ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইয়ারানা ও বইনারী

সৈয়দ আলতাফ হোসেন খলকু প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৩-২০১৯ ইং ০০:৪৬:৪৩ | সংবাদটি ৩৯৭ বার পঠিত

আগেকার দিনে আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যময় সংস্কৃতির একটি অংশ ছিলো গ্রামের ছেলেদের মধ্যকার একে অন্যের সাথে ‘ইয়ারানা’ পাতান, অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করা। একইভাবে মেয়েদের বেলায়ও একে অন্যের সাথে ‘বইনারী’ করা অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে দু’জনের মধ্যে ‘সই’ বা ‘সখির’ সম্পর্ক স্থাপন করা। যা কিনা ছিল একটি অত্যন্ত সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক বা বন্ধন। ইয়ার শব্দ মূলতঃ ফার্সি ভাষা থেকে আগত একটি শব্দ। অনেক ফার্সি শব্দ যেমন বাংলা ভাষায় যুক্ত হয়ে ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে ইয়ার শব্দটিও তেমনি শব্দ। অন্য দিকে ‘সই’ শব্দটি মূলতঃ আরবি ‘সহী’ শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ ‘সখী বা বান্ধবী বলা যায়। ইয়ার অর্থ বন্ধু, যার আরেক অর্থ ‘দোস্থ’। অতছ ‘দোস্থ’ আবার মূলত: ‘উর্দ্দু শব্দ, বাংলা ভাষায় এসে যুক্ত হয়েছে। তৎকালে সাধারণত আমাদের সিলেট অঞ্চলে বন্ধু কে ‘ইয়ার’ এবং বান্ধবীরা সখি কে ‘বইনারী’ বলে ডাকা হত। দু’টি শব্দই কিন্তু খুবই আন্তরিকতা ও মাধুর্যে ভরপুর। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ‘বোনকে’ বইন বলেও ডাকা হয়। এই বইন এর সাথে ‘আনা’ যুক্ত হয়ে বইনারী আনা হয়েছে। পূর্বেই বলেছি এই ধরণের বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করার রেওয়াজ আমাদের লোকায়ত গ্রাম বাংলার এক বলিষ্ট সংস্কৃতির অংশ ও মায়ার বন্ধন।
বিতর্কিত যান্ত্রিক সভ্যতার যাতাকলে পড়ে যা আজ লুপ্ত হয়ে গেছে। কেন বা কিভাবে ছেলেমেয়েদের মাঝে এমন মমতাপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠত এবং সমাজ তার গ্রহণযোগ্যতা, মূল্যায়ন এবং মর্যাদা কতোটুকু ছিল তা আলোচনার প্রয়োজন রাখে। আগেকার দিনে মানুষ ছিল খুবই সহজ সরল। মায়া-মমতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সহযোগিতায় ভরপুর ছিল গ্রামীণ জনপদ। বয়স্কদের এই সব সৎ গুণাবলী স্বাভাবিক ভাবেই ছোটদের চরিত্রে প্রতিফলিত হত। ছেলেদের একসাথে খেলাধুলা করা। স্কুলে যাওয়া, ছুটির দিনে দল বেঁধে ঘুরাফিরা করা, যেমন-আমের দিনে বা বরইর দিনে দলবেধে আম চাটনি করে খাওয়া। গ্রামের খাল বিলে দল বেঁধে পানি সেচে মাছ ধরা এবং খেলাধুলার মধ্যে কাবাডি খেলা, লাটিম খেলা, মারবেল খেলা, গোল্লাছুট ও দাড়িয়াবান্দা খেলা ইত্যাদি। এমনিভাবে ছেলেদের একে অন্যের মেলামেশার মাধ্যমেই গড়ে ওঠত বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তবে ছেলেবেলার দুষ্টামি যে ছিল না তা নয়। ছটকা দিয়ে পাখি শিকার করাও ছিল ছেলেদের মধ্যে একটি রোমাঞ্চকর শখ। এমনিভাবে একসাথে চলতে, খেলতে গিয়ে ছেলেদের মধ্যে গড়ে ওঠত বন্ধুত্বের সম্পর্ক। কোন দু’জনের উঠা-বসা, চলাফেরা, শখ ইত্যাদি একে অন্যের কাছে ভাল লেগে যেত। এথেকেই প্রাথমিক সম্পর্ক এবং পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হত। মেয়েদের বেলায়ও এই আবেগঘন মেলামেশা পাঠশালা বা উচ্চ বিদ্যালয়ে একসাথে পড়াশুনা বা সকাল বেলার মসজিদের ধর্মীয় পড়ার মক্তবে একসাথে পড়াশুনা থেকে একে অন্যের মধ্যে হৃদয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠত এবং তা থেকেই পরিশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বইনারীর সম্পর্ক স্থাপিত হত।
ইয়ারানা পাতানোর অনুষ্ঠানটিও হত অত্যন্ত সুন্দর ও হৃদয়তাপূর্ণ। দু’জনের কোন একজনের বাড়িতে অনুষ্ঠান করার একটি তারিখ নির্ধারণ করা হত। অন্যান্য সহপাঠিদেরও অনুষ্ঠানে আসার দাওয়াত দেয়া হত। মেহমানরা সকলেই আসতেন কিন্তু সঙ্গে কোন উপহার নিয়ে আসার রেওয়াজ ছিল না। যে দু’জনের মধ্যে ইয়ারানা হত উভয়েই গোসল করে নতুন পোশাক পরে অনুষ্ঠানে এসে উপস্থিত হতেন। উভয় পক্ষে সঙ্গে নিয়ে আসতেন মিষ্টি, জিলাপী, নকুল ইত্যাদি মিষ্টান্ন দ্রব্য। নির্দিষ্ট একটি ঘরের মেঝেতে সুন্দর করে মাদুর বিছানো হত। মেঝের উপর উভয়ই মুখোমুখি হয়ে বসতেন। তাদের চারিদিকে সহপাঠিরা ও আত্মীয় স্বজনরা এসে বসতেন। উভয়ের মধ্যখানে মিষ্টির পাত্রাদি বা খাঞ্চা রাখা হত। হাত দিয়ে খাঞ্চা হতে মিষ্টি হাতে নিয়ে একে অন্যের মুখে তুলে দিতেন এবং একে অন্যকে ইয়ার বলে স্বীকার করে নিতেন। সহপাঠীরা তখন হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাতো। একে অন্যের মুখে মিষ্টি দ্রব্য দেয়া নেয়ার পর উপস্থিত সকলের মধ্যেও মিষ্টি বিতরণ করা হত। দু’জন দাঁড়িয়ে একে অন্যের সাথে বুক মেলাতেন, কোলাকুলি করতেন, উপস্থিত সকলের সাথে হাত মেলানো, বুক মেলানো হত। এমনিভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে দু’জন দু’জনকে ইয়ার হিসাবে বরণ করে নিতেন। ইয়ার হওয়ার পর থেকেই একে অন্যকে নাম ধরে ডাকা বন্ধ হয়ে যেত। একজন আরেকজনকে শুধু ইয়ার বলেই সম্বোধন করত। মেয়েদের বেলায় বইনারী পাতানোর অনুষ্ঠানও প্রায় একই ধরণের ছিল। পরবর্তীতে একে অন্যের বাড়িতে দাওয়াত জিয়াফত চলত। ইয়ার হিসাবে একে অন্যের বাড়িতে দুই/তিন দিন অবস্থান করতেন। বইনারীদের বেলায়ও একে অন্যের বাড়িতে দাওয়াত জিয়াফত খাওয়া ও নাইওর থাকার রেওয়াজ ছিল। নাইওর হিসেবে একে অন্যের বাড়িতে সপ্তাহ থেকে দশ পনের দিন পর্যন্ত অবস্থান করতেন।
অনেক ক্ষেত্রে নতুন জামা কাপড় উপহার হিসেবে আদান প্রদান করা হতো। এই বন্ধুত্বের সম্পর্ক এত গভীর হত যে তা সারা জীবনই অটুট থাকত। তাছাড়া সম্পর্কটা শুধু এক জোড়া ছেলে মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তাদের দু’টি পরিবারের মধ্যেও হৃদ্যতার সম্পর্ক স্থাপন করত। ইয়ার ও বইনারীদের একে অন্যের পিতা মাতার প্রতি থাকত আলাদা একটি শ্রদ্ধাবোধ এবং একে অন্যের ভাইবোনদের প্রতিও থাকত মমত্ববোধ। বলা বাহুল্য ইয়ারানা ও বইনারী আনার মাধ্যমে তাদের ও তাদের দুটি পরিবারের মধ্যে গড়ে ওঠা এই মমত্ব, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের মাঝে বিন্দুমাত্র কৃত্রিমতার ছাপ ছিল না। ইয়ার ও বইনারী সম্পর্ক স্থাপন হওয়ার পর একে অন্যকে নাম ধরে ডাকা বন্ধ হয়ে যেত, আজীবন শুধু ইয়ার ও বইনারী বলে সম্বোধন করা হত। আমাদের এলাকায় এমন একজোড়া বইনারী জুটি আছেন যাদের বয়স হয়ে গেছে সত্তর বছর। সেই শৈশবকালে স্থাপিত তাদের এই সম্পর্ক এখনও বহাল আছে যদিও একজন থাকেন এখন লন্ডনে আরেকজন থাকেন আমেরিকায়। কিন্তু যোগাযোগ ঠিকই আছে।
বলা বাহুল্য কিশোর কিশোরীদের মধ্যে অথবা যে কোন বয়সের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কতো সামাজিক সহজাত মেলামেশার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে সত্য কিন্তু তাকে যদি একটি সুন্দর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বরণ করে প্রকাশ করা হয় তবে তা একটি আলাদা গুরুত্ব ও মর্যাদা লাভ করে এবং সম্পর্কটা আরও গভীরতা লাভ করে সন্দেহ নেই। আগেকার দিনের এই ইয়ারানা ও বইনারী আনার সম্পর্ক যত গভীর আপন এবং মমতাপূর্ণ ছিল তা আজকালকার কিশোর কিশোরীদের বর্ণনা করে বুঝানো সম্ভব নয়। যাক শেষের দিকে কিশোর কিশোরীদের প্রতি আমার একটি অনুরোধ থাকল ভিন্ন সংস্কৃতির অনুষ্ঠানাদি না করে নিজেদের মধ্যে যারা একে অন্যের বন্ধু বা সখি আছেন তারা যেন আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ককে গভীর ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেন। নিশ্চয়ই তাতে সম্পর্কটি হবে আরও আপন, দীর্ঘস্থায়ী। তাতে করে আমাদের হারানো সংস্কৃতিটা আবার ফিরে আসবে সন্দেহ নাই।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • Developed by: Sparkle IT