ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বেদে জীবনের চালচিত্র

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৩-২০১৯ ইং ০০:৪৬:৫৭ | সংবাদটি ৪৩ বার পঠিত



আধুনিক সভ্যতার মানুষ যখন উন্নত জীবন যাপন করছে, সেখানে নৌকায় সেই মানুষের জন্ম, বিয়ে, সংসার ও মৃত্যুর ব্যতিক্রমী চিত্রও রয়েছে। নদী কিংবা সাগরে নৌকায় ভেসে ভেসে মাছ শিকার করে চলে তাদের সংগ্রামী জীবন সংসার। যে নদীর পানিতে জীবন সেখানেই আবার মরণ। নিজস্ব কোন ভূমি না থাকায় মৃত্যুর পর মানুষের দেহ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ব্যতিক্রমী জীবন যাপনে অভ্যস্ত এ মানুষগুলো মুসলমান হলেও ‘মানতা’ সম্প্রদায় নামে পরিচিত। মাছ শিকার করে মানুষের আমিষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র হলেও দেশের অর্থনীতিতে এদের ভূমিকা রয়েছে।
মুক্তির লাল সূর্য ছিনিয়ে আনার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামেও এদের কারও কারও ভূমিকা আছে। অথচ শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানসহ কোনো মৌলিক চাহিদাই জুটছে না এদের ভাগ্যে। নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থা, পুষ্টিকর খাদ্যের যোগান কিংবা বিশুদ্ধ পানির সুবিধা। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার পেলেও নাগরিক হিসেবে কতোটুকু বা সুবিধা ভোগ করতে পারে এরা? এদের ভোটে যারা জনপ্রতিনিধি তারাই বা কতোটুকু খোঁজ রাখে এদের। এদের জীবন মান উন্নয়নে কি পরিকল্পনাই বা গ্রহণ করে জনপ্রতিনিধিরা?
প্রাকৃতিক ঝড় ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে জীবন বাজি রেখে রাত দিন একাকার করে মাছ ধরে কোনো রকম জীবন চলে এদের। সচেতনতা ও সুযোগের অভাবে এদের সন্তানেরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। সামান্য অক্ষর জ্ঞানও অর্জন করতে পারে না তারা। বড় হয়ে তাদের বেছে নিতে হয় মা-বাবার মাছ ধরার সেই পেশাকেই। শিক্ষার সুযোগ পেলে এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো বা আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারত। ভূমিকা রাখতে পারত দেশ ও জাতির উন্নয়নে।
‘মানতারা’ মুসলমান হলেও ধর্ম-কর্ম পালনে এ সম্প্রদায়ের আগ্রহ কম। আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ নিয়মিত নামায রোযা পালন করে। প্রতি বছর অনেক পরিবার ঈদও উদযাপন করে। ‘মানতা’ সম্প্রদায়ের বিয়ে ও বেদে তালাকের বিষয়ে রয়েছে চমকপ্রদ তথ্য। এক নৌকা অপর নৌকায় পছন্দের মেয়েটিকে তুলে নিলেই বিয়ে হয়ে যায়।
আবার দাম্পত্য কারনে যদি ছাড়াছাড়ি হওয়ার সিদ্ধান্ত হয় তাহলে বধূটি স্বামীর নৌকা থেকে লাফ দিয়ে বাবার নৌকায় গেলেই তালাক হয়ে যায়। এক নৌকা থেকে অপর নৌকায় যাওয়ার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে বধূ হয় তালাকপ্রাপ্তা। বর্তমানে কারও কারও বিয়ে রেজিস্ট্রার মাধ্যমেও হচ্ছে। নিজস্ব ভূমি না থাকায় মৃত্যুর পর অন্যের কাছে কবরের জায়গা চাওয়ার পর সে যদি আল্লাহর ওয়াস্তে জায়গা দেয় দাফন করা হয়। অন্যথায় নদীতে ভাসিয়ে দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না। এদিকে মানতা সম্প্রদায় জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করায় দিন দিন এদের জনসংখ্যা বাড়ছে। মাছ শিকারের সময় শিশু সন্তানকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে পানিতে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা হলেও বিষয়টি অমানবিক। বাল্য বিয়ে ও বহু বিয়ে তাদের অন্যতম রীতি। কেউ কেউ পাঁচটি পর্যন্ত বিয়ে করে। একাধিক বিয়ে করলে লাভ হয় তাদের। কারণ মাছ শিকারে পুুরুষের চেয়ে মেয়েরা বেশি পারদর্শী। স্ত্রী মাছ ধরে বিক্রি করে সব টাকা তুলে দেয় স্বামীর হাতে।
এক্ষেত্রে পুরুষরা তাদের আয় বৃদ্ধির উৎস হিসেবে নারীদের ব্যবহার করে থাকে।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক
  • মুক্তিযুদ্ধে ছাতক
  • একটি বিলুপ্ত বিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী
  • গড় যেভাবে গৌড় হলো
  • আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির কথকতা
  • ‘কান আই ঘাট’ থেকে কানাইঘাট
  • বেদে জীবনের চালচিত্র
  • ইয়ারানা ও বইনারী
  • আমেরিকা আবিস্কার ও রেড ইন্ডিয়ান
  • বাংলার জন্য প্রাণ দিলেন যারা
  • মুদ্রায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা
  • হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা
  • প্রথম ছাপানো বই
  • বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের শিলপাটা
  • গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস ও মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রাচীন মালয় রাষ্ট্র ব্রুনাই
  • সিলেটের ঐতিহ্য সুরমা
  • সিলেট অঞ্চলের ইংরেজি সংবাদপত্র
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সেকালে সিলেটের কেনাকাটা
  • Developed by: Sparkle IT