সাহিত্য

সঞ্জয় করের লাল সবুজের ফেরিওয়ালা

কৃষ্ণ দাস রায় প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৩-২০১৯ ইং ০০:৪৪:৪৫ | সংবাদটি ২০২ বার পঠিত


লাল সবুজের সাথে বাঙালির পরিচিতি অনেক কালের। বাংলাদেশের সবুজ জমিন অনেকবার লাল রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জন, প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের স্বজনদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এদেশের সবুজ জমিন। লাল সবুজ মিশে আছে আমাদের ভাষায়, আমাদের স্বাধীনতায়, আমাদের পতাকায়, আমাদের প্রকৃতিতে। বুকের তাজা রক্তের লাল, ভোরের সকালের রক্ত রাঙ্গা সূর্যের লাল রঙ, বসন্তের শিমুল কিংবা পলাশের রঙও লাল। আর দিগন্ত জোড়া সবুজ ফসলের মাঠ, সবুজ প্রান্তর, সবুজ বনানী সততই আমাদের মনকে নাড়া দেয়। লাল সবুজের এই মিত্রতা প্রতিটি বাঙ্গালীকে আন্দোলিত করে। হয়ত এই মিত্রতা থেকেই সঞ্জয় কর ‘লাল সবুজের ফেরিওয়ালা’ নামে একটি গল্প গ্রন্থ লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।
‘লাল সবুজের ফেরিওয়ালা’ সঞ্জয় করের একটি গল্পগ্রন্থ। শিশুকিশোরদের নিয়ে লেখা এগারটি ছোট গল্প স্থান পেয়েছে এই গল্পসংকলনে। অধিকাংশ গল্প স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও কিছু কিছু পরিবর্তন পরিবর্ধন করে বইটিতে উপস্থাপন করেছেন। একটি গল্প থেকে অন্য গল্প সম্পূর্ণ আলাদা। গল্পগুলো সহজÑসরল ভাষায়, সাদামাটা, নিজস্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে। কুসংস্কার কিভাবে মানুষের মনে বাসা বাঁধে তা তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাবার চেষ্টা করেছেন। প্রতিটি গল্পের মাধ্যমে তিনি কিছু বার্তা শিশুকিশোরদের দেয়ার চেষ্টা করেছেন ।
প্রথম গল্প ‘লাল সবুজের ফেরিওয়ালা’ গল্পের নায়ক একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বাংলাদেশের পতাকা ফেরি করে বিক্রি করেন। বাঁশের আগায় পতাকা ঝুলিয়ে কাঁধে ঝুলন্ত ব্যাগে মুক্তিযুদ্ধের ছবি, লাল সবুজ ক্যাপ, জাতীয় পতাকার স্টিকার, জাতির জনকের ছবি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফেরি করে থাকেন। তিনি শিশুদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প, ভাষা আন্দোলনের গল্প শুনাতে ভালবাসেন। লেখক ফেরিওয়ালার মাধ্যমে দেশের শিশুকিশোরদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শোনাতে প্রয়াসী হয়েছেন।
গৃহস্বামীর ঘর থেকে প্রতিদিন মিষ্টি চুরি হচ্ছে অথচ মিষ্টি চোরকে কোন ভাবেই ধরা যাচ্ছে না। বাড়ীর বর্তমান মুরব্বি জলিল মিয়া চোর ধরতে এক সন্ন্যাসীর শরণাপন্ন হলেন। বিভিন্ন ছলচাতুরী করে সন্ন্যাসী তার কাছ থেকে অনেক টাকা হাতিয়ে নিলেন। কিন্তু সমস্যার সমাধান না হওয়ায় এবং অনেক টাকা পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় কিপ্টে বুড়ো মনোকষ্টে আছেন। অবশেষে সমস্যার সমাধান করতে ছোট মামা সাজু মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন। পরবর্তীতে দেখা গেল ভাগ্নি কচি ওই চুরির প্রধান আসামী। মিষ্টি ওর খুবই পছন্দ তাই এই কর্ম সে করেছে। মিষ্টি নিয়ে সৃষ্টি কান্ড গল্পের ঘটনাটা ঠিক এ রকমই। এই গল্পে লেখক দুটি বার্তা দিয়েছেন প্রথমটি মিষ্টি জাতীয় খাবার বেশি খেলে দাঁতে ক্যাভিটি হয় এবং ডায়বেটিস রোগীর মিষ্টি খাওয়া উচিত নয়। বার্তা দুটি যদিও অনেকেরই জানা তবুও গল্পের মাধ্যমে জানালে ছোটদের অনেক দিন মনে থাকবে বলে আমি মনে করি।
অনুতপ্ত মন গল্পে আমরা দেখতে পাই, গল্পের নায়ক ‘মন’ পথিকদের ঢিল ছুড়ে রক্তাক্ত করে আনন্দ পেত। ঘটনাচক্রে একদিন তার বাবা তারই ছোড়া ঢিলে আহত হলেন। বাবার মাথা থেকে রক্ত বেরুতে দেখে নিজের ভুল বুঝতে পারল মন। বিবেকের আদালতে অপরাধী মন খুবই অনুতপ্ত হয়। একটি সার্থক গল্প অনুতপ্ত মন। কোমলমতি শিশুকিশোরদের মনে অপরাধ করা থেকে বিরত রাখতে অনেকটা সাহায্য করতে পারে এই গল্পটি।
বাড়ীতে না বলে রব্বানী শীত মেলায় গিয়েছিল। অনেক কিছুর সাথে মেলা থেকে আনা বাঘের মুখোশ পরে সে রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতে হাঁটছিল তাড়াতাড়ি বাড়ী ফেরার জন্য। অনেকক্ষণ মুখোশ মুখে থাকায় অস্বস্তি লাগছিল বলে মুখোশ খুলতেই সে লক্ষ্য করল লোকজন তাকে দেখে ভয় পাচ্ছে। কেউ আল্লাহু আল্লাহু বলে জিকির করছে, কেউবা দুর্গা দুর্গা বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে সবাই। ভাবনায় পড়ল সে, বাঘের মুখোশ দেখে ভয় পাবার কথা, অথচ তাকে দেখেই সবাই ভয় পাচ্ছে! যাই হোক মুখোশ মুখে দিয়েই সে বাড়ীতে ঢুকল। বাড়ীতে ঢুকে সে বিস্মিত হয়ে গেল। কল্পনা করতেও পারল না তার সামান্য ভুলের জন্য কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল পরিবারের। রব্বানী যখন বাড়ীতে না জানিয়ে শীত মেলায় ছিল তখন তার বাড়ীর পাশ দিয়ে চলে যাওয়া বিশ্ব রোডে তার বয়সি, দেখতে তারই মত একজন ট্রাক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা লাশটি পুলিশ কাউকে দেখতে দিচ্ছে না। লোকজন অনুমান করেছে নিহত ছেলেটি রব্বানী। বাড়ীর একমাত্র ছেলে আজ মৃত, বাড়ীতে কান্নার রোল পড়ে গেছে, রব্বানীর বাবা হাউমাউ করে কাঁদছেন, মা নেহারুন নেছা স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তখন রব্বানী বুঝতে পারে তাকে রব্বানীর আত্মা ভেবে সবাই ভয় পেয়েছিল। এই হলো ভুলের মাশুল গল্প। ছেলের একটু ভুলের জন্য পুরো পরিবারটির অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। এই গল্প যদি শিশুকিশোরদের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, তবে কি তারা কখনও এরূপ ভুল করবে? পাঠক আপনিই বিচার করুন।
এ রকম প্রতিটি গল্পেই আছে শিশুকিশোরদের জন্য নানা রকম শিক্ষামূলক উপদেশ। যা অত্যন্ত সহজ সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করেছেন লেখক। বর্তমান সময়ে শিশুকিশোররা মোবাইল, আইপ্যাড, লেপটপে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এই আসক্তিতে যে লেখাপড়ার বিবিধ ক্ষতি হচ্ছে তা ‘মনীষার শিক্ষা’ গল্পে দেখতে পাই। মনীষা কিছুদিন হয় ওর আইপ্যাডটি খুঁজে পাচ্ছে না। সে নিয়মিত ইন্টারনেট ব্রাউজিং করত, গেম খেলত, কার্টুন ডাউনলোড করত। শুধু সে নয় বান্ধবী সৈতি বাড়ীর কাজের মেয়ে লটকনী আইপ্যাডে আসক্ত। যাহোক আইপ্যাড খুঁজে না পাওয়ায় মনীষা লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করল। মনীষার সমাপনী পরীক্ষার রেজাল্ট বের হল, ভালো রেজাল্ট করেছে সে। মনীষার ছোট মামা রেজাল্টের খবর শুনে মিষ্টি নিয়ে এলেন। সাথে নিয়ে এলেন রঙিন কাগজে মোড়া আরও একটি প্যাকেট। প্যাকেটটি তিনি মনীষার হাতে তুলে দিলেন। প্যাকেট খুলে মনীষা আশ্চর্য্য হয়ে বলল মামা তুমিই কি আইপ্যাড চুরি করেছো! ভাগ্নির আইপ্যাড নিয়ে অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়েছে, এভাবে পড়ে থাকলে লেখা-পড়া হবে না, অন্যান্য সৃজনশীল কাজও হবে না, তাই মামা এ কাজটি করেছেন। আর মনীষার দাদু কর্তৃক আমদানী করা কবিরাজ চোর ধরতে কি ধরনের তুকতাক করেছেন তা গল্প পড়েই জানা যাবে। এগারটি গল্প মানে এগারোটি চমক। প্রতিটি গল্পই সাবলীল, সহজবোধ্য, যা পড়লে শিশু-কিশোরদের সাথে মা বাবা সহ বড়রাও সমান আনন্দ পাবেন।
‘লাল সবুজের ফেরিওয়ালা’ গল্পের ভূমিকায়, দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক জনাব আবদুল হামিদ মানিক লিখেছেন ‘শিশুকিশোরদের জন্য লিখতে পৃথক শৈলী থাকতে হয়। ভাষা এবং কাহিনী দুটোতেই পৃথক মেজাজ বজায় রাখতে হয়। সঞ্জয় কর এ ক্ষেত্রে সফল এবং সার্থক হয়েছেন, পাঠক হিসেবে নির্দ্বিধায় এ কথা বলতে পারি। বইটি যারা পড়বেন, আমার সঙ্গে তাঁরা একমত হবেন। এ বিশ্বাস আমার আছে। ‘লাল সবুজের ফেরিওয়ালা’ এর গল্পগুলো রহস্যমাখা স্বাদে ভরপুর। গ্রামীণ সংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, জ্বিন-ভূত ভিত্তি করে গল্পগুলো রচিত। রহস্য এবং বাস্তব সমাধান বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতেই সঞ্জয় কর তুলে ধরেছেন প্রায় প্রতিটি গল্পে। পড়তে শুরু করলে শেষ না করে পাঠক স্বস্তি পাবেন না। গল্পকারের এ ক্ষেত্রে দক্ষতা প্রশংসনীয়। গ্রামাঞ্চলে লোকবিশ্বাস এবং অহেতু ভূতপ্রেতের ভীতি আধুনিক যুগে হয়তো অতীতের মত নেই। কিন্তু সহজ সরল ভাষায় গল্পের আঙ্গিকে সঞ্জয় কর সেই ইতিহাস ধারন করেছেন।’
একুশে গ্রন্থমেলায় সপ্তবর্ণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থের প্রচ্ছদ করেছেন খ্যাতিমান চিত্র শিল্পী ধ্রুব এষ, অলংকরণে আছেন বিশ্বজিৎ আচার্য্য রন্টু। ৭৫ পৃষ্টার ঝকঝকে ছাপার এই বইটির মূল্য মাত্র ১৮০ টাকা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT