শিশু মেলা

বেজির বাসায় দুটি ছানা

শরীফ খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৩-২০১৯ ইং ০০:১৩:২১ | সংবাদটি ২৬১ বার পঠিত

বিশাল একটা বাগান। সেই বাগানে বড় একটা তেঁতুল গাছ। গাছটির গোড়ায় একটি কোটর। ওটাই বেজিদের বাসা। সেই বাসায় বেজির দু’টি ছানা। ওদের বয়স ১০ দিন। ছ’দিন বয়সে ওদের চোখ ফুটেছিলো। ন’দিন একটানা মায়ের দুধ পান করেছে। এখন মাছ-ব্যাঙ খেতে পারবে। মা-বাবা তাই বাইরে গেছে। ছানাদের জন্য মাছ-ব্যাঙ আনবে। ইঁদুর আনবে। পাখির ডিম-ছানাও আনতে পারে। হাঁস-মুরগির ডিম-ছানা পেলে তো আনবেই।
ছানা দুটি খুশিতে তাই মজার খেলায় মেতেছে। বিড়াল ছানাদের মতোই খেলে ওরা। এই কোটর থেকে বাইরে আসছে, আবার ঢুকছে। এই গাছ বেয়ে উঠে যাচ্ছে কিছুটা, লাফ দিয়ে নামছে আবার। আর মাত্র সাত-আটদিন। তারপরে মা-বাবার সঙ্গে শিকারে বেরুবে। মা-বাবার লেজে লেজে হাঁটবে। মায়ের দুধ তখন আর পান করা চলবে না। নিজেরাই শিকার করা শিখবে।
মা-বাবা ফিরলো বাসায়। বাবার মুখে ধরা একটি হাঁসের ছানা। মায়ের মুখে একটি মুরগির ডিম। ছানারা খুশিতে লাফাতে লাফাতে হামলে পড়লো খাবারের ওপরে।
বাসার বাইরে বসলো মা-বাবা। ভীষণ বিপদ গেছে আজ। হালদার বাড়ি থেকে ডিম ও হাঁসের ছানা চুরি করেছে। আজ নিয়ে ওই বাড়ির দশটি হাঁস-মুরগির ছানা চুরি করেছে। ডিম চুরি করেছে এগারোটি। ওই বাড়িতে কুকুর নেই। তবে বাড়িভরা মানুষ। ছেলেপুলেও অনেক। ক্ষেপে গেছে সবাই। আজ তো একটি মেয়ে লাঠি হাতে তেড়ে এসেছিলো। একটি ছেলে গাছি-দা ছুড়ে মেরেছিল। শরীরে লাগলে খবর ছিলো!
তবুও চুরি তো করতেই হবে। এই বয়সে ছানাদের ডিম-ছানা খাওয়াতে হয়। না হলে ছানারা তাড়াতাড়ি বাড়ে না। গাছে চড়ে অবশ্য পাখির ডিম-ছানা আনা যায়। পাওয়া তো যায় না সহজে। কাছিমের ডিম হলেও চলে। গুইসাপের ডিমও খুব ভালো। ওরা তো আবার মাটি খুঁড়ে ডিম পাড়ে মাটির তলায়। সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। পেলেও পায়ের নখর দিয়ে গর্ত খুঁড়তে হয়।
রাত পেরিয়ে ভোর হলো। মা-বাবা শিকারে বেরুলো। চলে এলো সেই শিকদার বাড়িতেই। উঠোনে একটি বড় খাঁচা রাখা। সেই খাঁচায় ভরা আট-দশটি তুলতুলে মুরগির ছানা। টিউ টিউ করে ডাকছে। জিভে জল এলো। উঠোনে কেউ নেই। বাবা বেজি এগিয়ে গেলো। ঢুকে পড়ল খাঁচায়। মুখে ধরলো একটি ছানা। অমনি পেছন দিকের দরজা আটকে গেল। ফাঁদ এটি! বেজিটা ভয় পেল। আড়ালে থাকা ছেলেপুলেরা হই হই করে দৌড়ে এলো। এতোদিনে আটকেছে বেজিকে! কঠিন সাজা দেবে।
বাড়ির বড়রাও এলেন। ছেলেপুলেরা পিটিয়ে মারতে চায়। এক দাদা বললেন, ‘মারা যাবে না। আইনেও নিষেধ। বেজি উপকারী প্রাণী। বিষধর সাপ মারে। সাপের ডিম খায়। ধান ক্ষেতের ইঁদুর খায়।’
‘তাহলে কি ছেড়ে দেব এটাকে’- বলল একটি ছেলে। অন্য একটি মেয়ে বললো, ‘দাদাজান। ডিম-ছানা মিলে এটা একুশটা শিকার তুলে নিয়ে গেছে!’
দাদা হাসলেন। পেটের দায়েই তো ওরা এ কাজ করে। তাছাড়া এটার বাসায় হয়তো ছানা আছে। ছানারা খালি ‘খাই খাই’ করে যে।
‘তাহলে এটাকে এখন কী করবেন’- বললো আরেকটি মেয়ে।
দাদা হাসলেন। বললেন, ‘আলতা ভরা একটা বোতল নিয়ে আয়।’
আলতার বোতল এলো। দাদা কৌশলে খাঁচা থেকে মুরগির ছানাগুলোকে বের করলেন। তারপরে ভীত বেজিটার শরীরে ঢেলে দিলেন আলতা। ছেলেপুলেরা খুশিতে লাফালাফি জুড়ে দিলো। হাততালি দিলো। বেজিটা তো এখন ‘আলতা বেজি’ হয়ে গেছে। দাদা বললেন, ‘অভিনব সাজা দিলাম। ছেড়ে দিলে পালাবে। বেজি সমাজ একে আর দলে নেবে না। এই, আরেক বোতল আলতা আন।’
আরেক বোতল এলো।
দাদা এবার ভালো করে আলতা ঢাললেন। বললেন, ‘আলতা রঙটা দু’মাসের আগে মুছবে না।’
দাদা ফাঁদের মুখ খুলে দিলেন। বেজিটা দৌড়ে পালালো। বাসায় ফিরলে ছানারা চিনলো না। ভয় পেলো। বাবা তখন মাকে কানে কানে কিছু কথা বললো। তারপরে দূরের একটা বাগানে চলে গেলো। ঝোপের তলায় বসে বসে ভাবছে। উপায় কী এখন! অমনি মাথায় একটা আইডিয়া এলো। কাছেই জেলেপাড়া। ওখানে এলো। মাটির চাড়িতে আঠা জল। দেশি গাব ঢেঁকিতে ছেঁচে জলে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে। জেলেরা জাল ভেজায় এই গাব আঠা জলে।
বেজিটা একটি চাড়িতে নামলো। গলা অবধি ভেজালো। সামনের দু’পা দিয়ে মাথায় মাখল জল। তারপরে উঠলো। রোদে বসে শরীর শুকালো। বাহ! আঠা জল শুকিয়ে লোম শক্ত হয়ে গেছে। খাড়া খাড়া! মাথার লোমগুলো যেন সিংহের কেশর। লেজের লোম ফুলে কাশফুল। এবার আর বেজিটাকে ঠেকায় কে! শরীরের রঙ এখন আলতা-কালো।
বেজি ফিরে এলো সেই বনে। একটা গুইসাপ কাছে এলো। বেজিকে দেখে অবাক। বললো, ‘তোকে কেমন বেজি বেজি লাগছে!’
বেজি বলল, ‘বেজি বটে। তবে আমি সাধু বেজি।’
গুইসাপটি হাসলো। বললো, ‘সাধু বেজি! মানুষ সাধু দেখেছি। মাথায় ঝাঁকড়া চুল থাকে। কোনো প্রাণীকে তো সাধু হতে দেখিনি। সাধু হলি কীভাবে?’
‘আরে গুইসাপ দাদা! বয়স হয়েছে না! সবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। বাদাবনে চলে গেলাম। দু’বছর থাকলাম। গুরুদেবকে মাছ-কাঁকড়া ধরে খাওয়ালাম। পা টিপে দিলাম। তাঁর সঙ্গে সাধনা করলাম। তাঁর পরেই না সাধু হলাম!’
‘তা তোর গুরুদেবটা কে?’
‘বাদাবনের রাজা। বাঘদেব।’
‘সাধুবাঘ’?
‘নয়তো কী? বাদাবনে আছেন বনবিবি। তিনি বাদাবনের রানী। হাজার বছরে তিনি একটা বাঘকে সাধু করে দেন। সেই সাধু বাঘ হরিণ খাওয়া ছেড়ে দেয়। ওই সাধু বাঘের পিঠে চড়ে বনবিবি বনবিহার করেন।’
‘বলিস কী বেজি!’
‘আরে গুইসাপ দাদা! আমিও তো এখন নিরামিষাশী। মাছ-মাংস-ডিম নিষেধ। খাব শুধু পোকা-মাকড়। বুঝলে গুইসাপ দাদা, সবই সাধনার ফল। সাধনার বলে আমার চেহারা দেখ! সাধু সাধু লাগছে না! সারা শরীরে জটা এখন।’ গুইসাপ বললো, ‘তাহলে সাপও মারবি না আর?’
‘তা তো মারবই। কাছিমের ডিম খাব না। তোমাদের ডিমও খাব না মাটি খুঁড়ে।’
গুইসাপ মেনে নিল সব কথা। বেজিকে তো সাধুর মতোই লাগছে। সাধুরা অনেক কিছু পারে। বোকাটারও তাই সাধু হবার শখ হলো। বলল, ‘ও সাধু বেজি। তুই আর আমি সাপ মারি। সাপের ডিম খাই। মুরগি ছানা খাই। তুই আর আমি তাই মিতা না?’
বেজিটি মাথার ঝাঁকড়া-কোঁকড়া লোমে ঝাঁকুনি তুললো।
গুইসাপ আবারও বললো, ‘তাহলে আমাকে তোর শিষ্য করে নে। আমিও সাধু হতে চাই।’
বেজিটি মনে মনে হাসলো। এই তো চাইছে সে। বললো, ‘টানা ছ’মাস আমাকে পোকা খাওয়াতে হবে। আরও আনবে হাঁসের ছানা, মুরগির ছানা। এগুলো প্রতি রাতে পাঠাবো বাদাবনে। বাঘ সাধু ওগুলোকে লালন করবে। সাধুদের অনেক রকম শখ থাকে তো! আর রোজ আমাকে তোর পিঠে চড়িয়ে বাগানবিহার করাবি।’ গুইসাপটি রাজি হলো। এসব করলে বেজি সাধু হয়তো কোনো ‘বর’ দেবে! বেজি তো মহাখুশি। বসে বসে খাওয়া যাবে। বউ এখানে আসবে। গোপনে খাবার নিয়ে যাবে। ছানাদের খাওয়াবে। দু’তিন মাস পরে শরীরের রঙ যাবে মুছে। লোমগুলো নরম হবে। তখন আবার সেই আগের বেজি। সমাজে মেশা যাবে। আবারও শিকার করা যাবে- হাঁসের ছানা, মুরগির ছানা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT