উপ সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সমস্যা ও করণীয়

ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুল মালিক প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৩-২০১৯ ইং ০০:০৮:১৫ | সংবাদটি ২৭ বার পঠিত

যেকোনো দেশ বা জাতির সমৃদ্ধির জন্য তার জনগোষ্ঠীকে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত অর্থাৎ সৃজনশীল, নৈতিকতাসম্পন্ন, আলোকিত মানুষ এবং অবশ্যই শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। তা না হলে দেশটি কখনোই কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে না। এ লেখায় আমি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সমস্যা ও করণীয় বিষয়ে কিছু আলোকপাত করব।
একসময় বাংলাদেশে প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল সংক্রামক রোগ। মূলত জরুরি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সরকারি-বেসরকারি নানামুখী পদক্ষেপ ও জোরালো প্রচারের ফলে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নির্মূলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছে। বিশেষ করে, টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমানো এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মতো উদ্ভাবনী মডেল বিশ্বে প্রশংসা অর্জন করেছে। এইডস-এর মতো মারণব্যাধিও এদেশে বিস্তার লাভ করতে পারেনি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে রোগের ধরণে পরিবর্তন এসেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মানুষের জীবনাচরণ ও খাদ্যাভ্যাসে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। তামাকের বহুল ব্যবহার, অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত (চর্বি ও চিনি) খাদ্য গ্রহণ, অত্যধিক লবণ গ্রহণ, কায়িক শ্রমের অভাব, মানসিক চাপের মতো ঝুঁকিগুলো বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং স্মার্টফোন ও অনলাইন মাধ্যমগুলোতে আসক্তির ফলে মাঠে খেলাধুলা কমে যাওয়ায় অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশ দূষণও অসংক্রামক রোগের কারণ। আমরা জানি, বিশ্বজুড়ে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী কয়েকটি অসংক্রামক ব্যাধি; যেমন: হূদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগ (সিওপিডি)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬৭ শতাংশ মৃত্যুর কারণই হচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধি। এর মাঝে ৩০ ভাগ হূদরোগে, ১২ ভাগ ক্যান্সারে, ১০ ভাগ শ্বাসতন্ত্রের জটিলতায়, এককভাবে ডায়াবেটিসে ৩ ভাগ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগে ১২ ভাগ মৃত্যু হয়।
এই হিসাবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে ৫ লাখ ৭২ হাজার ৬০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। আশঙ্কার কথা হচ্ছে, এর মাঝে ২২ শতাংশই হচ্ছে অকালমৃত্যু। এর ফলে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জটিল ও ব্যয়বহুল এসব রোগের কারণে তাত্ক্ষণিকভাবে মৃত্যু না হলেও শারীরিক, মানসিক এবং রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়বাবদ অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে মানুষ। আর একবার এসব রোগে আক্রান্ত হলে তা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, অনেক সময় পুরোপুরি নিরাময়ও করা যায় না।
অসংক্রামক রোগের এই বিস্তার দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জনগণের সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অসংক্রামক ব্যাধি কোনো একক কারণের ফলে হয় না। এর পিছনে রয়েছে বহুবিধ কারণ, যা নানাভাবে ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলে। যেমন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অসংক্রামক রোগগুলোর অধিকাংশের পিছনেই তামাক ও পরোক্ষ ধূমপান দায়ী। তাই উন্নত চিকিৎসা সুবিধার পাশাপাশি এই বহুবিধ কারণগুলোকে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ না করলে অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।
এজন্য স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ, বিশেষ করে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের (এসকাপ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক জরিপ ২০১৮ অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ সবচেয়ে কম, মাত্র ০.৮ শতাংশ। এ অঞ্চলে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি মালদ্বীপে, জিডিপির ১০.৮ শতাংশ। ভারতে ১.৪ শতাংশ, নেপালে ২.৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ২ শতাংশ, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে ২.৯ শতাংশ এবং পাকিস্তানে জিডিপির ০.৯ শতাংশ। আমাদের মনে রাখা উচিত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সুফল তাত্ক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না, বরং এর ফল সুদূরপ্রসারী। তাই জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থেই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং সেই অর্থের যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একদিকে যেমন আধুনিক চিকিত্সা সেবার ব্যবস্থা করতে হবে; অন্যদিকে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের কাজেও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা দরকার। এসবের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা, প্রচারণা ও জনসচেতনতা তৈরিতে অর্থ ব্যয় করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দক্ষ মানবশক্তির বিকল্প নেই। এজন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি অর্থাৎ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক, টেকনিশিয়ান গড়ে তুলতে সরকারের মাস্টারপ্ল্যান করা দরকার।
সরকারকে একদিকে যেমন জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে এবং তাদের গুণগত মান এবং সেবা ফিও তদারকি করতে হবে। তাহলেই মানুষ প্রকৃত সুফল পাবে। তা ছাড়া, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের ওষুধ, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণ, স্বাস্থ্য বিমা ও সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ঋণ প্রবর্তনে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আরেকটি বিষয় হলো, দেশে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের কারণে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বার্ধক্যজনিত রোগের ঝুঁকিগুলোও বেড়ে যাচ্ছে। সরকারকে এদিকেও নজর দিতে হবে। তা ছাড়া ২০১৬ সালে ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় স্পিকারদের সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার লক্ষ্যে রোডম্যাপ তৈরি করে তা বাস্তবায়ন অতি জরুরি। সর্বোপরি, পুরো স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান করা প্রয়োজন।
তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, সরকারের একার পক্ষে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থাকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মতো বিশেষায়িত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। এমনকি সরকারের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রণালয়কেও এইকাজে সম্পৃক্ত করা আবশ্যক। এখানে উল্লেখ্য, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে চিকিত্সা পেশাজীবীদের ১১টি সংগঠন নিয়ে ‘বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর এনসিডি কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (বিএনএনসিপি) এবং পাঁচটি সংগঠন নিয়ে ‘ইউনাইটেড ফোরাম অ্যাগেইনস্ট টোব্যাকো’ গঠন করা হয়েছে। সংগঠন দুটি দেশে অসংক্রামক রোগ ও তামাক নিয়ন্ত্রণে নানামুখী কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের উচিত এধরনের সংগঠনকে উত্সাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। মূল কথা হচ্ছে, সমন্বিতভাবে অসংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
এক্ষেত্রে ব্যক্তি পর্যায়েও আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অসংক্রামক রোগসমূহ বৃদ্ধির কারণ মূলত আমাদের জীবনাচরণের মাঝে নিহিত। ঘর থেকে বের হয়েই বাস, রিকশায় না চড়ে তিন-চার মাইল হাঁটতে হবে। দিনে কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটা বা কায়িক পরিশ্রম জরুরি। ভাজা-পোড়া অস্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবর্তে ফলমূল, স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। ফল বলতে শুধু আঙুর-বেদানাই নয়, আমাদের দেশীয় ফলেরও অনেক উপকারিতা রয়েছে। সেগুলো খেতে হবে। অতিরিক্ত লবণ পরিহার করা প্রয়োজন। এছাড়া আমাদের শারীরিক ওজন নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। গণমাধ্যম এসব ক্ষেত্রে জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে আমরা দেশ ও জাতিকে অসংক্রামক রোগ থেকে দূরে রাখতে পারব।
লেখক : জাতীয় অধ্যাপক। প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ সাবেক উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ১৯৭১-এর সেই ভয়াল রাত
  • স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম
  • মুক্তিযুদ্ধে পরদেশি বন্ধু সঙ্গীতশিল্পী
  • সড়ক দুর্ঘটনার দায় ও দায়িত্ব
  • সন্ত্রাসবাদের নির্মমতা ও বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ
  • একজন মারুফ জামানের ফিরে আসা
  • তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি
  • চোপড়া-জোলিরা কিসের বার্তা দিয়ে গেলেন?
  • জীবন থেকে নেওয়া
  • প্রাসঙ্গিক কথকতা
  • সিলেট বিভাগের শিল্পায়ন ও সম্ভাবনা
  • আমরা কি স্বাধীনতার অর্থ খুঁজি?
  • বৈশ্বিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ প্রয়োজন
  • হুমকির মুখে ভোলাগঞ্জ মহাসড়কের দশ নম্বর এলাকা
  • পাসপোর্ট ভোগান্তি
  • শিশুশিক্ষায় শাস্তি পরিহার বাঞ্ছনীয়
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  • ভোগবাদী বিশ্বায়ন বনাম লোকসংস্কৃতি
  • সমাবর্তনে শুভ কামনা
  • উন্নয়নে যুবসমাজের ভূমিকা
  • Developed by: Sparkle IT