শিশু মেলা

শেওড়াগাছের শীতবুড়ি

ইমতিয়াজ সুলতান ইমরান প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩৩:১১ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত



বাবু আর বুবলি। মা-মরা দুটো বাচ্চা। মা মারা যাওয়ায় সীমাহীন কষ্ট ওদের। ওদের সুখের কথা ভেবে বাবা বিয়ে করেননি। ঘরে সৎমা এলে ওদের কষ্ট আরও বাড়তে পারে। বাবা গরীব চাষী। অনেক সৎ। কর্মঠ। তিনি ভাল করেই বোঝেন, বিয়ে করলে বাবু আর বুবলির জন্য ঘরে খাল কেটে কুমির আনা হবে। বাবা কখনও নিজের সুখের কথা ভাবেননি। ভাবেন শুধু আদরের ছেলেমেয়ে দুটোর সুখের কথা। বাবু আর বুবলিও বাবার কষ্ট বোঝে। রান্নাবান্না, কাপড়কাচা, খড়কুটা কুড়ানো, ঘরদোর গুছানো। এসব কাজ ভালোই করে দুই ভাইবোন মিলে। বাবা সকালবেলায় কাজে যাবার আগে নিজ হাতে বাবু আর বুবলিকে নাওয়াখাওয়া করান। জামাকাপড় পরান। স্কুলে পাঠান। আদর করে বুকে টেনে বলেন, ‘স্কুলে গিয়ে দুষ্টুমি করো না। মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো। ছুটির পর সোজা বাড়ি এসো।’
মাঘ মাস। প্রচ- শীত পড়েছে। কথায় আছে, ‘মাঘের শীতে বাঘ পালায়।’ বাবু প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করেছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। বুবলি ক্লাশ ফোর থেকে ফাইভে উত্তীর্ণ হয়েছে। বুবলি বাবু থেকে একবছরের ছোট। বাবু আর বুবলি পড়াশোনায়ও বেশ। পাড়াপড়শিরা খুব আদর করে ওদের। বাবার মতো ওরাও খুব কর্মঠ ও বুদ্ধিমান। এতটুকুন বাচ্চা দুটো পড়াশোনার পাশাপাশি ঘরদোর সামলানোর কাজেও খুব পটু। ভাইবোন মিলে বাড়িঘরের কাজ এমনভাবে সামলায় বাবাকে তেমন বেগ পেতে হয় না। বাবা খুশি হয়ে বলেন, ‘তোমরা আমার ছেলেমেয়ে নও। তোমরা আমার বাবা-মা। বাবু আমার বাবা। আর বুবলি আমার মা।’
মাঘমাসের প্রচ- শীত। শৈত্যপ্রবাহে প্রতিদিন দেশের এই অঞ্চলে, সেই অঞ্চলে অনেক বৃদ্ধ আর খোকাখুকু মারা যাচ্ছে। হিম কুয়াশা সূয্যিমামাকে ঢেকে রেখেছে। সূর্যের আলো দেখাই যায় না। সবাই সারাক্ষণ গরম কাপড় পরছে। পুকুর বা কলের পানি এতো হিম! স্পর্শ করলেই মনে হয় হাত কেটে পড়বে। পানির হিম কামড়ের ভয়ে লোকজন ঠিকমতন গোসল করছে না।
শৈত্যপ্রবাহের কারণে বাচ্চারা ঠিকমত স্কুলে যেতে পারছে না। বাবু আর বুবলিও যাচ্ছে না। পরপর দুদিন তারা গোসল করেনি। নিয়মিত গোসল করা তাদের অভ্যাস। তারা জানে নিয়মিত গোসল না করলে অসুখবিসুখ হয়। বিশেষ করে শীতের দিনে নিয়মিত তেলপানি না মাখলে অসুখবিসুখ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আজ তারা গোসল করবেই। দিনের মাঝামাঝি সময়ে কুয়াশা কিছুটা কেটেছে আজ। সূয্যিমামার মৃদু আভাস দেখা যাচ্ছে। বাবু আর বুবলি সিদ্ধান্ত নিলো, গরমপানি দিয়ে গোসল করবে। বাবু বুবলিকে বললো, উঠানের চুলার পাশে কিছু খড়কুটা আনতে। বাবু গেলো পানি আর দেশলাই আনতে। বাবু রান্নাঘর থেকে একটা দেশলাই পকেটে গুঁজে খালি কলস হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো কল থেকে পানি আনতে। বুবলি বাবুকে ডেকে বললো, ‘ভাইয়া খড়কুটা তো কিছুই নাই। কী দিয়ে পানি গরম করবো?’ বুবলির কথা শুনে বাবু থমকে দাঁড়ায়। চটজলদি সিদ্ধান্ত নেয়, খড়কুটা জোগাড় করার। সে দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে কলসটি রেখে এসে বুবলিকে বললো, ‘চল্ বেশি করে খড়ি যোগার করতে হবে। গোসল না হয় আজও বাদ দিলাম। রান্নাবান্না করতে হবে না?’
বাবু আর বুবলি দ্রুত বেড়িয়ে পড়ে খড়ি যোগার করতে। আশপাশের গাছগাছালি আর ঝোপঝাড় থেকে খড়কুটা কুড়াতে-কুড়াতে দুই ভাইবোন বড় রাস্তায় গিয়ে ওঠে। বাড়ির পাশেই গ্রামের বড় রাস্তাটি। রাস্তার পাশে একটি শেওড়াগাছ। আকারে তেমন বড় নয়। কিন্তু গাছটি অনেক পুরাতন। অনেক বয়সী গাছ। গাছটি ডালপালা আর লতাপাতায় ভরাট। দেখতে যেনো সবুজ ছাতা। শেওড়াগাছটি ক্লান্ত পথিকের অনেক উপকার করে। গরমের দিনে গাছটির নিচে বসলে খুব ঠা-া লাগে। বৃষ্টির সময় গাছটি পথিকের মাথার ছাতা হিসেবে কাজ করে। তাই গ্রামের মানুষ এই শেওড়াগাছটিকে শীতলগাছ নামে ডাকে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে যাচ্ছে। বাবু আর বুবলি দেখে, শেওড়াগাছটিতে প্রচুর খড়কুটা লতাপাতা শুকিয়ে মটমট করছে। লোভ সামলাতে পারেনি ওরা। দুই ভাইবোন উঠে যায় শেওড়াগাছে। শুকনো খড়ি জোগাড় করতে-করতে ঢুকে গেলো ঘাছটির মাঝখানে। এক্কেবারে ঝোপের ভেতরে। গাছে উঠতেই ওদের গায়ে ঠা-া লাগতে শুরু করে। কিন্তু শুকনো খড়ির লোভে ঠা-ার কথা ভুলে যায় ওরা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে যাচ্ছে। সন্ধ্যার আঁধার দেখে ভয়ে কেঁপে ওঠে বাবু আর বুবলি। সাথে-সাথে অনুভব করতে থাকে প্রচ- শীতের কামড়। বুবলি কেঁপে-কেঁপে বাবুকে বলে, ‘ভাইয়া আমার হাত-পা হিম হয়ে যাচ্ছে। নাড়তে পারছি না।’ বাবুও কেঁপে-কেঁপে বললো, ‘আমার অবস্থাও একইরে বোন। আমরা খুব বেশি দেরি করে ফেলছি। আর দেরি নয়। খড়ি নিয়ে তাড়াতাড়ি নামার চেষ্টা করতে হবে।’ বাবু আর বুবলি গাছ থেকে নামার চেষ্টা করছে। বাবু ধীরে ধীরে নামার চেষ্টা করছে। কিন্তু বুবলি নামতে পারছে না। বুবলি কাঁপা গলায় বলছে, ‘ভাইয়া আমি এমনভাবে শীতে কাঁপছি একদম নামতে পারছি না। তুমি আমাকে রেখে নেমো না ভাইয়া। আমাকে ধরে নামাও তুমি।’ বাবু বুবলিকে ধরে নামানোর চেষ্টা করছে। ততক্ষণে বাবুও হিম হয়ে গেছে। সেও ঠিকমতো বুবলিকে সাহায্য করতে পারছে না। হঠাৎ তারা শুনতে পায় এক বুড়ির গলা। দাঁতপড়া বুড়ির মতো কাঁপা গলায় নাকেনাকে বলছে, ‘কীঁ সোনামণিরা কেমন লাগছে?’
ভীতু আর কাঁপা গলায় বাবু বললো, ‘কে তুমি? শীতে আমরা এমনভাবে কাঁপছি, মনে হচ্ছে, গাছ থেকে পড়ে যাবো। কে তুমি? আমাদের সাহায্য করো।’
‘না, তোমরা পড়বে না। তোমাদের পড়তে দেবো না। গাছ থেকে নামতেও পারবে না। আমি তোমাদের নামতেও দেবো না।’
কিন্তু কেন? কে তুমি?
আমি শীতবুড়ি। এই শেওড়াগাছে আমি থাকি। এটা আমার বাড়ি। তোমরা জানো না? এটা শীতলগাছ? এই গাছে আমি থাকি বলেই এখানে এলে এতো ঠা-া লাগে। বৃষ্টির সময় গাছের নিচে বৃষ্টি পড়ে না।
বৃষ্টি পড়ে না কেন?
কারণ, বৃষ্টি হয় গরমের দিনে। আমার খাবার হলো শীত। শীত খেয়েই আমি বাঁচি। গরমের দিনে শীত না পাওয়ায় আমি বৃষ্টির পানি, বাতাস আর গাছের পাতার রস খেয়ে বাঁচি। তাই গরমের দিনে আমার খুব কষ্ট হয়। আমি খুব শুকিয়ে যাই।
কিন্তু আমাদের দিয়ে তুমি কী করবে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, এখানেই তো মজা!
কী মজা?
মজা হলো, আমার শীতের কামড়ে যখন তোমাদের মতো পিচ্চি বাচ্চারা মারা যায়, তখন আমি খুব আনন্দ পাই। যতো বেশি বাচ্চারা মারা যায় আমি ততো বেশি সতেজ হই। আজ আমার শীতের কামড়ে তোমরা মরবে। আর আমি আনন্দ করবো। মজা পাবো।
না শীতবুড়ি। তুমি আমাদের মেরো না। আমাদের মা নেই। তুমি আমাদের মা। তোমার দোহাই। তুমি আমাদের মেরো না। আমরা মরে গেলে আমাদের বাবা খুব কষ্ট পাবেন। বাবা আমাদের খুব আদর করেন।
জানি। আমার শীতের কামড়ে বাচ্চারা মারা গেলে তাদের মা-বাবা যখন কাদে আমি তখন খুব হাসি। তোদের বাবা তোদেরকে পাগলের মতো খুজছে। আমার খুব ভাল লাগছে। হাঁ হাঁ হাঁ---! ছুঁ ছুঁ ছুঁ---!
শীতবুড়ির হাসি আর ফুঁকে বুবলি এক্কেবারে বরফ হয়ে গেছে। একদম নড়াচড়া করতে পারছে না। মৃতপ্রায় অবস্থা। বাবু মনে মনে ভাবতে থাকে কী করে শীতবুড়ির কবল থেকে বাঁচা যায়? হঠাৎ বাবুর মাথায় আসে, তার পকেটের দেশলাইটির কথা। শীতে কাঁপতে-কাঁপতে ধীরে ধীরে সাবধানে পকেট থেকে দেশলাইটি বের করে সে। ঠুকা দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় বুবলির পাশে জমানো খড়কুটায়। আগুনের আঁচ লাগতেই হাউমাউ করে চিৎকার করে ওঠে শীতবুড়ি। এদিকে সতেজ হয়ে ওঠে বুবলি। বাবুও অনেক জোর পেলো গায়ে। বাবু বুবলিকে নিয়ে সাবধানে নামতে থাকে শেওড়াগাছ থেকে। অইদিকে দাউদাউ করে বাড়তে থাকে শেওড়াগাছের আগুন। শীতলগাছে আগুন আর শীতবুড়ির করুণ চিৎকারে ছুটে আসেন গ্রামবাসী। ছুটে আসেন বাবু আর বুবলির বাবাও। শীতবুড়ি চিৎকার করে বলছে, ‘ওমা গো! গরমে মরে গেলাম গো!’ বাবু আর বুবলি পুরো উদ্দ্যামে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তাদের বাবাকে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT