মহিলা সমাজ

তারুণ্যের মননে স্বাধীনতার চেতনা

আলিজা ইভা প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩০:৪০ | সংবাদটি ১২৮ বার পঠিত

বাঙালির প্রতিটি চড়াই-উতরাই পেরোবার পথে পথে তারুণ্যের রয়েছে অপরিসীম অবদান। সিপাহি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে নীল বিদ্রোহ; তিতুমীর, দুদু মিয়া থেকে শুরু করে মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা, ক্ষুদিরাম প্রমুখ জানা-অজানা বীরের রক্তসিঁড়ি বেয়ে মুখ্যত আর মহান মুক্তিযুদ্ধে আপামর জনগণ যেভাবে পাকিস্তানি হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসরদের সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক অসাধারণ ঘটনা। মহান এ মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ থেকে শুরু করে সম্মুখ সমরে তরুণ-তরুণীরা লড়েছে অসীম সাহসিকতা নিয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের! আমরা ভূখন্ডগত স্বাধীনতা পেলেও সত্যিকারের স্বাধীনতা আমরা এখনো ভোগ করতে পারছি না। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক উত্থান যেভাবে স্বাধীন বাংলাদেশে হওয়ার কথা ছিল তা আশানুরূপ হয়নি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এখন আমাদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এখন এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে সেই পথে এখন আর দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ তৈরি না হয়ে তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, ক্যাডার। যেন-তেনভাবে টাকা বানানো যার একমাত্র মন্ত্র। নৈতিকতা ও আদর্শের বালাই নেই। ফলে তরুণ সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হচ্ছে।
স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানকে আজো কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা থাকলেও আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারিনি বা পরিষ্কারভাবে বললে বলতে হবে যে তুলতে চাইনি। ফলে সবজায়গাতেই নির্বাহী বিভাগের নাক গলানো দেখতে হচ্ছে। সবাই তাদের দিকে মুখ চেয়ে বসে থাকে। হ্যালোর কাছে ভালো পরাভূত হচ্ছে। কিন্তু এ অবস্থা আর কতদিন চলবে?
তাই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও মৌলবাদী রাজনীতি বন্ধে, সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানো, শিক্ষা ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন প্রভৃতি বিষয়ে তরুণসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। কারণ আমাদের এ আবাসভূমি আমাদেরই ঠিক করতে হবে। কে কী করল বা করল না তা না ভেবে নিজের দায়িত্বটুকু সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। নিজে স্বপ্ন দেখতে হবে। অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে হবে। কারণ স্বপ্ন না থাকলে সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। এ জন্য স্বপ্ন দেখতে হবে নিরন্তরভাবে। এ প্রসঙ্গে লেখক হুমায়ূন আহমেদের উক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, 'যে স্বপ্ন দেখতে জানে সে তা পূর্ণ করতে পারে। আমরা জানি স্বাধীনতা অর্জন করা কত কঠিন। কারণ স্বাধীনতা অর্জনের পথে ছড়ানো থাকে অনেক নাটকীয়তা, দ্বন্দ্ব আর সংঘাত। সেই বাধা আর দীর্ঘ বঞ্চনা আর রক্তগঙ্গা পাড়ি দিয়েই তবে স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভবপর হয়। ৩০ লাখ প্রাণ আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। এ এক পরম পাওয়া। কিন্তু এটা অর্জন করতে গিয়ে বাংলার তরুণ-তরুণী এবং আপামর জনগণ যেভাবে হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে তা বিশ্ব ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল এবং বিরল ঘটনা।
তাই যতদিন না একটা বৈষম্যমুক্ত, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, রাজনীতিতে সুদিন ফিরছে, শিক্ষা ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন আসছে, মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার অবসান হচ্ছে অর্থাৎ স্বাধীনতার সুফল প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত সমাজ পরিবর্তনের এ স্বপ্ন তারুণ্যই ছড়িয়ে দিতে পারে বাংলার হাটে-ঘাটে-মাঠে। তারুণ্যের হাত ধরে সে স্বপ্নগুলোও বাস্তব হয়ে উঠুক-তাই হোক বিজয়ের মাসে আমাদের চাওয়া।
বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার রয়েছে সুদীর্ঘ রক্তঝরা ইতিহাস। এ স্বাধীনতা কুড়িয়ে পাওয়া একমুঠো মুক্তো বা বদান্যতার উপহার নয়। এক সাগর রক্ত ও লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ স্বাধীনতা। মুক্তিসেনার রক্তে রঞ্জিত এক সুদীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। এ স্বাধীনতার সঙ্গে অনেক সংগ্রামী চেতনা বিজড়িত। তবে ঐক্যবদ্ধ জীবন প্রচেষ্টা, মিলন-বিরহ, আশা-নিরাশার বাস্তব অনুভূতি সংবলিত এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী অপরাজেয়। এ চেতনার সঙ্গে প্রতিনিয়ত নতুন করে পরিচিত হচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। আর তাই কেউ বা মুক্তিযুদ্ধের বই পড়ে আবার কেউ বা দাদা-দাদি, বাবা-মা অথবা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জেনে নিচ্ছেন সেই সময়ের মুহূর্তগুলো। কীভাবে বাঙালি জাতিকে চিরতরে মাথা নুইয়ে দেয়ার জন্য এ দেশের দোসররা পাক-বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছিল। আর কীভাবে নিজের প্রাণ বাজি রেখে এ দেশের দামাল ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও মুক্তিযুদ্ধে বীরদর্পে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
এক প্রশ্নের জবাবে তরুণ ছাত্র রহমান অপু জানালেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের অজানা অনেক তথ্য জেনেছেন এখান থেকে। কী কী জেনেছেন এর উত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এ অংশটি বলেন। 'পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করার পর বিজয়ের অবিশ্বাস্য আনন্দ করার আগেই একটি ভয়ঙ্কর তথ্য বাংলাদেশকে স্তম্ভিত করে দেয়। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সবাই যখন বুঝে গেছে এ যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, সত্যি সত্যি বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিচ্ছে তখন এ দেশের বিশ্বাসঘাতকের দল আলবদর বাহিনী দেশের প্রায় ৩০০ শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকদের ধরে নিয়ে যায়। আর পরে তাদের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়।' স্বাধীন বাংলাদেশ যেন আর কোনো দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য এ দেশের সোনার সন্তানদের ক্ষতবিক্ষত করা সেসব বিশ্বাসঘাতকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেন অপু। আর সম্মান জানান ওইসব বীরসন্তানদের প্রতি যাদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে।
আবু হাসান বলেন, আমরা স্বাধীনতা সেদিনই পাব, যেদিন আমরা চিহ্নিত রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের বিচার করতে পারব। এখনো ওইসব মীরজাফরদের অবাধে বিচরণ করতে দেখা যায়। তাদের মুখে বড় বড় বুলি শুনতে আমাদের মতো মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের খুব কষ্ট হয় বলে জানায় হাসান। ফারহিন মাসুদ দিঠি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা যে স্বপ্ন নিয়ে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন তার অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। তারা প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন করেছেন। দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় বাকি কাজটুকু নিজেদেরই করতে হবে।'
মনিবুর রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে নেমেছিলেন শুধু দেশকে ভালোবাসতেন বলে। আমাদের দেশের বর্তমান ও বিগত সরকারগুলোর নেতৃস্থানীয় পদের মানুষের দেশপ্রেম খুব কম পরিলক্ষিত হয়েছে। তারা দেশের জন্য আর কী করবে! নিজেদের আখের গোছাতেই বেশি ব্যস্ত। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সবার মধ্যে দিতে কাজ করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানান মাহবুব আলম।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT