মহিলা সমাজ

৪৮ বছর পর

সাজিয়া স্নিগ্ধা প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩৯:৪৭ | সংবাদটি ১৬৯ বার পঠিত

দীর্ঘ ১০ বছর যাবত শহীদ পিতার একখানি ছবি পাওয়ার আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী জামাল আহমেদ খান। ছয় ভাই এক বোনের মাঝে জামাল খান সকলের ছোট। অন্য ভাইরা ব্যর্থ হয়ে এক সময় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। বুধবার ২৭ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘদিনের সে স্বপ্ন সফল হলো একজন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে জামাল খানের পিতা শহীদ নুরুল হক খান (ব্যাচ নং-১০১২৮) ইপিআরে (বর্তমান বাংলাদেশ রাইফেলস) কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদস্যরা। গর্ভবতী স্ত্রীকে দেখতে নুরুল হক খান তখন ছুটিতে বাড়ি ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ডাকে আর আটকে থাকতে পারেননি ঘরে। গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে একাত্তরের এপ্রিল মাসে বেরিয়ে যান বাড়ি থেকে। এরপর নুরুল হক খানের আর কোন খবর নেই। দেশ স্বাধীন হয়। মুক্তিযোদ্ধারা ঘরে ফিরে আসতে শুরু করে। ইপিআরের অফিসাররাও অনেকে ফিরে আসতে শুরু করে কিন্তু নুরুল হক খান আর ফিরে আসে না। অপেক্ষাতেই জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জামাল খানের জন্ম হয়। পরিবারের সদস্যরা খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে একেক রকমের খবর পায়। কেউ বলেন, নুরুল হক খান গ্রেফতার হয়েছেন পাক আর্মির হাতে। কেউ বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছেন। খুঁজতে খুঁজতে পরিবারের সদস্যরা যখন ক্লান্ত তখন তৎকালীন বিডিআর সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, নুরুল হক খান মিশে আছেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটির বুকে। সিলেট ক্যাডেট কলেজের ভেতরে একটি গণকবরে সমাহিত আছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে একাত্তরের ৫ মে শহীদ হয়েছেন।
শহীদ নুরুল হক খানের মৃত্যুর ৮ মাস পরে জামাল খানের জন্ম হয় ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে। জন্মের পর হারানো বাবাকে খুঁজে ফিরে ছোট্ট জামাল। মায়ের কাছে প্রতিদিনের প্রশ্ন, সবার বাবা আছে আমার বাবা নেই কেন? বাবা আসবে কবে? বাবা কি আমাকে ভালবাসে না? আমি বাবার কাছে যাব? বাবা দেখতে কেমন? ছবি কই? হাজারো প্রশ্নে মা রাজিয়া বেগম ছোট্ট জামালকে ভুলিয়েছেন বাবার গল্পে। শুনিয়েছেন বাবার বীরত্বগাথা গল্প। সিলেট ক্যাডেট কলেজের ভেতরের গণকবরে নিয়ে যেতেন সঙ্গে করে। দোয়া করতেন। বিজয় দিবস স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে জামালকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। কিন্তু বাবার মুখায়ব দেখার অদম্য ইচ্ছা জামালকে সবসময় ভাবাত। মায়ের কাছে বাবার কোন ছবি নেই। মায়ের চোখ দিয়ে বাবাকে আঁকত জামাল। রাগ হলে মনে মনে বাবার কাছে কত অভিযোগ করত। কিন্তু নেই কোন ছবি কোন স্মৃতিচিহ্ন। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন, এরপর মধ্য বয়সে এসেও জামালের অপেক্ষা, একবার যদি বাবার চেহারাটা কেমন ছিল তা জানতে পারতেন। এতদিন তিনি শুধু কল্পনায় এঁকেছেন বাবার অবয়ব।
জামাল খানের মা রাজিয়া বেগম মারা যান ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে। এবার জামাল বাবার ছবির চেষ্টায় দৌড়াতে থাকেন। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সহকর্মী সবার কাছেই খোঁজ করেন। কোথাও ছবি মেলে না। ‘বাংলাদেশ রাইফেলস’র পুরনো নথিতে বাবার একখানা ছবি যদি পাওয়া যায় এ আশায় চিঠি ও ই-মেইল প্রদান করতে থাকেন নিয়মিত। মুক্তিযোদ্ধা পিতার ছবি সন্ধানে সন্তান জামাল খানের সহযোগিতায় কাজে নেমে পড়েন স্টাডি সার্কেলের চেয়ারপারসন সৈয়দ মোজাম্মেল আলী এবং সাজিয়া স্নিগ্ধা। এ সময় বাংলাদেশ হাইকমিশনের লুতফুল হাসানও সহযোগিতার হাত বাড়ান। এ যেন আরেক যুদ্ধ। শহীদ সন্তান কি তার বাবার মুখখানি দেখবে না! সারাজীবন কি কল্পনায়ই থেকে যাবে শহীদ পিতা! সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দীর্ঘ অপেক্ষার পালা শেষে পিলখানা বিজিবি সদর দফতরে পুরনো নথি ঘেঁটে জামাল খানের পিতা শহীদ নুরুল হক খান, (গ্রাম: সিরাজপুর, পোস্টঅফিস : খন্দকার বাজার, উপজেলা: বালাগঞ্জ, জেলা: সিলেট) এর ছবি সংবলিত পুরো ফাইল বের করা হয়। শহীদ নুরুল হক খান তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ রাইফেলস, বিডিআর) একজন নায়েক ছিলেন। পিতা শহীদ নুরুল হক খানের ছবি হাতে জামাল খান মাটিতে বসে অঝোরে কাঁদতে থাকে। তাঁর এ কান্না কেউ থামাতে পারে না। এ কান্না ৪৮ বছরের কান্না। (জামাল খানের ইন্টারভিউয়ের পরিপ্রেক্ষিতে) সৈয়দ মোজাম্মেল আলী উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রতিনিধিকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের দেশের সূর্যসন্তান। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এ স্বাধীনতা। নিজের সুখ-সুবিধা, পরিবার পরিজন, সংসারের কথা চিন্তা না করে দেশকে স্বাধীন করতে মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। দেশের এবং স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের সবার দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারকে যে কোন কাজে সহযোগিতা করা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ব্যাপারে সবসময় আপোসহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তার বাবার ছবি দীর্ঘ ৪৮ বছর পর দেখতে পেয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হয়ে আমার কাছে যে তা কি গর্বের তা ভাষায় বোঝানো যাবে না।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT