ধর্ম ও জীবন

ইসলামের দৃষ্টিতে মাইকের ব্যবহার

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৩-২০১৯ ইং ০১:২০:৩৮ | সংবাদটি ২৪৯ বার পঠিত

ওয়াজ আরবী শব্দ। যার বাংলা অর্থ হলো উপদেশ, নসিহত, বক্তব্য বা ধর্মসভা। পরিভাষায় বলা যায়, বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ইসলামের সুমহান বাণীকে সাধারণ মানুষের নিকট পৌছানোর পদ্ধতিকে ওয়াজ বলে। ওয়াজ মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। মুসলমানদের ইমান-আমলের উন্নতি ও সংশোধনের গুরুত্বপুর্ণ পন্থা হচ্ছে ওয়াজ।
ইসলামের শুরু থেকেই এ পবিত্র ধারা অদ্যাবধি চলে আসছে। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর স্মরণ করো ওই সময়ের কথা, যখন লোকমান তার পুত্রকে ওয়াজ (উপদেশ) করতে গিয়ে বলল, হে পুত্র আমার! আল্লাহর সঙ্গে শরিক কোরো না, নিঃসন্দেহে শিরক মহা অপরাধ।’ (সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৩) ওয়াজ-নসিহতের উত্তম এ ধারা রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের যুগ অতিক্রম করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত আলেম-উলামাদের মাধ্যমে বর্তমান অবধি তা অব্যাহত আছে এবং থাকাও অপরিহার্য। বর্তমানে তাতে মৌলিক কিছু ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে যা মোটে ও কাম্য নয়, যেমন মাইক ব্যবহারের নামে আওয়াজের প্রতিযোগিতা। ওয়াজ মাহফিলে মাইক ব্যবহার করা যাবে না তা বলছি না; বরং বলতে চাচ্ছি মাইকের সংযত বা পরিমিত ব্যবহার। মাইকের সংযত ব্যবহার বলতে বুঝায় শ্রুতাদের জন্য যতটুকু আওয়াজের প্রয়োজন ততটুকুর ব্যবহার। যেমন একটি মাহফিল এ উপস্থিত শ্রুতার সংখ্যা ১০০০ হাজার সেখানে চাইলে শুধুমাত্র সাউ- সিস্টেমের মাধ্যমেই ওয়াজ এর আয়োজন করা যায় অথচ সেখানে ১৫/২০ লাউড স্পিকার লাগিয়ে গোটা একটি এলাকায় আওয়াজের ভয়াবহ ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে যা ইসলাম নামক শান্তির ধর্ম কখনো সমর্থন করে কি? কারণ ইসলাম শব্দের অর্থই হলো শান্তি। সেখানে একটি ভালো কাজ করতে গিয়ে অন্য মানুষের কাজে ব্যাঘাত হউক তা ইসলাম সমর্থন করে না। আপনি যখন ওয়াজ করতেছেন ঠিক সেই মুহুর্তে অসংখ্য মানুষ তার ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগী তথা ব্যবসা বাণিজ্য, লেখাপড়ার কাজে ব্যস্ত; সেই মুহুর্তে আপনাদের মাইকের উচ্চ আওয়াজের কারণে অন্যের ব্যক্তিগত কাজে সমস্যা হচ্ছে, এটা কি শান্তির ধর্ম ইসলাম সমর্থন করে? একটু ভেবে দেখবেন সচেতন জ্ঞানশীল হযরাত উলামায়ে কেরামগণ। আজকালতো সকাল ১০টা হতে শুরু করে রাত ১/২টা প্রর্যন্ত মাইক উচ্চ আওয়াজে চলতেই থাকে; অথচ কত শ্রমজীবী ও অসুস্থ মানুষ আওয়াজের কারণে ঘুমাতে পর্যন্ত পারছে না তা কি ইসলাম সমর্থন করে?
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘মনে মনে তুমি আল্লাহর জিকির করো, গোপনে ও ভীতকম্পিত হয়ে, উচ্চকণ্ঠে নয়’। হযরত আবু বকর (রা.) বলতেন, তাহাজ্জুদে কুরআন তেলাওয়াত খুব নিম্নস্বরে করো। যাতে অন্য কারো ঘুম না ভাঙ্গে। হযরত ওমর (রা.) বলতেন, আমি চাই তেলাওয়াত হালকা উচ্চস্বরে হোক। যাতে নিদ্রিত ব্যক্তির ঘুম না ভাঙ্গে কিন্তু কিছুটা সজাগ ব্যক্তি পূর্ণ জাগ্রত হয়ে যায়। যেন, তার পক্ষে কিছু নামায ও তেলাওয়াত করা সম্ভব হয়। যখন এই ছিল মহান খলিফাদের দৃষ্টিভঙ্গি তখন ধর্মীয় কাজে মাইক ব্যবহারে সংযম কত প্রয়োজন হয় তা একবার চিন্তা করে দেখুন হযরাত উলামায়ে কেরাম।
মানুষের কষ্ট হয় এমন কোনো পদ্ধতি ইসলামি শরীয়ত কতটুকু সমর্থন করে?
রহমতের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মুসলমান হলো ঐ ব্যক্তি যার হাত এবং জবান থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকবে। প্রিয়নবী (সা.) নামাজের মধ্যে শিশুদের কান্না শুনলে নামাজকে সংক্ষিপ্ত করতেন, যাতে শিশুদের মায়েদের কষ্ট না হয়। চিন্তা করুন রহমতের নবী মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ব্যাপারে কত সচেতন ছিলেন। অথচ আমরা আজ ওয়াজের নামে মাইকের উচ্চ আওয়াজ দিয়ে কত মানুষকে মানসিক কষ্ট দিতেছি তা কি ইসলাম সমর্থন করে? আপনি ওয়াজের মাহফিলে কিছু লোকের সামনে ওয়াজ করবেন তাদের কানে আওয়াজ পৌছানোর জন্য ভেতরের মাইক-ই যথেষ্ট অথচ আপনি বাইরে ১০/১৫ টি মাইক চালু করে দিলেন, যার ফলে সমগ্র এলাকার মানুষের কানে আওয়াজ পৌছে দিচ্ছেন, এখন এলাকার কোন ব্যক্তি হয়ত ঘুমুতে চাচ্ছে অথবা কোন ব্যক্তি অসুস্থ সে বিশ্রাম নিচ্ছে, কিন্তু আপনি মাইকের আওয়াজ বলপূর্বক সমগ্র এলাকার উপর চাপিয়ে দিলেন। এ কাজ যবান দিয়ে কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে না? বলতে পারেন প্রতিদিন গান বাজনার নামে মাইকের উচ্চ আওয়াজে কত অনুষ্ঠান হচ্ছে তাতে কি অসুবিধা হচ্ছে না; অবশ্যই অসুবিধা হচ্ছে কিন্তু সেটা যেহেতু ধর্মের নামে হচ্ছে না সেহেতু সেখানে ইসলামী শরিয়তের বিধান প্রযোজ্য নয়। কেননা গান-বাজনাতো শরিয়তে জায়িজ নেই তাই তাতে উচ্চ আওয়াজ আর নিম্ন আওয়াজে কি যায় আসে। কিন্তু ওয়াজতো ইবাদত তাই সেখানে অবশ্য শরিয়তের উসুল মেনেই তা পালন করতে হবে।
নবী করিম (সা.) এর সুন্নত ও শরীয়তের কল্যাণমূলক নীতি অবশ্য ওয়াজ মাহফিলে অনুসরণ করা প্রয়োজন। ইসলাম সংযম ও সাধারণ মানুষের শান্তির পক্ষে তাই ওয়াজের নামে মাইকের অপব্যবহার হতে আমাদেরকে সচেতন হওয়া সময়ের দাবী। ইসলামে কুরআন তেলাওয়াত রত ব্যক্তিকে সালাম না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কেননা এতে তার কষ্ট হতে পারে।
তাই আসুন, ওয়াজের নামে আওয়াজের প্রতিযোগীতা হতে বিরত থাকি। ওয়াজ যাতে মানুষের হেদায়ত ও ইসলাহের নিয়তেই হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সত্য উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। আমিন!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT