শিশু মেলা

টুটুলের ভাবনা

এম, আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩২:২২ | সংবাদটি ১৩৩ বার পঠিত

একটা শালুকের অংশ মুখে দেয় টুটুল। তেতোর সাথে একটু মিষ্টিও। ঘ্যাস্ ঘ্যাস্ শব্দ হয়। হালি তলার আলে বসে বিশ্রাম নিতে নিতে শালুক চিবোয় সে। পৌষের পড়ন্ত বিকেলে ঝির ঝিরে বাতাস। গা ঠান্ডা হয়। মামা তাড়া দেয় কিতারে টুটুল, ভই রইছতনি? জলদি আয় ব্যাটা আলি ফুর। আন্ধাইর অই যারগি। পরে আর চৌখে দেখতে নায়। টুটুল ওঠে। হালিতে ধরে টান দেয় সে। কাঁচা হাতে হালি তুলে বেশ ভালই লাগে। ফুর ফুরে ধানের চারাগুলো মাটি থেকে তুলে মুঠো মুঠো আলাদা আলাদা জমা করে সে। ওর মামা সুরুজ মিয়া বিশেষ নিয়মে হালিগুলো দুটো কোমর সমান খাড়া করা লাঠির মাঝেখানে শুইয়ে দিয়ে আটি বাঁধেন। মূর্তার বেত দিয়ে বিশেষ নিয়মে চারাগুলো আটি বাঁধা হয়। বেশ বড় আটিগুলো কাদায় ডুবিয়ে রাখা হয়। দু’তিন দিন পর নির্ধারিত ক্ষেতে রোপণ করা হয় সেগুলো। বোরো ধানের চারাগুলো বেশ স্বাস্থ্যবান- টুটুল লক্ষ্য করে।
টুটুল একগাদা ভাইবোনের এক সদস্য। শীতের ছুটিতে মামা বাড়ি এসেছে। মা আর সাত ভাই বোন। বাবা আসেনি। কি জানি কোন কাজে বাড়িতে রয়ে গেলো। প্রথম চার পাঁচদিন বেশ ফূর্তিতে কাটলেও টুটুল দেখে ওদের আদর যতœ কমছে এখানে। আগের মত আর আদর আপ্যায়ন নেই। মামা মামীও যেনো কি রকম তাকান। দশ বছরের টুটুল সবই বুঝে। মনে মনে ভাবে বাবা আসে না কেন? বেশ ক’দিন হয়ে গেলো। ওর বাড়ির কথা মনে পড়ল। বিশাল মাঠে এখন কোন ফসল নেই। উদোম মাঠ। ঢাউস ঘুড়ি ওড়ানোর সময় এখন। এছাড়া ফুটবল, হাডুডু, গোল্লাছুট ইত্যাদি যার যার ইচ্ছামত মাঠে খেলা যায়। গাঁয়ের সকল ছেলে মেয়ে বিকেলে বেরিয়ে আসে মাঠে। পৌষের প্রতিটি দিনই যেনো বিজয় উৎসব। বিশেষ করে বিকেলটা উৎসবমুখর। প্রাণ ভরে চিৎকার-চেচামেচি, দৌড়, ডিগবাজী যা ইচ্ছা তাই করা যায়। এটা যেনো শিশু-কিশোরদের স্বর্গ রাজ্য। শাসন করার কেউ থাকে না। ইচ্ছেমত হেসে-খেলে, নেচে-গেয়ে বিকেলটা উপভোগ করা যায়। টুটুলের মামা বাড়িতে মন টেকে না। অথচ বাবা না আসলে যাওয়াও যাচ্ছে না। এদিকে কৃষক মামার টানা পোড়েনের সংসারে বাড়তি আটজনের বোঝা। এদিকে বোরো লাগানোর মৌসুম। চাষ দেয়া থেকে শুরু করে সব কাজই মামাকে করতে হয়। টুটুলকে হাতের কাছে পেয়ে মামা একটু সাহায্য পেতে চাইলেন। এমনিতে তো সারাদিন ঘরে বাইরে দৌড়াদৌড়ি করে কাটাচ্ছে। মাঠে থাকলে একটু আধটু সাহায্য করতে পারবে সে। একদিন বিকেলে মামা বললেন-টুটুল আয় ব্যাটা বন্দ যাই। দেখবেনে কিলান আলি ফুরি। টুটুলের উৎসাহ বেড়ে গেলো। সে বলল আচ্ছা মামা আও যাই। আমার আলি দেখতে খুব ভাল লাগে।
টুটুল মামার হাত ধরে হালি তলায় গেল। কি সুন্দর হালি চারা। বিন্যস্ত পরিপাটি। যেনো কেউ শীতল পাটি বিছিয়ে রেখেছে। একটা ক্ষেতে চার-পাঁচটা শীতল পাটি। টুটুলের মনে হলো নরম চারার উপর শুয়ে পড়লে কেমন হয়। মামা ডাকলেন টুটুল- হ্যাঁ মামা। আয় আলি তুলি। মামা তার অভ্যাস মত সুন্দর করে হালি তুলতে লাগলেন। টুটুল মামার দেখাদেখি হালি ধরে টান দিলো। কিন্তু প্রথমেই তিন চারটা হালি ছিড়ে আসলো। টুটুল বলল- মামা আলি ছিড়িযায়গি। মামা এগিয়ে এসে দেখিয়ে দিলেন- কিভাবে হালি ধরতে হয় এবং টান দিতে হয়। কয়েকবার চেষ্টা করার পর টুটুল ঠিক ঠিক মত তুলতে শিখে গেলো। মামা বললেন টুটুল ওউতো হিকিলিছত ব্যাটা। এখন সুন্দর লাগেরনি?
-অয় মামা। সুন্দর লাগের। সুরুজ মনে মনে ভাবলেন একটু পরেই কোমরে ব্যথা ধরলে আর হালি তুলতে চাইবে না টুটুল। তাই তিনি একটি গল্প বলা শুরু করলেন।
টুটুল একটা কিসসা হুন.....
-কও মামা।
-ই যে বন্দ কাম কররাম এর নাম অইল উড়ো বিল। আর যে জমিনো ই আলি লাগাইমু হিকটার নাম অইল কাঠো বিল। কাঠো বিল কিতা বুচ্ছসনি? ই বিলো বেশি কাঠুয়া (কচ্ছপ) থাকতো। এর কারণে ই বিলরে কাঠো বিল কয়। বুঝরেনি ব্যাটা।
-অয় মামা বুঝিয়ার। তুমি কইয়া যাও।
মামা দেখলেন টুটুল আনমনে হালি তুলছে আর সুন্দর পরিপাটি করে রাখছে। তিনি ভাবলেন দুই দিনের হালি চারা একদিনেই সংগ্রহ করতে পারছেন। তাই টুটুলকে একটা চিন্তায় ডুবিয়ে রাখার জন্য তিনি গল্পটা জুড়লেন।
মামা বললেন- এই যে উড়ো বিল- ইনোরও একটা ইতিহাস আছে। ই যে মাস চলের এর নাম কিতা?
-পৌষ মাস।
-মাঘ মাসর শেষো প্রত্যেক বছর ওউ ই বিল হিছা অয়।
-বিলর মাঝে বেশি হৌল আর গজার মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু ই গুলা ধরা বড় কঠিন। ধরতে গেলেউ উড় উড়াইয়া পেখর নিচে ঢুকি যায়। এর লাগি ইটার নাম অইছে উড়ো বিল। তবে ইনো আরও কাহিনী আছে।
-টুটুল বলল কী কাহিনী মামা....
-ই উড়ো বিলো গভীর রাইতে আইলে অনেক জিনিস দেখা যায়।
-কি তা দেখা যায় মামা?
-ওউতো আমরার সমতেরায় বাপ এখদ মাস আগে আরি গেছিলগি বাজার থাকি আইতে।
-টুটুল কান খাড়া করে ভালো করি শুনতে চেষ্টা করল।
-চিন্ছসনি ব্যাটা সমতেরার বাপরে। তোর হ ঘরর নানা।
-ও আচ্ছা চিনছি। কও......
-তাইন আইরা বাজার থাকি। রাইত বারোটা একটা অইবো। হউ দেখরেনি এক পুল?
-টুটুল দূরে চেয়ে দেখলো একটা বাঁশের সাঁকো।
-হউ পুল নিবা?
-অয় অয়। ওউ পুল তাইন যেমনে পারইতা গেছইন, হঠাৎ দেখইন পুল নাই। খালি পানি আর পানি। তাইন অবাক অইয়া জাগাত ভই গেছইন। আর মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়া শুরু করছইন। তান মনো অইগেছে ইনোর কথা। যে কেউ হৌল মাছ লইয়া আইলেউ ইনো বিপদো পড়ে। সমতেরার বাপ ভইয়া ভইয়া তান ব্যাগতনে হৌল মাছ বার করিয়া ইটা মারি দুরই পালাইতে ওউ দেখইন পুল খান যেখানো আছিল ওউ খানো আছে।
টুটুল আনমনে গল্প শুনছিলো। মামা থেমে যেতেই সে বলল ‘এরপর কিতা অইল মামা?
সুরুজ মিয়া একটু ঢুক গিলে টুটুলের কাজ দেখে নিলো। হ্যাঁ ইতোমধ্যে অনেক কাজ করে ফেলেছে টুটুল। আরও আধা ঘন্টা কাজ করে ফেললে আগামী দুই তিন দিন আর হালি তুলতে হবে না।
-সুরুজ মিয়া কৌশলে বলল এর পর সমতেরার বাপ আল্লাহ নবীর নাম লইয়া বাঁশের সাঁকো ধরি ধরি পার অইলো। কিন্তু রাস্তাতো সে দেখছে না। অন্ধকারে আন্দাজ করি হাঁটতে লাগলো বাড়ির দিকে।
সমতেরার বাপ বাড়ির রাস্তা তুকাইয়া পায় না। সারা রাইত ধরি হে এই উড়োবিলের চারিদিকে চক্কর দিলো। ফযরের আযান অইতেও অনেক দেরি। হঠাৎ এক বিরাট আকারের বুড়া বেটা তার সামনে আইয়া খাড়াইলো। পাও থাকি মাথা পর্যন্ত ধবধবে সাদা কাপড় লাগাইল, সাদা লম্বা দাড়ি, লম্বা চুল গর্দনা পর্যন্ত। ব্যাটা এতো লম্বা যে তার মুখ পর্যন্ত দেখা যার না। হঠাৎ করি লোকটা একটু বাট্টি অইলো। চখুর মাঝে চোখ পড়তেই সমতেরার বাপ ডারাই গেলোগি। চৌখ দুইটা জবা ফুলর মত লাল। গম্ভীর গলায় কইল হেই ব্যাটা তুই সকাল সন্ধ্যা আমার বিলে শোল মাছ ধরিস, এটা আমার পছন্দ নয়। আমি এই বিলের মালিক। এখানে যখন তখন মাছ ধরা চলবে না।
সমতেরার বাপ ডরাইয়া একেবারে মাটির লগে মিশিযায়গি। একটা কথাও কইত পারলো না। অনেক কষ্টে কইল ‘হুজুর আমি আর মাছ ধরতাম নায়। আমারে ছাড়ি দেও। আমার পুড়িয়ে কান্দের। সারা রাইত ধরি রাস্তা তুকাইয়া পাইরাম না।
-আচ্ছা দেখিস। আর এমন কাজ করবে না। মনে থাকে যেনো।
দূরের মসজিদে আযান অইতেউ সমতেরার বাপ দেখলো হে তার বাড়ির কান্দাত। দৌড়িয়া গিয়া পুড়িরে ডাকলো সমতেরা ও সমতেরা.....
সমতেরা দরজা যেই খুলছে ঠিক ওউ সময় অজ্ঞান অইয়া পড়ল সমতেরার বাপ। সমতেরা কইল ‘বাবা তোমার কিতা অইছে? বাবা.... ও বাবা.....। হায়রে বাবার কিতা অইলো রে.... ও বাবা মাতো না কেনে বা....
সমতেরার চিল্লাচিল্লি হুনিয়া বাড়ির হকল মানুষ দৌড়ি দৌড়ি আওয়া শুরু করল। উয়াবুল্লাহর বাপ আইয়া কইল। কিতা বেটি সমতেরা ইগু আছিল কই? দেখি.... দেখি.....উয়াবুল্লাহর বাপে নাকে-মুখে, মাথায়-বুকে হাত দিয়া কইল ..... ‘পানি আন বেটি পানি আন।’ সমতেরা দৌড়িয়া গিয়া জগো করি পানি আনিয়া উয়াবুল্লাহর বাপরে দিলো। তাইন পানি নাকে মুখে ছিটাইতেউ সমতেরার বাপ জাগিয়া উঠল।
টুটুল গল্প শুনতে শুনতে হালি তুলছিলো। কবে যে সন্ধ্যা হয়েছে টের পায়নি সে। সুরুজ মিয়া বলল, টুটুল আর অনে বাদ দে। ওগুলা বান্ধিলাই। তারপর বাড়িত যাইমুগি। টুটুল বলল আচ্ছা মামা.....।
হালির আটি বেঁধে সুরুজ অন্য কর্দমাক্ত জমিতে জিইয়ে রেখে বাড়ির পথ ধরল। পথে আসার সময় টুটুল আবার জিজ্ঞেস করল.... মামা তার পর সমতেরার বাপর কিতা অইল?
-সমতেরায় বাপ গত রাইতোর পুরা কাহিনী একে একে কইলো। এতে কেউ বিশ্বাস করল আবার কেউ কইলো মনে কয় ব্যাটায় মাথা খারাপ অইগেছে। যেতা মনে চায় কর ব্যাটায়।
-বাড়িতে এসে গোসল করে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল টুটুল।
পরদিন সুরুজ মাঠে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই টুটুল বলল আমি যাইতাম মামা তোমার লগে। মামা বললেন ‘বন্দ যে রইদরে বাবা। তুই আঙ্গাজ করতে পারতে নায়। টুটুল নাছোড়বান্দা- সে মাকে গিয়ে ধরল ‘আম্মা মামারে কও আমারে নিতা। ধান রোয়ারুয়ি ইতা আমার খুব ভালা লাগে।’
সুরুজ-টুটুলকে নিয়ে মাঠে গেলেন। আজ অন্য জমিতে চারা লাগাবেন। ‘সিকা-বাউ’ নিয়ে এসেছেন সাথে। হালি তলার পাশে থেকে হালির দুটো আঁটি দুই সিকায় তুলে বাউ দিয়ে বয়ে নিয়ে চললেন অন্য মাঠে। চারা লাগানোর জমি পূর্বেই প্রস্তুত ছিল। সুরুজ মিয়া হালির এক আটি খুলে হাতে চারা নিলেন। লাইন করে জমিতে চারা পুঁততে শুরু করলেন। টুটুল চেয়ে চেয়ে দেখছে। সে এতক্ষণ জমির আলে দাঁড়িয়ে ছিল। পৌষ মাসের মিষ্টি কড়া রোদ পড়ছে টুটুলের মুখে। একটু একটু ঘাম ঝরছে তার। তথাপি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। টুটুল বলল মামা আমি রুইতাম।
-তুই পারতে নায়রে বাপ। দেখ আমি কিলা লাগাই।
-না আমি রুইতাম।
সুরুজ মিয়া বলল, ‘আয়, ওলা আলি বাউ আতো ল। ডাইন আত দিয়া দুই তিনটা করি আলি ধরিস। প্রথম প্রথম বেশ কষ্ট হলো ওর। পরে মোটামুটি চারা রোপণ শিখে গেল সে।
অনেকক্ষণ একটানা চারা লাগানোর পর টুটুল কোমরে ব্যথা অনুভব করল। রৌদ্র তাপে পায়ের তলায় কাদাপানি গরম হয়ে উঠল। ঘাম ঝরছে ওর নাক মুখ দিয়ে। একটু পর আলের মধ্যে বসে পড়ল সে।
টুটুল ভাবলো কোন কাজইতো সহজ নয়। এই যে মাঠ জুড়ে দেখি ধান, এটাতো এমনি এমনি হয় না। অনেক কষ্টে, অনেক ঘাম ঝরিয়েই তবে ফলাতে হয়।
বাবার কথা মনে পড়ল টুটুলের। সারাদিন দোকানে বসে থাকেন, নিশ্চয়ই প্রচুর কষ্ট হয় তার। গাড়ি চালানো, মিস্ত্রি কাজ, কাঠের কাজ, ঘর তৈরি, সব কিছুতেই কষ্ট আছে। কষ্ট করেই আয় রোজগার করতে হয়। টুটুল আজ সিদ্ধান্ত নেয়-ও বাড়িতে গিয়ে বাবাকে একটু একটু সাহায্য করবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি একটা কাজ শিখা দরকার। কাজে যেমন কষ্ট আছে-তেমনি আন্দও। দেখ না গত দিন মামা কাজ করতে করতে কী সুন্দর গল্প বললেন। ওর কাছে কাজই যেনো খেলা। খেলতে খেলতে মামা বুড়ো হয়ে এসেছেন। এখনও সেই খেলাই খেলে যাচ্ছেন। কবে খেলা শেষ হবে..... তা তার জানা নেই।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT