ধর্ম ও জীবন

আগেকার রাজা-বাদশাহদের ইবাদত বন্দেগী

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩৫:০৯ | সংবাদটি ৫৭ বার পঠিত

আমাদের সকলের জীবনই ক্ষণস্থায়ী। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে আমাদের ব্যস্ততার শেষ নেই। অনেকে দুনিয়াবী কাজ নিয়ে ব্যস্ত আবার কেউ কেউ দ্বীনি বা ধর্মীয় কাজ নিয়ে ব্যস্ত। যে কারণেই ব্যস্ত থাকি না কেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্যই মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। সব ব্যস্ততার চির অবসান হবে মৃত্যুর পর। আমি ব্যস্ত ছিলাম, তাই আল্লাহর ইবাদত করতে পারিনি-এই অজুহাত কখনও আল্লাহর দরবারে কাজে আসবে না। আমরা আল্লাহর ইবাদত করতে ব্যস্ততার অজুহাত দেখাব কেন? আগেকার রাজা বাদশাহগণ হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে কিরূপ ইবাদত বন্দেগীতে মগ্ন থাকতেন তার কিছু ইতিহাস যদি আমরা পর্যালোচনা করি তাহলে আল্লাহর ইবাদত করতে ব্যস্ততার অজুহাত আমাদের থেকে চিরতরে ম্লান হয়ে যাবে।
সুলতান মাহমুদ গজনী ছিলেন ভারতীয় ইতিহাসের অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। সুলতান মাহমুদ গজনী (৯৭১-১০৩০ খ্রিস্টাব্দ) একজন ধার্মিক সুলতান ছিলেন। তিনি ১০০০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২৭ বছরে ১৭ বার ভারতে সফল অভিযান পরিচালনা করেন। দুঃসাহসিক অভিযাত্রিক সেই সুলতান মাহমুদ গজনীর দরবারে গিয়ে এক ব্যক্তি বললÑবাদশাহ জাহাপনা! আমার একান্ত বাসনা ছিল রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বপ্নে দেখবো এবং তাঁকে আমার দুঃখ দুর্দশার কথা বলবো। আল্লাহর অশেষ দয়ায় আমার বাসনা পূর্ণ হল। আমি এক রাতে স্বপ্নে রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জিয়ারত লাভ করলাম। নিজের জীবনকে ধন্য করে নিলাম। আমি স্বপ্নে রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দারবারে আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি এক হাজার দীনার ঋণ হয়ে গিয়েছি। এই ঋণ আমি কোনক্রমেই পরিশোধ করতে পারছি না। আমার ভয় হচ্ছে, যদি এই ঋণ পরিশোধ করার আগে আমি মারা যাই! দয়া করে আপনিই আমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিন। রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপনি সুলতান মাহমুদ গজনীর নিকট যাবেন এবং বলবেন আমি (নবী) বলেছি, তিনি যেন আপনার সমুদয় ঋণ পরিশোধ করেন। তিনি আবার আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সুলতান মাহমুদ গজনী যদি এব্যাপারে কানো প্রমাণ চান তাহলে আমি কী বলবো? রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সুলতান মাহমুদ গজনী যদি এব্যাপারে প্রমাণ চান, তাহলে আপনি বলবেনÑ‘তিনি প্রতিদিন ঘুমানোর পূর্বে ত্রিশ হাজার বার এবং ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর ত্রিশ হাজার বার যে দুরূদ শরীফ আমার প্রতি পাঠ করেন তার হাদিয়া আমার কাছে পৌঁছে। একথা শুনেই সুলতান মাহমুদ গজনী হু হু করে কেঁদে ফেললেন। সাথে সাথে ঐ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে দুই হাজার দীনার দান করে অত্যন্ত ধন্যবাদের সাথে তাকে বিদায় দিলেন। ঐ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ও সুলতান মাহমুদ গজনীর মধ্যকার কথোপকথন বাদশার মন্ত্রীবর্গ শুনতে ছিলেন। মন্ত্রীগণ জিজ্ঞেস করলেন, বাদশাহ জাহাপনা! আমরা তো আপনাকে সব সময়ই ব্যস্ত দেখি। এত ব্যস্ততার মধ্যে আপনি রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ষাট হাজার বার দুরূদ শরীফ পাঠ কিভাবে, কোন সময় পাঠ করেন? সুলতান মাহমুদ গজনী বললেন, আমি উলামায়ে কেরাম থেকে একখানা দুরূদ শরীফের ফজিলত শুনেছি, যে দুরূদ শরীফ খানা একবার পাঠ করলে দশ হাজার বার দুরূদ শরীফ পাঠ করার সাওয়াব পাওয়া যায়। এই দুরূদ শরীফখানা আমি প্রতিদিন ঘুমানোর পূর্বে তিনবার এবং ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তিন বার করতাম। এ নিয়মে দুরূদ শরীফ পাঠ করায় ষাট হাজার বার দুরূদ শরীফ পাঠের সমান হয়ে যেত। আমি অত্যন্ত আনন্দিত এজন্য যে, আমার পঠিত দুরূদ শরীফ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে পৌঁছে।
খাজা মঈন উদ্দিন চিশতি (৫৩৬-৬২৭ হিজরি) এর অন্যতম শিষ্য ছিলেন খাজা কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকী। হযরত খাজা কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রা.) যখন ইন্তেকাল করেন তখন তাঁর জানাযায় হাজার হাজার লোক সমবেত হলেন। বিশাল মাঠে তাঁর জানাযার আয়োজন করা হলো। পুরো মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হলো। জানাযার সময় হলে একজন ঘোষক ঘোষণা করলেন, খাজা কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রা.) ইন্তেকালের পূর্বে আমাকে ওসীয়ত করে গেছেন, যার মধ্যে চারটি গুণ থাকবে তিনিই যেন তাঁর জানাযা পড়ান। গুণ চারটি হলোÑ১) যার জীবনে কোনো দিন তাকবিরে উলা ছুটেনি। ২) যার কোনো দিন তাহাজ্জুদ কাজা হয়নি। ৩) যে কোনো দিন গায়রে মাহরামের দিকে বদ নজরে তাকাননি। ৪) যার জীবনে কোনো দিন আসরের সুন্নত ছুটেনি। একথা ঘোষণার পর পুরো মাঠ নীরব, নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কে আছেন এমন? এভাবেই চলে গেল বেশ কিছুক্ষণ। এরপর লোকের ভিড় থেকে বেরিয়ে এক সুমহান ব্যক্তি। তিনি জনসমক্ষে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে কসম খেয়ে বললেন, আমার মধ্যে এই চারটি গুণ আছে। জনতা অবাক হয়ে দেখলেন, তিনি আর কেউ নন; তিনি হলেন তৎকালীন বাদশাহ সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ (রা.)। একজন বাদশাহ যদি এতো ব্যস্ততার মধ্যেও এমনভাবে ইবাদত করতে পারেন তাহলে আমরা আল্লাহর ইবাদত করতে ব্যস্ততার অজুহাত দেখাব কেন? ইহা মোটেই উচিত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সার্বক্ষণিক ইবাদতে মগ্ন থাকা আমাদের উচিত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT