ইতিহাস ও ঐতিহ্য

একটি বিলুপ্ত বিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০১৯ ইং ০১:৪৪:১৪ | সংবাদটি ১৯৪ বার পঠিত

সিলেটে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন শিক্ষানুরাগী ও রাজনীতিক দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী। ব্রিটিশ আমলে উত্তরপূর্ব আসাম অঞ্চলসহ বৃহত্তর সিলেটের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিমন্ডলে যে ক’জন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, দেওয়ান ছনুবুর রাজা তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁর চিন্তার ফসলস্বরূপ ‘দোহালিয়া এম ই বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ বিদ্যালয়টি ছিল ব্রিটিশ আমলে গ্রামীণ জনপদের ইংরেজী মাধ্যম এক অন্যন্য বিদ্যানিকেতন। অনেকে এই বিদ্যানিকেতনকে সিলেটের অক্সফোর্ড বলতেন। এখানে পড়াশোনা করে পরবর্তী সময়কালে বৃহত্তর সিলেটের বহু গুণীজন স্ব স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন।
ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত সুসাহিত্যিক বিদ্যাবিনোদ দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব (এম.এল.এ), খ্যাতনামা দার্শনিক ও জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, উকিল ও ম্যাজিস্ট্রেট গুরুচরণ চৌধুরী, বৃহত্তর আসামের আই.জি কুমুদ রঞ্জন চৌধুরী, জেলা প্রশাসক মন্নাথ কুমার, ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মনমোহন ছাড়া এই বংশের আরো অনেকে সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। দেশ ভাগ হওয়ার (১৯৪৭) পূর্ব এই বংশে হিন্দু মুসলিম মিলে বত্রিশ জন গ্রেজুয়েট ছিলেন। আজরফসহ তৎকালীন সিলেট অঞ্চলের বহু জ্ঞানী গুণীদের লেখাপড়ার হাতেখড়ি ওই বিদ্যালয়ে।
কালের বিবর্তনে ও শিক্ষানুরাগী দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরীর পরবর্তী প্রজন্মের উদাসীনতার কারণেই দোহালিয়া এম ই বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রমের বিলুপ্তি ঘটে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দোহালিয়া পরগনার তাদের পূর্ব রাজা প্রেমনারায়নের বংশধর রাজা কুশাল রায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে অনেক দিন যুদ্ধ করেন। তাঁর যুদ্ধে সঙ্গী ছিলেন পার্শ¦বর্তী বরাঘিয়া পরগনার রাজা গঙ্গা সিং। ব্রিটিশরা যখন তাদের বন্দী করে, তখন গঙ্গা সিং বন্দী অবস্থায় পদ্মানদীতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। রাজা কুশাল রায় হিরা বহর যুক্ত আংটি মুখে দিয়ে আত্মহত্যা করেন। বৃটিশ সরকারের গেজেটে উল্লেখ রয়েছে, বৃহত্তর সিলেট জেলার জমিদারদের মধ্যে রাজা কুশাল রায় ও গঙ্গা সিং উভয়েই (১৭৮৩-১৭৯৩) তারা স্বাধীনতার জন্য এ ত্যাগ শিকার করেন। কুশাল রায় ও গঙ্গা সিং ভারতের স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত না হওয়ার জন্য কোম্পানী সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের জমিদারদের মধ্যে অন্যতম বলে প্রতিয়মান হয়। এখানে উল্লেখ থাকা আবশ্যক, ভারতের কোম্পানী সরকারের বিরুদ্ধে সৈয়দ হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া ১৭৮২ সালে শহিদ হন।
১৮৭৪ সালে সিলেট জেলাকে ঢাকা ডিভিশন থেকে পৃথক করায় সিলেটের হিন্দু-মুসলমান সাধারণ জনগণ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। সে সময় দেওয়ান ছনুবুর রাজা ও পৃথ্বিমপাশার কিশোর জমিদার আলী আমজদ খাঁর পিতা নওয়াব আলী আহমদসহ অনেক হিন্দু মুসলিম নেতৃত্ব দেন। তৎকালে প্রতিবাদকে প্রশমিত করার জন্য তখনকার দিনে ভারতের বড় লাট লর্ড নর্থব্রুক রাজধানী কলকাতা থেকে সিলেটে এনে তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। তখন বড় লাট লর্ড নর্থব্রুক আশ্বস্থ করে বলেছিলেন, এখন থেকে সিলেটিদের হাইকোর্ট ও বিশ^বিদ্যালয় কলকাতায়ই থাকবে। লর্ড নর্থব্রুক সিলেটে আসাকে কেন্দ্র করে জমিদার নওয়াব আলী আহমদ সিলেটের সুরমা নদীর তীরে চাঁদনিঘাট নির্মাণ করেন। একই সময়ে গ্রামীণ জনপদে উচ্চ শিক্ষার আলো পৌছে দিতে দেওয়ান ছনুবুর রাজা বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত দোয়ারাবাজার উপজেলার ‘দোহালিয়া মধ্যবঙ্গ এম ই বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। এক সময় তিনিই ওই বিদ্যালয়কে উচ্চ ‘মধ্যবঙ্গ’ বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৭৪ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত তিনি এ বিদ্যালয়ের সেক্রেটারি ছিলেন। পরবর্তীতে প্রায় সত্তর-আশি বছর বিদ্যালয়টি টিকে থাকলেও নানাবিধ সমস্যায়, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় বিদ্যালয়টি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে সুরমা তীরে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন ক্রমশই বিলীন হয়ে যায়।
দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী (১৮৪৫-১৯৩০) বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার অন্তর্গত দোহালিয়া (পরগনার) পানাইল গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সুদূর অতীত থেকেই হাওরপাড়ের গ্রামীণ জনপদে সুরমা নদীর তীরে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে দোহালিয়ায় পূর্ব জমিদারদের দানে একটি টোল প্রতিষ্ঠিত ছিল। শিক্ষার প্রতি সেই অনুরাগ থেকে দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী ১৮৭৪ সালে পানাইলে (দোহালিয়ায়) এমই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পারিবারিক সূত্র ধরেই তিনি নিজেও তৎকালে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তখনকার দিনে স্টিমার যোগে কলকাতায় যেতে হলে সিলেট থেকে স্টিমার ছাতক, তাহিরপুর, জামালপুর, ধর্মপাশা হয়ে কলকাতায় যেত। তাই তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার পর ছাত্রদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে দুহালিয়ায় স্টিমার ঘাট সৃষ্টি করে স্টিমার ঘাটে টিকেট ঘরের জায়গা দান করেন। সেই সময় টিকেট মাস্টারের দায়িত্বে ছিলেন দোহালিয়া দারগা বাড়ির শ্রী জিতেন্দ্র চক্রবর্তী, পরবর্তীতে শ্রী রাজা সুবোধ চৌধুরী। জনসাধারণ এবং ছাত্রদের রাস্তায় যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য তৎকালে সুনামগঞ্জ লকাল বোর্ডকে অনুরোধ করে সুরমা নদীর তীরে স্টিমার ঘাট থেকে এমই স্কুলের পাশ দিয়ে দোয়ারাবাজার খেয়াঘাট পর্যন্ত ও এই রাস্তার পশ্চিম দিকে সরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত বর্ধিত করে নিজস্ব ভূমির উপর প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করান। যাতে করে ছাত্ররা স্টিমার থেকে নেমে সহজেই স্কুলে যেতে পারে। তিনি তার সময়কালে সরকারি হাসপাতালে জায়গা দান করেন। হাসপাতালে যাওয়ার রাস্তা নিজে মোকদ্দমা করে বাহির করেন, পানাইল মৌজা ও করালী মৌজায় সরকারি পুকুরের জায়গা ও অন্যান্য জায়গায় অনেক স্কুল, মসজিদ ও কবরস্থানের জায়গা দান করেন। পানাইল (দোহালিয়া) রাজবাড়ী দুইটি প্রথা প্রচলিত ছিল যা দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরীর রাজত্ব কাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।
দেওয়ান ছনুবুর রাজা লেখাপড়া করেন পূর্ব পুরুষদের প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক ক্বওমি মাদরাসায়। পরে তিনি সিলেটে তাঁর অপর ভাই দেওয়ান মোহাম্মদ মসউদ রাজা চৌধুরীর সঙ্গে তখনকার দিনে সিলেটের কালীঘাটে বাস করে ইংরেজি পড়তেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকাতে চলে যান এবং ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে কুরআন-হাদিস, তফসির ও ফিকাহ শাস্ত্রের পান্ডিত্য অর্জনের পাশাপাশী ইংরেজিও অধ্যয়ন করতে থাকেন। ১৮৬৫ সালে তিনি এনট্রান্স পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতকালে তৎকালীন ঢাকার ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে ডেকে নিয়ে ঢাকার সাব রেজিষ্ট্রারের পদ প্রদান করেন। পরবর্তীকালে এনটান্স পাসের পর তিনি ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক হন। অতঃপর তিনি ঢাকার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন।
এখানে উল্লেখ্য যে, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো বর্তমান দোয়ারাবাজার উপজেলার পানাইল ‘দোহালিয়ার মধ্যবঙ্গ’ (পরবর্তীতে উচ্চ মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়) ও পানাইল জমিদার বাড়ীর ক্বওমি মাদ্রাসা। যা সুনামগঞ্জ মহকুমার তথা সুনামগঞ্জ জেলায় এর আগে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তথাপি দোহালিয়া পরগনার জমিদার বংশের লোকেরা সুদূর অতীত হতেই শিক্ষা দীক্ষায় অগ্রসর ছিলেন। তাই প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়েছিল বলে প্রতিয়মান হয়। দোহালিয়া পরগনার জমিদার রাজা মোহাম্মদ ইসলাম (পানাইল) জমিদার বাড়ীতে ১৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে খানে বাড়ী জামে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখ্য যে, রাজা প্রেম নারায়ণ চৌধুরী নাম পরিবর্তন করে রাজা মোহাম্মদ ইসলাম ও তার অনুরোধে তাঁর অন্তরঙ্গ সাথি পানাইল উত্তরপাড়া নিবাসী উদয় দাসও নাম পরিবর্তন করে মোহাম্মদ নজিম রেখে সিলেটের তৎকালীন ফৌজদারের নিকট ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। যার ফলে উভয়ই জ্ঞাতি হিন্দু পরিবার হইতে বিতাড়িত হয়ে রোষানলে পড়েন। রাজা মোহাম্মদ ইসলাম ও মোঃ নজিম বাধ্য হয়ে নিরাপত্তার জন্য গভীর জঙ্গলে নিকটস্থ জায়গা হতে মাটি খনন করে খননকৃত জায়গার পাশে থাকার জন্য ভিট করে ঘর তৈরী করেন (১৭০৫)। পরবর্তীতে ঘরসহ এই ভিটকে দুহলী (ওয়াকফ) করে মসজিদে দিয়ে দেন। এই দুহলী অর্থাৎ ওয়াকফ হইতে দোহলীয়া পরগনার নাম হয়। মসজিদ ও গর্তটি দুহালিয়া মুসলিম রাজ পরিবারের খানে বাড়ী জামে মসজিদ ও গর্ত কালের স্বাক্ষী হিসাবে আজবধি বহন করছে। প্রায় তিনশত বৎসরের অধিক সেই স্থাপত্য শিল্প নির্মিত মসজিদ ও (গর্ত) পুকুরটি এখন বিদ্যমান। যার ফলে এখান থেকেই পানাইল সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্মের শিক্ষা ও সংস্কৃতির গোড়া পত্তন হয়।
রাজা মোহাম্মদ ইসলাম অত্যন্ত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁর দুই সন্তান মোহাম্মদ বাছির ও নাছিরকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় আরবি ও ফার্সি শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। বাছির সাহেব তাঁর সন্তান রাজা মোহাম্মদ নাজিম উরফে মাছুমকে উচ্চ শিক্ষার জন্য মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে পড়াশোনা করান। অত্যন্ত সুনামের সহিত ফার্সি শাস্ত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করেন। তখনকার দিনে বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব আলিবর্দি খা ও রাজা মোহাম্মদ নাজিম চৌধুরী উরফে মাছুম সাহেব একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একসাথে পড়াশোনা করেন। মাছুম সাহেব এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষা অর্জন করায় নওয়াব আলিবর্দি খা তাকে দেওয়ান অর্থাৎ রাজস্ব মন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন এবং পরে বাড়িতে আসার সময় তিনটি উপহার দেন। তিনটি উপহারের মধ্যে প্রথমটি হাতির দাঁতে তৈরী পাখা, দ্বিতীয়টি মোহর, তৃতীয়টি হাতির দাঁতের তৈরী সুরমাদানী। এরই মধ্যে প্রথমটি সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ও মতিন উদ্দিন আহমদ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। অন্যগুলো বিলুপ্ত। দোহালিয়ায় বহু পূর্ব হতেই জমিদারদের দানে একটি টোল প্রতিষ্ঠিত হয়। যেটি ছিল এখানকার সংস্কৃতি শিক্ষার প্রাথমিক পাঠশালা। বহুবছর এ পাঠশালায় শিক্ষা-দীক্ষা অব্যাহত ছিল। এর সূত্র ধরেই পরবর্তীকালে পানাইলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার গোড়াপত্তন ঘটে বলে প্রতিয়মান হয়। রাজা প্রেম নারায়ণ রায় চৌধুরীর ইসলাম গ্রহণের পর তারই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পানাইলে একটি দ্বীনি বিদ্যাপীঠ (মাদরাসা) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ধারণা করা হয় এসময় থেকে এ অঞ্চলে সর্বপ্রথম মাদ্রাসা শিক্ষা বা ধর্মীয় শিক্ষার বিকাশ ঘটে এবং এটিই এই অঞ্চলের প্রথম মাদরাসা। এই মাদরাসায় কুরআন-হাদীস, ফেকাহ শাস্ত্রের একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত ছিল। যদিও কালের বিবর্তনে পুরনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই বিলীন হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য যে, ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে দোহালিয়ার পানাইলে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত ‘মধ্যবঙ্গ’ স্কুলটি এক সময় উচ্চ মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। এ বংশেরই দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী নিজস্ব ভূমিতে নিজের অর্থায়নে সুনামগঞ্জ মহকুমার সাবেক ছাতক থানার বর্তমান দোয়ারাবাজার উপজেলার পানাইলে (দোহালিয়ায়) প্রথম এম ই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ স্কুলে তৎকালীন ছাত্রসংখ্যা আনুমানিক দুইশত জনেরও অধিক ছিল। ছনুবুর রাজা সাহেব ছাত্রদের সবধরনের সুযোগ সুবিধা করে দিতেন। যে কারণে পরবর্তীতে উচ্চ মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয় হিসেবে উন্নীত হয়। এই বিদ্যালয়ে এম ই স্কুল পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত ছিল।
বৃহত্তর সিলেটে ইংরেজ আমলে পানাইলে প্রথম ‘দোহালিয়া এমই বিদ্যালয়ে’ পড়াশোনা করে তৎকালে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে স্বস্ব ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন অনেকেই। এ স্কুল থেকে জ্ঞানলাভ করে বেশ কয়েকজন কৃতী বিদ্যা ব্যক্তি সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার বিন্নাকুলি গ্রামের সার্ক জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন-এর সভাপতি হাসান শাহরিয়ারের বাবা সাংবাদিক মকবুল হোসেন চৌধুরী, নবীগঞ্জ উপজেলার কসবা গ্রামের কৃতী সন্তান, আসাম সরকারের মন্ত্রী, বিভাগ পরবর্তী ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রদূত জনাব মদব্বির হোসেন চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর সহোদর নজমুল হোসেন চৌধুরী, হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ থানার দেবপাড়া ইউনিয়নের জিনারপুর সদরঘাট গ্রামের দেওয়ান আব্দুল বারী চৌধুরী ছুনই মিয়া, তিনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। বৃহত্তর সিলেট জেলার স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার, ঢাকা দক্ষিণের গিয়াসউদ্দিন সাহেব, সুনামগঞ্জ জেলার দুর্গাপাশা ইউনিয়নের দুর্গাপাশা গ্রামের প্রাক্তন ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুর রশিদ চৌধুরী, হেডমাস্টার আব্দুর রাজ্জাক, সুনামগঞ্জ গার্লস স্কুলের হেড মাস্টার বাবু, দেওয়ান একলিমুর রাজা (কাব্য বিশারদ), দেওয়ান আফতাবুর রাজা, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার ছৈলা গ্রামের মফিজুর রহমান চৌধুরী, তিনি সুনামগঞ্জ বারের দ্বিতীয় মুসলিম উকিল ছিলেন। তৎকালীন পানাইল গ্রামের সৈয়দ বাড়ীর সৈয়দ শমশেদ হোসেন, সৈয়দ জমশেদ হোসেন, সৈয়দ নওশেদ হোসেন ও সৈয়দ তরশেদ হোসেন পড়াশোনা করেন। তাদের বড় ভাই সৈয়দ শমশেদ হোসেন পরবর্তিতে স্কুলে শিক্ষকতাও করেন। তৎকালে সুনামগঞ্জ মহকুমাসহ বৃহত্তর সিলেটের অন্যান্য জায়গায় এ ধরনের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ছিল না। পড়াশোনায়, আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানে সুনাম অর্জন করায় অনেকে এই স্কুলকে সিলেটের অক্সফোর্ড বলতেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় দেওয়ান ছনুবুর রাজা সাহেবের মৃত্যুর পর এ স্কুলটি আর্থিক দৈন্যদশায় পতিত হয়। এতে এই অঞ্চলের গরিব মেধাবী ছাত্রদের পক্ষে এখানে বসবাস করে পড়াশোনা করা ভীষণ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে তাঁর উত্তরাধিকারীরা এ স্কুলটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেননি। দেওয়ান ছনুবুর রাজা জনগণের স্বার্থে এবং তাঁদের ডাকে রাজনীতি করেছেন, রাজপথেও দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন, নিষ্ঠাবান ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে আজীবন নিজস্ব অর্থ ও শ্রম ব্যয় করেছেন। কিন্ত তার জন্য কোনও প্রশংসা বা উপাধি গ্রহণ করতে চাননি। শিক্ষাদানে তাঁর এত উৎসাহ ও আগ্রহ ছিল যে, তিনি তাঁর পুত্রদ্বয় দেওয়ান রইছুর রাজা ও দেওয়ান রউফুর রাজাকে স্কুল দিতেন। পড়াশোনায় অনাগ্রহতা দেখলে তাদেরকে বেত্রাঘাত করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। দেওয়ান রউছুর রাজা চৌধুরী ১৯২০ সালে ঘোড়ার সিফতের উপর একটি বই রচনা করেন। তাঁর ছোট ভাই এই এলাকার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অনেক দিন সরফ-ফাইজ ছিলেন। তার রচিত একটি গীতিকাব্য পান্ডুলিপি রয়েছে। গ্রামের ও বিভিন্ন এলাকার লোকদের নিয়ে তার স্মরচিত গীতিকাব্যকে নিয়ে গানের আসর বসাতেন। তাঁর মেয়েদেরকে তিনি শিক্ষিত বরের কাছে পাত্রস্থ করেন। এটিও তাঁর শিক্ষানুরাগের বহিঃপ্রকাশ। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে হয়ত বা এই বিদ্যাপিঠটি থাকলে কালের আবর্তে স্কুল-কলেজ থেকে বিশ^বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হতো।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT