সাহিত্য একটি রেড ইন্ডিয়ান উপাখ্যান

নানাবজহের ভূতল

ভাষান্তর : প্রফেসর মোঃ আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৩-২০১৯ ইং ০০:১৫:৪৮ | সংবাদটি ২২৯ বার পঠিত


অনেক অনেক দিন আগের কথা। তা এত আগের যে, সম্ভবত সেদিনগুলোর কথা কারো মনে নেই। তখন চারদিকে কিচ্ছু ছিল না। বিস্তীর্ণ জায়গা জোড়ে ছিল কেবল সাগরের পানি। তার উপর অবশ্য ছিল বাতাস। রাতের বেলা অনেক উপর থেকে তারাগুলো ছড়িয়ে থাকা মেঘের ফাঁক দিয়ে জ্যোৎ¯œা ঢেলে দিত। আর ঠান্ডা বাতাস ধীরে ধীরে বয়ে যেত। তখন জাদুকরদের স্রষ্টা নানাবজহ তরুণ ছিল।
চতুর্দিকে ছিল গম্ভীর নীরবতা। ছিল না কোন বৃক্ষ যার পাতার ফাঁক দিয়ে বাতাস গান গেয়ে যেতে পারত। পাহাড়ের গা বেয়ে কলকল ধ্বনি তোলে কোন ঝরনা প্রবাহিত হতো না, কারণ কোন ভূমি ছিল না। কেবল পানি আর পানি। নানাবজহ নিজেই পানির উপর ছিল, কারণ আর কোথাও তার থাকার জায়গা ছিল না। সেখানে সে দীর্ঘকাল ব্যাপী ছিল। অবশেষে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল এবং স্থির করল কিছু প্রাণী সৃষ্টি করবে, যারা তার সঙ্গী হয়ে থাকবে। প্রথমে সে কচ্ছপ সৃষ্টি করল এবং একে সে নিরাপদ শক্ত খোসা দিয়ে ঢেকে দিল। তারপর সে সৃষ্টি করল মাস্করেট। নানাবজহ মাস্করেটের গায়ে দিল লম্বা লম্বা পশম। মাস্করেট যখন পানিতে ডুব দিত তখন প্রচুর বায়ুর কণা বুদবুদ আকারে তার পশমের মধ্যে আটকে থাকত; আর চালাক মাস্করেট তার নাক পশমের মধ্যে গুঁজে দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস চালিয়ে যেত। তারপর নানাবজহ সৃষ্টি করল উদবিড়াল। উদবিড়াল শক্তিমত্তা নিয়ে পানিতে খুব সুন্দর সাঁতার কাটে। নানাবজহ সবশেষে সৃষ্টি করল গায়ে ঘন বাদামী লোম ও একখানা লম্বা চ্যাপ্টা লেজ দিয়ে বিভার।
এখন বিশাল সমুদ্রের মধ্যে নানাবজহ অনেক সঙ্গী পেয়ে গেল। তারা সবাই মনের আনন্দে পানিতে সাঁতার কাটে একসাথে। এভাবে চলতে থাকল অনেক দিন। তাদের দ্বারা যা করা সম্ভব তারা সবই করল এবং তাদের দ্বারা যা বলা সম্ভব তারা সবই বলল। তা সত্ত্বেও নানাবজহ বিরক্ত ও ক্লান্ত বোদ করতে লাগল।
-‘তা আর কখনো হবে না’, নানাবজহ মনে মনে বলল, ‘এগুলোর চেয়ে আরো অনেক বেশি আমোদপূর্ণ সঙ্গী আমার থাকতে হবে।’ এ ব্যাপারে নানাবজহ কিছুক্ষণ ভাবল। তার সৃষ্টিকে নিরানন্দ মনে করায় নানাবজহ প্রথমে নিজকেই দোষারোপ শুরু করল। অতঃপর নিজকে প্রবোদ দেবার চেষ্টা করল, ‘যা হোক! এগুলো তো আমিই বানিয়েছি। তা যদি নিরানন্দ হয়, তাহলে তো আমিই দায়ী! আমি দেখব, পরবর্তী সৃষ্টি যেন আরো সুন্দর হয়!’
এ ব্যাপারে নানাবজহ অনেক সময় ধরে চিন্তা করল। অবশেষে সে বোঝতে পারল সে, আসল সমস্যা হচ্ছে পানি নিয়ে। চতুর্দিকে কেবল পানি আর পানি। পানি ছাড়া কিছু নেই। আর পানিতে বাস করতে পারে মাত্র কটি প্রাণী। ইতোমধ্যে এদের অনেকটি তৈরি হয়ে গেছে। নানাবজহ মনে মনে ভাবল, ‘এখানে কঠিন কিছু নেই। আমি পা রাখতে পারি এমন কঠিন কিছু চাই। আমি যদি কঠিন কিছুর উপর দাঁড়াতে পারতাম এবং এক পায়ের সামনে আরেক পা রাখতে পারতাম; তাহলে আমি হাঁটতে পারতাম। এমনকি ইচ্ছা করলে বেশ দ্রুত হাঁটতে পারতাম। আমার পদচারণ সাঁতারের চেয়েও দ্রুত হতো।’ এখন নানাবজহ বোঝতে পারল যে, সে নতুন কিছু করার ইঙ্গিত পেতে শুরু করেছে। কিছু কঠিন বস্তু।’ ‘পানি ছাড়া অন্য কিছু আমি পাই কোথায়?’
একদিন নানাবজহ উত্তর পেয়ে গেল। তখন সে উদবিড়ালের সঙ্গে পানিতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। উদবিড়াল পানিতে ডুব দিয়ে সাগরের গভীরতর স্থানে চলে গেল, আর নানাবজহ তাকে দেখতে পেল না।
-‘এটা তা-ই!’ নানাবজহ চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘পানির নিচে অবশ্যই কঠিন কিছু রয়েছে, নইলে তো পানি গড়িয়ে চলে যেত। পানির তলদেশে যা কিছু কঠিন রয়েছে; তা আমাকে পেতেই হবে।’
সুতরাং, নানাবজহ দীর্ঘ এক শ্বাস নিয়ে পানিতে ডুব দিয়ে যথাসম্ভব গভীরে চলে যেতে থাকল। পানির নিচে, অনেক নিচে সে চলে গেল। যেতে যেতে সে ভীষণ অন্ধকারে পৌঁছে গেল এবং কিছুই দেখতে পেল না। তার মনে হলো, সাগরের তল আরো অনেক দূর নিচে! তখন সে অনুভব করল, তার ফুসফুস যেন ভেঙ্গে খন্ড বিখন্ড হয়ে যাচ্ছে, সে ফিরে আসল, উপরে এসে ছিটকে পড়ল, আর হাঁফাতে লাগল।
-‘তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে?’ উদবিড়াল জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার অবর্তমানে আমরা ভয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি ছিলে না দীর্ঘ সময় ধরে!’
-‘হ্যাঁ’, নানাবজহ স্বীকার করল, ‘আমি দেখতে চেয়েছিলাম, পানির তলে কি রয়েছে।’
-‘তাই নাকি! তা তো নিছক বোকামি!’ বলে বিভার হাসল; ‘অবশ্যই নিচে আরো পানি রয়েছে।’
-‘ওহ! হ্যাঁ!’ নানাবজহ সম্মতি প্রকাশ করে দৃঢ়তার সাথে প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু তার নিচে কি? তার নিচে কি রয়েছে?’
-‘আরো আরো পানি!’ মন্তব্য করল মাস্করেট।
-‘আমি তা মনে করি না’, বলল নানাবজহ। ‘দেখ! যদি কেবল পানি থাকত, তাহলে পানি গড়িয়ে চলে যেত। যখন তোমরা পানি পান কর, পানি নিচের দিকে তোমাদের পাকস্থলিতে চলে যায়, পানিকে ধারণ করার জন্য যদি কিছু না থাকত, সব পানি চলে যেত। তাই পানিকে আটকে রাখার জন্য তলায় কিছু অবশ্যই থাকতে হবে।’
-‘ভালো! ধারণাটি যৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে’, উদবিড়াল স্বীকার করল, ‘তা তুমি নিচে গিয়ে দেখ না কেন?’
-‘আমি তো সে চেষ্টাই করেছিলাম’, জবাবে নানাবজহ বলল, ‘কিন্তু তা আমার থেকে অনেক দূরে! আমার মনে হচ্ছিল আমার ফুসফুস ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যাচ্ছে।’
শুনে তারা সবাই বিস্ময়ে একে অন্যের দিকে তাকাল আর মনে মনে ভাবতে লাগল এখন কি করা যায়! নানাবজহ বলল, ‘আমার এক পরিকল্পনা আছে।’
শুনে উদবিড়াল নিজ পিঠ চুলকাতে মনোনিবেশ করল। বিভার ও মাস্করেট একটু সরে গিয়ে নির্লিপ্তভাবে সাঁতার কাটতে লাগল। কচ্ছপ তার স্বভাব সুলভভাবে ঘুমিয়েছিল এবং কিছু শুনতে পেল না। তারা সবাই শান্ত রইল; কিছুতেই কিছু বলল না। কারণ তারা ইতোমধ্যে বোঝতে পেরেছিল যে, নানাবজহ-এর মাথায় যখন কোন পরিকল্পনা জন্মে, তখন কাউকে না কাউকে সমস্যায় পড়তে হয়।
-‘আমি বললাম, আমার এক পরিকল্পনা আছে!’ নানাবজহ পুনর্বার বলল, ‘এবং তা হচ্ছে, বিভার! তুমি কাছে আস এবং তোমার লেজের সাথে আমার মাছ ধরার দড়িটি বাঁধতে দাও।’
বিভার অবশ্য তা চায়নি। কিন্তু নানাবজহ ছিল এক বড় জাদুকর এবং সে যা বলত, তা বাস্তবায়ন করেই ছাড়ত!
-‘এ জন্য তুমি কি করতে চাও?’ বিভর জিজ্ঞেস করল।
-‘আমি চাই ডুব দিয়ে তুমি যতদূর সম্ভব নিচে চলে যাবে এবং দেখে আসবে পানির তলায় কি রয়েছে।’
-‘ভালো কথা! চেষ্টা করতে আমার অমত নেই। কিন্তু মাছ ধরার দড়ি কি জন্য?’ উদ্ভিগ্ন চিত্তে বিভার জানতে চাইল।
-‘ওহো! এটি তোমাকে টেনে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য যদি পানির তলায় তোমার ফুসফুস ফেটে যায়।’
বিভার তার দিকে বিষণœ দৃষ্টিতে তাকাল। অতঃপর ঘুরে বসল যাতে নানাবজহ তার লেজে মাছ ধরার দড়িখানা বাঁধতে পারে। লেজে দড়িখানা বেঁধে নানাবজহ আদেশ করল, ‘ঠিক আছে। এবার তুমি যাত্রা শুরু কর।’
বিভার একে একে নানাবজহ, উদবিড়াল, মাস্করেট এবং এইমাত্র ঘুম থেকে জেগে ওঠা কচ্ছপের দিকে তাকাল। অতঃপর সে এক কমনীয় ভঙ্গিতে চক্কর দিল; লেজ দিয়ে পানিতে এক চাপড় মেরে বোঝতে চাইল যে, সে জানে তার সম্মুখে এক বিপদ রয়েছে; তারপর পানির গভীরে ডুব দিল।
অতঃপর অনেক সময় কেটে গেল। তেমন কিছু ঘটল না। নানাবজহ এর হাত থেকে মাছ ধরার দড়ি ক্রমশ নিচের দিকে যেতে থাকল এবং মনে হলো যেন সীমাহীন গভীরে ইতোমধ্যে চলে গেছে। একসময় দড়ির নিচের দিকে গমন থেমে গেল এবং শিথিল হয়ে গেল। বিভারের চার সঙ্গী দড়ির দিকে মনোযোগ সহকারে তাকাল; তারপর নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করল। এবার নানাবজহ দড়ি গুটাতে শুরু করল।
সময় পার হতে থাকল। অবশেষে হতভাগা বিভারের নিথর ছোট দেহখানা পানির উপর ভেসে উঠল। তখনো দড়িখানা তার লেজের সাথে শক্তভাবে বাঁধা রয়েছে।
ক’দিন যেতে না যেতেই নানাবজহ পুনরায় একই পরিকল্পনায় হাত দিল। এবার তার দৃষ্টি পড়ল মাস্করেটের উপর। নানাবজহের কথা শুনে মাস্করেট বলল, ‘লক্ষ কর! বিভারের বেলায় কি ঘটেছিল।’
-‘হ্যাঁ, আমি জানি; কিন্তু তোমার পশম বায়ু ধরে রাখতে পারে; তাই তুমি পানির নিচে অনায়াসে শ্বাসপ্রশ্বাস চালিয়ে যেতে পারবে।’
-‘হ্যাঁ, কয়েক মিনিটের জন্য পারব’, স্বীকার করল মাস্করেট। তারপর দৃঢ়কন্ঠে বলল, ‘সব সময়ের জন্য নয়।’
-‘তোমাকে সব সময়ের জন্য তা করতে হবে না। কেবল পানির তলায় যাওয়া এবং পুনরায় ফিরে আসার মধ্যে। আমি একটি নতুন মাছ ধরার দড়ি পেয়েছি, আগের দড়ির চেয়ে অনেক লম্বা। দুটো দড়ি একসাথে যুক্ত করতে পারব এবং কোন অঘটন ঘটলে তোমাকে টেনে ফিরিয়ে নিয়ে আসব।’
-‘ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করব’, শান্তভাবে বলল মাস্করেট। অতঃপর নানাবজহ তার লেজে দড়ি বাঁধল এবং মাস্করেট বিষণœ দৃষ্টিতে তার বন্ধুদের দিকে তাকাল, বিভারও ঠিক এভাবে তাকিয়েছিল। তারপর মাস্করেট পানিতে ডুব দিল।
প্রথমে দড়ি খুব দুত বেগে পানির গভীরে যেতে থাকল; কারণ মাস্করেট সাঁতার কেটে খুব তাড়াতাড়ি ওখানে পৌঁছাতে চেষ্টা করছিল। তারপর দড়িখানা ক্রমশ ধীরে ধীরে যেতে থাকল। শেষের দিকে দড়িখানা কদাচিৎ যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল।
এদিকে সবাই মাস্করেটের প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষার পর অপেক্ষা করতে লাগল দীর্ঘতম সময় ব্যাপী। অবশেষে নানাবজহ দড়িতে মৃদুভাবে টান দিল। কিন্তু জবাবে কিছুই পাওয়া গেল না। এমনকি কোন নড়াচড়াও নেই। এবার নানাবজহ ধীরে ধীরে দড়ি গুটাতে শুরু করল। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেল। দীর্ঘ, অতি দীর্ঘ দড়ি গুটিয়ে এল। তারা পানির নিচে ঈষৎ অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল মাস্করেটের বুকের সাদা পশম।
বেচারা মাস্করেটের প্রাণহীন দেহ নানাবজহ টেনে উপরে তুলল এবং অবাক হয়ে দেখল মাস্করেটের দু’হাতের থাবা দু’টো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে আছে এক পিন্ড বাদামী বর্ণের আঠালো বস্তু। নানাবজহ আঠালো বস্তুটি খুব সাবধানে চেঁচে পৃথক করে এনে কচ্ছপের খোসার উপর শুকাবার জন্য রাখল। সে বস্তুটির গন্ধ শোঁকে দেখল, পরীক্ষা করল এবং দীর্ঘ সময় ব্যাপী এ নিয়ে চিন্তা করতে লাগল।
অবশেষে সে ঘোষণা দিল, ‘আমার বিশ্বাস এ বস্তুটি হচ্ছে কাদা, এবং যদি তা-ই হয়, এটি দিয়ে আমি অনেক কিছু করতে পারি।’
কাদা পিন্ডটি প্রায় শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত নানাবজহ অপেক্ষা করল। তারপর সে তা কচ্ছপের খোসা থেকে তুলে নিয়ে নিজের আঙ্গুলগুলোর মধ্য ডলতে শুরু করল। আশ্চর্যের ব্যাপার, নানাবজহ যতই তা ডলতে থাকে, ততই তা আকারে বৃদ্ধি পেতে লাগল। অবশেষে তা প্রকান্ড একটি গোলকে পরিণত হলো, যার পৃষ্ঠদেশ এতই বিশাল যে, এখানে হাজার হাজার মানুষ ও প্রাণী বসবাস করতে পারে। এখানে গাছপালা জন্মানোর জন্য এবং নদী বয়ে চলার জন্য যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। কাদার উঁচু সারি সারি পাহাড় তৈরি হলো এবং শুন্যগর্ভগুলো হ্রদে পরিণত হলো। নানাবজহর খুব তাড়া ছিল পাছে কাদা শুকিয়ে যায়। এখানে অনেক বড় বড় কাদামাটি পূর্ণ জলাভূমি রয়েছে, যা কখনো শুকিয়ে যাবে না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT