন্থা তোমাদের স্বভাব ও অভ্যাসে পরিণত হবে। তখন আর সম্পদের প্রাচুর্যের কোন আবশ্যকতা থাকবে না। সম্পদের মোহও এতে প্রবল হবে না যে, নিজস্ব লাভ ক্ষতির বিবেচনা ও নেশা তোমাকে অন্ধ করে দেবে।
আর নামায দ্বারা যশ-খ্যাতির আকর্ষণও দমে যাবে। কেননা, নামাযের মধ্যে আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সব ধরণের বিনয় ও ন¤্রতাই বিদ্যমান। যখন যথা নিয়মে ও যথাযথভাবে নামায আদায় করার অভ্যাস গড়ে ওঠবে, তখন সর্বক্ষণ আল্লাহ পাকের সামনে নিজের অক্ষমতা ও ক্ষুদ্রতার ধারণা বিরাজ করতে থাকবে। ফলে অহঙ্কার, আত্মম্ভতা ও মান মর্যাদার মোহ হ্রাস পাবে।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT