ইতিহাস ও ঐতিহ্য

‘কান আই ঘাট’ থেকে কানাইঘাট

মো. কলিম উল্লাহ প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৩-২০১৯ ইং ০০:৪৮:৫০ | সংবাদটি ২০৭ বার পঠিত

লোকশ্রুতি মতে কানাই মাঝির ঘাট হতে কানাইঘাট নামের উৎপত্তি ও বিকাশ সাধিত হয়েছে কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করা হলে দেখা যায় যে, চীনের কানুস প্রদেশ হতে হুয়াং জিন বা হলুদ পাগড়ি পরিহিত একদল নৃগোষ্ঠি কানাইঘাট সহ জৈন্তাপুর উপজেলার অধিকাংশ স্থান দখল করে খ্রিস্ট পরবর্তী ২৭৫ সালে একটি রাজ্য স্থাপন করেছিল। সরেজমিনে পরিদর্শন করে জানা যায় যে, ওই সময়ে তারা ইয়াং-সি-কিয়াং নামে একটি রাজ্য সৃষ্টি করেছিল। ঐতিহাসিক ইয়াং রাজবাড়ি মুলাগোল গরগণার ভারতীয় অংশে এবং চারিকাটা পরগণার বাংলাদেশ অংশে (লালাখাল গ্রান্ট মৌজার উত্তর পূর্বাংশে বিদ্যমান উঁচু টিলায়) বিদ্যমান ছিল বলে জনশ্রুতিও অল্প বিস্তর সরেজমিনে পাওয়া যায়। সাম্প্রতিককালে বাউরভাগ দক্ষিণ মৌজার থুবাং এলাকায় বিদ্যমান বাউরভাগ উত্তর (থুবাং) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থিত খেলার মাঠের পূর্ব পাশে যে সমাধি পাওয়া গিয়েছে, ওই সমাধির গায়ে সম্ভবত মধ্যযুগের কোন এক সময়ে উৎকীর্ণ লেখা (ডিং মং জৈন্তা) থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, ইয়াং রাজারা এতদঞ্চল শাসনাধীনে ছিল। সমাধিটি দৈর্ঘ্যে বেশ লম্বা না হলেও ভূমি থেকে দুই আড়াই ফুট উঁচু এবং পাঁকা দেখা যায়। প্রাচীন যুগে কানসু প্রদেশে হুয়াং জিনরা বসবাসরত ছিল। তাদের সমাধির সাথে ওই সমাধির আকৃতি ও প্রকৃতির সাথে বেশ মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। চীনের রূপরেখা গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, তারা চীন থেকে ২৬৫ খ্রিস্টাব্দে কৃষি বিপ্লবের কারণে উৎখাত হয়েছিল এবং বাসস্থানের জন্য ভারতীয় অংশে প্রবেশ করে মণিপুর, উদয়পুর (ত্রিপুরা) ও জৈন্তিয়াপুরের কিছু অংশ নিয়ে একটি রাজ্য ২৭৫ সালে সৃষ্টি করেছিল। প্রাচীন বরাক নদীর শাখা সুরমা নদী অতিক্রম করে কানরা (কানসু প্রদেশের অধিবাসীরা) জৈন্তিয়ায় প্রবেশ পূর্বক দখলক্রমে রাজ্যভূক্ত করেছিল, ওই ঘাটকেই কান আই ঘাট নামে সেসময়ে অভিহিত করেছিল। পরবর্তীকালে ‘কান আই’ থেকে কানাই শব্দ সাধিত হয়ে ঘাট শব্দের সাথে সংযুক্তির কারণে কানাইঘাট শব্দের বিকাশ সাধিত হয়েছে বলে মনে হয়। এরকম হাজারো বিদেশি শব্দ বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়।
কানসুরা মুলত বিজ্ঞানী ছিল। বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত (৩.১৪১) নির্ণয় করেছিলেন বৈজ্ঞানিক যো-ছোংবি। ঐ সময়েই জিয়া সিসীয়ে লিখেছিলেন ছিমিন ইয়াও-শু (জনসাধারণের জন্য জরুরি বিদ্যাসমূহের সংহিতা)। এতে কৃষি ও পশু পালনের বিভিন্ন পদ্ধতি নির্দেশ রয়েছে। মূলাগোল পরগণার মণিপুর (এসএ, জেএল নং- ২১৯) বাজেরাজ পরগণার জন্তিপুর (এসএ, এল নং- ১৫৩) এবং সাতবাক পরগণার জয়পুর (এস, জেএল নং- ১৭৯) থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হুয়াং জিনরা ইয়াং সি কিয়াং রাজ্যের অভ্যন্তরে মণিপুর, জন্তিপুর (জৈন্তিয়াপুর) ও জয়পুর (ত্রিপুরা) রাজ্যের কিছু অংশ দখল করেছিল।
Statistical Account of Assam Vol. 2 গ্রন্থের তথ্য মোতাবেক ১৮৭২ সালে ব্রিটিশরা যে মূলাগোল আউটপোস্ট (পরবর্তীতে ১৯০৮ সালে কানাইঘাট থানা) সৃষ্টিকালে নি¤œবর্ণিত দশটি পরগণায় ৩০১.৪৮ বর্গ মাইল আয়তন দ্বারা সীমাবদ্ধ করেছিল কিন্তু পাক-ভারত বিভাজনকালে ১৯৪৭ এর রেফারেন্ডাম মূলে সিলেট তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানভুক্ত হলেও জৈন্তিয়ারাজ্যেভূক্ত পাহাড়ি অঞ্চল ভারতীয় অংশ থেকে গিয়েছে এবং এর ফলে জৈন্তিয়া রাজ্যের শাসনাধীন পরগণা সমূহের আয়তনও অনেক হ্রাস পেয়েছে।
Statistical Account of Assam Vol. 2 গ্রন্থের তথ্য থেকে জানা যায় যে, ১৮৩৯ সালে জৈন্তিয়া রাজ্যের স্থলাংশের লোক সংখ্যা ১,১১,৩৫৫ জন ছিল। পরবর্তীতে ১৮৭২ সালে মূলাগোল আউটপোস্টের আওতাধীন অঞ্চলে লোকসংখ্যা ছিল ৪৭,৪৭৭ জন। দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেইন চৌধুরী প্রণীত ‘জালালাবাদের কথা’ গ্রন্থের তথ্য মতে জানা যায় যে, ১৮৭২ সালের পরবর্তী সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি জনিত কারণে গ্রাম সংখ্যা ও বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮৭২ সালের আদমশুমারী তথ্য মতে মুসলমান জনসংখ্যা বেশি ছিল।
পাক ভারত স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কয়েক হাজার মুসলিম পরিবার ভারত থেকে মোহাজির হিসেবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অনুপ্রবেশ করে এবং কানাইঘাট থানার আওতাধীন অঞ্চলে জনবসতি গড়ে তোলে। Statistical Account of Assam Vol. 2 গ্রন্থের তথ্য মতে, যেহেতু ১৮৭২ সালে মূলাগোল আউটপোস্টের আওতাধীন অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা অধিক ছিল। এখানে ভারত থেকে প্রত্যাগত মোহাজির পরিবারগুলোও মুসলিম হওয়ায় সঙ্গত কারণে কানাইঘাট থানার আওতাধীন অঞ্চলে বসবাস করা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে নিরাপদ মনে করেছিল।
History of Cachar অবলম্বনে জানা যায় যে, শ্রীহট্ট বিজয়ী হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সঙ্গে আগত তিনশ’ষাট ওলীদের দ্বারাই মূলাগোল আউটপোস্টের তথা কানাইঘাট উপজেলাধীন অঞ্চলসহ কাছাড়ের কিছু অংশ মুসলিম সেনাবাহিনী কর্তৃক জয় করা হয়েছিল। কাছাড়ের তদানীন্তন রাজা এবং জৈন্তার রাজা কর্তৃক মুসলিম সেনাবাহিনীদের দখলীয় অঞ্চল পুনঃদখল করা হয়েছিল মর্মে জানা যায়, (তথ্যসূত্র : মৎপ্রণীত ইতিহাস ঐতিহ্যে জৈন্তিয়া, গোয়াইনঘাট খন্ড, পৃষ্ঠা-১১১)।
এ বিষয়ে সরেজমিনের জনশ্রুতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যরাজি অনুসন্ধান করা হলে দেখা যায় যে, ইরানের রশিদুদ্দিন সম্পূর্ণ আরবি ভাষায় ৭০৩-৭১০ হিজরি সনে ‘জামে-আত তাওয়ারিখ’ নামে একখানা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি ঐ গ্রন্থে কামরূপ, শ্রীহট্ট, জৈন্তিয়া ও কাছাড় সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক
  • মুক্তিযুদ্ধে ছাতক
  • একটি বিলুপ্ত বিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী
  • গড় যেভাবে গৌড় হলো
  • আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির কথকতা
  • ‘কান আই ঘাট’ থেকে কানাইঘাট
  • বেদে জীবনের চালচিত্র
  • ইয়ারানা ও বইনারী
  • আমেরিকা আবিস্কার ও রেড ইন্ডিয়ান
  • বাংলার জন্য প্রাণ দিলেন যারা
  • মুদ্রায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা
  • হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা
  • প্রথম ছাপানো বই
  • বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের শিলপাটা
  • গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস ও মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রাচীন মালয় রাষ্ট্র ব্রুনাই
  • সিলেটের ঐতিহ্য সুরমা
  • সিলেট অঞ্চলের ইংরেজি সংবাদপত্র
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সেকালে সিলেটের কেনাকাটা
  • Developed by: Sparkle IT