সাহিত্য

পাগলী

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৩-২০১৯ ইং ০০:৪৫:২৯ | সংবাদটি ৬৭ বার পঠিত

বছরখানেক আগে পির সাব এসেছিলেন রোকেয়াদের বাড়িতে। মঞ্জিলা বিবির সাথে এখানেই পরিচয়। পরিচয়ের পর থেকে মঞ্জিলা বিবি যেকোনো পরামর্শের জন্য পির সাবের সঙ্গে মোবাইলে আলাপ করে। সে প্রায়ই পির সাবকে মিনতি করে বলে তাদের গ্রামে আসতে। ব্যস্ততার কারণে পির সাব আসতে পারেন না। তিনি পির মানুষ, তাঁর একটা নিজস্ব রুটিন আছে, মঞ্জিলা বুঝে। কিন্তু তারও যে অনেক কথা জমে আছে পির সাবকে বলার জন্য। শুধু মঞ্জিলার নয়, এই গ্রামে আরো অনেকের একই অবস্থা। সবাই ফোনে পির সাবকে একবার ঘুরে যাওয়ার জন্য বলে। পির সাব তাঁর রুটিনমাফিক বছরখানেক পর একদিন রোকেয়াদের বাড়িতে ভক্তশিষ্য সঙ্গে নিয়ে হাজির। পির সাবকে দেখতে গ্রামের অনেক ভক্তশিষ্য এলেও মঞ্জিলার কোনো খবর নেই। সকাল গিয়ে দুপুর। দুপুর গিয়ে সন্ধ্যা হয়, মঞ্জিলা আসেনা। পির সাব ক’বার রোকেয়ার কাছে মঞ্জিলার খবর নিলেন। রোকেয়া জানালো খবর দিয়েছে, মঞ্জিলা আসবে। কিন্তু পির সাব আশ্চর্য হলেন যখন দেখলেন সন্ধ্যা হয়ে গেলো, তব্ওু মঞ্জিলা বিবি এলো না।
মাগরিবের নামাজের পর পির সাব বিছানায় বসে ভক্তশিষ্যদের সঙ্গে কথা বলছেন, এমন সময় হাউমাউ করে কেঁদে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে মঞ্জিলা। সে চোখ মুচতে মুচতে বলে, বাবা, আমারে মাফ কইরা দেন বাবা। আমি বিপদে আছি। বাবা আমারে রক্ষা করেন।
পির সাব মঞ্জিলার উপর রেগে ছিলেন বলে তার দিকে তাকালেন না। নবীয়ে করিম (স.) কারো উপর রাগলে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। পির সাব তো নায়বে নবী, তিনিও তাই করলেন। মঞ্জিলা কাঁদতে থাকলো। তার হাউমাউ কান্নায় পির সাব কষ্ট অনুভব করলেন। এবার মঞ্জিলাকে কাছে ডেকে জানতে চাইলেন কী হয়েছে? মঞ্জিলা পির সাবের পায়ে হাত রেখে বলে, বাবা আমার নাতিনটারে বাঁচান। বাবা তারে জ্বীনে ধরছে। আমার নাতিনটারে তার ফুফু যাদু কইরা ফালাইছে। বাবা আমার নাতিনটারে বাঁচান।
পির সাব মঞ্জিলার মাথায় হাত রেখে জানতে চাইলেন, জ্বীন ধরেছে এই কথা বুঝলে কেমন করে? মঞ্জিলা কাঁদতে কাঁদতে বলে, এক পির সাব কইছেন। পির সাব আবার জানতে চাইলেন, তবে যাদুর কথা কে বলেছে? মঞ্জিলা বলে, একজনই।
পির সাব মনে মনে হাসেন। মঞ্জিলারা কতই না সরল, তাকে একজন পির সাব বলেছেন জ্বীনে ধরেছে, ফুফু যাদু করেছে, আর সেও বিশ্বাস করে নিয়েছে! পির সাব কিছুই বললেন না, মঞ্জিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাতিন কোথায়? মঞ্জিলা বলে বাড়িতে। পির সাব বললেন, যাও, নিয়ে এসো।
শীতের রাত। তখন প্রায় সাতটা। মঞ্জিলা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ঘন্টাখানেক পর সে তার নাতিনকে নিয়ে ফিরে আসে। মঞ্জিলার নাতিনের কোমর লোহার বড় শেকলে বাঁধা। শেকলের এক মাথায় ধরে আছে মঞ্জিলা। সাথে আছে বেশ কিছু তামিশগির।
পির সাব মঞ্জিলার কাছে জানতে চাইলেন, শেকল দিয়ে একে বেঁধে রেখেছো কেনো? মঞ্জিলা বলে, বাবা, সে তো পাগল, পালিয়ে যায়। পির সাব ধমক দিয়ে বললেন, পাগল বলতে কিছু নেই। পাগলামি হলো অন্য রোগের অনুসঙ্গ। তাকে ছেড়ে দাও। সে আর যাবে না। মঞ্জিলা পির সাবের দিকে দৃষ্টিপাত করে আশ্চর্যের সুরে বললো, সত্যি কি ছেড়ে দেবো? যেনো ছাড়লেই বিশাল কিছু ঘটে যাবে। পির সাব বললেন, হ্যাঁ ছেড়ে দাও।
মঞ্জিলা তার শাড়ীর মাথা থেকে চাবি বের করে নাতিনের কোমর শেকলমুক্ত করে দিলো। পির সাব মঞ্জিলার নাতিনকে ডেকে তাঁর পাশে বসতে বললেন। মেয়েটা বসতে চাইলো না। পির সাব তার ব্যাগ থেকে চকোলেট বের করে মেয়েটির হাতে দিলেন। মেয়েটি চকলেট হাতে নিয়ে উলট-পালট করে দেখলো। তারপর চকলেটটা পির সাবের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললো, খাই না, আমারে যাইতে দেও। মেয়েটা চোখ ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দেখছে। সবাই তার পাগলামিতে মজা পাচ্ছে। পাগলকে কেন্দ্র করে চলছে হাসিতামশা। পির সাব সবাইকে বললেন, আপনাদের উচিৎ ছিলো তাকে ভালো হওয়ার জন্য সহযোগিতা করা। উল্টো তাকে পাগল সাজিয়ে মজা করছেন। আপনারা তাকে নিয়ে যে তামাশা করছেন তা অমানবিক।
মেয়েটি চলে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। পির সাব মেয়ের হাবভাব বুঝে তার হাত ধরলেন। তিনি মনে মনে সঙ্কুচিত হলেন, শরিয়তের আইন বিষয়ে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে এই সঙ্কুচ কেটে গিয়ে মন বললো, আইন দিয়ে রাষ্ট্র চলে, মানুষের মনের চিকিৎসা চলে না। মন নিয়ন্ত্রণ করতে হয় মন দিয়ে। সে তো মনের রোগী, তিনি মনের ডাক্তার। পির সাবের কাছে শরিয়তের আইন গৌণ হয়ে মানুষ রক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। সমাজের অনেকেই এই যুক্তি মানবে না। কিন্তু প্রাণ বাঁচাতে মরা গরুও খাওয়া জায়েজ, এই মানবিক নীতিতে শরিয়ত বিবেচনায় আনতে হবে, পির সাব মনে করেন। পির সাব ঘন্টাখানেক ধরে মেয়েটির হাত ধরে বসে থাকলেন। মেয়েটিও ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকলো। এক সময় কথা বন্ধ করে সে শুধু নীচের দিকে তাকিয়ে রইলো। পির সাব তাকে কথা বলাতে চাইলে সে শুধু বলে, আমারে ছাইড়া দেন, আমি যাইমুগা, হে আমার লাইগা বাইরে দাঁড়াইয়া আছে।
পির সাব জানতে চাইলেন, হে কেডা? মেয়েটা উত্তর দেয় না। পির সাব অনেক চেষ্টা করেও যখন অন্য কোন তথ্য বের করতে পারছেন না, তখন তিনি বিছানায় গা হেলিয়ে চোখবন্ধ করে কী যেনো ভাবলেন। মেয়েটির হাত তার হাতের মধ্যে তখনও। পির সাব চোখ খুলে মঞ্জিলার দিকে তাকালেন। মঞ্জিলা দু’হাত জোড় করে এমন ভঙ্গি করলো, যেনো সে বলতে চাচ্ছে, বাবা আমার নাতিনকে বাঁচান। পির সাব আবার চোখ বন্ধ করে থাকেন। দীর্ঘ সময়। পুরো সময়ই তার চোখের সামনে মঞ্জিলার চোখের জল আর মুখের আকুতি ‘বাবা আমার নাতিনকে বাঁচান’ ভাসতে থাকে।
এদিকে পির সাবের ভক্তরা মাটিতে খড় বিছিয়ে বিছানা করে বসে জিকির শুরু করলো। পির সাব হঠাৎ অনুভব করেন মেয়েটা কাঁপছে। এই কম্পন কিসের? পির সাব ভাবিত হলেন। তবে শীতের বিষয়টাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি তার নিজের চাদরটা মেয়ের গায়ে জড়িয়ে দিলেন। মেয়েটি চোখ তুলে একটা মুচকি হাসি দিলো। পির সাব জানতে চাইলেন, তোমার নাম কী? সে বললো, স্বর্ণালী। পির সাব বলেন, বাহ, খুব সুন্দর নাম তো। তোমার সমস্যা কী, বলো তো? স্বর্ণালী বলে, কিছুই না।
পির সাব লক্ষ করলেন স্বর্ণালী এখন একটু একটু কথা বলছে। তবে মাঝে মধ্যে বলছে আমাকে যেতে দিন, সে অপেক্ষা করছে।
রাত তখন একটা। শীতের মধ্যরাত। পির সাব স্বর্ণালীর দিকে চেয়ে বললেন, তুমি এখন তো কোথাও যেতে পারবে না। আগামীকাল সকালে যেখানে ইচ্ছে যাও। আর হ্যাঁ, এখন আমি ঘুমিয়ে যাচ্ছি। তুমি চলে যেতে চাইলে যেতে পারো। স্বর্ণালী বলে, তুমি ছুট্টি না দিলে আমি যাইমু না। জায়গা দিলে এইখানে থাইক্কা যাইমু। পির সাব স্বর্ণালীর কাছে জানতে চাইলেন, তুমি কি আমারে প্রেম কইরা ফালাইতাছ? স্বর্ণালী মুচকি হেসে মাথা নীচু করে। পির সাব বুঝলেন স্বর্ণালীর অন্তরে ‘ফানা-এ-শায়েখ’ এসে গেছে। এখন তাকে সামনে নিয়ে যেতে হবে। তিনি স্বর্ণালীকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আমার সাথে জিকিরের মাহফিলে বসবে? সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। পির সাব বিছনা ছেড়ে তাকে নিয়ে মাহফিলের মধ্যে গেলেন।
দীর্ঘ এক ঘণ্টা স্বর্ণালী জিকিরের মধ্যে থাকলো। জিকিরের মাহফিল ভাঙলো রাত তিনটায়। সবার চোখে ঘুম। গোপনে গোপনে সবাই ঘুমের প্রস্তুতি নিতে থাকলে পির সাব সবাইকে ঘুমানোর অনুমতি দিলেন। আস্তে আস্তে সবাই ঘুমিয়ে গেলো। জেগে থাকলেন শুধু পির সাব, মঞ্জিলা ও তার নাতিন স্বর্ণালী। নাতিনটাও এক সময় ঝিমাতে ঝিমাতে পির সাবের বিছানায় ঘুমিয়ে যায়। পির সাব একটা চাদর আর কিছু কাপড় স্বর্ণালীর উপরে দিয়ে নিজেও ঘুমানোর চেষ্টা করলেন। মঞ্জিলাও ইতোমধ্যে ঘুমিয়ে গেলো। কিন্তু ঘুম হলো না শুধু পির সাবের। একটা জিন্দা যুবতীকে নিজের বিছানায় ঘুমাতে দিয়ে পির সাব ভাবতে থাকেন উচিৎ হলো কি? তার এক মন বলতে থাকে, এটা তো মেয়ে নয়, সে তো মানসিক রোগী। অনুচিতের কিছু নেই। বরং এটাই মানবিক। আরেক মন বলছে, আমাদের সমাজ কিংবা আইনের তো অন্তঃর্দৃষ্টি নেই, তারা যদি দেখে, তবে কি সহজে মেনে নেবে? এই সব ভাবতে ভাবতেই ফজরের আজান হয়ে যায়। পির সাব উঠে অজু করে নামাজ পড়েন। মেয়েটির জন্য আল্লার কাছে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মাওলা, আমার কোন শক্তি বা ক্ষমতা নেই। তুমি সর্বশক্তিমান। গরীবের মেয়েকে একটু রক্ষা করো।
সকাল আটটার দিকে মেয়েটি ঘুম থেকে জাগে। আশ্চর্য হয়ে সে পির সাবকে দেখতে থাকে। দেখতে থাকে সে পির সাবের বিছানায় যে ঘুমিয়ে ছিলো। পির সাব স্বর্ণালীকে বললেন, যাও মুখ পরিষ্কার করে এসো। সে একাই গিয়ে মুখ পরিষ্কার করে আসে। পির সাবের যাবার সময় হয়ে গেছে। মঞ্জিলা কাঁদতে কাঁদতে বিদায় চায়। মঞ্জিলার বিদায়ের কান্না প্রথম কান্না থেকে ভিন্ন। এই কান্না মূলত নাতিনের সুস্থতার খুশিতে। মঞ্জিলার সাথে স্বর্ণালীও পির সাবের কাছে বিদায় চায় বাড়ি যেতে। পির সাব তাকে বিদায় দিলেন। যাওয়ার সময় মঞ্জিলা তার শাড়ীর পাড় থেকে কিছু টাকা বের করে পির সাবের হাতে দিয়ে বলে, বাবা দোয়া কইরেন। পির সাব ধমক দিয়ে বলেন, আমি দোয়ার ব্যবসায়ী না। এখানে দোয়া বিক্রি করতে আসি নাই। তোমার টাকা তোমার কাছে রেখে আমার জন্য দোয়া করতে থাকো। আমি নিজেও দোয়ার মুখাপেক্ষী।
মঞ্জিলা এবং স্বর্ণালী বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। বাকি সবাই একবার তাদের দিকে তাকায় এবং আরেকবার পির সাবের দিকে। পির সাব যখন রোকেয়াদের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে গ্রাম ছাড়তে জমিনের মেঠোপথে হাঁটছেন, তখন বিভিন্ন বাড়িতে মানুষ দাঁড়িয়ে পির সাবের বিদায় দেখছে। পির সাবের কাফেলার রাহবার পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দূরের একটি বাড়ির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে যখন কাফেলা অন্য রাস্তায় ঘুরে যাচ্ছে, তখনই একজন পির সাবকে বললো, হুজুর পাগলিটা আবার আসছে। পির সাব চেয়ে দেখলেন, স্বর্ণালী দৌঁড়ে তার দিকে আসছে। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন।
স্বর্ণালী খুব দ্রুত কাছে আসে এবং পির সাবের পা জড়িয়ে বলে আপনি কি যাইতাছেন গা? আপনি না কইলেন আমারে সাথে নিয়া যাইবেন? পির সাব মুচকি হেসে বলেন, তুমি যদি পাগল থাকতে, তবে ঠিকই লইয়া যাইতাম। অহন আর নেওন যাইবো না। স্বর্ণালী মুচকি হেসে বলে, আমি অহন আবার পাগল হইলে তো নিবা? তাইলে আমি আবার পাগল হইয়া যাইমু। পির সাব মাথা নেড়ে মুচকি হেসে বলেন, হ্যাঁ নিমু। কিন্তু লোকে যে আমার নিন্দা করবো অহন আবার তুই পাগল হইলে। লোকে কইবো মাইয়া গো, পাগলা পির মাইয়ারে যাদু কইরা নিয়া গেছে গা। স্বর্ণালী দু’ হাত নেড়ে বলে, তাইলে থাক, তাইলে থাক, তোমার নিন্দা হইলে আমার যাওন লাগবো না। দোয়া কইরো। আমার দিকে নজর রাইখো। ওগো মুর্শিদ! আমি তোমার নজরের ভিখারী।
পির সাব সামনের দিকে হাঁটতে থাকেন। আর পিছনে অনেক মানুষের সাথে স্বর্ণালি মাটিতে হাঁটু গেড়ে পির সাবের দিকে চেয়ে থাকে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT