ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩০:১৯ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
বিনয়ের নিগুঢ় তত্ত্ব :
‘কিন্তু বিনয়ীদের পক্ষে মোটেও কঠিন নয়’। কুরআন ও সুন্নাহয় যেখানে ‘খুশু’ বা বিনয়ের প্রতি উৎসাহ প্রদানের বর্ণনা রয়েছে, সেখানে এর অর্থ অক্ষমতা ও অপারগতাজনিত সেই মানসিক অবস্থাকেই বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ পাকের মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা ও দীনতার অনুভূতি থেকে সৃষ্টি হয়। এর ফলে এবাদত-উপাসনা সহজতর হয়ে যায়। কখনও এর লক্ষণাদি দেহেও প্রকাশ পেতে থাকে। তখন সে শিষ্টাচারসম্পন্ন বিন¤্র ও কোমল মন বলে পরিদৃষ্ট হয়। যদি হৃদয়ে খোদাভীতি ও ন¤্রতা না থাকে, মানুষ বাহ্যিকভাবে যতোই শিষ্টাচারের অধিকারী ও বিন¤্র হোক না কেন, প্রকৃত প্রস্তাবে সে বিনয়ের অধিকারী হয় না। বিনয়ের লক্ষণাাদি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ করাও বাঞ্ছনীয় নয়।
হযরত ওমর (রা.) একবার এক যুবককে নতশিরে বসে থাকতে দেখে বললেন, ‘মাথা ওঠাও, বিনয় হৃদয়ে অবস্থান করে’।
হযরত ইব্রাহিম নখয়ী (রা.) বলেন যে, মোটা কাপড় পরা, মোটা খাওয়া এবং মাথা নত করে থাকার নামই বিনয় নয়।
‘খুশু’ বা বিনয় অর্থ ‘হক্ব’ বা অধিকারের ক্ষেত্রে ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সবার সঙ্গে একই রকম ব্যবহার করা এবং আল্লাহ পাক তোমার উপর যা ফরয করে দিয়েছেন তা পালন করতে গিয়ে হৃদয়কে শুধু তারই জন্য নির্দিষ্ট ও কেন্দ্রিভূত করে নেয়া। সারকথা-ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম উপায়ে বিনয়ীদের রূপ ধারণ করা শয়তান ও প্রবৃত্তির প্রতারণা মাত্র। আর তা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। অবশ্য যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়, তবে তা ক্ষমার্হ।
জ্ঞাতব্য :
‘খুশু’ এর সাথে সাথে অপর একটি শব্দ ‘খুজু’ ও ব্যবহৃত হয়। কুরআন করীমের বিভিন্ন জায়গায় তা রয়েছে। এ শব্দ দু’টি প্রায় সমার্থক। কিন্তু ‘খুশু’ শব্দ মূলতঃ কণ্ঠ ও দৃষ্টির নি¤œমুখিতা ও বিনয় প্রকাশার্থ ব্যবহৃত হয়Ñ যখন তা কৃত্রিম হবে না বরং অন্তরের ভীতি ও ন¤্রতার ফলশ্রুতিস্বরূপ হবে। কুরআন কারীমে আছে ‘শব্দ নিচু হয়ে গেল’ এবং ‘খুজু’ শব্দে দৈহিক ও বাহ্যিক বিনয় ও ক্ষুদ্রতাকে বোঝায়। কুরআন কারীমে আছে ‘অতঃপর তাদের কাঁধ তার সামনে ঝুঁকিয়ে দিল।’
নামাযে বিনয়ের ফেকাহগত মর্যাদা :
নামাযে ‘খুশু’ বিনয়ের তাকীদ বার বার এসেছে। এরশাদ হয়েছেÑ‘আমার স্মরণে নামায প্রতিষ্ঠা কর’ এবং একথা স্পষ্ট যে, অমনোযোগিতা স্মরণের পরিপন্থী। যে ব্যক্তি আল্লাহ থেকে ‘অমনযোগী’ সে আল্লাহকে স্মরণ করার দায়িত্ব পালন করতে সমর্থ নয়। এক আয়াতে এরশাদ হচ্ছে, ‘এবং অমনযোগীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনÑনামায বিনয় ও ক্ষুদ্রতা প্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। অন্য কথায়, অন্তরে বিনয় ও ক্ষুদ্রতাবোধ না থাকলে তা নামাযই নয়। অপর এক হাদিসে আছেÑযার নামায তাকে অশ্লীলতা ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত না রাখে, সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। আর গাফেল বা অমনোযোগীর নামায তাকে অশ্লীলতা ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে না। এ থেকে বুঝা গেল, যে লোক অন্যমনস্ক হয়ে নামায পড়ে, সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। ইমাম গাযালী (রহ.) উল্লেখিত আয়াত ও রেওয়ায়েত সমূহ এবং অন্যান্য প্রমাণাদির উদ্বৃৃতি দিয়ে এরশাদ করেছেন, এগুলোর দ্বারা বুঝা যায় যে, ‘খুশু’ বা বিনয় নামাযের শর্ত এবং নামাযের বিশুদ্ধতা এরই উপর নির্ভরশীল। হযরত মু’আয ইবনে জাবাল (রা.) সুফিয়ান সওরী ও হাসান বসরী (রা.) প্রমুখের অভিমত এই যে, ‘খুশু’ বা বিনয় ব্যতিত নামায আদায় হয় না, বরং তা ভঙ্গ হয়ে যায়।
কিন্তু ইমাম চতুষ্টয় এবং অধিকাংশ ফকীহগণের মতে ‘খুশু’ নামাযের শর্ত না হলেও তাঁরা একে নামাযের রূহ বা আত্মা বলে মন্তব্য করে এ শর্ত আরোপ করেছেন যে, তকবীরে তাহরিমার সময় বিনয়সহ মনের একাগ্রতা বজায় রেখে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামাযের নিয়ত করতে হবে। পরে যদি খুশু বিদ্যমান না থাকে যদিও সে নামাযের অতটুকু অংশের সওয়াব লাভ করবে না যে অংশে খুশু উপস্থিত ছিল না, তবে ফেকাহ অনুযায়ী তাকে নামায পরিত্যাগকারীও বলা চলবে না এবং নামায পরিত্যাগকারীর উপর যে শাস্তি প্রযোজ্য, তার জন্য সে শাস্তি বিধানও করা যাবে না।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT