ইতিহাস ও ঐতিহ্য

আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির কথকতা

মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০১৯ ইং ০১:৪২:১৮ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

প্রত্যেক স্বাধীন দেশের একটি পতাকা আছে। বাংলাদেশেরও একটি পতাকা আছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নির্মিত পতাকা স্বাধীনতা অর্জনের পর হুবহু একই থাকেনি। প্রথম পতাকা কিভাবে নির্মিত হয় এবং পরবর্তীতে কখন কি পরিবর্তন আনা হয় এটাই আলোচ্য বিষয়।
১৯৬৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনে লৌহমানব ফিল্ড মার্শাল প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের পতন ঘটে। অপরদিকে শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে নিঃশর্ত মুক্তি লাভ করেন। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানকে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে নিয়ে যেতে তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস গ্রুপ আ.স.ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গোপনে পরপর সভা করে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ’। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত মনোনীত করা হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। তদুপরি ‘জয় বাংলা বাহিনী’ নামে একটি বিপ্লবী বাহিনী গঠন করা হয়। জয় বাংলা বাহিনীর জন্যে একটি পতাকা নির্দিষ্ট করার গোপন সভা আহবান করেন।
ঢাকা ভার্সিটির আজকের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের নাম তখন ছিলো ইকবাল হল। পতাকা তৈরির লক্ষে ১৯৭০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ইকবাল হলের ১১৬ নম্বর রুমে সমবেত হন আ.স.ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, কাজী আরেফ আহমদ, শিব নারায়ণ দাস, মার্শাল মণি, হাসানুল হক ইনু, কামরুল আলম খান খসরু, স্বপন চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। শাজাহান সিরাজ পতাকার মধ্যখানে লাল বৃত্ত রাখার প্রস্তাব করেন। উদীয়মান সূর্যের প্রতিচ্ছবি হিসেবে সবাই মেনে নেন এ প্রস্তাব। মার্শাল মণি গাঢ় সবুজ জমিনের প্রস্তাব করেন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক চিত্র হিসেবে এ প্রস্তাবটিও সবাই সমর্থন করেন। কাজী আরেফ লাল বৃত্তের মধ্যখানে বাংলাদেশের মানচিত্র রাখার প্রস্তাব করেন। মতপার্থক্য দেখা দিলেও পরিশেষে সকলে ঐক্যমত পোষণ করেন কাজী আরেফের প্রস্তাবের প্রতি।
পতাকার রং রূপ নির্দিষ্ট হওয়ার পর আসে পতাকা অঙ্কনের পালা। শিব নারায়ণ দাস ছিলেন একজন ভালো আঁকিয়ে। তাকে রং রূপ বুঝিয়ে পতাকা অঙ্কনের দায়িত্ব দেয়া হয়। শিব নারায়ণ দাস সারারাত জেগে রং তুলি দিয়ে একটি মানানসই পতাকা অঙ্কন করেন। পরদিন সকালে আর্কিটেক শিব নারায়ণ দাস, কামরুল আলম খান খসরুসহ কয়েকজন অঙ্কিত পতাকা নিয়ে নিউ মার্কেট সংলগ্ন ‘নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্স’ এর নামফলক টেইলার খালেক মোহাম্মদের কাছে চলে যান। টেইলার খালেক রং রূপ মাপজোক অনুযায়ী প্রথমে ২০টি পতাকা তৈরি করে দেন। পরে শত শত পতাকা ৫ টাকা দামে ঢাকার রাস্তায় বিক্রি হয়।
৬ দফা দিবস উদযাপন উপলক্ষে ১৯৭০ সালের ৭ জুন সকালে পল্টন ময়দানে জয় বাংলা বাহিনী এই পতাকা হাতে উড়িয়ে কুচকাওয়াজ সহকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গার্ড অফ অনার প্রদান করে।
১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রছাত্রীদের সমাবেশে আ.স.ম আব্দুর রবের নেতৃত্বে ছাত্র নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে এই পতাকাটি উড্ডয়ন করেন। এই দিন জয়বাংলা বাহিনী এই পতাকা হাতে নিয়ে মিছিল করে ঢাকার রাস্তায়।
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে স্বাধীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকার অনেক অফিস থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।
গাঢ় সবুজ জমিনের বুকে রক্তবৃত্ত এবং রক্তবৃত্তের বুকে সোনালী আছড়ে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকাই ছিলো মু্িক্তযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রীসভায় ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধকালীন পতাকার লালবৃত্ত থেকে বাংলাদেশের মানচিত্র অপসারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এবং লাল বৃত্তকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের রক্তের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাকী সব যেমন ছিলো তেমনই থাকে। এরপর থেকে গাঢ় সবুজের বুকে রক্তবৃত্ত পতাকাই হয় আমাদের জাতীয় পতাকা।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সাথে আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির ইতিহাসও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের জাতীয় পতাকার মতো জাতীয় পতাকার রূপকাররাও চিরভাস্বর ও চিরঞ্জীব।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT