ধর্ম ও জীবন

 আল্লাহকে পাওয়ার সহজ পথ

মোঃ আতাউর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৩-২০১৯ ইং ০১:২৫:২৮ | সংবাদটি ৩৬ বার পঠিত

সর্বকালের প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহ তা’আলার জন্য। যিনি অনস্তিত্ব থেকে সমস্ত সৃষ্টকে অস্তিত্বদান করেছেন। তবে তিনি সকল সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন মানুষকে আর বাকি সকল মাখলুককে তৈরি করেছেন শুধুমাত্র মানুষের কল্যাণের জন্য। আর এটি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের উপর সবচেয়ে বড় নেয়ামত। আর মানুষকে আল্লাহ তৈরি করেছেন একমাত্র তার নৈকট্য অর্জন করার জন্য। আর যেই নৈকট্য অর্জন করবে সেই সফল। তবে সেই নৈকট্য লাভের একমাত্র মাধ্যম হলো খোদাভীতি।
খোদাভীতি বলা হয়, অন্তরের এমন অবস্থাকে যার দ্বারা মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়। অন্তরে আল্লাহর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বদ্ধমূল হয়। আল্লাহর ভালোবাসা অন্তরে এমনভাবে জায়গা করে নেয় যে, মানুষ তার অসন্তুষ্টির কল্পনা করতেও কেঁপে ওঠে। মানুষ তার ভালোবাসায় একাকার হয়ে যায়। সে গুনাহ ও পাপের দিকে আর অগ্রসর হয় না।
ইমাম গাজালী (রহ.) বলেন, খোদাভীতির আরো ধরণ আছে। যেমন, নামাজে খোদাভীতি। আর নামাজের ভিতরের খোদাভীতিকে তুমা’নীনাহ বলা হয়। অর্থাৎ, নামাযকে এমন প্রশান্ত চিত্তে আদায় করা যে, প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গে শান্তি ও স্থিরতা আসা এবং তা দিলে আরকানের প্রতি খেয়াল রাখা। আর একেই বলা হয় জমে নামায পড়া। প্রশান্ত চিত্তে নামায পড়া। তার প্রমাণ মুহাম্মদ আরবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিসে রয়েছে। এক ব্যক্তি নামাযে দাঁড়িয়ে দাড়ির ভেতর আঙুল দিয়ে নড়াচড়া করছিল। এ দৃশ্য দেখে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ লোকটির অন্তরে যদি খোদাভীতি থাকতো তাহলে সে তার দাড়ি নিয়ে খেলতো না। তার হাত চুপ থাকতো।
আবার আল্লাহর যিকিরে খোদাভীতি :
মানুষ যখন যিকির করে, মোরাকাবাহ অবস্থায় থাকে, তখনও তার অন্তরে খুশু থাকে। তার ধরণ এমন হয় যে, অনেক সময় মানুষের মুখ থেকে আল্লাহর মুহব্বতে ‘আহ’ শব্দ বের হয়ে আসে। অনেক সময় শীতল নিঃশ্বাস গ্রহণ করে। অনেক সময় চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে। অনেক সময় শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায়। অনেক সময় শরীরে কম্পন সৃষ্টি হয়। অনেক সময় কেঁদে কেঁদে অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যায়।
সাধারণ মানুষের খোদাভীতি :
সাধারণ মানুষের ভয় এমন হয়ে থাকে যে, সে আল্লাহকে ভয় পায়। আবার সে ফেরেশতাকে ভয় পায়। কিয়ামতের দিনের অপমান অপদস্থতাকে ভয় পায়। আবার সে ভয় হিসাব নিকাশের মুহূর্তকে। সে ভয় পায় সেই সময়কে যেই সময় সূর্য অতি নিকটে চলে আসবে। এই সবের প্রতি লক্ষ্য রেখে সে ছেড়ে দেয় চুরি, ডাকাতি। এগুলো থেকে তাওবা করে, চিরতরে বিদায় জানায় সকল প্রকার অপকর্মকে। আর প্রতিটি মুহূর্তে তার চোখ দিয়ে আল্লাহর ভয়ে ঝরতে থাকে অশ্রু। আর এভাবেই সে গুনাহ থেকে বিরত থাকে।
আল্লাহ ও আলাদের অন্তরে খোদাভীতি :
আল্লাহ ওয়ালাদের ভীতির ধরন ভিন্ন। তাদের অন্তরে ভয়ঙ্কর বিষণœতার অবস্থা এই হয় যে, যদি আমি গুনাহ করি, আমার প্রতি আমার প্রতিপালক অসন্তুষ্ট হবেন। আর আল্লাহ তা’আলা যদি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন তাহলে আমার কোন উপায় নেই। যদিও আল্লাহ ওয়ালারা গুনাহের কাছেও যেতেন না তবুও তারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কান্না করে সারা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। তারা ইবাদত করতেন আর মনে মনে ভাবতেন আমার ইবাদত কবুল হচ্ছে কি না? তারা আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তিলাভ ও তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য রাতের পর রাত তাহাজ্জুদ পড়ে কান্নার বন্যা বইয়ে দিতেন।
এই জন্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, খোদাভীরু লোকদেরকে কবরে বলা হবেÑ ‘তোমরা নববরের মতো ঘুমিয়ে থাক’ (তিরমিযি-৯৯১)
সিদ্দিকে আকবর (রা.) এর অন্তরে খোদাভীরুতা :
হযরত আয়শা (রা.) বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন তিনি এমন কান্নাকাটি করতেন যে, ইমামতি করার সময় মুসল্লিগণ তাঁর কান্নার কারণে তিলাওয়াতের কিছুই বুঝতেন না।
হযরত ওমর (রা.) এর অন্তরে খোদাভীরুতা :
হযরত ওমর (রা.) ফজরের নামাযের ইমামতি করতেন। সেই সময় সূরা ইউসুফ তিলাওয়াত করতেন। তখন তিনি এত পরিমাণ কান্নাকাটি করতেন যে, জামায়াতের শেষ কাতার থেকে তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনা যেত।
কান্না হলো নৈকট্য অর্জনের সহজপন্থা : এ সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনÑ যে ব্যক্তি তার গুনাহের কথা স্মরণ করল এবং চোখ থেকে অশ্রু ঝরালো এর দ্বারা তার প্রভূ খুব বেশি খুশি হন। আর কান্না তৈরির মাধ্যম হলো খোদাভীতি। উভয় মিলে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। সবচেয়ে বেশি কান্নাকাটি করেছেন আম্বিয়ায়ে কেরাম। যার কারণে তাঁরা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় ছিলেন। যেমনÑ হযরত আদম (আ.) তিনশ’ বছর কেঁদেছিলেন। হযরত দাউদ (আ.) চল্লিশ বছর কেঁদেছিলেন।
হযরত ওমর (রা.) এতো বেশি কান্না কাটি করতেন যে, তার অধিক কান্নার কারণে গালে অশ্রু গড়ানোর দাগ পড়ে গিয়েছিল। হযরত হাসান বসরী (রহ.) এতো বেশি কাঁদতেন যে, তার অধিক কান্নার কারণে তার চোখের পানি জমিনে বয়ে যেত। হযরত রাবেয়া বসরী (রহ.) এতো বেশি কাঁদতেন যে, জমিনে তার কান্নার পানি জমে যেত। যার ফলে সেখানে ঘাষ পর্যন্ত গজাত।
কান্নাকাটির ফযিলত :
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোনো মানুষ যখন আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করে আর তার চোখ থেকে মাছির মাথার সমান অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তা’আলা তার এই অশ্রুর কারণে জাহান্নামের আগুন হারাম করেছেন। (ইবনে মাজাহ- ৪১৮৭, মিশকাত- ৫৩৫৯)
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর নিকট দু’টি ফোঁটা সবচেয়ে বেশি প্রিয়। ১. ঐ অশ্রুর ফোঁটা যা আল্লাহর ভয়ে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে। ২. ঐ রক্তের ফোঁটা যা জিহাদরত অবস্থায় মুজাহিদের শরীর থেকে গড়িয়ে পড়ে। (তিরমিযি, মিশকাত- ৩৭৩৮)
মোটকথা, আল্লাহর নৈকট্য লাভ ছাড়া মুক্তির কোনো উপায় নাই। আর সেই নৈকট্য অর্জন করতে হলে অবশ্যই তার আদেশ নিষেধ পালন করতে হবে ও তার প্রতি ভয় থাকতে হবে। তার ভয়ে প্রচুর পরিমাণ কাঁদতে হবে। সাথে সাথে তাঁর রহমতের আশা করতে হবে। সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম তাদের সিংহ ভাগ সময় কান্না কাটির মাঝে অতিক্রম করেছেন। যদিও তারা কখনো গুনাহের আশ পাশেও যেতেন না। তারপরও তাঁরা কেঁদেছেন। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, হে ঈমানদারগণ, তোমরা বেশি বেশি কাঁদো আর কম কম হাসো। যে সকল লোক আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করেছে তাঁরা সকলেই কান্নাকাটির মাধ্যমেই নৈকট্য অর্জন করেছে। আল্লাহ তা’আলা এ সকল লোকদেরকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। এই পন্থাই হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে তাঁর নৈকট্য অর্জন করার তৌফিক দান করুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT