সাহিত্য

কবি

এম, আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩৬:৪৪ | সংবাদটি ২৪১ বার পঠিত

কবি তাঁর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইটির প্রুপ রিডিং করছিলেন। কম্পিউটার অপারেটর আসাদ তার ডান হাতে থাকা মাউস টিপে টিপে একের পর এক পৃষ্ঠা বের করছিলেন আর এটা ওটা যোজন-বিয়োজন করে করে ফাইনাল করছিলেন। দক্ষ কম্পিউটার অপারেটর মাঝে মাঝে শব্দ চয়ন নিয়ে দু’একটা মন্তব্য অথবা মুক্তিযুদ্ধের ফটোগ্রাফ কোথায় কিভাবে বসবে সেটাও কবির কাছ থেকে জেনে নিচ্ছিলেন। কবি খোলামেলা রসাত্মক আলাপ করে ইতোমধ্যে কাজের চাপটা হালকা ও উপভোগ্য করে নিয়েছেন। কিছু কাজ আগানোর পরেই সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। তিনি বয়সে সিক্সটি আপ হলেও কথাবার্তায়, কবিতায়, শিল্প মননে এখনও তরুণ। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে যে কেউ অতি পরিচিত হয়ে ওঠে। আসাদও তাই এরই মধ্যে গুরুগম্ভীরতা ছেড়ে খোশ মেজাজে কবির সঙ্গ দিচ্ছেন।
আসাদের পরামর্শ মাঝেমধ্যে কবির কাছে বেশ মনঃপুত হচ্ছে। আর তাই তিনি খুশি হয়ে দু’একটা প্রস্তাবও দিতে ভুলছেন না। এই যেমন বাবা আসাদ বিয়ে করছ?
-জ্বী না।
-বেশ ভালোই হয়েছে। আমার একটা ভাগনি আছে। এক পা খোড়া আর চোখে দেখে কম। তোমার কাছে বিয়ে দিয়ে দেব। এতে সুবিধা অনেক। তোমাকে বেশি জ্বালাবে না। তুমি যদি একটু হ্যাংকি প্যাংকি কর তাও সে কিছু দেখতে পাবে না। আর যদি তুমি ওকে পছন্দ না কর তাইলে এটি বাদ।
-আঙ্কেল এই শব্দটি কী হবে? আসাদ প্রসঙ্গ ঘুরাতে প্রশ্ন করে। কিন্তু কবি বললেন- আরে রাখো তোমার শব্দ। আমার কথা এখনও শেষ হয়নি।
-শোন বাবা- আরেকটা ভাগনি আছে.... দূর সম্পর্কীয়। ও সুন্দরী। কিন্তু একটু সমস্যা আছে। তোতলামির দোষ আছে। তবে এটাও ভাল হবে। যখন সে তোমাকে কিছু বলতে যাবে তখন ওর কথা শেষ হতে না হতেই তুমি বন্দরবাজার চলে যেতে পারবে।
-আসাদ লজ্জিত উচ্চারণে বলল- কীভাবে?
-এই তো ধরো শাড়ি কেনার জন্য বায়না ধরবে। তখন ওর মুখ থেকে শাড়ি উচ্চারণ করতে যাবে। কিন্তু সহজে সেটা বলতে পারবে না। সে বলবে এরকম......আ...... মার...... জন্য..... এ...কটা.... শা.....ড়ি.... শাড়ি শব্দটি সমাপ্ত হতে হতে তুমি বন্দরবাজার চলে যাবে। ও বলতেও পারল না আর তুমি শাড়ি না কিনেই বেঁচে গেলে। এখানে উপস্থিত অন্যান্য অপারেটর, প্রকাশক, কবি সাহিত্যিকরা হো হো করে হেসে উঠলেন। কবি বললেন- বাবা আসাদ আমি ডাইবেটিসের প্যাশেন্ট। কিছু খেতে হবে। ওসমানী এদিকে এসো। (অন্য অপারেটর) আমার জন্য নান রুটি আনো। বড় দেখে তিনটা আনবে। আজ ইনস্যুলিন একটু বেশি নিয়ে ফেলেছি। কাজেই শরীরে চিনি কমে গেছে। চিনিসহ লাল চা তৈরি কর। ওসমানী ওর কাজে লেগে গেল।
কবি শাহ জালালনগরী। সাহিত্যিক সাংবাদিক, ব্যাংকার, সমাজ হিতৈষী সর্বোপরি উঁচু মানের একজন লেখক। বই এর সংখ্যা শততম ছাড়িয়ে গেলেও প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা একত্রিশটি। বত্রিশ নাম্বারে কাজ চলছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোক। নিজেও মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধকে তিনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন। তাই নিজের দেখা ইতিহাস রোমন্থন করে স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখা লিখে যাচ্ছেন তিনি। এখন তার বয়স পয়ষট্টি। কিন্তু গেটআপ দেখে মোটেও বুঝার উপায় নেই যে এত বয়স হয়েছে তাঁর। এখনও প্রেমের কবিতা যুবতীদের আকৃষ্ট করে। তার কবিতা পড়ে অনেক সাহিত্যমনা মানসী খুঁজে ফেরে ঐ কবিমানস। খুঁজতে খুঁজতে অফিস পর্যন্ত ছুটে আসে। অল্প সময়ের মধ্যে এতসব গল্প করে ধূমপানের নেশায় ধরল তাঁকে। চট করে প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে সাথে সাথে ধরালেন সেটি। অবশ্য প্রকাশনা অফিসে সেটি টানলেন না। সিগারেট ধরিয়ে বেরিয়ে গেলেন। সিগারেট ফুঁকে শেষ করে আবারো তার জায়গায় এসে বসলেন। ততোক্ষণে তার একটু মেজাজ হালকা হয়ে গেছে।
ইতোমধ্যে এখানে উপস্থিত জনৈক নবীন লেখক জিজ্ঞেস করলেন- কবি সাব- আপনি জাসদের আখতার আহমদকে চিনতেন?
-হ্যাঁ চিনবো না কেন? উনি তো গহরপুরের লোক। উনি আমার নেতা ছিলেন।
-আর মহিউদ্দীন শিরু?
-ওহ হো...। ওতো আমার ক্লাসমেট ছিল। ও একজন ঝানু সাংবাদিক ছিল। আমিও তো সে সময়ের সাংবাদিক। দুর্ভাগ্য ওর মত একজন একনিষ্ট সাংবাদিক অকালে হারিয়েছি। আর হারাবেই বা না কেন? ওর ছিল হাইপ্রেশার। মানুষ হাইপ্রেশারের রোগীকে কবরেও টেবলেট দেয়। উঠলে যাতে টেবলেট খেয়ে আবারও ঘুমাতে পারে। আর ও তো টেবলেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। তাই তো সে স্ট্রোক করল। এতটুকু বলে থামলেন কবি।
ইতোমধ্যে ওসমানী নাস্তা নিয়ে এলে সবাই ভাগ করে খেতে চাইলে কবি বললেন আমাকে একটু বেশি দিতে হবে। কারণ ডায়াবেটিসের রোগী তো? বেশি খেয়ে ডাইবেটিস জিইয়ে রাখতে চাই। ভালই লাগে ডাইবেটিসের রোগী পরিচয় দিতে। একটা বড়লোক বড়লোক ভাব এসে যায়। কথাটি বলে নিজের জামার আস্তিন টেনে নড়ে চড়ে বসলেন তিনি।
নাস্তা শেষে চা খাওয়া শুরু করলেন। এতক্ষণে কাজ বেশ এগিয়েছে। নিজেকে একটু ঝেড়ে নিয়ে বললেন আরে এখন একটু কাজ থামান। আমার একটা গল্প শুনুন-
লেখক, প্রকাশক, কম্পিউটার অপারেটর সবাই কাজ বাদ দিয়ে তাঁর দিকে মনোযোগী হলেন।
কবি শুরু করলেন, আজ থেকে চল্লিশ কি পঞ্চাশ বছর আগের কথা। আয় ইনকাম কিছুই নেই। পাড়ার দোকান থেকে বাকী খেতে খেতে এখন আর বাকী দেয় না। আমাকে দেখলেই সিগারেটের বাক্স লুকিয়ে রাখে। সিগারেট চাইলেই বলে সিগারেট নেই। ডিম চাইলেই বলে চারটা ডিম আছে এগুলো বিক্রিত। এমনি যখন চলছিল তখন দেখতে দেখতে এলো শবে বরাত। একটি টাকাও পকেটে নেই। আমার এক মোল্লা মার্কা দোস্ত ছিল। ওরও পকেট গড়ের মাঠ। সারাদিন চিন্তা করতে করতে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম যে কোন ভাবে টাকা কামাই করতে হবে। মোল্লা আলী বেপারিকে বললাম এ্যাই তুই আমার সাথে আয়। ইতস্তত করতে করতে গেলাম সেই দোকানে। আমাদের দেখেই দোকানী ভাবল এই বুঝি বাকী চাইতে এসেছে। মুখটা কালো করে অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখল। আমি ডাকলাম- ও মাজন সাব। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উত্তর দিল কি ভাই?
-ভাই, আমাদের কিছু মোমবাতি আর আগর বাতি দিতে হবে।
-বাকী?
-হ্যাঁ তবে এই শবে বরাতের রাতে কথা দিচ্ছি দু’তিন ঘন্টা পর দিয়ে দিব। দোকানদার এক প্যাকেট মোমবাতি আর এক প্যাকেট আগর বাতি দিল।
সেকালে কনডেন্সডমিল্কের কালো পট ছিল। দুটো খালি পটে বালি ভর্তি করে আগর বাতি আর মোমবাতি জ্বালিয়ে আমার মোল্লা বন্ধুটিকে একটা অশ্বত্থ গাছের নিচে একটা ভাঙ্গা চৌকির উপর বসিয়ে দিলাম। ও মুখ দিয়ে বলছে আমার শেখানো বুলি.... শাহ এশ বাবাজির দরগায় লিল্লাহ দিন.......। কিন্তু কেউ এদিকে আসছে না। হঠাৎ তিনজন পুলিশ উপস্থিত। পুলিশ দেখে মোল্লা বন্ধুটি কাঁপছে। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ পেল না। ওরা এসেই মোল্লাকে বলল- এখানে কি? ও বলল- শাহ এশ বাবাজীর দরগায় লিল্লাহ দিন।
-এখানে লিল্লাহ দিলে কি হয়?
-আরে ঐ দরগায় মোমবাতি, আগর বাতি রেখে আসতে না আসতেই ওগুলো আপনা-আপনি জ্বলে ওঠে।
-পুলিশ আর কথা বাড়াল না। পকেট হাতড়ে তিন টাকা পেল। বোধ হয় ঘোষের টাকা ছিল। ওগুলো দিয়ে দিল শাহ এশ বাবাজীর দরগায়। তখনকার সময়ে তিন টাকা কম নয়। এক টাকার বেশি ঘোষ দেয়া হত না। সেই তো শুরু। টাকা দেখে দেখে লোকেরা টাকা ফেলতে লাগল। রাত তিনটার মধ্যে প্রায় চল্লিশ টাকা রোজগার হলো। মোল্লাকে বললাম- এবার উঠ। অনেক হয়েছে।
কথামত দোকানদারের টাকা পরিশোধ করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। এবার আনন্দ ফূর্তির পালা। একটু সামলে এগুতেই পেলাম পরিচিত এক রিকশা ড্রাইভার। ওকে দু’টাকা দিয়ে বললাম- যা নাস্তা করগে আর রিকশাটা আমাকে দে। মোল্লাকে রিকশায় তুলে আমি রিকশা চালিয়ে চলে গেলাম নামকরা হোটেলে। ইচ্ছেমত বিরিয়ানী খেতে খেতে বিল হল বিশ টাকা। বিল মিটিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
কবির গল্প শেষ হতে না হতেই প্রকাশক বললেন- স্কুল থেকে বাচ্চা আনতে হবে- আমি গেলাম। ততক্ষণে কবির ফোন বেজে উঠল। ফোন উঠিয়েই বললেন- খুব খুশি হয়েছি আপনার ফোন পেয়ে। মনে হচ্ছে আজ ম্যারেজ ডে। আজ বাসায় এসে একশোটা চুমু দেবো। ফোন রেখেই বললেন- বুঝলেন? আমার ওয়াইফ। উনি ফোন ধরেন না। ফোনটা সাথে সাথে উঠানোর জন্যই মূলত এই ব্যবস্থা। সকলে হেসে উঠলে তিনি বললেন হাসবেন না, হাসবেন না। আমি আগামী ২৮ তারিখে পঁয়ষট্টিতে পা দেব। কিন্তু এই দুনিয়াতে বয়স বলতে কিছু নেই। ফূর্তিতে থাকো? মন এমনিতেই ভালো থাকবে।
অনেকক্ষণ পর আসাদ এবার মুখ খুললেন।
-তাহলে আংকেলের জন্মদিন পালন করতে হবে?
-হ্যাঁ, হ্যাঁ তাতো অবশ্যই। ঘটা করে পালন করতে হবে। সেই সাথে একটা জিনিস করতে হবে।
-সেটা কি?
-জন্ম দিনের কেকটি কাপনের কাপড় দ্বারা মোড়াতে হবে?
-কেন?
-কারণ জন্ম নিলেই তো মৃত্যুবরণ করতে হয়।
আমার জন্য তো এখন মৃত্যু অপেক্ষা করছে।
এত আনন্দের মাঝেও এলো বিষাদের ছায়া।
এই ফাঁকে নবীন লেখক কবির কাছ থেকে বিদায় নিলেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT