ইতিহাস ও ঐতিহ্য

গড় যেভাবে গৌড় হলো

এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০১৯ ইং ০১:৪৩:০৫ | সংবাদটি ১৭৯ বার পঠিত

১৫৮১ সালে ত্রিপুরার মহারাজা অমর মানিক্য তাঁরই আশ্রিত রাজ্যের অংশের বা তরফের শাসককে আশ্রয় দানের শর্তানুযায়ী রাজকার্যে শ্রমিক পাঠানোর নির্দেশ দিলে তরফ শাসক সৈয়দ মুসা তা তামিল না করায় মহারাজা ক্ষুব্ধ হন। অবাধ্যতা ও শর্তভঙ্গ করার প্রতিশোধ নিতে মহারাজা যুবরাজ রাজধর মানিক্যকে বাইশ হাজার সৈন্যসহ আশ্রিত অংশ বা তরফ আক্রমণ ও দখলে পাঠান। ত্রিপুরা রাজার তরফ আক্রমণের খবর পেয়ে তরফের আসল এবং সিলেটের তদানিন্তন প্রথম স্বাধীন মুসলিম শাসক ফতেহ খান লোহানি সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল সৈন্য দ্রুতবেগে তরফের শাসক সৈয়দ মুসার সাহাযার্থে প্রেরণ করেন।
বর্তমান চুনারুঘাটের নিকটবর্তী জিকুয়া নামক স্থানে উভয় পক্ষের তুমুল যুদ্ধে ত্রিপুরা রাজ্যের বিজয় হলে তরফের শাসক সৈয়দ মুসা ও তাঁর পুত্র সৈয়দ ইব্রাহিম এবং সেনাপতি শুদ্ধরাম বন্দি হয়ে ত্রিপুরার রাজধানি উদয়পুরে নীত হন এবং তাঁরা কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে মহারাজা সন্তুষ্ট হয়ে শর্তাধীনে পুত্র সৈয়দ ইব্রাহিমকে মুক্তি দিয়ে আশ্রিত অংশ তরফ এলাকার পুনপরিচালনার ভার দেন। পিতা সৈয়দ মুসাকে এলাকা ত্যাগ করতে হয়। সিলেট শাসক প্রেরিত সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিন সঙ্গী-সাথিসহ যুদ্ধ করেও সেখানে শহীদ হলে তাদেরকে নিকটস্থ মোড়ারবন্দে সমাহিত করা হয় যা সর্বজন শ্রদ্ধেয় পবিত্র স্থান হিসাবে আজো পরিচিত।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, সিলেট শহরের উত্তরদিকে চৌকিদেখিতে সৈয়দ নাসির উদ্দিনের বসতবাড়িতে সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিনের আরেকটি মাজারসহ অন্যান্য মাজার নির্মাণ এবং তৎনামে ব্রিটিশ আমলে কিভাবে নিষ্কর ভূমি বন্দোবস্ত নেওয়া হয়। বর্ণিত নিষ্কর ভূমি বন্দোবস্ত নিতেই বোধহয় সেসব নকল কবর তৈরি করা হয়েছিল সন্দেহে তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। যেভাবে অন্যান্য স্থানেও নিষ্কর ভূমি বন্দোবস্ত নিতে এইভাবে পীর হযরত শাহজালালের (রহ.) সাথী বলে বিভিন্ন নকল মাজার সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হওয়ায় বর্ণিত নিষ্কর ভূমি বাজেয়াপ্ত ও করযুক্ত করা হয়। উল্লেখ্য তখনকার সময়ে রাজস্ব প্রদানের ভয়ে লোকজন অতিরিক্ত ভূমি বন্দোবস্ত নিতেন না বিধায় ব্রিটিশ কোম্পানীর রাজস্ব আদায় কম হত। তাই প্রথমে ধর্মীয় কারণে নিষ্কর ভূমি বন্দোবস্ত দিয়ে উৎসাহিত করে পরে তা করযুক্ত করা হয়। অন্যদিকে সিলেট শাসক ফতেহ খান লোহানি ত্রিপুরার আশ্রিত অংশ তরফের রক্ষার্থে তরফ এলাকার আসল মালিক ত্রিপুরার মহারাজের বিপক্ষে সিলেট থেকে সৈন্য প্রেরণের অপরাধে ত্রিপুরার মহারাজা বিরাট সেনাদল নিয়ে দিনাজপুর হয়ে সিলেটের দিকে অগ্রসর হন এবং সিলেটের পশ্চিমে কামালের বাজারের নিকট পৌছলে ফতেহ খানও সসৈন্যে বাধা দিতে অগ্রসর হন। নিকটস্থ গোধরাইল গ্রামে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ফতেহ খান পরাজিত ও বন্দি হলে ফতেহ খানসহ তার পরাজিত সেনাদেরকে সামন্তরাজ্য দুলালি এবং ত্রিপুরার আশ্রিত রাজ্য ইটার মধ্যে দিয়ে ১৫৮২সালের পহেলা মাঘ ত্রিপুরার রাজধানি উদয়পুরে নীত হলে বুদ্ধিমান ফতেহ খান ইতিপূর্বে নিজ বিপদের সময় মহারাজের অধীনস্থ ত্রিপুরার অংশ যাকে ফার্সি ভাষায় তরফ বলে সেখানে আশ্রয় প্রদানের কথা স্মরণ করে নিজ অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করেন। ফতেহ খাঁনের অনুশোচনা ও ভদ্র ব্যবহারের জন্য মহারাজা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ক্ষমা করে কর প্রদানের শর্তে মুক্তি দিয়ে পুনরায় সিলেটের শাসনভার ফিরিয়ে দেন।
সিলেটের এ বিজয়কে স্মরণীয় রাখতে মহারাজা অমর মানিক্য ১৫৮২ সালেই এক স্মারক মুদ্রাও প্রচার করেন। সিলেটে প্রাপ্ত এবং বর্তমানে ঢাকা মিউজিয়ামে রক্ষিত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় ফতেহ খান লোহানি ১৫৮৮ সাল পর্যন্ত সিলেটের শাসক ছিলেন। অন্যদিকে ১৫৭৪ সালে মোগল সম্রাট আকবরের স্বনামধন্য রাজপুত সেনাপতি ও আত্মীয় মানসিংহের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বাংলার সোনারগাঁর প্রখ্যাত শাসক ঈশা খাঁ মোগল বশ্যতা স্বীকার করে মোগল সম্রাট কর্তৃক সর্বোচ্চ সম্মান মসনদে আলী উপাধিতে ভূষিত হয়ে মোগল সম্রাটের অধীনে সুবে বাংলার সোনারগাঁর শাসক নিযুক্ত হন। একই সাথে সিলেটের পাঠান শাসক ফতেহ খান লোহানিও মোগল বশ্যতা স্বীকার করে মসনদে আলা উপাধি প্রাপ্ত হয়ে মোগল দরবারে সম্মানিত হন। একই সময়ে সিলেট ও ময়মনসিংহের ভাটি অঞ্চল বানিয়াচং রাজ্যের রাজা গোবিন্দ নারায়ণ সিংহও মোগল বশ্যতা স্বীকার করার সাথে সাথে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে হবিব খান নাম ধারণ করেন এবং এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারে অবদান রাখেন। অন্যদিকে রাজা গোবিন্দ সিংহের ভ্রাতা সমতল লাউড় রাজ্যের রাজা জগন্নাথ নারায়ণ সিংহ উত্তর দিকে নিজ রাজধানি স্থাপন করে নিজ নামানুসারে নাম দেন জগন্নাথপুর যার রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ আজো সেখানে বিদ্যমান। উল্লেখ্য মূল লাউড় রাজ্য পাশ্ববর্তী লাউড় পাহাড়ে অবস্থিত যার রাজধানী তুরা শহরে যা বর্তমানে ভারতের মেঘালয়ের সীমান্ত জেলা শহর হিসাবে পরিচিত।
স্মরণীয় সমতল লাউড় রাজ্যের মালিক ছিলেন দু’ভাই- জগন্নাথ নারায়ণ সিংহ এবং ছোট ভাই গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ যাদের মধ্যে রাজ্যভাগ হলে এক অংশের নাম থাকে লাউড়/ লেউড় যার মালিক হন এক ভ্রাতা জগন্নাথ নারায়ণ সিংহ এবং অপর অংশের নাম হয় বানিয়াচুং যা তিব্বতি ভাষায় চুং তথা সমুদ্র থেকে বনিয়া বা গড়ে উঠে এবং যার মালিক হন অপর ভ্রাতা গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ যারা উভয়ই পরে মোগল সম্রাট আকবরের বশ্যতা স্বীকার করেন। তবে বানিয়াচুং অধিপতি গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ বশ্যতা স্বীকারের সাথে সাথে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে হবিব খান নাম গ্রহণ করে নিজ নামেই রাজ্যের রাজধানীর নামকরণ করেন হবিগঞ্জ। তারা শ্রীহট্টের স্বাধীন হিন্দু রাজা গোবিন্দ কেশব দেব এবং পরবর্তি প্রথম স্বাধীন মুসলিম শাসক ফতেহ খান লোহানি ও প্রখ্যাত ইসলাম ধর্ম প্রচারক পীর হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সমসাময়িক। পরবর্তিতে লাউড় রাজা জগন্নাথ নারায়ণ সিংহের পুত্র বিজয় সিংহের একমাত্র সুন্দরি কন্যা রাজকুমারী ভবানিকে বিয়ে করেন বানিয়াচুঙ্গের রাজা হবিব খানের পুত্র মজলিশ খান। উল্লেখ্য রাজকুমারি ভবানি বাগান বাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভবানিপুর গ্রাম আজো জগন্নাথপুরে বর্তমান। রাজা বিজয় সিংহের মৃত্যু হলে এবং তার কোন পুত্র সন্তান না থাকায় লাউড় রাজ্য ও বানিয়াচুং রাজা মজলিশ খার সুযোগ্য পুত্র আনোয়ার খানের দখলে চলে যায় যার অধিকাংশই পরবর্তিতে ব্রিটিশ আমলে জোয়ার বানিয়াচুঙ্গ পরগনা নামে পরিচিতি লাভ করে।
পরবর্তীতে বাংলার সুবেদার মুর্শিদকুলি খানের সময় রাজস্ব প্রদানের জন্য বানিয়াচুঙ্গ অধিপতি তার অধীনস্ত সম্পূর্ণ ভূমির হিসাব না দিলে এবং পরবর্তিতে নবাব কর্তৃক হিসাব বহির্ভূত অংশ বাজেয়াপ্ত হয়ে রাজস্ব আদায়ের জন্য নুতনভাবে কুবাজপুরের খালিসা জমিদারদের কাছে বন্দোবস্ত দিলে বানিয়াচুঙ্গর অধিনস্থ অংশের নাম হয় মোজরাই বা বানিয়াচুঙ্গ অধিনস্ত এবং অন্য অংশের নাম হয় খালিসা বা বানিয়াচুঙ্গ মুক্তাংশ- যা পরে ব্রিটিশ কোম্পানি আমলে বিভিন্ন নানকার ও খানেবাড়ী তালুকে ভাগ হয়ে বন্দোবস্ত হয়। এলাকার অন্যান্য ছোট ছোট রাজ্যের শাসকগণও মোগল সম্রাট আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে মোগল সম্রাট আকবরের অধীনেই নব গঠিত সুবে বাংলার অধীনস্থ ফার্সি ভাষায় সরকারে সিলাহট নামে মোগল শাসনের ফৌজদারি ও দেওয়ানি বা রাজস্ব বিভাগে অধীনে বৃহত্তর সিলেট হিসাবে প্রথমবারের মত একীভূত হয় এবং পরে প্রশাসনিক এবং রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে আটটি মহল বা অঞ্চলে বিভক্ত হয় যেমন- প্রতাপগড়, বানিয়াচুঙ্গ, বাহুয়া/ বাহুয়াসার, জৈন্তা, হাবিলি সিলাহেত (বসতি সিলেট), সতরখন্ডল (সরাইল), লাউড় এবং হরিনগর/ দুলালি। এসব এলাকার শাসকেরা প্রশাসনসহ সিলেটের দেওয়ানের পক্ষে কমিশন ভিত্তিতে খাজনা বা দেওয়ানি আদায়ের অধিকারও প্রাপ্ত হন যা মোগল সম্রাট আকবরের রাজস্বও প্রশাসন সংক্রান্ত লিখিত বহি আইন-ই-আকবরিতে সুবে বাংলার সরকারে ছিলাহেত অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে। ইতোপূর্বে পাঠান সম্রাট শেরশাহের আমলেও ভূমি জরিপসহ রাজস্ব আদায়ের ও সুব্যবস্থা হয়েছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়।
এসময় মহান মোগল সম্রাট আকবর পবিত্র কুরআনের বাণী-রাব্বুল আলামিন/ বিশ্বভ্রহ্মান্ডের পালক বর্ণনা করে সাম্রাজ্যবাসিকে ধর্মীয়ভাবে এক করতে সকল ধর্মের সমন্বয়ে দীন-ই-এলাহি নামক একেশ্বরবাদী তৌহিদী একই ধর্ম প্রচারের উদ্দ্যোগ নেন যার প্রভাবে দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের হিন্দু ধর্মেও কর্ম ও শ্রেণী-বর্ণহীন একেশ্বরবাদী বৈষ্ণব-ধর্মেরও উদ্ভব ঘটে যা চৈতন্য দেবের নেতৃত্বে শ্রীহট্টেও প্রচারিত হয়। এ সময়ই সিলেটেও হযরত শাহজালাল নামক প্রখ্যাত সুফি সাধক তার সঙ্গী সাথী নিয়ে সিলেট আসেন। যদিও আইন-ই-আকবরিতে এর কোন উল্লেখ নাই। ১৬০৫ সালে প্রতাপশালী মোগল সম্রাট আকবরের মৃত্যু হলে বিশাল মোগল সাম্রাজ্যে সাময়িক বিভ্রান্তির সুযোগে সিলেটসহ সুবে বাংলায় মোগল বিরোধি পূর্বের স্থানিয় হিন্দু ও পাঠান মুসলমান তথা বাংলার প্রখ্যাত বারো ভূঁইয়াগণ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেন এবং মোগল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আইন-ই-আকবরিতে সুবে বাংলা অধ্যায়ে সুবে বাংলাকে বোলগাখানা বা সদা সর্বদা ঝামেলাপূর্ণ এলাকা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সর্বোপরি মহান মোগল সম্রাট আকবর মহান ভারত সম্রাট অশোকের ন্যায় অযথা রক্তপাত পছন্দ না করে সাম্রাজ্যের সর্বত্র শান্তিপূর্ণ ও সর্ব ধর্মীয় সহ-অবস্থানে বিশ্বাসি ছিলেন বিধায় বিরোধী সকল শক্তিকেই মোগল প্রশাসনে মর্যাদাপূর্ণ স্থান দিয়ে তাদের সাহস, মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন যে নীতি একইভাবে তিনির সুযোগ্য পুত্র এবং প্রেমিক সম্রাট জাহাঙ্গিরও মহান পিতার মতো তা অনুসরণ করেছিলেন। একে কেহ কেহ দুর্বলতা হিসাবে ভুল করে খেসারতও দিয়েছিলেন। কারণ মোগল শক্তি এত প্রবল ছিল যে তা ঢেউয়ের মত এক দল সৈন্যের পর আরেকদল সৈন্যের আক্রমণের মুখে কোন শক্তিই দাঁড়াতে পারত না। যা পরবর্তিতে চীনের মহান নেতা মাও সে তুংও অনুসরণ করেছিলেন।
মহান মোগল সম্রাট আকবরের মৃত্যুজনিত কারণে সৃষ্ট সাময়িক শূন্যতার সুযোগে সিলেটসহ সুবে বাংলায় মোগল বিরোধি শক্তি আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তারই রেশ হিসাবে বাংলার প্রখ্যাত বারো ভূইয়াগণ সোনারগাঁর ঈশাখার পুত্র মুসা খাঁ বৃহত্তর সিলেটের ফতেহ খাঁন লোহানী, বানিয়াচুঙ্গের আনোয়ার খান, দিনারপুরের হায়দর গাজী প্রমুখ নিজ নিজ এলাকার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। অথচ এরাই মোগলামলে নিজ নিজ এলাকায় মোগল শক্তির কর্ণধার ছিলেন। এ সুযোগে বাংলার এক শাসক ভূইয়া বায়োজিদ বোকাইনগর/ একলিমিয়া মোয়াজ্জামাবাদের শাসক ভূইয়া খাজা উছমানের সাহায্যে ছিলাহতের বৃদ্ধ শাসক এবং মোগল বশ্যতা স্বীকারকারি তরে পরবর্তিতে পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণাকারি ফতেহ খান লোহানিকে তাড়িয়ে ছিলাহেত/ সিলেট রাজ্য দখল করে নিজ শাসন কায়েম করেন। ফতেহ খান লোহানী পালিয়ে যান।
ইতোমধ্যে সম্রাট আকবরেরই সুযোগ্য সন্তান জাহাঙ্গীর দিল্লির সিংহাসনে আসীন হয়েই নিজ ক্ষমতা সংহত করতে থাকেন। সুবে বাংলায় বিদ্রোহের খবর পেয়ে সম্রাট নিজ বাল্যবন্ধু এবং দক্ষ শাসক ইসলাম খান চিশতীকে সুবে বাংলার সুবেদার নিয়োগ দিয়ে বিরাট সেনা বাহিনীসহ বাংলার দিকে প্রেরণ করেন। সুবেদার ইসলাম খানের আহ্বানে প্রথমেই সোনারগাঁর বিদ্রোহি শাসক প্রয়াত ঈশা খাঁর ছেলে মুসা খান নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করলে সুবেদার ইসলাম খান মুসা খানকে সম্মানিত করতে মসনদে আলা উপাধি দিয়ে প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন। একইভাবে বানিয়াচুঙ্গের আনোয়ার খান, দিনারপুরের হায়দার গাজী প্রমুখ ও নিঃশর্তে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গিরের বশ্যতা স্বীকার করে কর প্রদানের শর্তে নিজ নিজ এলাকা ফেরত পান তবে বোকাইনগরের পাঠান শাসক খাজা ওসমান মোগল বশ্যতা স্বীকার করতে অস্বীকার করলে সুবেদার ইসলাম খানের নির্দেশে ১৬১১ সালে মোগল বাহিনি কেল্লা বোকাইনগর দখল করতে এগিয়ে গেলে ভয়ে খাজা ওসমান সদলবলে পালিয়ে গিয়ে বানিয়াচুঙ্গের শাসক আনোয়ার খানের সহযোগিতায় ত্রিপুরার আশ্রিত ইটা রাজ্যের রাজা সুবোদ নারায়ণের ছেলে সুর্য নারায়ণের অধীনস্ত দুর্গ সূর্যগড় দখল করে নিজ নামে নামকরণ করেন উছমান গড় যা বর্তমানে মৌলবীবাজারের কমলগঞ্জের একটি ইউনিয়ন। পুত্রের সাহায্যে রাজা সুবোদ নারায়ণ এগিয়ে এলে যুদ্ধে রাজা সুবোদ নারায়ণ নিহত হলে তার পুত্রগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে খাজা উসমানের অধীনস্থ শাসক/ দেওয়ান হিসাবে অধিষ্ঠিত হন যার উত্তরাধিকারিগণ ইটা রাজ্যের তদানিন্তন রাজধানি রাজনগরে দেওয়ান উপাধিতে আজো বসবাস করছেন।
অতঃপর খাজা উছমান তরফ রাজ্যও দখল করে নিজ রাজ্যের পরিধি বাড়ান। অন্যদিকে পাঠান বীর খাজা উসমান মোগলদের বশ্যতা স্বীকার না করায় সুবেদার ইসলাম খানের নির্দেশে সুযোগ্য মোগল সেনাপতি সুজাত খাঁর নেতৃত্বে এক বিরাট সৈন্য বাহিনী উছমান খাঁর বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। এ মোগল বাহিনীতে সুযোগ্য নৌ-সেনাপতি মির্জা ইহতিমাম খাঁন এবং তাঁরই সুযোগ্য পুত্র মির্জা নাথান, মুতাকিব খানের মত সুদক্ষ সেনাপতিগণও ছিলেন। মোগল বাহিনী ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়ে সরাইল হয়ে প্রথমে খাজা উছমানের দখলিয় তরফ দূর্গ এবং পরে পুটিজুরি দূর্গ দখল করলে দূর্গাধিপতি খাজা উছমানের ভ্রাতা খাজা ওয়ালি পলায়ন করে ভাই উছমানের সাথে যোগ দেন। দৌলম্ভাপুর বা দুর্লভপুরের নিকটস্থ হাইল হাওরের উত্তর দিকস্থ জলাভূমিতে উছমান বাহিনীর সাথে মোগল বাহিনীর তমুল যুদ্ধে মোগল বাহিনীর দক্ষ তীরন্দাজের তীরের আঘাতে খাজা উছমানের চক্ষুতে আঘাতজনিত রক্ত ক্ষয়ের কারণে পাঠান বীর উছমানের করুণ মৃত্যু হলে উছমানগড়সহ উছমান-রাজ্য মোগলদের দখলে আসে। যা বাহারিস্থানই গায়বি নামক বহিতে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। একইভাবে সুবেদার ইসলাম খান আরেক দক্ষ মোগল সেনাপতি শেখ কামালের নেতৃত্বে সরকারে ছিলাহেতের বিদ্রোহী আরেক পাঠান শাসক এবং বাংলার প্রখ্যাত বারো ভূইয়াদেরই একজন ভূইয়া বায়োজিদকে বশে আনতে আরেক সেনা অভিযান প্রেরণ করেন। মোবারিজ খান, মীরক বাহাদুর জলই ও মীর আবদুর রজ্জাক সিরাজিও এ বাহিনীর সহ-অধিনায়ক ছিলেন মীর আলি বকস ছিলেন বকশি বা কোষাধ্যক্ষ। বিজ্ঞ সুবেদার ইসলাম খান সেনাপতি শেখ কামালের সাহার্য্যার্থে মীর মাসুম সাকীর নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনীও প্রেরণ করেন যাতে এ এলাকার শেষ যুদ্ধ জয়ে কোন ঘাটতি না থাকে।
সিলেট শাসক বায়োজিদ তার ভাই ইয়াকুবকে নিকটস্থ পার্বত্য জাতিদের নেতাসহ সুরমা নদীর উত্তর তীরে প্রতিরোধের জন্য অবস্থান নিতে নির্দেশ দেন। ইতোমধ্যে কাছাড় রাজাও সিলেট শাসক বায়োজিদের সাহার্যার্থে সৈন্য প্রেরণ করেন। শেখ কামাল এলাকার সামন্ত রাজা শত্রুজিত রায়সহ অন্যান্য জমিদারদের সাহায্যে শহরের বাহিরে দু’মাইল দক্ষিণে কদমতলায় সসৈন্যে অবস্থান নেন। সাতদিন ব্যাপী পাঠান মোগল তুমুল যুদ্ধের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে (যাকে সোহেলী এমনী বহিতে জায়নামাজ বিছিয়ে সুরমা নদী পার হওয়া বলা হয়েছে) মোগল সৈন্যগণ সুরমা নদী অতিক্রম করে ইয়াকুবের দূর্গ দখল করে। ইতোমধ্যে দৌলাম্বপুর/ দূর্লভপুরের যুদ্ধে মোগলদের কাছে খাজা উছমানের পরাজয় ও মৃত্যুর সংবাদ সিলেটে পৌছলে সিলেট শাসক ভূইয়া বায়োজিদ হতাশ হয়ে আত্মসমর্পণ করলে বায়োজিদের সুলতান উপাধি রহিত করে মোগল অধিনস্থ একজন সামন্তরূপে কাজ করতে দেওয়া হয়। বায়োজিদকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করার অপরাধে সেনাপতি কামাল কাছাড় আক্রমণ করে রাজ্যের প্রতাপগড় দূর্গ দখল করলে কাছাড় রাজা আত্ম

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT