উপ সম্পাদকীয়

ভূরাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে ইরান-আজারবাইজান

রায়হান আহমেদ তপাদার প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৩-২০১৯ ইং ০১:২১:১৬ | সংবাদটি ২৮ বার পঠিত

আজারবাইজান তেলসমৃদ্ধ। দেশটি রাসায়নিক দ্রব্য, মেশিনারি, আঙ্গুর ও শাকসবজি, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস, নন-ফেরাস মেটাল, তেলকূপের যন্ত্রপাতি, সিমেন্ট, ফেব্রিক্স, কটন, পাহাড়ি লবণ, মার্বেল, লাইমস্টোন ও নির্মাণ সামগ্রী রফতানি করে থাকে। ইরানের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়াতে প্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলো ইরান হয়ে ইরাক ও পাকিস্তানে সহজে পরিবাহিত হতে পারবে। আজারবাইজানের সাথে পাশের খ্রিস্টান অধ্যুষিত দেশ, আর্মেনিয়ার বিরোধ বহুদিনের। বিশেষ করে নাগার্নো কারাবাখ নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ চলে আসছে। পশ্চিমের অনেক দেশ আর্মেনিয়াকে অস্ত্র সহায়তা দিয়ে আসছে। সে তুলনায় আজারবাইজান সহায়তা পায়নি। আজারবাইজান একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাশিয়া তখন আজারবাইজানের তেল শোষণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে। অথচ প্রয়োজনের সময় রাশিয়া তাদের সহায়তা না দিয়ে আর্মেনিয়াকে সাহায্য করছে। কিছু দিন আগে রাশিয়া আর্মেনিয়াতে মিসাইল ঘাঁটি স্থাপন করেছে। ইরান ও তুরস্ক আজারবাইজানে সাহায্য সহায়তা করতে পারে। কিন্তু উভয় দেশ রাশিয়ার সাথে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ। আজারবাইজান আরো সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য মুসলিম দেশগুলোর সহায়তা প্রয়োজন। এমন এক সন্ধিক্ষণে ইরান এগিয়ে এসেছে এবং আজারবাইজানের সাথে তার নতুন করে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। আজারবাইজানকে আগুনের দেশ বলা হয়, কারণ আজারবাইজানের রাজধানী বাকুর কাছাকাছি ইয়ানার দাগ নামের স্থান থেকে অবিরাম আগুন নির্গত হচ্ছে।
এই স্থানটি জ্বলন্ত পর্বত নামেও খ্যাত। আগুনের হলকা ও ফুলকি তিন মিটার পর্যন্ত ওপরে ওঠে।১৩ শতাব্দীতে পর্যটক মার্কোপলো এখানে এসেছিলেন। তখনো তিনি এই ‘রহস্যময়’ আগুনের ফুলকি দেখে তা ভ্রমণ কাহিনীতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।কয়েক শতাব্দী পর ফ্রান্সের বিখ্যাত লেখক আলেকজান্ডার দুমাও এই রহস্যময় অগ্নিশিখার উল্লেখ করেছেন। অগ্নি উপাসকেরা এতে দুই হাজার বছর ধরে অর্ঘ্য দিয়ে আসছে। সোভিয়েত আমলে বিজ্ঞানীরা প্রচুর তেলের সন্ধান পেলে পুরো এলাকার তেল মস্কো সরকার শোষণ করে নিয়ে যায়। ফলে শিখার তেজ কমতে কমতে শূন্যে চলে আসে। আজারবাইজান সরকার এই শিখা চালু রাখার জন্য অন্য কূপ থেকে গ্যাসের সরবরাহ বজায় রেখেছে। এই অঞ্চলে কোনো পর্যটক এলে বাকুর প্রজ্বলিত শিখা না দেখে যান না। স্থানীয় এক কফি হাউজ থেকে পর্যটকরা এই প্রজ্বলন দেখে থাকেন। ইয়ানার দাগে আগুনের ১০ মিটার লম্বা দেয়াল হাজার হাজার বছর ধরে জ্বলছে।
আজারবাইজানের আরেক বড় সমস্যা পানীয় জল। ৮.২ মিলিয়ন নাগরিক এর সঙ্কটে। তেলের পাইপলাইনের নিঃসরণ এবং সংরক্ষিত ট্যাংকের ‘লিকেজ’ ভূগর্ভের পানি অবিরত দূষিত করছে। অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার, কারখানার বর্জ্য ইত্যাদি নদীর পানি দূষিত করছে। সমুদ্রের লবণাক্ততা পানীয় জলের পাইপ লাইনকে বিনষ্ট করছে। এ সব মিলিয়ে রাজধানী বাকুসহ আজারবাইজানের পানীয় জলের সঞ্চালনব্যবস্থা বড়ই নাজুক।
কিন্তু পানীয় জলের স্বল্পতা এবং পাইপলাইনে কম পানি সরবরাহের কারণে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া কলেরা ও হেপাটাইটিস রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটাচ্ছে। পানীয় জলে ‘মেটালের’ উপস্থিতির কারণে ক্যানসার রোগেরও প্রাদুর্ভাব হচ্ছে। এই সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য ইরানের সহায়তায় ক্যাসপিয়ান সাগর থেকে পানি সরবরাহের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে তেলসমৃদ্ধ ইরানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে আজারবাইজানিরা উৎসাহবোধ করছে। কিন্তু ইরানি সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ মোহাম্মদ বাকেরি ৯ জানুয়ারি আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি এর আগে আরো দুবার রাজধানী বাকুতে সরকারি সফরে গিয়েছিলেন। বলতে গেলে তিনি এই নতুন সম্পর্কের ভিত গড়েছেন। বাকেরি অনেক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন করেছেন। এগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ছাড়াও সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তিও রয়েছে।১৯৯১ সালে আজারবাইজা নের স্বাধীনতার পর ২৭ বছরে, কোনো ইরানি উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার প্রথম সফল সফর হলো এবার। বাকেরি আজারি প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জাকির হাসানভের সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটালেন। মনে করা হচ্ছে- পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ২০১৮ সালে উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের সফর বিনিময়ের কারণে উভয় দেশ কাছাকাছি আসতে সক্ষম হয় এবং নববর্ষের শুরুতে চুক্তি সম্পাদন করে। ইরান, তুরস্ক এবং রাশিয়ার মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সহায়তা পেলে বহু দিনের পুরনো নাগার্নো কারাবাখ সমস্যা যেটি আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে বহু যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে, সেটি মেটানোর শক্তি জোগাবে।
অন্তত রাশিয়া আর্মেনিয়াকে সামরিক সহায়তা প্রদান স্থগিত করবে। এটাও এক বড় প্রাপ্তি। সিরিয়ায় যেভাবে তুরস্ক-ইরান-রাশিয়া কাজ করছে, তেমিন উদ্যোগ এখানেও নেয়া হলে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান সৃষ্টি হতে পারে। ইরানি নৌচলাচলের ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান এই চাপ থেকে নিষ্কৃতি লাভের উপায় খুঁজছে। তাই নর্থ সাউথ করিডোর ইরানের নৌ ও বাণিজ্যতরী চলাচলের জন্য বিকল্প পথ হতে পারে। আজারবাইজান ট্রানজিট রুটের কাজও করতে পারে। যদিও এক বড় অংশ ইরানের, তথাপি আজারবাইজানের সহযোগিতাও ভালো ফল বয়ে আনতে পারে। করিডোর ভালোভাবে কাজ করতে পারলে আজারবাইজান ও রাশিয়ার আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা এবং এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশ সহজ ও অর্থবহ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তখন ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হবে। বাকেরি খুব চেষ্টা করছেন- উন্নত সম্পর্ক সৃষ্টি করে এর ফসল ঘরে তুলতে। বিশেষ করে এ মুহূর্তে আমেরিকার চাপ থেকে ইরানের নিষ্কৃতি পেতে করিডোর সহায়ক হবে এবং তখন পশ্চিমাদের একটি বার্তা দেয়াও সম্ভব হবে। উভয় দেশ সম্পর্কোন্নয়ন করে ভূরাজনৈতিক পরিবেশ পাল্টে দিতে সক্ষম হবে। উভয় দেশ যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে-এর মধ্যে আছে,পারস্পরিক সম্পর্কের আরো উন্নয়ন, সামরিক সহযোগিতা প্রসার, উভয় দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা, আঞ্চলিক অখ-তা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, নর্থ-সাউথ করিডোরের কাজ সম্পন্ন করে রেল, নৌপথও ও স্থলপথে বাণিজ্যের সম্প্রসারণ। নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে বিরোধে ইরান সবসময় আজারবাইজানের পক্ষে থাকবে বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। এটি আজারবাইজানের একটি বড় পাওনা।
এসব চুক্তির আগে গত বছর উভয় দেশ কাসপিয়ান সি চুক্তি সম্পাদন করে, যেখানে উভয়ের মালিকানা স্বীকৃত হয়। এই চুক্তির পর উভয় দেশের প্রচুর পর্যটক যাওয়া আসা শুরু করেছেন। একটি কথা বলে রাখা দরকার, কাসপিয়ান সাগর তেলে ভরপুর। লোকে বলে ‘পানির চেয়ে তেল বেশি। তাছাড়া, ইরান ও আজারবাইজানের মধ্যে যে সীমান্ত রয়েছে, সেখানে আজো কোনো সংঘর্ষ বা সীমান্ত বিরোধ দেখা যায়নি। উভয় দেশের সীমান্তে অনেক ইরানি বসবাস করছেন যাদের ভাষা তুর্কি ভাষার অনুরূপ। ইরানের এই সীমান্ত গোলযোগহীন ও শান্ত, যদিও ইরানের অন্যান্য সীমান্ত গোলযোগপূর্ণ। যেমন বলা যায়- ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের দখলদারি ইরানি সীমান্তেও নানা সমস্যার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তান সীমান্তে ইরানি সেনা নিখোঁজ হওয়া ও হত্যার ঘটনা লেগেই আছে। ইরান-আজারবাইজান সীমান্ত শান্ত থাকার কারণে কিছু উল্লেখযোগ্য বাঁধ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ার সাথে তুলনা করলে ককেশাস অঞ্চলে আজারবাইজান একটি স্থিতিশীল দেশ। তবে ইরানিরা ব্যবসায় ও অবসর কাটানোর জন্য জর্জিয়ায় বেশি যায়। জর্জিয়ার অনেক বদনাম আছে, ইরানিদের জন্য ভিসামুক্ত হলেও অনেক ইরানিকে জর্জিয়া থেকে বের করে দেয়া হয়েছে এবং অনেককে ঢুকতে বারণ করেছে। ইরানি ব্যবসায়ীদের ওপর অনেক অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এসব কারণে বলা যায়, আজারবাইজান শান্ত ও বন্ধুবৎসল। ২০১৮ সালে আর্মেনিয়ার ‘মখমল বিপ্লব’ও ইরানিদের আজারবাইজানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে ইন্ধন জুগিয়েছে। এর মধ্যে আজারবাইজান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনেক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পেরেছে, যা জর্জিয়া ও আর্মেনিয়ার জন্য পীড়াদায়ক।
মৌলিক কারণে দশকের পর দশক ইরান ও আজারবাইজান একমত হতে পারেনি।আর্মেনিয়া সরকারিভাবে নাগার্নো কারাবাখ প্রজাতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে তাদের সব ধরনের সহায়তা আর্মেনিয়া দিয়ে থাকে। রাাশিয়াও নিজের স্বার্থে স্বঘোষিত কারাবাখ প্রজাতন্ত্রকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। এখানকার সমস্যা ভূখ- সম্পর্কিত ও জাতিগত।
বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে ইরান, তুরস্ক এবং রাশিয়া নতুন অক্ষরূপে আবির্ভূত হয়েছে। ইরান, আজারবাইজান, তুরস্ক নিয়মিত এবং মাঝে মধ্যে রাশিয়ার কর্মকর্তারা মিলিত হয়ে রাজনৈতিক মঞ্চে একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছেন। মনে করা হচ্ছে, একটি ‘ল্যান্ড করিডোর’ প্রতিষ্ঠা করাই দেশ চতুষ্টয়ের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। যুক্তরাষ্ট্রের হাভার্ড কেনেডি স্কুলের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, লৌহ যবনিকার অন্তরালে থাকার কারণে আজারবাইজান দুই শ’ বছর বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। পাশের দেশ ইরানের সাথে সম্পর্ক তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশের মধ্যে ২১৮ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, উভয় দেশের সীমানা কাসপিয়ান সাগরেও রয়েছে। সেখান থেকে সহজেই বাণিজ্য ও রণতরী এই দু’দেশে যাতায়াত করতে পারে বিশ্বের দ্বিতীয় শিয়াপ্রধান দেশ হলো আজারবাইজান। এর বড় জনগোষ্ঠী তুর্কিভাষী। দেখা গেছে, তুর্কিভাষী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন কারণে সেখানে বঞ্চিতদের তালিকায়। শিয়া-সুন্নি বিরোধের কারণে এতদিন ইরানও এগিয়ে আসেনি; তুরস্কও এগোয়নি। ফলে সামগ্রিকভাবে মুসলমানরা বঞ্চিত হয়েছে, আর সুযোগটা কাজে লাগায় রাশিয়া ও আর্মেনিয়া এবং পাশ্চাত্য। তাই পারস্পরিক সহযোগিতা পেলে উভয় দেশ উপকৃত হবে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ১৯৭১-এর সেই ভয়াল রাত
  • স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম
  • মুক্তিযুদ্ধে পরদেশি বন্ধু সঙ্গীতশিল্পী
  • সড়ক দুর্ঘটনার দায় ও দায়িত্ব
  • সন্ত্রাসবাদের নির্মমতা ও বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ
  • একজন মারুফ জামানের ফিরে আসা
  • তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি
  • চোপড়া-জোলিরা কিসের বার্তা দিয়ে গেলেন?
  • জীবন থেকে নেওয়া
  • প্রাসঙ্গিক কথকতা
  • সিলেট বিভাগের শিল্পায়ন ও সম্ভাবনা
  • আমরা কি স্বাধীনতার অর্থ খুঁজি?
  • বৈশ্বিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ প্রয়োজন
  • হুমকির মুখে ভোলাগঞ্জ মহাসড়কের দশ নম্বর এলাকা
  • পাসপোর্ট ভোগান্তি
  • শিশুশিক্ষায় শাস্তি পরিহার বাঞ্ছনীয়
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  • ভোগবাদী বিশ্বায়ন বনাম লোকসংস্কৃতি
  • সমাবর্তনে শুভ কামনা
  • উন্নয়নে যুবসমাজের ভূমিকা
  • Developed by: Sparkle IT