পাঁচ মিশালী

বাংলা সাহিত্যের অমর কবি

মোহাম্মদ আবু তাহের প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৩-২০১৯ ইং ০১:৩৪:৩৬ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত



‘সোনালী কাবিন’ এর কবি আল মাহমুদ চলে গেছেন না ফেরার দেশে। রাজধানীর একটি হাসপাতালে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন আল মাহমুদ। তার প্রকৃত নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ। সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির দমন নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে পঞ্চাশের দশকে এসে বাংলা কবিতার বাঁক বদল ঘটে। কবিতায় এ সময় রাজনীতি আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, লোকায়ত জীবন, সাম্যবাদ ইত্যাদি প্রবলভাবে উঠে আসতে থাকে। এ ধারার কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আল মাহমুদ। লোকায়ত জীবন ও সাম্যবাদ তাঁর কবিতায় স্থান পায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে সোনালী কাবিন ছাড়াও লোক লোকান্তর এবং কালের কলস রয়েছে। ডাহুকী, কবি ও কোলাহল, নিশিন্দা নারী উপন্যাস লিখেছেন কবি আল মাহমুদ। তাঁর গল্প গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে পান কৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত ও গন্ধবনিক। বাংলা একাডেমি পুরস্কার সহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।
আল মাহমুদ দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেকগুলো দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেছেন তিনি। পাকিস্তান আমলে দৈনিক ইত্তেফাকের মফস্বল বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন আল মাহমুদ। স্বাধীনতার পর দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন আল মাহমুদ। কবি আল মাহমুদের সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ ছিল। সারা বিশ্বের বাংলাভাষী মানুষ কবি আল মাহমুদকে বর্তমান সময়ের প্রধান কবি মনে করেন। দেশীয় সংস্কৃতিকে তাৎপর্যময় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে তার অবদান ছিল অপরিসীম। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, গীতিকার হিসেবেও তিনি ছিলেন ঈর্ষনীয় উচ্চতায়। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য কারাবরণ করতেও তিনি দ্বিধা করেননি। সংবাদপত্রে তাঁর ক্ষুরধার কলম ছিল অসহায় উৎপীড়িত মানুষের মনের ভাষা। তিনি ছিলেন কালজয়ী মানুষ। বাংলা সাহিত্য যতদিন থাকবে কবি আল মাহমুদও ততদিন প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন।
সমাজবাদী চিন্তা চেতনা আল মাহমুদকে সমাজবাদের সৈনিক হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। এক কবি লিখেছিলেন সবাই কবি নন, কেউ কেউ কবি। আল মাহমুদ সত্যিকারের কবি হতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন এক অনন্যসাধারণ কবি, যার ছিল নিজস্ব ভাষারীতি। কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারের জন্য তাঁকে চেনা যায় আলাদাভাবে। সোনালী কাবিন তাঁর এমন এক কাব্যগ্রন্থ যা বাংলাভাষার এক অবিস্মরণীয় সম্পদ হিসেবে থাকবে চিরকাল। এছাড়া লোক লোকান্তর, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতরের নদী সহ আরো অনেক কাব্য গ্রন্থ বাংলা কবিতাকে ঐশ্বর্যময় করে তুলেছে। চিলির বিপ্লবী কবি পাবলো নেরোদা কবিতাকে শান্তির ভাষা বলেছেন। কানাডার খ্যাতিমান কবি ও ঔপন্যাসিক লিওনার্দ কোহেন বলেছেন কবিতা হলো ¯্রফে জীবনের দলিল। বিংশ শতকের ইংরেজ কবি ক্রিস্টোফার ফ্রাই বলেছেন কবিতা হলো সেই ভাষা যেখানে মানুষ তার নিজের বিস্ময় আবিষ্কার করে। কবি আল মাহমুদ ও এধরনেরই একজন কবি ছিলেন।
জীবনকে কত বিচিত্রভাবেই দেখে থাকেন কবিরা। পাবলো নেরোদা জালাল উদ্দিন রুমি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও আল মাহমুদের কবিতা বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন। আল মাহমুদের কাব্য প্রতিভা ও কবিতার বিষয়বস্তুর কথা শেষ হওয়ার নয়। তাঁর মৃত্যু পরিণত বয়সে হলেও মনে হয় আরও দীর্ঘজীবন বেঁচে থাকলে দেশ ও সমাজ উপকৃত হতো। মহান আল্লাহর ঘোষণা প্রত্যেক আত্মা মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কিন্তু মানুষ ইচ্ছে করলে মৃতুঞ্জয়ী হতে পারে সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে। আল মাহমুদ তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতার দ্বারা বেঁচে থাকবেন দীর্ঘকাল। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন তোমাদের মধ্যে সৎকর্মে কে অগ্রগামী তা পরীক্ষার জন্যই তিনি মৃত্যুর ব্যবস্থা ও জীবন সৃষ্টি করেছেন। কবি আল মাহমুদ তিনি তাঁর কর্মের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পেরেছেন বলে মনে করি। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT