ধর্ম ও জীবন

ইসলামে হাস্যরস

মোঃ শামছুল আলম প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৩-২০১৯ ইং ০১:১৮:২৭ | সংবাদটি ১৫৪ বার পঠিত

মনকে সুস্থ রাখার জন্য প্রয়োজন আনন্দময় জীবন। আর আনন্দময় জীবনের জন্য প্রয়োজন হাস্য রসিকতা। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সুখ বা আনন্দ শব্দটি প্রায় ২৫ বার এসেছে। যারা মানুষের জন্য আনন্দ ও সুখের ব্যবস্থা করেন, পবিত্র কুরআনে তাদের প্রশংসার পাশাপাশি পরকালে তারা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাবেন বলেও ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
রাসূল (সা.) এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘যে কেউ একজন মুমিনকে আনন্দ দিল, সে যেন আমাকে আনন্দ দিল, আর যে আমাকে খুশি করল, সে অবশ্যই আল্লাহকেও খুশি করল।’
বিশ্বনবী (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম রেজা (রা.) বলেছেন, আনন্দ ও চিত্তবিনোদন মানুষকে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে সহায়তা করে এবং এর মাধ্যমে দুনিয়ার বা পার্থিব বিষয়ে অনেক সাফল্য পাওয়া যায়।
আজকাল মনোবিজ্ঞানীরাও মানুষের সুস্থতার জন্য আনন্দ ও চিত্ত বিনোদনকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও আনন্দ ও চিত্ত বিনোদনকে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অনেক মনোবিজ্ঞানী বলছেন, চিত্তবিনোদন, হাসি-খুশি ও প্রফুল্লতা বিভিন্ন ধরনের রোগ প্রতিরোধ করে এবং শরীরে নানা ধরনের ক্যান্সারের দ্রুত ছড়িয়ে পড়াকেও ঠেকিয়ে রাখে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হাসি ও প্রফুল্লতা এমন এক অনৈচ্ছিক প্রতিক্রিয়া যার ফলে মুখের ১৫টি মাংসপেশি একই সময়ে সংকুচিত হয় এবং দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস ঘটে। এ ছাড়াও হাসি ও প্রফুল্লতার সময় শরীরের রক্ত-প্রবাহ দ্রুত সঞ্চালিত হওয়ায় রক্তে এড্রেনালিন বেড়ে যায়। ফলে মানুষ আরো সজীবতা ও আনন্দ অনুভব করে। মানুষের জীবনে যদি আনন্দ ও প্রফুল্লতা না থাকত তাহলে মানুষ মানসিক চাপের তীব্রতায় প্রাণ ত্যাগ করত।
একইভাবে পরিবার ও সমাজের উন্নতির জন্যেও দুঃখ ও হতাশা দূর করা এবং আনন্দ ও চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করা জরুরী। আনন্দিত বা দুঃখিত হওয়া কেবল একজন মানুষের নিজের সাথে সম্পর্কিত বিষয় নয়। কারণ, একজন মানুষের হাসি-খুশী মুখ এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত চেহারা অন্যদেরও প্রভাবিত করে।
পবিত্র ইসলাম ধর্ম মানুষের শারীরিক ও মানসিক চাহিদার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ ইসলাম মনে করে, একটি সফল জীবনের জন্য প্রশান্তি ও প্রফুল্লতা থাকা জরুরী। ইমাম রেজা (রা.) বলেছেন, তোমার প্রাত্যহিক তৎপরতার সময়কে চার ভাগে ভাগ করে নাও। এই চার ভাগের এক ভাগ সময়ে আল্লাহর এবাদত করবে। এক ভাগ ব্যয় করবে আয়-উপার্জনের জন্য, অন্য এক ভাগ সময়ে নিজের বিশ্বস্ত ভাইদের সাথে ও এমন লোকদের সাথে যোগাযোগ রাখবে যারা তোমাকে তোমার দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত করবে। এ ছাড়াও অন্য এক ভাগ সময় চিত্তবিনোদন ও আনন্দের জন্য বরাদ্দ রাখবে। আর আনন্দ ও চিত্তবিনোদনের মাধ্যমে অর্জিত মানসিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অন্য সময়ের দায়িত্ব এবং কাজগুলো সম্পন্ন করবে।
আনন্দের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো রসিকতা। রসিকতা যে খারাপ জিনিস তা কিন্তু নয়, কেননা টেনশন, হতাশা, বিষাদগ্রস্ততা দূর করার জন্যে হাসি-রসিকতা একটি ভালো উপাদান। মানসিক প্রফুল্লতার জন্যেও হাস্যরসের যথেষ্ট উপযোগিতা রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো রসিকতার সীমা মেনে চলা। সীমা লঙ্ঘন হয়ে গেলে অনেকের মনেই আঘাত লাগতে পারে। তাই সীমারেখাটি আগে জানতে হবে এবং পরে তা মানতে হবে। কোনোভাবেই অপরকে উত্যক্ত করা বা খোঁচা দেয়ার জন্যে কৌতুক করা যাবে না।
এ প্রসঙ্গে ইমাম সাদেক (রা.) এর একটি বর্ণনার উদ্ধৃতি দেয়া যায়। তিনি একবার ইউনূস শিবাণীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘লোকজনের সাথে কী পরিমাণ কৌতুক ও মজা কর? ওই লোক জবাবে বলেছিল,খুব কম। ইমাম সাদেক (রা.) তখন তিরস্কারের সুরে বলেছিলেন কেন লোকজনের সাথে হাসি-মজা কর না? হাসি-কৌতুক সুন্দর আচার-ব্যবহার আর সচ্চরিত্রের অংশ।’
ইসলামের দৃষ্টিতে মুমিনদের একটি দায়িত্ব হলো দ্বীনী ভাইদেরকে আনন্দ দেয়া। হযরত আলী (আ.) বলেছেন- রাসূল (সা.) যখনই তাঁর কোনো সহচরকে বিষণœ বা মনমরা অবস্থায় দেখতেন, তখনই কৌতুক মজা করে তাকে প্রফুল্ল করে তুলতেন এবং বলতেন, নামাযের পর সবচেয়ে উত্তম আমল হলো মুমিনদের অন্তরকে প্রফুল্ল করা। অবশ্য এমনভাবে হতে হবে যেন তাতে গুনাহ’র লেশমাত্র না থাকে।
হাস্য রসিকতা বা কৌতুক পরস্পরকে ঘনিষ্ট করে তোলে। এ কারণে পরিপূর্ণ জীবন বিধান ইসলামে কৌতুককে বিশেষ করে মুমিনদের জন্যে জরুরি একটি বিষয় বলে মনে করা হয়।
ইমাম হাসান (রা.) কে ইমাম আলী (রা) এক উপদেশ বাণীতে বলেছেন, হে সন্তান আমার! সে-ই ইমানদার যে তার দিনরাতের সময়গুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করে নেয়। একটি অংশকে কাজে লাগায় আধ্যাত্মিকতার চর্চা এবং আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করার মধ্য দিয়ে। অপর একটি অংশকে কাজে লাগায় পার্থিব জগতের প্রয়োজনীয়তা ও জীবন জীবিকার চাহিদা মেটাতে। আর তৃতীয় অংশটিকে নির্দিষ্ট করে বৈধ এবং হালাল বিনোদন উপভোগ করার জন্যে।
রাসূলে (সা.) এবং আমিরুল মুমেনিন আলী (রা.) এর খুরমা খাওয়া নিয়ে চমৎকার একটি কৌতুক আছে। কৌতুকটি হলো একদিন এই দুই মহান মনীষী একসাথে বসে খুরমা খাচ্ছিলেন। রাসূলে খোদা (সা.) খুরমা খেয়ে বিচিগুলো আলী (রা.) এর সামনে রাখতেন। খাওয়া শেষে রাসূল বললেন-যার সামনে বীচি বেশি সে অতিভোজী। আমিরুল মুমেনিন দেখলেন রাসূলের সামনে কোনো বীচিই নেই, তাই জবাব দিলেন-যে বীচিশুদ্ধ খুরমা খেয়েছে সে-ই বেশি পেটুক।
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, একবার আব্দুল মোত্তালেবের মেয়ে রাসূলে (সাঃ) বৃদ্ধা ফুফু সফিইয়্যাহ্ নবীজীর কাছে এলেন। রাসূলকে তিনি বললেন-ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার জন্যে একটু দোয়া করো যেন বেহেশ্তবাসী হতে পারি।‘ নবীজী একথা শুনে হাসতে হাসতে মজা করে বললেন-‘বৃদ্ধ মহিলারা বেহেশতে যাবে না।’ সফিইয়্যাহ্ ভীষণ বিষণœ হয়ে পড়লেন এবং ফিরে গেলেন। নবীজী তখন মুচকি হেসে বললেন-সফিইয়্যাকে বলো-বৃদ্ধ মহিলারা আগে তরুণী হবে তারপর বেহেশতে যাবে।
সতর্কতা : কৌতুক বা হাস্যরস হতে হবে বাস্তবতার আলোকে। খেয়াল রাখতে হবে যেন, কোরান-হাদিসের বা শরিয়তের খেলাপ না হয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT