ধর্ম ও জীবন

ইসলামে মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্ব

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৩-২০১৯ ইং ০১:১৭:৩৩ | সংবাদটি ১৪৭ বার পঠিত

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আল্লাহ পাক মানুষকে সৃষ্টি করে তাদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। আর সেই ভাষার ¯্রষ্টা স্বয়ং মহান আল্লাহ তা’আলা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে ‘খালাক্বাল ইনসানা আল্লামাহুল বায়ান’ অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন অর্থাৎ ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। (সূরা : আর রাহমান, আয়াত : ৩-৪)
জন্মের পর থেকেই প্রত্যেক মানব শিশু তার মায়ের কাছ থেকে শুনে শুনে জ্ঞান অর্জন করে। মায়ের কাছ থেকে প্রত্যেক শিশু মাতৃভাষাই শুনে থাকে।তাই জন্মগতভাবেই প্রত্যেক মানুষ মাতৃভাষায় কথা বলে থাকে। পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে আল্লাহ পাক তাঁকে ভাষা জ্ঞান বা ভাষা কৌশল শিক্ষা দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘ওয়া আল্লামা আদামাল আসমাআকুল্লাহ’ অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) আদমকে সমস্ত কিছুর নাম তথা ভাষাজ্ঞান শিক্ষা দিলেন। (সূরা : বাক্বারা, আয়াত : ৩১)
আল্লাহ পাক হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেই সব ভাষার সব বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন যা উক্ত আয়াত দ্বারাই প্রমাণ হল। সুতরাং মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্ব যে কতটুকু তা এখান থেকেই সহজে প্রতীয়মান হয়। মাতৃভাষা চর্চা করা সকলের জন্য অপরিহার্য বলেই আল্লাহ পাক সর্ব প্রথম হযরত আদম (আ.) কে ভাষাজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন।
ভাষা মানুষের প্রতি মহান আল্লাহ প্রদত্ত অশেষ দয়া ও অনুগ্রহ এবং তাঁর সৃষ্টির অনুপম নিদর্শন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন ‘ওয়া মিন আয়াতিহি খালকুছ ছামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি ওয়াখতিলাফু আলসিনা তিকুম ওয়া আলওয়ানিকুম’ অর্থাৎ আল্লাহর আরো একটি নিদর্শন হচ্ছেÑ নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। (সূরা : রুম, আয়াত : ২২)
পৃথিবীতে মানব সন্তানদের বংশ বৃদ্ধির ফলে তারা বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত হয়ে যায় এবং প্রত্যেক জাতি ও গোত্র এক একটি ভাষা গ্রহণ করে নেয়। আর তারা এসব ভাষায় কথাও বলতে থাকে। ফলে এসব ভাষাই তাদের মাতৃভাষা হয়ে যায়।
মহান আল্লাহ পাক সকল যুগের সকল মানুষকে তাদের মাতৃভাষা চর্চার প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছেন আর এজন্যই যুগে যুগে যতো নবী ও রাসুল মানুষের হেদায়েতের জন্য এ ধরায় পাঠিয়েছেন সকল নবী রাসুলকে স্ব স্ব জাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছেন। আর যত ধর্মগ্রন্থ নাযিল করেছেন সকল ধর্মগ্রন্থই ঐসব জাতির ভাষায় নাযিল করেছেন। প্রত্যেক জাতি যাতে সহজে তাদের ধর্মগ্রন্থ বুঝতে পারে এবং স্ব স্ব ভাষা বেশি বেশি চর্চা করতে পারে সেজন্যই আল্লাহ পাক সেসব জাতির ভাষায় ধর্মগ্রন্থ সমূহ নাযিল করেছেন। মাতৃভাষার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেনÑ ‘ওয়ামা আরসালনা মিন রাসুলিন ইল্লা বিলিসানি কাউমিহি লিইয়্যুবাইয়্যিনা লাহুম’ অর্থাৎ আর আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। (সূরা : ইব্রাহিম, আয়াত : ৪)
যুগে যুগে নবী রাসুলগণ তাঁদের উম্মতগণকে তাদের মাতৃভাষায়ই দ্বীন সম্পর্কে, দ্বীনের বিধিবিধান সম্পর্কে পরিস্কারভাবে বুঝিয়েছেন। তাঁরা তাঁদের উম্মতগণকে মাতৃভাষার চর্চা করতে উৎসাহিত করেছেন। খোদাদ্রোহী স¤্রাট ফেরাউনকে আল্লাহর দ্বীন ও ঈমানের প্রতি দাওয়াত দেয়ার জন্য আদিষ্ট হওয়ার পর হযরত মুসা (আ.) তদীয় ভাই হযরত হারুন (আ.) কে সঙ্গী পাওয়ার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছিলেন। কারণ, হযরত মুসা (আ.) থেকে হযরত হারুন (আ.) ছিলেন স্পষ্টভাষী। পবিত্র কুরআনে বিষয়টি এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে ‘আমার ভাই হারুন আমা অপেক্ষা প্রাঞ্জলভাষী। অতএব, তাকে আমার সাথে সাহায্যের জন্য প্রেরণ করুন, সে আমার সত্যায়ন করবে’ (সূরা : কাসাস, আয়াত : ৩৪)
রাসুল (সা.) নিজে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাষী ছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেনÑ‘আনা আফছাহুল আরব’ অর্থাৎ আমিই আরবের মধ্যে সবচেয়ে প্রাঞ্জলভাষী। এভাবে কুরআন-হাদিসে মাতৃভাষা চর্চার প্রতি বিশেষ বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশ্বমানবতার মুক্তির দর্পণ মহাগ্রন্থ আল কুরআন আরবদের মাতৃভাষায় নাজিল হয়েছে। কেননা, নবী (সা.) নিজেই ছিলেন আরবি ভাষাভাষী। তিনি যে দেশে বাস করতেন সে দেশের সকলের ভাষা ছিল আরবি। তাই আরবের লোকদের মাতৃভাষার প্রতি লক্ষ্য রেখেই আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআন আরবি ভাষায় নাযিল করেছেন এবং বিশ্ববাসীকে মাতৃভাষা চর্চার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। ইরশাদ হচ্ছেÑ‘নিশ্চয়ই আমি একে নাযিল করেছি আরবি ভাষায় কুরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো’ (সূরা : ইউসুফ, আয়াত : ২)
মাতৃভাষা চর্চার ক্ষেত্রে রাসুলে পাক (সা.) ছিলেন আদর্শের মূর্তপ্রতীক। রাসুলে পাক (সা.) নিজ মাতৃভাষা আরবিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি হাদিসে ইরশাদ করেনÑতোমরা তিনটি কারণে আরব তথা আরবি ভাষাকে ভালোবাসবে। কেননা, আমি আরবি ভাষী, কুরআনের ভাষা আরবি এবং জান্নাতবাসীর ভাষাও আরবি। (বায়হাকী)
ইসলামে মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। মাতৃভাষার সঙ্গে সকলের সভ্যতা ও সংস্কৃতি জড়িত থাকে। পারস্পরিক ভাব আদান প্রদান, একে অপরকে বুঝা ও বুঝানো, অন্যকে প্রভাবিত করা, ধর্মের বিধি-বিধান এসব মাতৃভাষার মাধ্যমেই সহজভাবে সম্ভব। মাতৃভাষা চর্চা ব্যতিত কারো অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। তাই আমাদেরকে সর্বাগ্রে মাতৃভাষা চর্চায় আত্মনিয়োগ করতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT